Article

মার্কিন নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থীর জয়: একটা ভুল ব্র্যান্ডিং

November 6, 2026

4 views

জোহরান মামদানি বা আবদুল এল-সায়েদের নির্বাচনী বিজয়ের উদযাপনকে ‘মুসলিমদের ধর্মীয় উদযাপন’ হিসেবে চিহ্নিত করার একটি সরলীকৃত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই ব্যাখ্যা কেবল রাজনৈতিকভাবে ত্রুটিপূর্ণই নয়, বরং মার্কিন সমাজে মুসলমানদের নাগরিক আকাঙ্ক্ষার বহুমাত্রিক রূপটিকে আড়াল করারও এক সূক্ষ্ম চেষ্টা। ৯/১১-পরবর্তী পদ্ধতিগত ইসলামোফোবিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যকে যারা অস্বীকার করতে চান - কিংবা সমাজে এই বিদ্বেষকে বাঁচিয়ে রাখতে চান, ঘৃণার মহীরুহে পরিণত করতে চান - তারা এই সরলীকৃত ন্যারেটিভের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেন।

ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কোনো প্রার্থীকে ‘দৈত্য বানিয়ে’ (demonize) ভোট পাওয়ার যে পরিচিত সংস্কৃতি মার্কিন রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চর্চিত হয়ে আসছে, সম্প্রতি যা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে, সমাজের এক বৃহৎ অংশ যে তা চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখান করেছে - এই বিজয়ের মাধ্যমে মূলত সেই সামাজিক সত্যই উন্মোচিত হয়েছে।

ফলে উদযাপনের সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যকে এড়িয়ে একে কেবল ‘ধর্মীয় সাফল্য’ বানানোর চক্রান্ত ইসলামের প্রতি বিদ্বিষ্টদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যকেই সিদ্ধ করে।

প্রকৃতপক্ষে, এই সামাজিক ও রাজনৈতিক উদযাপনের গভীরে অন্তত তিনটি মৌলিক মনস্তাত্ত্বিক ও বৈপ্লবিক অনুভূতি ক্রিয়াশীল:

১. পরিচয়ের রাজকীয় স্বীকৃতি:

মার্কিন রাজনীতির মূলধারায় মুসলিম পরিচয়ের একজন মানুষের নেতৃত্ব অর্জিত হওয়া কোনো সামান্য বিষয় নয়। আমেরিকান ইতিহাসে যেভাবে একজন কৃষ্ণাঙ্গ, একজন নারী বা যেকোনো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রথম জয় উদযাপনযোগ্য হয়েছিল, এটিও ঠিক তেমনই। এটি মূলধারার রাজনীতিতে এক দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতির ইতিহাস।

২. পদ্ধতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে সম্মিলিত স্বস্তি:

দীর্ঘদিন ধরে মুসলমানদের সন্ত্রাসবাদ, চরমপন্থা ও অনুগতহীন ‘বিদেশি’ সত্তা হিসেবে ফ্রেম করার যে চেষ্টা চলে আসছে, বিপুল রাজনৈতিক জনসমর্থন তার বিরুদ্ধে এক জোরালো চড়। এটি প্রমাণ করে, ঘৃণার চাষ করে সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার ফর্মুলা সব সময় সফল হয় না।

৩. বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন:

ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একজন মুসলিম প্রার্থী যখন অ-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভোট ও ভালোবাসা জয় করে নেন, তখন তা আমেরিকান সামাজিক চুক্তির ইতিবাচক দিককেই শক্তিশালী করে। এটি নাগরিককে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ব্যক্তির নীতি, মূল্যবোধ ও কাজের যোগ্যতাই শেষ কথা - তার ধর্মীয় পরিচয় নয়।

এই ব্যাখ্যার পক্ষে বাস্তব প্রমাণও বিদ্যমান। ২০২৫ সালে নিউইয়র্কের মেয়রাল নির্বাচনে মামদানির জয় এবং ২০২৬ সালে মিশিগান সিনেট নির্বাচনে আবদুল এল-সায়েদের সাফল্য মার্কিন মনস্তত্ত্বে এক বড় পরিবর্তন এনেছে। এল-সায়েদ বিজয়ী হওয়ার পর স্পষ্ট করেই বলেছিলেন - মিশিগানের সচেতন মানুষ ঘৃণা ও ধর্মের ভিত্তিতে রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টির অপচেষ্টাকে ভোটের মাধ্যমে প্রতিহত করেছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (AP) প্রতিবেদনগুলোতেও দেখা গেছে, সাধারণ মুসলিম আমেরিকানদের কাছে এই বিজয় নিছক ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না; বরং দীর্ঘদিন ধরে বহন করা ভয়, অপরাধবোধ ও সন্দেহের সংস্কৃতি থেকে একপ্রকার মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি।

এখানে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা রয়েছে। ৯/১১-পরবর্তী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা তরুণ প্রজন্মের কাছে মুসলিম পরিচয় রক্ষা করা অনেক সময় এক ধরনের আত্মরক্ষামূলক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল। নিজের নাম, ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা পারিবারিক শিকড় নিয়ে তাদের এক ধরনের অস্বস্তি ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়েছে।

আজ যখন সেই তরুণরা দেখছেন - নিজের ধর্মীয় পরিচয় গোপন না করেও একজন ব্যক্তি নিউইয়র্কের মেয়র হতে পারেন বা মিশিগানের সিনেটর পদে নির্বাচিত হতে পারেন, তখন তাদের ভেতরে থাকা দীর্ঘদিনের আত্মসন্দেহ ভেঙে পড়ে। তারা বুঝতে শেখে:

-- আত্মপরিচয়ের জন্য লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই।

-- ধর্মীয় বিশ্বাস কখনোই নাগরিক মর্যাদা ও অধিকারকে খর্ব করে না।

-- উত্তরসূরিদের এই দেশে বেড়ে উঠতে হলে পরিচয় আড়াল করার কোনো প্রয়োজন নেই।

-- বিষাক্ত রাজনৈতিক প্রচারণাই সাধারণ সমাজ ব্যবস্থার চূড়ান্ত প্রতিফলন নয়।

তবে, এই জয়গুলোকে মার্কিন সমাজে ইসলামোফোবিয়ার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি শুধু প্রমাণ করে - বিদ্বেষ থাকা সত্ত্বেও সমাজে তার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য যা কিনা এক পরম স্বস্তির বিষয়।

মামদানি বা এল-সায়েদের বিজয়কে ‘ধর্মীয় রাজনৈতিক জয়’ না মনে করে ‘বহুত্ববাদী গণতন্ত্র ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের জয়’ বলেই মনে করছে মুসলিম আমেরিকানরা। কারণ তারা নিজেরাও জানে সমর্থক গোষ্ঠীতে কেবল মুসলিমরাই ছিলেন না - ছিলেন ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু, ধর্মনিরপেক্ষ জনগোষ্ঠী এবং সর্বস্তরের সাধারণ নাগরিক। সমাজের এই অন্তর্ভুক্তিমূলক (inclusive) চরিত্র এবং অন্য ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের এই ইতিবাচক অংশগ্রহণই মুসলিমদের মনে সবচেয়ে বড় আনন্দের উৎস, উদযাপনের উপলক্ষ।

সুতরাং, এই উদযাপনের গভীরে কোনো ধর্মীয় আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা নেই; আছে সমান মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার মানবিক দাবি।

একজন মুসলিমের কাছে এই জয়গুলো কোনো ধর্মীয় সাফল্য নয় - এটি এমন এক সাম্যবাদী মার্কিন সমাজের সম্ভাবনার প্রতীক, যেখানে কাউকে তার নাম বা বিশ্বাসের কারণে উন-মানুষ গণ্য করা হবে না।

এই বোধই প্রকৃতপক্ষে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মাঝে এইরকম বিজয়কে উদযাপনে উৎসাহিত করে - কোনো ধর্মীয় অবেগ থেকে নয়, অবশ্যই। যারা ভুল ব্র্যান্ডিং করছে তাদের উদ্দেশ্যও স্পষ্ট।।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login