শরতের শেষ বিকেল। গ্রামের আকাশে তখন সাদা মেঘের ভেলা, বাতাসে কাশফুলের নরম দোল আর দূরের নদীটায় পড়ন্ত রোদের সোনালি ছায়া। গ্রামের নাম শালিখাপুর। ছোট্ট একটি গ্রাম, চারদিকে ধানখেত, মাঝখান দিয়ে চলে গেছে মাটির রাস্তা, রাস্তার দুপাশে তালগাছ আর বাঁশঝাড়। গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি পুরোনো বটগাছ, তার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সরু নদী। বর্ষায় নদীটি ভরে ওঠে, আর শীতকালে তার বুকজুড়ে জেগে ওঠে বালুচর। এই গ্রামেই বাস করত নীলয়। বাবা মারা গেছেন ছোটবেলায়। মা আর একমাত্র ছোট বোনকে নিয়ে তাদের সংসার। অভাব ছিল নীলয়ের নিত্যসঙ্গী, কিন্তু স্বপ্নের অভাব ছিল না। গ্রামের বাজারে একটি ছোট বইয়ের দোকানে কাজ করত সে। সকালে দোকান খুলত, সারাদিন বই, খাতা, কলম বিক্রি করত, আর অবসর পেলেই কোনো পুরোনো বইয়ের পাতা উল্টে দেখত। তার একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল,প্রতিদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার আগে বটগাছের নিচে কিছুক্ষণ বসে থাকত। নদীর দিকে তাকিয়ে নিজের সঙ্গে কথা বলত। তার মনে হতো, নদীরও বুঝি মানুষের মতো অনেক কথা আছে, শুধু বলার ভাষা নেই। সেই গ্রামেরই মেয়ে নন্দিতা। সবাই তাকে নন্দী বলে ডাকত। তার বাবা গ্রামের একজন সাধারণ কৃষক। সংসারে সচ্ছলতা না থাকলেও মেয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। নন্দিতা ছিল গ্রামের স্কুলের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রীদের একজন। পড়াশোনার পাশাপাশি গান গাইতে ভালোবাসত। তার কণ্ঠে যখন রবীন্দ্রসংগীত কিংবা পুরোনো দিনের কোনো গান ভেসে আসত, তখন মনে হতো গ্রামের বিকেলটা আরও একটু দীর্ঘ হয়ে গেছে।
নন্দিতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল,সে নাকে একটি ছোট্ট সোনার নোলক পরত। নোলকটি তার মায়ের দেওয়া। নন্দিতার মা বহু বছর আগে অসুখে মারা গিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে মেয়ের হাতে নোলকটি দিয়ে বলেছিলেন, “এটা শুধু সোনা নয় মা, এটা আমার ভালোবাসার স্মৃতি। কখনো হারিয়ে ফেলিস না।” সেই থেকে নোলকটি নন্দিতার কাছে মায়ের স্মৃতির মতোই মূল্যবান। একদিন দুপুরে গ্রামের বাজারে বই কিনতে এসেছিল নন্দিতা। স্কুলের বাংলা বইয়ের সঙ্গে একটি গল্পের বইও নিতে চেয়েছিল সে। দোকানে তখন নীলয় একা। নন্দিতা দোকানে ঢুকে বলল, “ভাইয়া, জীবনানন্দ দাশের কোনো কবিতার বই আছে?” নীলয় তাকিয়ে দেখল মেয়েটিকে। পরিচিত মুখ, কিন্তু কখনো কথা হয়নি। সে তাক থেকে একটি বই নামিয়ে দিয়ে বলল, “আছে। তবে কবিতা পড়তে ভালোবাসেন বুঝি?” নন্দিতা হেসে বলল, “কবিতা পড়তে ভালো লাগে। মনে হয়, কিছু কথা আছে, যেগুলো মানুষ সরাসরি বলতে পারে না, কবিতায় বলে।” নীলয় কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “ঠিক বলেছেন। কিছু অনুভূতির জন্য মানুষের ভাষা যথেষ্ট নয়।” সেদিনের কথোপকথন খুব দীর্ঘ ছিল না। নন্দিতা বই কিনে চলে গিয়েছিল।
কিন্তু নীলয়ের মনে মেয়েটির কথাগুলো রয়ে গেল। বিশেষ করে সেই শেষ বাক্যটি,কিছু অনুভূতির জন্য মানুষের ভাষা যথেষ্ট নয়। এরপর থেকে নন্দিতা প্রায়ই বইয়ের দোকানে আসত। কখনো খাতা কিনতে, কখনো গল্পের বই নিতে, কখনো বা শুধু নতুন কোনো বই এসেছে কি না জানতে। নীলয়ও তার জন্য বই আলাদা করে রাখত। কোনো বই ভালো লাগলে নন্দিতাকে পড়তে দিত। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হলো। কথা হতো বই নিয়ে, নদী নিয়ে, বৃষ্টির দিন নিয়ে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে। নন্দিতা বলত, সে বড় হয়ে শিক্ষক হতে চায়। গ্রামের মেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করতে চায়। নীলয় বলত, একদিন সে নিজের একটা বড় বইয়ের দোকান করবে, যেখানে গ্রামের ছেলেমেয়েরা বসে বিনা পয়সায় বই পড়তে পারবে। নন্দিতা হাসত। বলত, “তাহলে তোমার দোকানের নাম হবে স্বপ্নের পাঠশালা।” নীলয় বলত, “আর সেই পাঠশালার প্রথম ছাত্রী হবে তুমি।”
এমন করেই দিন কাটছিল। একদিন বিকেলে হঠাৎ বৃষ্টি নামল। আকাশ কালো করে মেঘ জমেছিল, কিন্তু কেউ ভাবেনি এত জোরে বৃষ্টি হবে। নন্দিতা স্কুল থেকে ফিরছিল। বাজারের কাছে এসে বৃষ্টির মধ্যে আটকে গেল। নীলয় দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে দেখে বলল, “ভেতরে আসুন, বৃষ্টি থামলে যাবেন।” নন্দিতা দোকানের ভেতরে এসে দাঁড়াল। বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি, টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ। দোকানে তখন আর কোনো ক্রেতা নেই। নীলয় চা আনতে গেল পাশের দোকান থেকে। দুজন পাশাপাশি বসে চা খেল। নন্দিতা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “বৃষ্টি হলে আমার মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। মা বৃষ্টির দিনে পিঠা বানাতেন। আমি জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখতাম।” নীলয় ধীরে বলল, “আমারও মায়ের কথা মনে পড়ে। বাবা মারা যাওয়ার পর মা কত কষ্ট করে আমাদের মানুষ করেছেন। মাঝে মাঝে মনে হয়, মায়ের জন্য কিছুই করতে পারলাম না।” নন্দিতা তার দিকে তাকাল। সেই প্রথম সে নীলয়ের চোখে এমন এক নীরব কষ্ট দেখল, যা কোনো শব্দে প্রকাশ করা যায় না।
সেদিন বৃষ্টি থামার পরও তারা কিছুক্ষণ দোকানে বসেছিল। তারপর নন্দিতা বাড়ি ফিরে গেল। যাওয়ার আগে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল, “নীলয়, তোমার সঙ্গে কথা বললে মনে হয়, অনেক দিনের চেনা কেউ।” নীলয় কোনো উত্তর দিতে পারেনি। শুধু তাকিয়ে ছিল। সেই রাতেই নীলয় বুঝতে পারল, নন্দিতার জন্য তার মনে অন্যরকম একটা অনুভূতি জন্ম নিয়েছে। কিন্তু সে অনুভূতির নাম দিতে ভয় পাচ্ছিল। কারণ সে জানত, তার জীবনে অভাব আছে, দায়িত্ব আছে, অনিশ্চয়তা আছে। সে কি কাউকে ভালোবাসার স্বপ্ন দেখার অধিকার রাখে? অন্যদিকে নন্দিতার মনেও পরিবর্তন আসছিল। সে এখন বইয়ের দোকানে যাওয়ার অজুহাত খুঁজত। নতুন কোনো বই না এলেও পুরোনো বইয়ের কথা জানতে চাইত। নীলয়ের সঙ্গে কথা না হলে তার দিনটা অসম্পূর্ণ মনে হতো। কিন্তু কেউ কাউকে কিছু বলত না। গ্রামের মানুষ অবশ্য অনেক কিছুই বুঝতে শুরু করেছিল। একদিন নন্দিতার বান্ধবী রূপা তাকে বলল, “তুই কি নীলয়কে পছন্দ করিস?” নন্দিতা লজ্জা পেয়ে বলল, “এসব কী বলিস!” রূপা হেসে বলল, “তোর চোখ কিন্তু সব বলে দেয়।”
নন্দিতা সেদিন কোনো উত্তর দেয়নি। শুধু বাড়ি ফেরার পথে বারবার নিজের নোলকটিতে হাত দিয়েছিল। শীতের শুরুতে গ্রামের স্কুলে বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলো। নন্দিতা গান গাইবে। নীলয়ও দর্শকদের মধ্যে বসে ছিল। নন্দিতা মঞ্চে উঠে গান শুরু করল। তার কণ্ঠে ভেসে এল এক বিষণ্ন সুর। নীলয় মনে মনে ভাবল, এই মেয়েটি যদি কোনোদিন তার জীবনের অংশ হয়ে যায়, তবে পৃথিবীর সব অভাব হয়তো এতটা কষ্ট দেবে না। অনুষ্ঠান শেষে নন্দিতা তার কাছে এসে বলল, “গানটা কেমন হলো?” নীলয় বলল, “খুব সুন্দর।” নন্দিতা মৃদু হেসে বলল, “শুধু সুন্দর?” নীলয় একটু থেমে বলল, “কিছু গান শুনলে মনে হয়, নিজের মনের কথাই কেউ গেয়ে দিচ্ছে।” নন্দিতা তার দিকে তাকিয়ে রইল। দুজনের চোখে এমন কিছু কথা ছিল, যা মুখে বলা হয়নি। এরপর একদিন নীলয় সাহস করে নন্দিতাকে নদীর ধারে ডাকল।
বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। নদীর পাড়ে বসে নীলয় বলল, “নন্দিতা, একটা কথা বলব?” নন্দিতা বলল, “বলো।” নীলয় অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তুমি আমার জীবনে আসার পর থেকে অনেক কিছু বদলে গেছে। আগে সন্ধ্যা হলেই বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করত। এখন মনে হয়, দিনটা একটু দীর্ঘ হলে ভালো হতো। আগে বইয়ের পাতায় গল্প খুঁজতাম, এখন তোমার সঙ্গে কথা বলার মধ্যে গল্প খুঁজে পাই।” নন্দিতা চুপ করে শুনছিল। নীলয় আবার বলল, “আমি জানি, আমার খুব বেশি কিছু নেই। একটা ছোট চাকরি, অসুস্থ মা, সংসারের দায়িত্ব। তোমাকে দেওয়ার মতো বড় কোনো প্রতিশ্রুতি আমার নেই। তবু তোমাকে ভালো লাগে। খুব ভালো লাগে।” নন্দিতার চোখে জল চিকচিক করে উঠল। সে ধীরে বলল, “সব ভালোবাসার শুরু কি সম্পদের হিসাব দিয়ে হয়, নীলয়? তোমার কাছে যা নেই, তা নিয়ে আমি ভাবিনি। আমি শুধু জানি, তোমার সঙ্গে কথা বললে আমার মন ভালো হয়ে যায়।” নীলয় যেন দীর্ঘদিনের জমে থাকা কোনো ভার থেকে মুক্তি পেল।
সেদিন নদীর পাড়ে তাদের ভালোবাসার শুরু হলো। কোনো আড়ম্বর ছিল না, কোনো সাক্ষী ছিল না, কোনো প্রতিজ্ঞার আয়োজন ছিল না। শুধু দুটি মানুষ, একটি নদী আর হেমন্তের মৃদু বাতাস। নন্দিতা সেদিন নোলকটি ছুঁয়ে বলেছিল, “জানো, এই নোলকটা আমার মায়ের শেষ স্মৃতি। মা বলতেন, ভালোবাসা কখনো জোর করে ধরে রাখতে নেই। ভালোবাসাকে যত্ন করতে হয়।” নীলয় বলেছিল, “আমি তোমার এই কথাটা মনে রাখব।” এরপর তাদের দিনগুলো যেন অন্যরকম হয়ে উঠল। দেখা হতো কখনো বাজারে, কখনো স্কুলের পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে, কখনো নদীর পাড়ে। নীলয় নন্দিতাকে বই উপহার দিত। নন্দিতা নীলয়ের জন্য নিজের হাতে বানানো বুকমার্ক নিয়ে আসত। বুকমার্কে ছোট করে লেখা থাকত,‘স্বপ্নের পাঠশালার জন্য।’ নীলয় বুকমার্কটি তার সবচেয়ে প্রিয় বইয়ের ভেতর রেখে দিত। একদিন নন্দিতা বলল, “নীলয়, তুমি কি কখনো শহরে যাবে?” নীলয় বলল, “কেন?” নন্দিতা বলল, “তোমার বইয়ের দোকানটা বড় করতে হলে শহরে গিয়ে কিছু কাজ শেখা দরকার। তুমি চেষ্টা করতে পারো।” নীলয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “মাকে রেখে কীভাবে যাব? বোনের পড়াশোনাও আছে।” নন্দিতা বলল, “আমি চাই তুমি নিজের স্বপ্নটাও পূরণ করো। শুধু দায়িত্ব পালন করতে করতে নিজের জীবনটাকে হারিয়ে ফেলো না।” নীলয় তার কথার গভীরতা বুঝেছিল। কিন্তু তখনই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।
এর কিছুদিন পর গ্রামের পরিবেশ বদলে গেল। নন্দিতার বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা প্রয়োজন। সংসারের অবস্থা এমনিতেই ভালো ছিল না। নন্দিতার পড়াশোনা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। সে নীলয়কে কিছু জানায়নি। কিন্তু নীলয় খবর পেয়ে একদিন তাদের বাড়িতে গেল। নন্দিতার বাবা তাকে দেখে বললেন, “বাবা, তুমি তো নন্দিতার সঙ্গে পড়াশোনার কথা বলো। মেয়েটাকে বুঝিয়ো, এখন সংসারের অবস্থা ভালো নয়।” নীলয় বুঝতে পারল, নন্দিতার জীবনে বড় সংকট এসেছে। সে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু টাকা দিতে চাইল। নন্দিতা প্রথমে নিতে রাজি হয়নি। বলেছিল, “তোমার নিজের সংসার আছে। আমি তোমার কাছ থেকে টাকা নিতে পারব না।” নীলয় বলেছিল, “এটা ধার নয়, সাহায্যও নয়। আমরা তো একে অপরের স্বপ্নের কথা জানি। তোমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলে আমারও খারাপ লাগবে।” অনেক অনুরোধের পর নন্দিতা টাকাটা নিয়েছিল। কিন্তু সে বুঝতে পারছিল, তাদের সামনে পথ সহজ নয়। গ্রামের মানুষও তাদের সম্পর্ক নিয়ে নানা কথা বলতে শুরু করেছিল।
একদিন নন্দিতার চাচা বাড়িতে এসে বললেন, “মেয়ের বিয়ে দেওয়ার বয়স হয়েছে। বেশি পড়াশোনা করে কী হবে? ভালো ঘর থেকে প্রস্তাব এসেছে।” নন্দিতার বাবা অসুস্থ, সংসারের অভাব, আত্মীয়দের চাপ,সব মিলিয়ে তিনি দ্বিধায় পড়ে গেলেন। প্রস্তাবটি ছিল পাশের উপজেলার এক ব্যবসায়ীর ছেলের। ছেলেটির পরিবার সচ্ছল। তারা নন্দিতাকে পছন্দ করেছে। নন্দিতা যখন বিষয়টি জানতে পারল, তখন তার পৃথিবী যেন থমকে গেল। সে বাবার কাছে গিয়ে বলল, “বাবা, আমি এখন বিয়ে করতে চাই না। আমার পড়াশোনা শেষ করতে চাই।” বাবা ক্লান্ত গলায় বললেন, “মা, আমি তোকে কষ্ট দিতে চাই না। কিন্তু সংসারের অবস্থাও তো বুঝিস। তোর ভবিষ্যৎটা নিরাপদ হোক, সেটাই চাই।” নন্দিতা বুঝতে পারল, বাবার অসহায়ত্বের সামনে তার ভালোবাসার কথা বলা কঠিন। সে নীলয়ের সঙ্গে দেখা করল। নদীর ধারে সেদিন অনেকক্ষণ কেউ কথা বলেনি। শেষে নন্দিতা বলল, “আমার বিয়ের কথা চলছে।” নীলয়ের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে বলল, “তুমি কী বলেছ?” নন্দিতা বলল, “আমি রাজি নই। কিন্তু বাবাকে কীভাবে বোঝাব?” নীলয় বলল, “আমাকে কিছুদিন সময় দাও। আমি কাজের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি। শহরে একটা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে পরিচিত একজন আছেন। কথা বলব। কিছু টাকা জমাতে পারলে তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলতে যাব।” নন্দিতা তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কি পারবে?” নীলয় উত্তর দিল, “আমি চেষ্টা করব। তোমার জন্য নয় শুধু, আমাদের স্বপ্নের জন্য।”
এরপর নীলয় দিনরাত পরিশ্রম শুরু করল। দোকানের কাজের পাশাপাশি সন্ধ্যায় কয়েকজন ছাত্রকে পড়াতে লাগল। নিজের প্রয়োজন কমিয়ে টাকা জমাতে লাগল। তার মা ছেলের পরিবর্তন লক্ষ করলেন। একদিন জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, তুই কি কারও জন্য এত কষ্ট করছিস?” নীলয় মৃদু হেসে বলল, “মা, একদিন তোমাকে সব বলব।” মা ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন, “যার জন্য করিস, সে যেন তোর কষ্টের মর্যাদা দেয়।” এদিকে নন্দিতার বিয়ের আলোচনা দ্রুত এগোতে লাগল। প্রস্তাবের পরিবার বারবার যোগাযোগ করছিল। নন্দিতা পড়াশোনায় মন দিতে পারছিল না। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে নদীর পাড়ে গিয়ে বসত। নীলয়ের দেওয়া বুকমার্কটি হাতে নিয়ে ভাবত, তাদের স্বপ্নের পাঠশালা কি কোনোদিন সত্যি হবে? কয়েক সপ্তাহ পর নীলয় শহরে যাওয়ার সুযোগ পেল। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের একজন তাকে সহকারী হিসেবে কাজ দেওয়ার আশ্বাস দিলেন। বেতন খুব বেশি নয়, কিন্তু ভবিষ্যতে উন্নতির সুযোগ আছে। নীলয় আনন্দে নন্দিতাকে খবর দিতে গেল।
কিন্তু সেদিন নন্দিতার বাড়িতে গিয়ে সে জানতে পারল, নন্দিতার বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গেছে। আর মাত্র পনেরো দিন বাকি। নীলয় যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে নন্দিতার বাবার সঙ্গে দেখা করতে চাইল। অসুস্থ মানুষটি তাকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বাবা, তুই ভালো ছেলে। কিন্তু আমার মেয়েকে আমি অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখতে পারব না। ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি ভয় পাই। আমার হাতে সময়ও বেশি নেই। আমি চাই ও একটা নিরাপদ সংসার পাক।” নীলয় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সে বলতে চেয়েছিল, নন্দিতার নিরাপত্তার জন্য সে সবকিছু করবে। কিন্তু তার কাছে এমন কোনো নিশ্চয়তা ছিল না, যা একজন অসহায় বাবার ভয় দূর করতে পারে।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে নীলয় সরাসরি নদীর পাড়ে গেল। নন্দিতা সেখানে অপেক্ষা করছিল। নীলয়কে দেখে সে বলল, “তুমি খবর পেয়েছ?” নীলয় মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ।” নন্দিতার চোখ ভিজে উঠল। সে বলল, “আমি বাবাকে কষ্ট দিতে পারছি না, নীলয়। বাবা সারাজীবন আমার জন্য কষ্ট করেছেন। তাঁর শেষ বয়সে আমি তাঁর বিরুদ্ধে যেতে পারব না।” নীলয় বলল, “তাহলে আমাদের এত স্বপ্ন?” নন্দিতা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, “স্বপ্ন সব সময় পূরণ হয় না। কিন্তু তাই বলে স্বপ্ন মিথ্যে হয়ে যায় না।” নীলয় পকেট থেকে একটি ছোট বাক্স বের করল। বাক্সের ভেতরে ছিল একটি ছোট রুপার নোলক। সে বলল, “তোমার নোলকটা তোমার মায়ের স্মৃতি। আমি জানি, সেটার জায়গা কেউ নিতে পারবে না। এটা আমার পক্ষ থেকে একটা ছোট উপহার। তুমি রাখবে?” নন্দিতা বাক্সটি হাতে নিয়ে কাঁদতে লাগল। বলল, “আমার নোলকের পাশে এটা রাখব। কিন্তু তুমি আমাকে ভুলে যেও না।” নীলয় বলল, “মানুষ কি চাইলেই ভুলতে পারে?”
সেদিন তারা শেষবারের মতো নদীর পাড়ে বসেছিল। আকাশে তখন পূর্ণিমার চাঁদ। নদীর জলে চাঁদের আলো ভেঙে ভেঙে পড়ছিল। দূরে কোনো বাড়ি থেকে ভেসে আসছিল ভাটিয়ালি গান। নন্দিতা নিজের নাকের নোলকটি ছুঁয়ে বলল, “জানো, মা বলতেন, নোলক মেয়েদের মুখের সৌন্দর্য বাড়ায়। কিন্তু আমার মনে হয়, নোলক আসলে স্মৃতি ধরে রাখে। এই ছোট্ট জিনিসটার মধ্যে মায়ের ভালোবাসা আছে, আর আজ থেকে তোমার দেওয়া স্মৃতিও থাকবে।” নীলয় কোনো কথা বলল না। শুধু নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। পনেরো দিন পর নন্দিতার বিয়ে হয়ে গেল। গ্রামের মানুষ খেতে গেল, বাড়ি আলোয় সাজানো হলো, উঠানে প্যান্ডেল পড়ল, মাইকে গান বাজল। সবাই বলল, মেয়েটির ভাগ্য ভালো, সচ্ছল ঘরে বিয়ে হচ্ছে। কিন্তু বিয়ের সাজে বসে নন্দিতা বারবার নিজের নোলকটির দিকে তাকাচ্ছিল। তার পাশে ছোট বাক্সে রাখা ছিল নীলয়ের দেওয়া রুপার নোলকটি। সে সেটি পরেনি। শুধু মায়ের নোলকটি পরে বিদায়ের সময় বাবার হাত ধরে কেঁদেছিল।
নীলয় সেদিন গ্রামের বাইরে ছিল। সে শহরে চলে গিয়েছিল কাজের সন্ধানে। যাওয়ার আগে মায়ের হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলেছিল, “মা, আমি কয়েক মাস পর ফিরব।” মা বুঝেছিলেন, ছেলের মন ভেঙেছে। কিন্তু তিনি কিছু বলেননি। শুধু বলেছিলেন, “যেখানেই থাকিস, নিজের যত্ন নিস।” শহরের জীবন নীলয়ের জন্য সহজ ছিল না। ছোট একটি ঘরে আরও কয়েকজনের সঙ্গে থাকত সে। সকালে কাজে যেত, রাতে ফিরত। বইয়ের দোকানের স্বপ্নটা সে ভুলে যায়নি। কিন্তু নন্দিতার স্মৃতি তাকে প্রায়ই পিছু টানত। কোনো বইয়ের পাতায় নতুন কবিতা পড়লে মনে হতো, নন্দিতা থাকলে নিশ্চয়ই ভালো লাগত। বৃষ্টির দিনে টিনের চালের শব্দ শুনলে মনে পড়ত সেই বিকেলের কথা। কোনো মেয়ে নাকে নোলক পরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে সে অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে থাকত।
একদিন শহরের একটি বইয়ের দোকানে কাজ করতে গিয়ে সে একটি পুরোনো বইয়ের ভেতর শুকনো শিউলি ফুল পেল। ফুলটি দেখে তার মনে পড়ল, নন্দিতা একদিন বলেছিল, “শিউলি ফুলের সৌন্দর্য বেশি সময় থাকে না, কিন্তু তার গন্ধ অনেকক্ষণ মনে থাকে।” নীলয় বইটি কিনে নিজের ঘরে নিয়ে গেল। সেই রাতেই সে অনেকদিন পর ডায়েরি খুলে লিখল, “কিছু মানুষ জীবনে থাকে না, তবু তাদের জন্য মনের ভেতর একটি জায়গা চিরকাল খালি পড়ে থাকে।” এদিকে নন্দিতার নতুন সংসার শুরু হয়েছিল। স্বামী রাশেদ মন্দ মানুষ ছিল না, তবে নন্দিতার মনের ভাষা বোঝার মতো সংবেদনশীলতাও তার ছিল না। সে ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকত। নন্দিতা সংসারের কাজ করত, শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনা করত। কিছুদিন পর সে আবার পড়াশোনা শুরু করার কথা বলেছিল। কিন্তু রাশেদের পরিবার বলেছিল, “এখন সংসার সামলাও। পরে দেখা যাবে।” পরে আর সেই সময় আসেনি।
নন্দিতা প্রায়ই রাতে জানালার পাশে বসে গ্রামের কথা ভাবত। বাবার কথা, নদীর কথা, বটগাছের কথা, আর সেই বইয়ের দোকানের কথা। তার কাছে নীলয়ের দেওয়া রুপার নোলকটি ছিল একটি ছোট বাক্সে। মাঝে মাঝে বাক্সটি খুলে দেখত। কাউকে কিছু বলত না। বছর ঘুরে গেল। নন্দিতার বাবা একদিন অসুস্থ হয়ে মারা গেলেন। খবর পেয়ে নন্দিতা গ্রামের বাড়িতে এসেছিল। বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল। নীলয়ও তখন গ্রামে ফিরেছিল মাকে দেখতে। বহু বছর পর তাদের দেখা হলো। গ্রামের রাস্তার মোড়ে, পুরোনো বটগাছের কাছে। নন্দিতা পরেছিল সাদা-লাল শাড়ি, নাকে সেই পুরোনো সোনার নোলক।
নীলয়কে দেখে সে থমকে দাঁড়াল। নীলয় বলল, “কেমন আছ?” নন্দিতা মৃদু হাসল। “ভালো আছি। তুমি?” “চলছে।” দুজনের মাঝখানে দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল। এত কথা জমে ছিল, অথচ বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পাওয়া গেল না। নন্দিতা বলল, “তোমার বইয়ের দোকান হয়েছে?” নীলয় হেসে বলল, “হয়েছে। ছোট্ট একটা দোকান। নাম দিয়েছি ‘স্বপ্নের পাঠশালা’।” নন্দিতার চোখে জল চলে এল। সে বলল, “সত্যি?” নীলয় মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ। গ্রামের বাচ্চারা সেখানে বসে বই পড়ে। কেউ বই কিনতে না পারলেও পড়তে পারে।” নন্দিতা বলল, “তাহলে তোমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।” নীলয় একটু থেমে বলল, “সব স্বপ্ন নয়।” নন্দিতা বুঝতে পারল, সে কোন স্বপ্নের কথা বলছে। কিন্তু তাদের জীবনের পথ এখন আলাদা। নন্দিতা আর কোনো কথা বলল না। শুধু নিজের নোলকটি ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এরপর কয়েক বছর কেটে গেল। নীলয়ের দোকান ধীরে ধীরে বড় হলো। গ্রামের ছেলেমেয়েরা সেখানে পড়তে আসত। নীলয় তাদের বই পড়তে উৎসাহ দিত। সে কখনো কাউকে জিজ্ঞেস করত না, বই কেনার টাকা আছে কি না। তার বিশ্বাস ছিল, বইয়ের দরজা সবার জন্য খোলা থাকা উচিত।
নন্দিতাও একসময় নিজের সংসারের দায়িত্বের পাশাপাশি গ্রামের মেয়েদের পড়াশোনায় সাহায্য করতে শুরু করেছিল। স্বামীর সঙ্গে তার সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ না হলেও সে নিজের ভেতরের মানুষটিকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। গ্রামের বাড়িতে এলে মেয়েদের পড়াত, বই দিত, স্কুলে যেতে উৎসাহ দিত। একদিন নন্দিতা নীলয়ের দোকানে এল। সঙ্গে ছিল কয়েকটি বই। বলল, “এই বইগুলো মেয়েদের জন্য। যারা কিনতে পারে না, তাদের পড়তে দিও।” নীলয় বইগুলো হাতে নিয়ে বলল, “তুমি নিজে পড়াবে?” নন্দিতা বলল, “হ্যাঁ। ভাবছি, সপ্তাহে দুদিন মেয়েদের নিয়ে বসব।” নীলয় তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, তাদের বহু বছরের পুরোনো স্বপ্নটি অন্য এক পথে ফিরে এসেছে। সে বলল, “তাহলে আমাদের স্বপ্নের পাঠশালা সত্যিই পূর্ণ হলো।” নন্দিতা মৃদু হেসে বলল, “হয়তো কিছু স্বপ্ন মানুষ নিজের মতো করে পূরণ করতে পারে না, কিন্তু সময় অন্যভাবে পূরণ করে দেয়।”
সেদিন দোকান থেকে বের হওয়ার সময় নন্দিতার নোলকটি হঠাৎ খুলে মাটিতে পড়ে গেল। নীলয় দ্রুত তুলে নিয়ে তার হাতে দিল। নোলকটি হাতে নিয়ে নন্দিতা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। বলল, “এখনো মায়ের স্মৃতি ধরে রেখেছি।” নীলয় বলল, “আর রুপার নোলকটা?” নন্দিতা একটু থেমে বলল, “সেটাও আছে। হারাইনি।” নীলয় আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। নন্দিতা চলে গেল। দোকানের দরজায় দাঁড়িয়ে নীলয় অনেকক্ষণ তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, কিছু সম্পর্কের কোনো নাম থাকে না, কোনো সামাজিক স্বীকৃতি থাকে না, তবু তারা মানুষের জীবনের গভীরে থেকে যায়।
সেদিন রাতে নীলয় দোকান বন্ধ করে ডায়েরি খুলল। বহুদিন পর লিখল, “নোলকটি ছোট, অথচ তার ভেতরে কত বড় স্মৃতি লুকিয়ে থাকে! এক নোলকে মায়ের ভালোবাসা, অন্য নোলকে এক অসমাপ্ত স্বপ্ন। মানুষ হয়তো জীবনে সবকিছু পায় না। কিন্তু না-পাওয়ার মধ্যেও কিছু পাওয়া থাকে,একটি সুন্দর স্মৃতি, কিছু সত্যিকারের অনুভূতি, আর এমন একজন মানুষ, যার কথা মনে পড়লে আজও হৃদয়ের ভেতর নীরব নদী বয়ে যায়।” পরদিন সকালে নন্দিতা আবার স্কুলের মেয়েদের নিয়ে নীলয়ের দোকানে এল। মেয়েরা বই দেখে আনন্দে মেতে উঠল। কেউ কবিতার বই নিল, কেউ গল্পের বই, কেউ খাতা-কলম। নন্দিতা তাদের বলল, “তোমরা সবাই পড়বে। নিজের পায়ে দাঁড়াবে। কারও স্বপ্ন যেন অভাবের কাছে হার না মানে।” নীলয় দূর থেকে কথাগুলো শুনছিল। তার মনে হলো, নন্দিতা আজও সেই আগের মেয়েটিই আছে,যে একদিন বলেছিল, বড় হয়ে গ্রামের মেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করবে। শুধু সময় তাদের বদলে দিয়েছে, সম্পর্কের পরিচয় বদলে দিয়েছে, কিন্তু তাদের স্বপ্নের ভিতটা ভাঙতে পারেনি।
বিকেলের দিকে নন্দিতা বাড়ি ফিরে গেল। যাওয়ার আগে দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, “নীলয়, একটা কথা বলব?” নীলয় বলল, “বলো।” নন্দিতা বলল, “তুমি কি এখনো কবিতা পড়ো?” নীলয় হেসে বলল, “পড়ি। মাঝে মাঝে লিখিও।” “আমাকে একদিন তোমার লেখা কবিতা শোনাবে?” নীলয় বলল, “অবশ্যই।” নন্দিতা চলে গেল। নীলয় জানত, তাদের জীবনে আর কোনো নতুন অধ্যায় শুরু হবে না। তবু তার মনে হলো, গল্পটি একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। কারণ ভালোবাসা সব সময় একসঙ্গে থাকার নাম নয়। কখনো কখনো ভালোবাসা মানে দূরে থেকেও কারও স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা, কারও স্মৃতিকে সম্মান করা, কারও জীবনের ভালো কাজের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা।
কয়েক দিন পর নীলয় একটি কবিতা লিখল। কবিতার নাম দিল ‘নোলক’। সেখানে সে লিখল,একটি ছোট্ট নোলকের ভেতর লুকিয়ে আছে একটি গ্রামের বিকেল, নদীর পাড়ে বসে থাকা দুটি মানুষ, কিছু না-বলা কথা, আর সময়ের কাছে হার মেনে নেওয়া এক অসমাপ্ত ভালোবাসা। কবিতাটি সে নন্দিতাকে দিল। নন্দিতা কবিতাটি পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নিজের নোলকটি ছুঁয়ে মৃদুস্বরে বলল, “কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না, নীলয়।” বাইরে তখন হেমন্তের বাতাস বইছে। ধানখেতে সোনালি শিষ দুলছে। দূরের নদী বয়ে চলেছে আপন গতিতে। গ্রামের আকাশে সন্ধ্যার পাখিরা ঘরে ফিরছে। আর শালিখাপুরের সেই পুরোনো বটগাছের নিচে পড়ে আছে দুটো মানুষের বহু বছরের না-বলা গল্প। হয়তো কোনোদিন কেউ জানবে না, একটি সোনার নোলক আর একটি রুপার নোলক কীভাবে দুটি মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অথচ অসমাপ্ত অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে ছিল। কিন্তু নীলয় জানে, নন্দিতা জানে। তাদের কাছে নোলক আর অলংকার নয়; সেটি এক জীবনের স্মৃতি, এক মায়ের আশীর্বাদ, এক তরুণের স্বপ্ন, এক মেয়ের নীরব ভালোবাসা এবং সময়ের কাছে হার না মানা এক অনুভূতির নাম। জীবনের সব ভালোবাসা ঘর পায় না, সব অপেক্ষার শেষ হয় না, সব স্বপ্নের ঠিকানা মেলে না। তবু কিছু ভালোবাসা মানুষের ভেতরে থেকে যায়, নদীর মতো,কখনো দৃশ্যমান, কখনো অদৃশ্য, কিন্তু কখনোই পুরোপুরি শুকিয়ে যায় না। আর সেই ভালোবাসারই নাম,নোলক।