Post

হারিয়ে যাওয়া সময়ের কাছে

November 2, 2026

33 views

শীতের বিকেলগুলো কেমন যেন অদ্ভুত। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতে না নামতেই চারপাশে একটা শিরশিরে হাওয়া বয়ে যায়। অথচ সেই হাওয়ার সঙ্গে কোথা থেকে যেন একরাশ মন খারাপও এসে ভিড় করে। মনে হয়, জীবনের কোথাও কিছু একটা ফেলে এসেছি। কী ফেলে এসেছি, ঠিক মনে করতে পারি না। শুধু মনে হয়, কিছু একটা আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া যাবে না।

হয়তো ফেলে আসা ছেলেবেলা, অকালে হারিয়ে যাওয়া কিছু মানুষ, একসঙ্গে হাঁটা পুরোনো বন্ধুরা কিংবা এমন কিছু পথ, যে পথে এখন আর হাঁটা হয় না। কিছু ফুলের ঘ্রাণ, কিছু বিকেল, কিছু মানুষের কণ্ঠস্বর, সবকিছু কেমন ধীরে ধীরে স্মৃতির ভেতর মিশে গেছে।

শীত এলেই আমার গ্রামের কথা মনে পড়ে। তখন শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে স্কুলের ছুটিও আসত। সারাদিন ফাঁকা ধানক্ষেতের মাঠে ঘুরে বেড়ানো, বিকেলে পাখির ডাক শুনতে শুনতে বাড়ি ফেরা, আর সন্ধ্যা হলেই লেপের নিচে ঢুকে গল্পের বই পড়া। রাতে বেশি শীত পড়লে খড়কুটো আর গাছের শুকনো পাতা দিয়ে আগুন জ্বালানো হতো। সব চাচাতো ভাইবোন মিলে আগুন পোহাতাম, আর ডাকাতের গল্প শুনতাম। তখন সত্যিই গ্রামে ডাকাতের ভয় ছিল। রাত একটু গভীর হলেই চারপাশের অন্ধকারকে অন্যরকম মনে হতো।

কী অদ্ভুত ছিল সেই দিনগুলো! তখন মনে হতো, বড় হলেই বুঝি পৃথিবীর সবকিছু নিজের মতো করে পাওয়া যাবে। অথচ বড় হতে হতে একসময় বুঝলাম, মানুষ বড় হয় ঠিকই, কিন্তু তার জীবনের অনেক প্রিয় জিনিস ছোটবেলাতেই কোথাও হারিয়ে যায়।

এখনো শীত আসে। কুয়াশা নামে, সন্ধ্যা হয়, রাত বাড়ে। শহরের রাস্তায় নিয়ন আলো জ্বলে। কিন্তু সেই অন্ধকার শীতরাতের মধ্যে যে মায়া ছিল, এত আলোতেও আজ আর তা খুঁজে পাই না। শিশিরভেজা লাউয়ের ডগায় সকাল, বাড়ির পাশের খোলা ধানক্ষেত, দুপুরবেলার পাখির ডাক কিংবা নদীর ধারে অলস বসে থাকা বিকেল, সবই কেমন অন্য এক জীবনের গল্প হয়ে গেছে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও একটা ব্যাপার বুঝতে শিখেছি। মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে, যখন নিজের কাছেই নিজের কোনো ব্যাখ্যা থাকে না। কেন মন খারাপ, কেন পরিচিত মানুষগুলোকেও অচেনা লাগে, কেন সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরও ভেতরে একটা শূন্যতা কাজ করে—কিছুই বোঝা যায় না। অথচ জীবন থেমে থাকে না। সকাল হয়, মানুষ কাজে যায়, বাজার বসে, বাচ্চারা মাঠে খেলে। শুধু নিজের ভেতরে কোথাও একটা অগোছালো সময় চলতে থাকে।

একসময় ভাবতাম, বড় হওয়া মানে সবকিছু বুঝতে শেখা। এখন মনে হয়, বড় হওয়া মানে অনেক কিছু না বুঝেও স্বাভাবিক থাকার অভিনয় শিখে যাওয়া। কিছু সম্পর্কের কোনো শেষ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না, কিছু মানুষ কেন দূরে চলে যায় তা-ও জানা হয় না। কিছু স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই নিজের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। আর কিছু ইচ্ছা থাকে, যেগুলো কাউকে বলাও যায় না, নিজের কাছেও স্বীকার করতে ইচ্ছে করে না।

জীবনের একটা পর্যায়ে এসে মানুষ বুঝতে পারে, সবকিছু গুছিয়ে নেওয়া যায় না। কিছু অভাব সারাজীবন থেকে যায়, কিছু অপেক্ষার শেষ হয় না। মন খারাপ নিয়েই কাজে যেতে হয়, ভেতরে ক্লান্তি নিয়েই পরিবারের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতে হয়। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও প্রত্যেক মানুষের ভেতরে হয়তো এমন কিছু গল্প থাকে, যা কাউকে কখনো বলা হয় না।

মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে, সবকিছু ছেড়ে একবার সেই গ্রামে ফিরে যাই। কোনো প্রয়োজন থাকবে না, কোনো ব্যস্ততা থাকবে না। শুধু পুরোনো বাড়িটার উঠানে বসে থাকব। পরিচিত মানুষগুলোর মুখ দেখব। হয়তো যাদের আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া যাবে না, তাদের কথাও মনে পড়বে। সেই পুরোনো পথ ধরে হাঁটব, যে পথে একসময় কোনো গন্তব্য ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে বেড়াতাম।

কিন্তু সময়ের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ব্যাপার হলো, সে কাউকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসে না। একই গ্রাম হয়তো আছে, বাড়িটাও আছে, ধানক্ষেতে আবারও ফসল হয়। শুধু সেই সময়ের মানুষগুলো আর আগের মতো নেই। কেউ হারিয়ে গেছে, কেউ বদলে গেছে, আর আমরাও তো সেই আগের মানুষটি নেই।

তবু এত কিছুর পরও জীবন থেমে থাকে না। কোনো শিশুর হাসিতে মন ভালো হয়ে যায়, হঠাৎ পরিচিত কোনো গন্ধে বহু বছর আগের একটা দুপুর ফিরে আসে। বিকেলের বাতাসে কখনো কখনো মনে হয়, পৃথিবীতে এখনো মায়া বলে কিছু আছে। হয়তো এই ছোট ছোট অনুভূতিগুলোর জন্যই মানুষ এত হারানোর পরও বেঁচে থাকে।

এখন আর আগের মতো সবকিছু ফিরে পাওয়ার ইচ্ছে করি না। শুধু মাঝে মাঝে পেছনে তাকাই। মনে মনে সেই ছোট্ট ছেলেটার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করে, যে একদিন শীতের রাতে আগুন পোহাতে পোহাতে ডাকাতের গল্প শুনেছিল। যে জানত না, একদিন তার জীবনে এমন একটা সময় আসবে, যখন পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটাকেও সে শুধু স্মৃতির মধ্যে খুঁজে ফিরবে।

জীবন আসলে আমাদের কাছ থেকে একদিনে কিছু কেড়ে নেয় না। একটু একটু করে নেয়। প্রথমে শৈশব, তারপর প্রিয় কিছু মুখ, কিছু অভ্যাস, কিছু বিকেল। একসময় আয়নায় তাকিয়ে দেখি, মানুষটা এখনো বেঁচে আছে, কিন্তু তার ভেতরের অনেক চেনা মানুষ আর কোথাও নেই।

হয়তো বড় হয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কষ্ট এটাই একদিন বুঝতে পারা, ফিরে যেতে চাইলেও আর ফেরার কোনো সময় নেই।

যে জীবনটাকে একদিন খুব সাধারণ মনে হয়েছিল, আজীবন সেই জীবনটার কাছেই ফিরে যেতে ইচ্ছে করে।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login