Story

স্বপ্নেরও কিস্তি থাকে

November 1, 2026

7 views

মাসের দশ তারিখের মধ্যে মানুষের রক্তচাপ স্বাভাবিক নিয়মে বাড়ার কোনো চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা হয়তো নেই, কিন্তু মধ্যবিত্ত জীবনে এর চেয়ে অকাট্য সত্যি আর কিছুই হতে পারে না। নিয়াজ সাহেবের মানিব্যাগে যখন আঙুল যায়, তখন ভেতরের চামড়াটা এক অদ্ভুত শীতলতা ফিরিয়ে দেয়। সেই ঠান্ডা স্পর্শ বুকের খাঁচা অবধি নেমে আসে। বয়সটা ঠিক মধ্যবয়সের সীমানায় পা রেখেছে নিয়াজের,চল্লিশ ছুঁইছুঁই। তবে নিয়াজ নিজেকে কখনো ‘মধ্যবয়সী’ ভেবে স্বস্তি পায় না। সে ভাবে, সে এখনো এক ক্লান্ত, অপূর্ণ যুবক; যে যৌবনের সমস্ত স্বপ্নগুলোকে পেছনের ব্যাগে ভরে রেখে সামনের পথে ছুটে চলছে শুধু দেনার অঙ্ক মেলাতে গিয়ে। চুলগুলোতে রুপোলি ছোপ লেগেছে ঠিকই, কানের পাশ দিয়ে কয়েকটা সাদা চুল চকচক করে রোদে, কিন্তু বুকের ভেতর যে তীব্র ছটফটানি, তা সেই তেইশ-চব্বিশ বছরের বেকার দিনগুলোর মতোই টাটকা। পার্থক্য শুধু একটাই,তখন স্বপ্ন দেখার সাহস ছিল, এখন কেবল সেই ফেলে আসা স্বপ্নগুলোর চড়া সুদের কিস্তি শোধ করতে হয়।

সকাল সাড়ে সাতটার অ্যালার্মটা যখন বাজল, নিয়াজের চোখের কোণায় তখনো রাতের অর্ধেক ঘুম আটকে আছে। কাল রাতে বেসরকারি ব্যাংকের লোন স্টেটমেন্ট দেখতে দেখতে আড়াইটা বেজে গিয়েছিল। পাশেই ঘুমিয়ে আছে রুমানা। তার ক্লান্ত মুখের দিকে তাকালে নিয়াজের বুকের কোথাও একটা সূক্ষ্ম অপরাধবোধ কামড়ে ধরে। রুমানার গায়ের হলদেটে সুতির শাড়িটার পাড়টা সামান্য ফেঁসে গেছে। এই মেয়েটা একদিন কত সাজতে ভালোবাসত। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে কাচের চুড়ির রিনিঝিনি শব্দে মুখর থাকত তার হাতদুটো। আর আজ সেই হাতে কেবল তরকারির গন্ধ, ওয়াশিং পাউডারের রুক্ষতা আর সংসারের রশি শক্ত করে ধরে রাখার ঘষা দাগ।

বিছানা ছেড়ে নামার সময় নিয়াজের ডান হাঁটুর অস্থিসন্ধিটা মৃদু শব্দ করে উঠল। বয়স জানান দিচ্ছে। কিন্তু নিয়াজের কাছে বয়স মানে কেবল আরেকটা বছর পার হওয়া নয়, বয়স মানে আরেকটা ঋণের মেয়াদের শেষের দিকে এগিয়ে যাওয়া। ফ্ল্যাট কেনার জন্য যে পঁচিশ লাখ টাকার হাউজিং লোন নেওয়া হয়েছিল আজ থেকে সাত বছর আগে, তার অর্ধেকও শোধ হয়নি। অথচ মিরপুরের সেই ছোট্ট দুই রুমের ফ্ল্যাটটার চুনকাম খসে পড়ছে, বাথরুমের পাইপ দিয়ে পানি চুইয়ে নিচে পড়ে বলে নিচের তলার ফ্ল্যাট মালিক প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কটূক্তি শোনায়।

রান্নাঘরে চুলার ওপর চা বসিয়ে রুমানা ডাকল, "শুনছ, রাহুলের স্কুলের নোটিশ দিয়েছে। বার্ষিক পরীক্ষার ফি আর কোচিংয়ের টাকাটা আগামী পরশুর মধ্যে জমা দিতে হবে। না হলে রোল নম্বর আটকে দেবে বলেছে।"

নিয়াজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত ব্রাশ করছিল। মুখের ফেনাটা ফেলে সে মুখ মুছল তোয়ালে দিয়ে। তোয়ালেটার কোণাটাও কেমন ছিঁড়ে গেছে। সে একটু সময় নিয়ে বলল, "কত?"

"সব মিলিয়ে আট হাজার চারশো।" রুমানা গ্যাসের শিখাটা একটু বাড়িয়ে দিল। তার গলায় কোনো আবেগ ছিল না, কোনো দ্বিধাও ছিল না। দীর্ঘ বারো বছরের দাম্পত্যে এই অর্থনৈতিক দেনা-পাওনার ঘোষণাগুলো এখন ঠিক অফিসের ফাইল পাঠানোর মতো যান্ত্রিক হয়ে গেছে।

"ঠিক আছে, ব্যবস্থা করছি," নিয়াজ নিচু গলায় বলল।

‘ব্যবস্থা করছি’,এই দুটো শব্দ নিয়াজের জীবনের সবচেয়ে বড় মিথ্যে। কিন্তু এই মিথ্যেটুকু না বললে সকালের চায়ের কাপে এক ফোঁটাও শান্তি থাকে না। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে সে ব্যাংকের অ্যাপ খুলল। ব্যালেন্স দেখাচ্ছে তেরো হাজার চারশো বাষট্টি টাকা। অথচ মাসের এখনও কুড়িটা দিন বাকি। চালের ড্রাম ফাঁকা হতে চলেছে, মায়ের আর্থ্রাইটিসের ইনজেকশনটা এই মাসের পনেরো তারিখের মধ্যে দিতেই হবে, আর ফ্ল্যাটের ইএমআই বাবদ বাইশ হাজার টাকা কাটা যাবে আগামী পনেরো তারিখে। নিয়াজের চোখের সামনে গোটা পৃথিবীটা যেন একটা মস্ত বড় ক্যালকুলেটরে বদলে যায়। সেখানে ভালোবাসার দাম নেই, ক্লান্তির হিসাব নেই, শুধু বিয়োগফলের একটা লম্বা সারি।

মিরপুরের দশ নম্বর গোলচত্বরে যখন সে এসে দাঁড়াল, তখন সকাল সাড়ে আটটা। পিচঢালা কালো রাস্তা দিয়ে তখন রোদের হলকা উঠছে। ঢাকার বাতাস ধুলোয় ভারী। একদল স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়ে হইহই করতে করতে বাসে উঠছে। তাদের পিঠের ব্যাগগুলো ভারী হলেও চোখগুলোতে এক অদ্ভুত চপলতা। নিয়াজ তাদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আজ থেকে পনেরো-কুড়ি বছর আগে সে নিজেও তো এমনই ছিল।

জাহাঙ্গীরনগরের ক্যাম্পাসে মুক্তমঞ্চের পেছনের ঘাসে বসে বন্ধুদের সাথে সে কি শুধু চাকরির স্বপ্ন দেখেছিল? না। নিয়াজ হতে চেয়েছিল একজন নাট্যকার। এক বুক স্বপ্ন ছিল, সে দেশের মঞ্চ কাঁপাবে, মানুষের মনের খাঁচাকে নাড়িয়ে দেবে তার লেখার শক্তিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য সংসদ থেকে প্রকাশিত ছোট পত্রিকায় তার একটা দীর্ঘ গল্প ছাপা হয়েছিল,‘অসমাপ্ত ক্যানভাস’। বন্ধুরা বলেছিল, নিয়াজ তুই বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দিবি।

সেই মোড় ঘুরেছিল ঠিকই, কিন্তু সাহিত্যের নয়, নিয়াজের নিজের ভাগ্যের। বাবার হঠাৎ স্ট্রোক, সংসারে উপার্জনের একমাত্র মানুষটির চিরতরে শয্যাশায়ী হওয়া, আর ছোট দুই বোনের পড়ালেখার খরচ। নিয়াজকে তখন হাত থেকে কলম নামিয়ে এক বহুজাতিক সিমেন্ট কোম্পানির সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভের ইন্টারভিউ লাইনে দাঁড়াতে হয়েছিল। প্রথম যেদিন সে স্যুট আর পলিয়েস্টার টাই পরে রাস্তায় নেমেছিল সিমেন্টের বস্তা বিক্রির টার্গেট মাথায় নিয়ে, সেদিন মিরপুরের একটা চায়ের দোকানে বসে একা একা বমি করেছিল সে। আত্মসম্মানের বমি, স্বপ্নের মৃত্যু দেখার বমি। তারপর কেটে গেছে সতেরোটা বছর। সিমেন্ট থেকে টাইলস, টাইলস থেকে এফএমসিজি কোম্পানির এরিয়া ম্যানেজার। নাম বদলেছে, পদের নাম ভারী হয়েছে, বেতন বেড়েছে কয়েকগুণ, কিন্তু সেই সাথে বেড়েছে চাহিদার নাগপাশ।

অফিসে ঢুকতেই দেখা হলো তানভীরের সাথে। তানভীর তার বয়সে বছর পাঁচেকের ছোট, সদ্য অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার হয়েছে। ঝকঝকে টাই, মুখে সব সময় একটা ইউরোপিয়ান করপোরেট হাসি ঝুলিয়ে রাখে। নিয়াজকে দেখেই বলল, "গুড মর্নিং নিয়াজ ভাই। লাস্ট কোয়ার্টারের ডিস্ট্রিবিউশন রিপোর্টটা কিন্তু আজও মেলেনি। হেড অব সেলস কিন্তু ক্ষেপে আছেন। আজ বিকালের মিটিংয়ে আপনাকে কিন্তু জবাবদিহি করতে হবে।"

নিয়াজ শুধু একটু মাথা নাড়ল। এই এক মাথা নাড়া শিখতে তার অনেক বছর লেগেছে। একসময় তার ভেতরে যে আগুন ছিল, যে আত্মমর্যাদা সামান্য কর্কশ কথাতেই জ্বলে উঠত, তা এখন ঠান্ডা ছাই হয়ে গেছে। এই করপোরেট দুনিয়ায় আত্মমর্যাদা হলো এক অপ্রয়োজনীয় বাহুল্য; যার যত বেশি ঋণ, যার সংসারে যত বেশি কিস্তির চাপ, সে তত বেশি নতজানু হতে বাধ্য। নিয়াজ খুব ভালো করেই জানে, এই চাকরিটা চলে যাওয়া মানে স্রেফ বেকার হওয়া নয়; এর মানে তার ছেলের ভবিষ্যৎ বন্ধক পড়ে যাওয়া, বৃদ্ধা মায়ের ওষুধের ড্রয়ার খালি হয়ে যাওয়া, আর রুমানার মুখ থেকে শেষ হাসিটুকুও চিরতরে মুছে যাওয়া। নিজের কিউবিকলে গিয়ে বসল নিয়াজ। কম্পিউটারের স্ক্রিন অন হতেই একরাশ ইমেলের নোটিফিকেশন জমা হতে লাগল। লাল রঙের অ্যালার্ট,টার্গেট পূরণ হয়নি, রেভিনিউ ঘাটতি বারো শতাংশ, নতুন ডিলারের ক্রেডিট লিমিট ছাড়িয়ে গেছে।

কাজের ফাঁকে ফাঁকে মোবাইলের স্ক্রিনটা জ্বলে ওঠে। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মেসেজ:'জরুরি প্রয়োজনে পার্সোনাল লোন নিন মাত্র ১২% সুদে...''আপনার ক্রেডিট কার্ডের লিমিট বৃদ্ধি করা হয়েছে, এখনই আবেদন করুন...''ইএমআই সুবিধায় কিনে নিন আপনার পছন্দের স্মার্টফোন...'

নিয়াজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা উল্টো করে রাখল। এই শহর, এই রাষ্ট্র, এই পুঁজিবাদী সমাজ,সবাই মিলে একটা ফাঁদ পেতে রেখেছে। তারা প্রথমে মধ্যবিত্তের চোখে বড় বড় স্বপ্নের ছবি ঝুলিয়ে দেয়। রঙিন টেলিভিশন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শোবার ঘর, ব্র্যান্ডের জামাকাপড়, নামীদামি স্কুলের শিক্ষা,সবকিছুকে ‘বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার’ বলে গেলানো হয়। আর যখন সেই ফাঁদে পা পড়ে, তখন ধরিয়ে দেওয়া হয় কিস্তির হিসাব। মানুষ সারা জীবন বেঁচে থাকে না, সে কেবল বেঁচে থাকার কিস্তি শোধ করতে করতে একদিন ফুরিয়ে যায়।

দুপুরের লাঞ্চে নিয়াজ একাই বের হলো। অফিসের ক্যান্টিনে অনেকের সাথেই খাওয়া যায়, কিন্তু সেখানে চলে কার বাড়ি কত স্কয়ার ফিটের হলো, কার ছেলে কোন ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ছে, কিংবা কে কোন ব্র্যান্ডের গাড়ি কিনল,তার নীরব প্রদর্শনী। নিয়াজের এই প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার মতো কোনো তুরুপের তাস নেই। সে অফিস ভবনের পেছনে একটা ছোট্ট খাবারের হোটেলে গিয়ে বসল। সেখানে এক প্লেট ভাত আর ডাল-সবজি দিয়ে পেট ভরালো। পকেট থেকে একশো টাকার একটা নোট দিয়ে খুচরো চল্লিশ টাকা ফেরত নিয়ে খুব সাবধানে মানিব্যাগে রাখল। এই চল্লিশ টাকা দিয়ে সে বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় বাসভাড়া দেবে।

হোটেলে বসে পানি খেতে খেতে সে খেয়াল করল, তার ডান হাতের আঙুলগুলোতে হালকা কাঁপুনি। কয়েকদিন ধরেই এটা হচ্ছে। ডাক্তার দেখিয়েছিল গত মাসে। ডাক্তার ব্লাড টেস্ট আর ইসিজি করতে বলেছিলেন। খরচ পড়বে প্রায় হাজার পাঁচেক। নিয়াজ সেই প্রেসক্রিপশনটা ব্যাগের এক কোণে লুকিয়ে রেখেছে। পাঁচ হাজার টাকা মানে রাহুলের স্কুলের মাসের বেতন। নিজের শরীরের ক্ষয়ের চেয়ে ছেলের খাতার পাতার দাম যে মধ্যবিত্ত সংসারে অনেক বেশি! বিকেলের মিটিংটা নিয়াজের জন্য এক চূড়ান্ত মানসিক নির্যাতন হয়ে দাঁড়াল। সেলস ডিরেক্টর চৌধুরী সাহেব এককালে নিয়াজের সমসাময়িক ছিলেন, কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক তেলমর্দন আর করপোরেট রাজনীতির জোরে তিনি আজ অনেক উঁচুতে।

প্রজেক্টরের আলোয় নিয়াজের জোনের লাল রঙের গ্রাফটা দেখিয়ে চৌধুরী সাহেব ঠান্ডা গলায় বললেন, "নিয়াজ, তোমার বয়স তো খুব বেশি না, কিন্তু তোমার কাজের এনার্জি দেখে মনে হচ্ছে তুমি রিটায়ারমেন্টের জন্য রেডি হয়ে গেছ। এই কোয়ার্টারে যদি টার্গেট মিট না হয়, কোম্পানি কিন্তু আন্ডার-পারফর্মারদের বয়ে বেড়াবে না। উই নিড রেজাল্ট, নট এক্সকিউজেস।" পুরো মিটিং রুমে প্রায় জনা বিশেক তরুণ এক্সিকিউটিভ বসে ছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিয়াজের জুনিয়র হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিল। সবার সামনে এই তিরস্কারটুকু যখন নিয়াজের গায়ে এসে বিঁধল, তখন তার কান দুটো গরম হয়ে উঠল। তার মনে হলো, সে উঠে দাঁড়িয়ে চৌধুরী সাহেবের মুখের ওপর নিজের পদত্যাগপত্রটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলে,‘চৌধুরী, আমি যখন সাহিত্যের মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলতাম, তখন শত শত মানুষ নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনত। তোমার এই কাগজের টার্গেটের চেয়ে মানুষের জীবনের গল্প অনেক বড়।’

কিন্তু নিয়াজ কিছুই বলল না। সে কেবল টেবিলের নিচে নিজের মুষ্টিবদ্ধ হাত দুটোকে শক্ত করে চেপে ধরে রাখল। নখের ডগা গিয়ে বিঁধল হাতের তালুতে। সে শুধু শান্ত মুখে বলল, "আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট, স্যার।"

মিটিং শেষে যখন সে নিজের ডেস্কে ফিরল, তখন বাইরের আকাশটা অন্ধকার হয়ে এসেছে। কাচের জানালার ওপারে দেখা যাচ্ছে কারওয়ান বাজারের জ্যাম। গাড়ির লাল-হলুদ বাতির দীর্ঘ মিছিল। নিয়াজের মনে হলো, এই বাতিগুলো যেন এক একটা কিস্তির লাল দাগ। কোনোটা জীবনের, কোনোটা সংসারের, কোনোটা বা অপ্রাপ্তির।

সন্ধ্যা সাতটায় অফিস থেকে বের হয়ে সে সোজা বাসে উঠল না। কেন যেন আজ বাসের সেই ঘর্মাক্ত ভিড় সহ্য করার শক্তি তার ছিল না। সে ফার্মগেটের দিকে হাঁটতে শুরু করল। ফুটপাত ধরে হাজার হাজার মানুষ হাঁটছে। সবার মুখেই এক অদ্ভুত তাড়া। এই শহরের কারও দাঁড়িয়ে দেখার সময় নেই যে, তার পাশের মানুষটার ভেতরের মেরুদণ্ডটা কতটুকু বেঁকে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে সে একটা পুরোনো বইয়ের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ফুটপাতে ত্রিপল বিছিয়ে পুরোনো বই সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বইয়ের সেই চেনা গন্ধটা নাকে আসতেই নিয়াজের বুকের ভেতরটা কেমন যেন হুহু করে উঠল। সে নিচু হয়ে একটা বই তুলে নিল। বাদল সরকারের নাট্যসমগ্র। কতদিন, কত বছর সে এমন একটা বই হাত দিয়ে ছোঁয়নি!

পাতা উল্টাতেই নিয়াজের চোখে পড়ল একটি লাইন,‘যে মানুষ নিজের স্বপ্নকে বিক্রি করে ভাত কেনে, সে আসলে জীবিত থেকেও এক প্রেতাত্মা।’

বইটা বন্ধ করে সে খুব সাবধানে রেখে দিল। যেন পৃষ্ঠাগুলো তাকে পোড়াচ্ছিল। বিক্রেতা ছেলেটি মুখ তুলে চাইল, "নিবেন স্যার? মাত্র একশো বিশ টাকা।" নিয়াজ হাত দিয়ে পকেটটা ছুঁল। তার কাছে মাত্র একশো ষাট টাকা আছে। বাসের ভাড়া দিতে হবে চল্লিশ টাকা। বইটা কিনলে তাকে ফার্মগেট থেকে মিরপুর পর্যন্ত হেঁটে যেতে হবে। এক মুহূর্তের জন্য সেই তেইশ বছরের অপূর্ণ নিয়াজটা যেন জেগে উঠল। সে কি এই সামান্য একশো কুড়ি টাকার বিলাসিতাও নিজের জন্য করতে পারে না? সারাটা জীবন তো অন্যের জন্যই খরচ হলো। রুমানার শাড়ি, ছেলের পড়ার ফি, মায়ের ওষুধ, অফিসের টার্গেট,নিজের জন্য এই শহরে তার কি কোনো দাবি নেই?

সে মানিব্যাগ খুলে একশো কুড়ি টাকা বের করে ছেলেটির হাতে দিল। বইটা বুকের ভেতর চেপে ধরে সে যখন ফুটপাতে নামল, তখন তার মুখে এক অদ্ভুত, অস্পষ্ট হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। দীর্ঘ পনেরো বছর পর সে নিজের জন্য কিছু একটা কিনল। রাস্তা দিয়ে হাঁটা শুরু করল নিয়াজ। আট কিলোমিটারের পথ। শরীর সায় দিচ্ছে না, পায়ের জুতোজোড়া তলায় ক্ষয়ে গিয়ে পিচের তাপ সরাসরি তালুতে এসে লাগছে। কিন্তু প্রতিটি কদমে নিয়াজ যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া সত্তাকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছিল। সে মনে মনে নাটকের সংলাপ আওড়াতে লাগল, যে সংলাপগুলো সে কুড়ি বছর আগে ডায়েরির পাতায় লিখেছিল।

কাজীপাড়ার কাছাকাছি যখন সে পৌঁছাল, তখন রাত সাড়ে নয়টা। শরীর ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। বুকটা কেমন যেন ভারী লাগছে, শ্বাস নিতে সামান্য কষ্ট হচ্ছে। একটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে সে থামল। জুতোর ভেতর পায়ের পাতাটা জ্বলছে।

হঠাৎ পকেটে ফোনটা কেঁপে উঠল। রুমানার ফোন। নিয়াজ হাঁপাতে হাঁপাতে রিসিভ করল, "হ্যাঁ, রুমানা?"

ওপাশ থেকে রুমানার কান্নাজড়িত গলা ভেসে এল, "তুমি কোথায়? তাড়াতাড়ি বাসায় এসো। মায়ের প্রেসার একদম লো হয়ে গেছে, জ্ঞান হারাচ্ছেন বারবার। পাশের বাসার রফিক ভাইকে ডেকেছি, উনি বলছেন এখনই হাসপাতালে নিতে হবে। অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হবে নিয়াজ... তোমার কাছে টাকা আছে তো?"

বুকের ভেতর চেপে রাখা নাটকের বইটা নিয়াজের হাত থেকে প্রায় খসে পড়ার উপক্রম হলো। এক লহমায় ফার্মগেটের ফুটপাতের সেই রোমান্টিকতা, বাদল সরকারের নাটকের সংলাপ, আর নিজের জন্য একশো বিশ টাকা খরচের সেই অহংকার ধুলোয় মিশে গেল। নিয়াজের মনে হলো, এক বিশাল লোহার হাতুড়ি এসে সজোরে তার মাথায় আঘাত করেছে। বাস্তবতা এত নির্মমভাবে ফিরে আসে? স্বপ্নের কোনো মূল্য এই পৃথিবীতে নেই; এখানে প্রতিটি মুহূর্তের একমাত্র দাবি কেবল নগদ টাকা।

"আমি... আমি আসছি রুমানা। রফিক ভাইকে বলো মাকে নিয়ে অ্যাপোলোর দিকে রওনা হতে, আমি সরাসরি আসছি," নিয়াজের গলা কাঁপছিল। ফোনটা কেটে দিয়ে সে পাগলের মতো রাস্তায় তাকাল। পকেটে আছে মাত্র চল্লিশ টাকা। এখান থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত সিএনজি ভাড়া লাগবে অন্তত আড়াইশো টাকা।

সে রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে দ্রুত ক্রেডিট কার্ডের অ্যাপে ঢুকল। ক্যাশ উইথড্রয়ালের লিমিট চেক করল। আছে, এখনও পাঁচ হাজার টাকা তোলার মতো লিমিট বাকি আছে। কিন্তু সুদের হার আকাশচুম্বী, প্রতি একশো টাকায় প্রতিদিনের সুদ কাটা হবে। নিয়াজ কোনো কিছু ভাবল না। এটিএম বুথ খুঁজে নিয়ে সে টাকাটা তুলল। এটিএম মেশিনের সেই নোট গোনার খটখট শব্দটা নিয়াজের কাছে মনে হলো তার কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার শব্দ। হাসপাতালে যখন সে পৌঁছাল, তখন রাত সাড়ে এগারোটা। এমার্জেন্সির করিডোরে রুমানা বসে আছে রাহুলকে জড়িয়ে ধরে। রাহুল মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে। নিয়াজকে দেখে রুমানা উঠে দাঁড়াল। তার চোখে জল, মুখে ত্রস্ত আতঙ্ক।

"ডাক্তার ভেতরে আছেন। বললেন আইসিইউ লাগতে পারে। নিয়াজ, আমাদের কি অত টাকা আছে?" রুমানা নিয়াজের হাতটা চেপে ধরল। সেই হাত, যে হাতে নিয়াজ একসময় ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, আজ সেই হাত কেবল কাঁপে।

নিয়াজ রুমানার মাথায় হাত রাখল। "তুমি ভেবো না। আমি আছি তো। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।" ডাক্তার বের হয়ে এলেন কিছুক্ষণ পর। "পেশেন্টের অবস্থা এখন কিছুটা স্থিতিশীল। স্ট্রোকের লক্ষণ ছিল, তবে সময়মতো আনা হয়েছে বলে বড় বিপদ কাটানো গেছে। তবে উনাকে অন্তত দুই দিন অবজারভেশনে রাখতে হবে। আপনারা কেবিনের ডিপোজিটটা জমা দিয়ে দিন।"

কাউন্টারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল নিয়াজ। প্রাথমিক বিল এসেছে আঠারো হাজার টাকা। নিয়াজ নিজের পকেট থেকে সেই সদ্য তোলা পাঁচ হাজার টাকা দিল, বাকি টাকার জন্য সে তার শেষ সম্বল ক্রেডিট কার্ডটা কাউন্টারের ছেলেটির দিকে বাড়িয়ে দিল। কার্ডটা যখন মেশিনে সোয়াইপ হলো, তখন নিয়াজের মনে হলো তার বুকের ভেতরের শেষ রক্তবিন্দুটাও এই মেশিনটা শুষে নিচ্ছে।

রাত দুটো। হাসপাতালের ঠান্ডা করিডোরের এককোণে রাখা স্টিলের চেয়ারে বসে আছে নিয়াজ। রুমানা রাহুলকে নিয়ে মায়ের কেবিনের সোফায় শুয়ে পড়েছে। হাসপাতালের দেয়ালগুলো অদ্ভুত সাদা, যেন সব অনুভূতি শুষে নেওয়া কোনো শবাগার। নিয়াজ তার কাঁধের ব্যাগটা খুলল। ভেতরে রাখা বাদল সরকারের সেই পুরোনো নাট্যসমগ্র। ধুলোমাখা কভারের ওপর হাসপাতালের নিয়ন বাতির নীলচে আলো পড়েছে।

সে বইটা বের করল। পাতা উল্টাল। কিন্তু এবার আর কোনো আবেগ তাকে ছুঁয়ে গেল না। কোনো রোমাঞ্চ জাগল না। সে দেখল, বইটার পাতার ভাঁজে ভাঁজে যেন কেবল হাসপাতালের রসিদ, ক্রেডিট কার্ডের সুদের নোটিশ, আর রাহুল-এর স্কুলের বেতন বইয়ের ছবি আঁকা।

মধ্যবয়স আসলে কোনো শারীরিক পরিবর্তনের নাম নয়। মধ্যবয়স হলো সেই মুহূর্ত, যখন একজন মানুষ নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারে,তার ব্যক্তিগত স্বপ্নগুলো আসলে কোনো রাজকীয় সৌধ নয়, সেগুলো স্রেফ কিছু চড়া সুদের কিস্তি। সেই কিস্তিগুলো তাকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে, অথচ কোনোদিনই তার মালিকানা তার নিজের হবে না। সে কেবল পরের প্রজন্মের জন্য পথ পরিষ্কার করতে করতে, আর আগের প্রজন্মের ঋণ শোধ করতে করতে নিজেকে নিঃশেষ করে দেবে।

নিয়াজ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। করিডোরের শেষ মাথায় একটা ডাস্টবিন রাখা আছে। সে বইটার দিকে শেষবারের মতো তাকাল। এই বইটা ছিল তার আত্মমর্যাদার শেষ প্রতীক, তার ফেলে আসা যৌবনের শেষ স্মারক। কিন্তু এই প্রতীক ধরে রাখার সামর্থ্য তার নেই। নিয়াজ বইটা ডাস্টবিনের ভেতর ফেলে দিল। কোনো শব্দ হলো না। কেবল একটা নীরব বিসর্জন সম্পন্ন হলো।

এরপর সে বেসিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চোখে-মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিল কয়েকবার। আয়নায় মুখটা ভেসে উঠল। চল্লিশ ছুঁইছুঁই এক মানুষ। কপালে চিন্তার গভীর রেখা, চোখের নিচে কালো দাগ, চোয়ালের হাড়গুলো শক্ত হয়ে উঠেছে।

নিয়াজ আয়নার সেই মানুষটার চোখের দিকে তাকাল। সেখানে আর কোনো অশ্রু নেই, কোনো ক্ষোভ নেই, কোনো স্বপ্নভঙ্গের হাহাকারও নেই। সেখানে আছে এক আদিম, নিষ্ঠুর লড়াইয়ের প্রস্তুতি। আগামীকাল সকাল আটটায় তাকে আবার অফিসে পৌঁছাতে হবে। সেলস ডিরেক্টর চৌধুরীর অপমান মুখ বুজে সহ্য করতে হবে। নতুন টার্গেটের জন্য ক্লায়েন্টের দরজায় দরজায় ঘুরতে হবে। কারণ এই মাসের পনেরো তারিখে ঋণের কিস্তিটা দিতেই হবে। রুমানার মুখে ভাত তুলে দিতে হবে, রাহুলকে মানুষ করতে হবে, মায়ের ইনজেকশনের টাকা জোগাড় করতে হবে।

স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছে তো কী হয়েছে? জীবনের কিস্তি তো আর থেমে থাকে না। নিয়াজ পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখটা মুছল। টাইয়ের নটটা শক্ত করে বেঁধে সে কেবিনের দিকে পা বাড়াল। তার হাঁটার ভঙ্গিতে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো ক্লান্তি নেই। সে এক পরাজিত সৈনিক হতে পারে, কিন্তু লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে পালানোর কাপুরুষ সে নয়। স্বপ্নের কিস্তি শোধ করতে করতে যদি গোটা জীবনটাই কাবার হয়ে যায়, তবে তাই হোক। এই মধ্যবিত্ত যুদ্ধের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সে কিস্তি গুনে যাবে।

 

 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login