Poetry

কবি রথো রাফির জন্য এলিজি

October 31, 2026

42 views

কবির জানালার পাখি ও চায়ের পেয়ালা

স্তব্ধ হয়ে গেছে ঘরের কোণের সেই চিরচেনা টেবিলটা,
ডেস্কে পড়ে থাকা পাণ্ডুলিপির পাতাগুলো আজ বড় একা।
যে হাতগুলো শব্দের মালায় বুনত রূপকথার আলো,
সেই আঙুলগুলোর চলাচল চিরতরে থেমে গেছে।
পাণ্ডুলিপির পাতার ভাঁজে জমে আছে কত না বলা দীর্ঘশ্বাস,
প্রকাশের আলো দেখল না যা, রয়ে গেল এক বুক আকুতি।
কবির মনোজগৎ, তার ভাবনা আর অক্ষরের দীর্ঘ মিছিল,
মহাকালের অন্তরীক্ষে হারিয়ে গেল নীরব এক তুফান তুলে।
আজও ভোর হতে না হতেই ডানা ঝাপটে উড়ে এসে বসেছে,
জানালায় বসা চেনা পাখিটার চঞ্চল চোখ দুটিতে বিস্ময়।
সে তো জানে না মানুষটা আজ আর বিছানায় নেই শুয়ে,
যে কবিকে সে রোজ দেখত, সে কি তবে সত্যি হারিয়ে গেছে?

পাখিটা ডানা ঝাপটে তার ছোট্ট নীড়ে ফিরে গিয়ে বলত,
আজও আমি দেখে এলাম, একজন অন্যরকম মানুষকে আমি চিনি।
কিন্তু আগামীকাল যখন সে আবার এসে বসবে ওই চেনা জানালায়,
কবিকে আর দেখতে না পেয়ে সে কী ভাববে মনে মনে?
পাখিটার ছোট চঞ্চু আর অবুঝ সেই বুকভরা কৌতূহল,
শূন্য ঘরের দিকে চেয়ে থাকবে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা নিয়ে।

সে বুঝবে না কেন সে মানুষটি ডাকতে আসল না স্নেহের সুরে,
কেন আজ নিস্তব্ধ হয়ে আছে কবির ঘর আর চারিপাশ।

এদিকে আজিজ সুপারের পুরোনো সেই চায়ের আড্ডায়,
বন্ধুরা এসে বসেছে যথারীতি পুরনো দিনের সেই নির্দিষ্ট টেবিলে।
প্রাণের আড্ডা, তর্ক আর জীবনের নানা টুকরো গল্পে,
আচমকা নেমে আসে এক পিনপতন নিস্তব্ধতার গাঢ় ছায়া।
অভ্যাসবশতই তাদের একজন হঠাৎ করে ডেকে ওঠে বেয়ারাকে
বলে, আগের মতোই আরেক কাপ চা দাও আমাদের কবির জন্য।
কিন্তু কথাটি মুখ থেকে বেরোতেই থেমে যায় সবার গলা,
শূন্যতা এসে গ্রাস করে তাদের গলা জড়িয়ে থাকা স্বরগুলোকে।
চায়ের পেয়ালাটি টেবিলে এসে বসে তার নিখুঁত ধোঁয়া তুলে,
কিন্তু যার জন্য অর্ডার দেওয়া, সে তো আর নেই টেবিলে।
অর্ডার দিয়েই সকলে কেমন যেন পাথর হয়ে চুপ করে যায়,
টেবিলে রাখা পেয়ালাটার দিকে চেয়ে চোখ ভিজে ওঠে অজান্তে।

বন্ধুরাই তো সবচেয়ে আগে টের পায় এই না-থাকার অভাব,
তারা নিঃশব্দে ভাবে, ইশ, বন্ধুটা যদি আজ আমাদের মাঝে থাকত!
চায়ের কাপের উষ্ণতা জুড়িয়ে যায় স্মৃতির হাহাকারে,
আর বুক চিরে বেরিয়ে আসে এক অলিখিত দীর্ঘশ্বাস।
পাণ্ডুলিপিটা বুক শেলফে একা একা কেঁদে ফেরে গোপনে,
সে হয়তো কোনোদিন আলো দেখবে, অথবা হয়তো চিরকালই নিঃসঙ্গ পড়ে রবে।
কিন্তু কবির ভাবনা আর অন্তরের সেই দুর্লভ সুষমা,
হারিয়ে গেছে সময়ের অতল গহ্বরে, ফিরে আসার নেই কোনো পথ।
জানালার ধারের পাখিটা আর মানুষটার সেই চায়ের টেবিলে,
কেবলই পড়ে থাকে একাকী স্মৃতির অমলিন জলছাপ।

একজন কবি চলে গেছেন শব্দের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূরে,
রেখে গেছেন তার না বলা কথা আর অন্তহীন এক শূন্যতা।
কালও পাখিটা বসবে এসেই শূন্য ওই জানালার কার্নিশে,
বন্ধুদের চায়ের কাপে জমবে আবার দীর্ঘশ্বাসের সারী।

পৃথিবীর রুটিনমাফিক চলা এই ব্যস্ত নগরের কোলাহলে,
কেবল একটি মানুষের অনুপস্থিতি হয়ে রবে চিরকালের কান্না।
শব্দহীন বেদনায় মোড়ানো এই অদ্ভুত এক মায়াবী প্রাঙ্গণে,
কবি নেই, শুধু রয়ে গেল তার রেখে যাওয়া দীর্ঘ ছায়া।

(কবি রথো রাফির সাথে আমার পরিচয় ছিল না। আজিজ সুপার মার্কেটে আমার নিয়মিত পদচারণার দিনগুলো ২০০১ বা ২০০২ এ শেষ হয়েছে। এরপর জীবনের তাগাদায় অন্য শহরে যাওয়া। বাংলাদেশের আধুনিক সাহিত্যের নব প্রজন্মের যাত্রা এখান থেকেই শুরু, সে আমি বিশ্বাস করি। রথো রাফির মৃত্যুতে তার সম্পর্কে বিভিন্ন গুণী ব্যাক্তিদের লেখা পড়তে পড়তে মন খারাপ হয়ে গেছে। তাঁর জন্য দোয়া রইল।)

Picked up where you left off

Comments

mamun abdulla was this story’s first reader

+25 XP

    Please login to post comment. Login

  • sayed mahmud 3 days ago

    কালও পাখিটা বসবে এসেই শূন্য ওই জানালার কার্নিশে, বন্ধুদের চায়ের কাপে জমবে আবার দীর্ঘশ্বাসের সারী।সবই চলবে পৃথিবীর নিয়মমতো। শুধু কবিই চলে গেলেন। শ্রদ্ধা এবং দোয়া রইল।

  • raisa 3 days ago

    কেবলই পড়ে থাকে একাকী স্মৃতির অমলিন জলছাপ। কবির জন্য শ্রদ্ধা রইল।

  • shoyeb 3 days ago

    রথো রাফির জন্য দোয়া রইল।

  • robin ahmed 3 days ago

    শব্দহীন বেদনায় মোড়ানো এই অদ্ভুত এক মায়াবী প্রাঙ্গণে, কবি নেই, শুধু রয়ে গেল তার রেখে যাওয়া দীর্ঘ ছায়া। হ্যাঁ, কবির জন্য দোয়া রইল।

  • sayed Hossain 3 days ago

    ভালো লিখেছেন। রথো রাফির জন্য দোয়া রইল।

  • mamun abdulla 3 days ago First reader

    বিনম্র শ্রদ্ধা। একজন কবি চলে গেলে সভ্যতার একটা পথ অবরুদ্ধ হয়ে যায়। কবিতাটির জন্য ধন্যবাদ।