বিকেলের আকাশে তখন মেঘ জমেছে। নদীর ওপার থেকে ভেসে আসছে নৌকার মাঝির গান। গ্রামের সরু পথ ধরে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছিল অরণ্য। তার হাতে একটি পুরোনো চিঠি, আর বুকের ভেতর জমে থাকা এক সমুদ্র নীরবতা।
চিঠিটা সে পেয়েছে আজ সকালে। কে রেখে গেছে, তা সে জানে না। খামের ওপর তার নাম লেখা—‘অরণ্য’।
অথচ এই নামে তাকে এখন আর কেউ ডাকে না।
শহরে দীর্ঘ দশ বছর কাটিয়ে অরণ্য ফিরে এসেছে নিজের গ্রামে। যে গ্রামে তার শৈশবের হাসি পড়ে আছে আমগাছের ডালে, যে গ্রামের মেঠোপথে একদিন খালি পায়ে দৌড়ে বেড়াত সে, যে নদীর ধারে বসে এক মেয়েকে বলেছিল, ‘একদিন আমি অনেক বড় হব, তারপর তোমাকে নিয়ে এই গ্রাম ছেড়ে চলে যাব।’
মেয়েটির নাম ছিল মেঘলা।
মেঘলা হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘বড় হওয়ার পর যদি আমাকে ভুলে যাও?’
অরণ্য উত্তর দিয়েছিল, ‘মানুষ কি নিজের ছায়াকে ভুলে যেতে পারে?
সেদিন কথাটা বলতে তার খুব সহজ লেগেছিল। মানুষ যখন ছোট থাকে, তখন ভবিষ্যৎকে নিজের ইচ্ছেমতো সাজানো যায় বলে বিশ্বাস করে। সে জানে না, সময় একদিন তার সবচেয়ে প্রিয় স্বপ্নগুলোর ওপরও ধুলো জমিয়ে দেবে।
অরণ্য নদীর ধারে এসে বসল। চিঠির খাম খুলে দেখল, ভেতরে মাত্র কয়েকটি লাইন।
‘অরণ্য,
তুমি ফিরে এসেছ শুনেছি। জানি না, এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছাবে কি না। জানালার পাশে বসে প্রতিদিন যে পথটার দিকে তাকিয়ে থাকতাম, সেই পথে এখন আর তোমার পায়ের শব্দ শোনা যায় না।
তবু কিছু অপেক্ষা শেষ হয় না। শুধু অপেক্ষা করতে করতে মানুষ একদিন চুপ হয়ে যায়।
তোমার মনে আছে, নদীর ধারে তুমি বলেছিলে, পৃথিবীর যেখানেই থাকো, একদিন ফিরে আসবে?
আমি সেই কথাটাকে অনেক বছর সত্যি ভেবেছিলাম।
ভালো থেকো।
—মেঘলা’
চিঠির শেষ লাইনটুকু পড়ে অরণ্য অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।
দশ বছর আগে সে গ্রাম ছেড়েছিল। শহরে পড়াশোনা, চাকরি, নিজের পরিচয় তৈরি করার ব্যস্ততায় একসময় চিঠি লেখা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রথমদিকে মেঘলা লিখত। অরণ্যও উত্তর দিত। তারপর উত্তরগুলো ছোট হতে হতে একসময় হারিয়ে গেল।
অরণ্য ভেবেছিল, জীবন এমনই। কিছু মানুষ পেছনে পড়ে থাকে, আর মানুষ সামনে এগিয়ে যায়।
কিন্তু আজ নদীর ধারে বসে তার মনে হলো, সামনে এগিয়ে যাওয়া আর পেছনে ফেলে আসা এক কথা নয়।
পরদিন সকালে সে মেঘলাদের বাড়িতে গেল।
বাড়িটা আগের মতো নেই। উঠানের এক কোণে শিউলিগাছটি বুড়ো হয়েছে। দেয়ালের রং উঠে গেছে, জানালার কাঠে জমেছে সময়ের দাগ। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অরণ্য ডাকল।
একজন বৃদ্ধা বেরিয়ে এলেন। মেঘলার মা।
তাকে দেখে বৃদ্ধা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘তুমি অরণ্য?’
অরণ্য মাথা নাড়ল।
বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘তুমি একটু দেরি করে ফেলেছ বাবা।
কথাটা শুনে অরণ্যের বুকের ভেতর কেমন যেন হয়ে গেল।
‘মেঘলা কোথায়, খালা?
বৃদ্ধা পাশের ঘর থেকে একটি ছোট বাক্স এনে তার হাতে দিলেন।
‘গত বছর ওর বিয়ে হয়েছে। এখন স্বামীর বাড়িতে থাকে। যাওয়ার আগে বলেছিল, তুমি কোনোদিন এলে বাক্সটা যেন তোমাকে দিই।
অরণ্য বাক্সটি খুলল।
ভেতরে অনেকগুলো পুরোনো চিঠি, শুকিয়ে যাওয়া শিউলি ফুল আর একটি ছবি। ছবিতে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছে দুজন কিশোর-কিশোরী। ছেলেটির চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন, মেয়েটির চোখে পৃথিবীর সমস্ত বিশ্বাস।
বাক্সের একেবারে নিচে একটি ছোট ডায়েরি ছিল।
অরণ্য পাতা উল্টাতে লাগল।
একটি পাতায় লেখা
‘মানুষকে ভালোবাসলে তাকে নিজের করে পাওয়াই কি শেষ কথা? হয়তো নয়। কখনো কখনো কাউকে ভালোবাসার অর্থ হলো, সে যেন নিজের জীবনে সুখী হতে পারে, সেই প্রার্থনা করা। তবু স্বীকার করতে লজ্জা নেই, কিছু সন্ধ্যায় মনে হয়—অরণ্য যদি একবার ফিরে আসত!
অরণ্য ডায়েরিটি বন্ধ করে দিল।
বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
সে বুঝতে পারল, মেঘলা তাকে ঘৃণা করেনি। অভিযোগও করেনি। সে শুধু নিজের জীবন নিয়ে এগিয়ে গেছে। অথচ অরণ্য এত দিন ধরে নিজের ব্যস্ততাকে জীবনের সাফল্য বলে ভেবেছে; একবারও বুঝতে পারেনি, তার নীরবতার ওপাশে কেউ একজন উত্তর পাওয়ার আশা নিয়ে বসে ছিল।
বৃষ্টি থামার পর অরণ্য আবার নদীর ধারে গেল।
নদীটি আগের মতোই বয়ে চলেছে। জল বদলেছে, তীর বদলেছে, বদলে গেছে নদীর পাশের মানুষগুলোও। অথচ নদী যেন কিছুই ভুলে যায়নি।
অরণ্য পকেট থেকে একটি সাদা কাগজ বের করল। লিখল
‘মেঘলা,
তোমার চিঠি পেয়েছি। উত্তর দিতে আমার দশ বছর লেগে গেল। জানি, কিছু উত্তর সময়মতো না পৌঁছালে আর কোনো কাজে আসে না।
তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। সেদিন আমি তোমাকে ছেড়ে যাইনি, আমি শুধু ভেবেছিলাম, ফিরে আসার জন্য অনেক সময় পড়ে আছে। আজ বুঝলাম, সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না।
তুমি ভালো থেকো। তোমার জীবনে যেন এমন কোনো সন্ধ্যা না আসে, যেদিন তোমাকে কারও ফিরে আসার আশায় জানালার পাশে বসে থাকতে হয়।
আর যদি কখনো নদীর ধারে আসো, মনে রেখো—একদিন এখানে দুজন মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল। তাদের স্বপ্ন পূরণ হয়নি, কিন্তু স্বপ্ন দেখার দিনগুলো মিথ্যে ছিল না।’
চিঠিটি ভাঁজ করে সে বাক্সের ভেতরে রেখে দিল। মেঘলাকে পাঠাবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নিতে পারল না।
কিছু কথা পাঠানোর জন্য লেখা হয় না। কিছু কথা মানুষ লেখে নিজের ভেতরে জমে থাকা অনুশোচনাকে একটি নাম দেওয়ার জন্য।
সন্ধ্যা নামল।
দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এল। নদীর ওপারে জ্বলে উঠল দু-একটি আলো। অরণ্য ধীরে ধীরে বাড়ির পথে হাঁটতে লাগল।
তার মনে হলো, জীবনে সব হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফিরে পেতে নেই। কেউ কেউ আমাদের জীবনে আসে, আমাদের বদলে দেয়, তারপর চলে যায়। তাদের রেখে যাওয়া শূন্যতাটুকুই একদিন আমাদের মানুষ করে তোলে।
বাড়ি ফেরার পথে সে একবার পেছনে তাকাল।
নদী তখনও বয়ে চলেছে।
শুধু নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দুটি কিশোর-কিশোরী আর কোথাও নেই।
আছে কেবল তাদের স্বপ্নের স্মৃতি—যা কোনো চিঠিতে পুরোপুরি লেখা যায় না, কোনো বিদায়ে পুরোপুরি শেষ হয় না।
আর আকাশের শেষ আলোটুকু নিভে যাওয়ার আগে অরণ্য প্রথমবারের মতো বুঝল—
কিছু মানুষকে আমরা হারাই না বিদায়ের দিনে; হারাই সেই দিন, যেদিন তাদের অপেক্ষাকে আমাদের জীবনের অংশ বলে ভাবা বন্ধ করে দিই।
সময় চলে যায়। মানুষও চলে যায়।
কিন্তু কোনো কোনো বিকেল, কোনো কোনো চিঠি, আর কোনো কোনো নাম—সারা জীবন মনের দরজায় নীরবে কড়া নেড়ে যায়।