ভালোবাসা কী, তা হয়তো কোনো দিনই ঠিক করে বুঝতে পারতাম না, যদি জীবনের কোনো এক অচেনা সময়ে তাঁর আগমন না ঘটত। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, তিনি এসেছিলেন বলেই যে তাঁকে সম্পূর্ণভাবে পাওয়া হয়েছে, ব্যাপারটা মোটেও এমন নয়। বরং এই ঝাপসা পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের ভিড়ে তাঁকে পেয়েও যেন কোথাও হারিয়ে ফেলেছি। কখনো মনে হয়, খুব অল্প সময়ের জন্য তাঁর দেখা পেয়েছিলাম; আবার কখনো মনে হয়, এতটা পথ পেরিয়েও তাঁকে বুঝি আজও খুঁজে ফিরছি।
তবু একটা কথা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, তাঁর উপস্থিতি আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে।
এ ভালোবাসা প্রথম দেখার কোনো গল্প নয়। কোনো এক বিকেলে চোখাচোখি হতেই হৃদয়ে ঝড় উঠে যাওয়ার মতো সিনেমার দৃশ্যও নয়। বরং ভালোবাসাটা তৈরি হয়েছিল একটু একটু করে। প্রথমে হয়তো ভালো লাগা, তারপর অকারণ অপেক্ষা, তারপর ছোট ছোট কথায় আনন্দ খুঁজে পাওয়া। কখন যে সেই ভালো লাগা মনের গভীরে শিকড় ছড়িয়ে ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে, তার কোনো নির্দিষ্ট দিন-তারিখ আমার জানা নেই।
একসময় নিজেকেই আবিষ্কার করলাম এক অদ্ভুত অনুভূতির মধ্যে। বুঝতে পারলাম, মানুষটিকে শুধু তাঁর সুন্দর মুহূর্তগুলোর জন্য ভালো লাগে না। তাঁর হাসি, অভিমান, নীরবতা, রাগ, সরলতা, এমনকি তাঁর না বলা কথাগুলোর প্রতিও এক অদ্ভুত মায়া জন্মেছে।
আমি তাঁর বর্তমানকে ভালোবেসেছি, তাঁর অতীতকে জানার আগ্রহ অনুভব করেছি। তাঁর ভবিষ্যৎ কেমন হবে, সেখানে কে থাকবে, কোন পথে তিনি হাঁটবেন, সেসব ভাবনাও কখনো কখনো আমার ভাবনার অংশ হয়ে উঠেছে। শুধু তাঁকে নয়, তাঁর অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রতিটি ছোট ছোট বিষয়কেও আপন মনে হয়েছে।
অথচ তাঁর চোখে জল দেখতে আমার ভীষণ কষ্ট হয়। মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ যদি নিজের কাছে নিয়ে নেওয়া যেত, তবে হয়তো তাঁর চোখ দুটো অন্তত হাসতে পারত। কিন্তু ভালোবাসার মানুষকে সব সময় হাসিয়ে রাখা যায় না। কখনো কখনো দূর থেকে শুধু তাঁর কষ্টের খবরটুকু জানা যায়, অথচ পাশে দাঁড়িয়ে হাতটা ধরে বলার সুযোগটুকুও থাকে না। এই অসহায়ত্বের নামও হয়তো ভালোবাসা।
কখনো কখনো ভাবি, এই অনুভূতির ব্যাখ্যা দিতে হলে কী উদাহরণ দেওয়া যায়!
ভৈরবের নদীতে এক মাঝি দিনের পর দিন নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে যায়। সকাল পেরিয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা আসে। জাল ফেলে, অপেক্ষা করে, আবার জাল তোলে। অথচ দিনের পর দিন তার জালে কিছুই ধরা পড়ে না। তবু পরদিন ভোরে সে আবার নদীতে নামে। কেন নামে, সে নিজেও হয়তো জানে না। হয়তো নদীর প্রতি তার এক অদ্ভুত টান আছে, হয়তো একটুখানি আশার জন্যই তার এই ফিরে আসা।
তারপর কোনো এক ক্লান্ত সন্ধ্যায়, দীর্ঘ অপেক্ষার পর যখন জালে একটি মাছ ধরা পড়ে, তখন তার মুখে যে হাসিটুকু ফুটে ওঠে, সেই হাসির কাছে পৃথিবীর অনেক বড় প্রাপ্তিও তুচ্ছ মনে হয়। আকাশের মিষ্টি চাঁদটাও যেন সেদিন একটু বেশি আলো ছড়ায়।
আমার অনুভূতিটাও অনেকটা তেমন। তাঁকে পাওয়া না-পাওয়ার হিসাবের বাইরে গিয়ে, তাঁর সামান্য উপস্থিতি, একটুখানি হাসি কিংবা হঠাৎ চোখে পড়ে যাওয়া কোনো মুহূর্ত আমাকে যে আনন্দ দেয়, তার পরিমাপ আমার জানা নেই। হয়তো এটাই আমার ভালোবাসার সবচেয়ে সত্যিকার রূপ। যেখানে প্রাপ্তির চেয়ে অপেক্ষা বেশি, অধিকারের চেয়ে মায়া বেশি, আর প্রত্যাশার চেয়ে অনুভূতি অনেক গভীর।
কখনো কখনো আড়াল থেকে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকি। খুব সাধারণ কোনো মুহূর্তেও তাঁকে অসাধারণ মনে হয়। হয়তো তিনি জানেন না, তাঁর চোখের একটুখানি চাহনি কারও সারাটা দিন বদলে দিতে পারে। তাঁর মুখের মায়াভরা অভিব্যক্তি কারও মনে কত শত গল্পের জন্ম দিতে পারে। তাঁর হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট কোনো অভিমানও কারও কাছে কতটা প্রিয় হতে পারে।
কবি-সাহিত্যিকেরা হয়তো এমন মুহূর্তের জন্যই হাজার হাজার কবিতা লিখেছেন। কেউ লিখেছেন অপেক্ষার গল্প, কেউ লিখেছেন বিচ্ছেদের কবিতা, কেউবা লিখেছেন এমন এক ভালোবাসার কথা, যার কোনো পূর্ণতা নেই, অথচ অনুভূতির কোনো কমতিও নেই। আমারও মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি লেখার ভাষা দিয়ে হৃদয়ের সবটুকু অনুভূতি প্রকাশ করা যেত, তবে হয়তো কয়েকটি জীবন শেষ হয়ে যেত, তবু তাঁর জন্য লেখা শেষ হতো না।
কিন্তু ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন জায়গাটা বোধহয় এখানেই।
যাকে এতটা ভালোবাসা যায়, তাকে নিজের করে পাওয়া যাবে কি না, সেই নিশ্চয়তা থাকে না। কোনো একদিন পাশাপাশি হাঁটার সুযোগ হবে কি না, একই আকাশের নিচে পাশাপাশি বসে সন্ধ্যা দেখার সৌভাগ্য হবে কি না, কিংবা জীবনের কোনো ক্লান্ত বিকেলে তাঁর হাতটা ধরে নির্ভার হওয়ার সুযোগ মিলবে কি না, কিছুই জানা নেই।
হয়তো কোনো দিন সবকিছু সুন্দরভাবে পূর্ণতা পাবে। আবার হয়তো জীবনের কোনো এক মোড়ে দুজনের পথ আলাদা হয়ে যাবে। সময়ের সঙ্গে কথাগুলো ফুরিয়ে যাবে, অভ্যাসগুলো বদলে যাবে, যোগাযোগের জায়গায় নেমে আসবে দীর্ঘ নীরবতা। তবু কিছু মানুষ থেকে যায়। স্মৃতিতে, অনুভূতিতে, কোনো পুরোনো গানের সুরে কিংবা হঠাৎ বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একাকী বিকেলে।
কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়ার জন্য যতটা সময় প্রয়োজন, তাদের ভালোবেসে ফেলার জন্য হয়তো তার চেয়েও বেশি সময় লাগে।
আমি জানি না, এই ভালোবাসার শুরু কোথায়, শেষই বা কোথায়। জানি না, কেন তাঁর কথা ভাবলে মন ভালো হয়ে যায়, কেন তাঁর অনুপস্থিতি কখনো কখনো পুরো একটা দিনকে বিষণ্ন করে রাখে। কেন হাজারো মানুষের ভিড়েও হঠাৎ তাঁর মুখটা মনে পড়ে যায়। কেন কোনো আনন্দের মুহূর্তে মনে হয়, এই খবরটা তাঁকে জানাতে পারলে ভালো হতো!
হয়তো ভালোবাসার কোনো যুক্তি হয় না। মানুষ সব সময় হিসাব করে কাউকে ভালোবাসে না। কখনো কখনো হৃদয় নিজের অজান্তেই কাউকে নিজের অনুভূতির সবচেয়ে গভীর জায়গাটুকু দিয়ে বসে।
তাঁর কাছে আমার কোনো অভিযোগ নেই। কোনো দাবি নেই, কোনো হিসাবের খাতা নেই। শুধু কিছু অনুভূতি আছে, যেগুলো হয়তো কোনো দিন তাঁকে বলা হবে, হয়তো কোনো দিন বলা হবে না। কিছু কথা আছে, যেগুলো বুকের ভেতর জমে থাকবে। কিছু স্মৃতি আছে, যেগুলো সময়ের কাছে হার মানতে চাইবে না।
তবু যদি কোনো দিন কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে, জীবনে ভালোবাসা কাকে বলে বুঝেছি কি না, আমি হয়তো খুব বেশি কিছু বলব না। শুধু সেই মানুষটির কথা মনে করব, যিনি আমার জীবনে এসে আমাকে বুঝিয়েছেন, কাউকে ভালোবাসার জন্য সব সময় তাঁকে নিজের করে পাওয়া লাগে না। কখনো কখনো একজন মানুষের অস্তিত্বই অন্য একজনের জীবনে ভালোবাসার সংজ্ঞা বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
আর আমার গল্পে সেই মানুষটি তিনি।
আমি তাঁকে ভালোবাসি। কেন ভালোবাসি, তার উত্তর আমার জানা নেই। কী কারণে ভালোবাসি, তারও কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। কতটা ভালোবাসি, সেটাও হয়তো কোনো শব্দ দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়।
শুধু এটুকু জানি, ভালোবাসার এই দীর্ঘ গল্পে তাঁর নামটি একবার লেখা হয়ে গেছে। সেই লেখা মুছে ফেলার মতো কোনো ইচ্ছা, কোনো সাহস কিংবা কোনো প্রয়োজন আমার কখনো অনুভব হয়নি।
হয়তো তাঁকে পাওয়া হবে না, হয়তো কোনো দিন নিজের করে রাখাও হবে না। তবু এই সমস্ত অনিশ্চয়তার মাঝেও একটা অনুভূতি আজও একই রকম সত্য।
আমি তাঁকে ভালোবাসি। ভালোবাসি, এবং ভালোবেসে যাব।
কেন ভালোবাসি, জানি না। শুধু জানি, ভালোবাসি।