Novel

জিরো থেকে গডমোড

November 7, 2026

10 views

প্রারম্ভিক প্রস্তাবনা: অন্ধকারের কোড এবং এক রাতের বিপ্লব

ঢাকার কুড়িল বিশ্বরোডের কাছে একটি স্যাঁতসেঁতে, ছোট মেসে রাত কাটত রনির। বয়স সবেমাত্র তেইশ। পরনে ময়লা টি-শার্ট, চোখের নিচে ক্লান্তি আর অনিদ্রার কালো দাগ, আর সামনে পুরোনো একটা ডেল ল্যাপটপ—যার স্ক্রিনটা মাঝেমধ্যে কেঁপে ওঠে। রনি সাধারণ কোনো হ্যাকার ছিল না; আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার কোড নেম ছিল ‘ফ্যান্টম জিরো’ (Phantom Zero)। সে পৃথিবীর যেকোনো ফায়ারওয়াল বা সিকিউরিটি সিস্টেম নিমেষে ভেদ করতে পারত। কিন্তু এত মেধা থাকার পরও তার জীবন ছিল চরম দরিদ্র ও হতাশাজনক। বড় বড় কর্পোরেট সিন্ডিকেট এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডনদের কাজ করে দিয়ে সে পেত সামান্য কিছু বিটকয়েন, যা দিয়ে কোনোমতে হাত খরচ চলত।

রনি সবসময় বলত, "এই পৃথিবীতে সৎভাবে মেধা বিক্রি করে বড়লোক হওয়া যায় না; বড়লোক হতে হলে সিস্টেমের মাথার ওপর পা রাখতে হয়।"

আর সেই সিস্টেমের মাথার ওপর পা রাখার সুযোগটা এল ঠিক এক বৃষ্টির রাতে। যে রাতটি রনির সাধারণ জীবনকে চিরকালের মতো বদলে দিল।

অধ্যায় ১: ট্রিলিয়ন ডলারের ভুল কোড

সেদিন রাত দুটো বেজে পনেরো মিনিট। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। রনি তার ল্যাপটপে ডার্ক ওয়েবের একটি বিশেষ রিলে সার্ভার স্ক্যান করছিল। হঠাৎ তার স্ক্রিনে একটি এনক্রিপ্টেড প্যাকেট ফ্ল্যাশ করল। প্যাকেটটি সাধারণ কোনো মেসেজ নয়—এটি ছিল বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় অফশোর ডিজিটাল ব্যাংক ‘সেন্ট্রাল সুইফ্ট গ্লোবাল নেটওয়ার্ক’ (CSGN)-এর একটি ব্যাকডোর ট্রানজ্যাকশন প্রোটোকল।

রনি কোডগুলো ডিকোড করতেই তার চোখ কপালে উঠে গেল।

সে দেখতে পেল, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি দুর্নীতির সাথে জড়িত মেগা-করপোরেশন এবং গ্লোবাল সিন্ডিকেট মিলে গোপনে তাদের সমস্ত কালো টাকা—মোট প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার—একটি বিশেষ শেল কোম্পানির মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর এই ট্রান্সফারের মূল সিকিউরিটি সিস্টেমটি ডিজাইন করেছে স্বয়ং সাইবার সিকিউরিটি জায়ান্ট ‘নোভাটেক’।

কিন্তু ভুলটা হয়েছিল নোভাটেকের প্রধান স্থপতির কোডিংয়ে। তিনি কোডের ভেতর একটি স্থায়ী ব্যাকডোর বা ‘গডমোড’ টোকেন রেখে দিয়েছিলেন, যার মাধ্যমে পুরো ব্যাংকের সেন্ট্রাল সার্ভারের মেইন এক্সেস যে কেউ নিজের দখলে নিতে পারে।

রনির মুখের কোণে এক চিলতে ঠান্ডা হাসি খেলে গেল। সে বুঝতে পারল, আজ রাতে ভাগ্য তার দরজায় কড়া নেড়েছে। হয় সে এই কোড ইগনোর করে সারাজীবন এভাবেই মেসে ধুঁকে মরবে, না হয় এক রাতে এমন এক চাল দেবে যে পুরো পৃথিবীর ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম তার ইশারায় নাচবে।

অধ্যায় ২: রাতারাতি ডিজিটাল সাম্রাজ্যের দখল

রনি বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করল না। সে তার নিজের তৈরি করা কাস্টম এআই স্ক্রিপ্ট—যাকে সে নাম দিয়েছিল ‘ভাইপার-এক্স’ (Viper-X)—সেটি সেই ব্যাকডোর প্রোটোকলে রান করে দিল।

ল্যাবের পুরোনো ফ্যানটা সাঁ সাঁ শব্দে ঘুরতে লাগল। স্ক্রিনের সবুজ কোডের লাইনগুলো ঝড়ের বেগে ওপর থেকে নিচে নামতে লাগল।

‘ব্রেকিং ফায়ারওয়াল... লেয়ার ১... লেয়ার ২... লেয়ার ৩... এক্সেস গ্রান্টেড।’

হঠাৎ রনির ল্যাপটপের স্ক্রিনটি উজ্জ্বল নীল রঙে পরিবর্তিত হয়ে গেল। সামনে ভেসে উঠল সেন্ট্রাল সুইফ্ট ব্যাংকের সেন্ট্রাল অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ড। সে এখন সেই সিস্টেমের সুপ্রিম রুট ইউজার বা ‘গডমোড’-এর অধিকারী। ১২ বিলিয়ন ডলারের ডিজিটাল সম্পদ এখন আক্ষরিক অর্থেই তার আঙুলের ডগায়।

রনি লোভে অন্ধ হয়ে সব টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে পালিয়ে যাওয়ার মতো বোকা হ্যাকার ছিল না। সে জানত, ততক্ষণে ইন্টারপোলের সাইবার ক্রাইম ইউনিট এবং ওই মেগা-করপোরেশনের এআই ট্র্যাকাররা তার আইপি ট্রেস করা শুরু করে দিয়েছে।

সে এক জাদুকরী কাজ করল। সে পুরো ১২ বিলিয়ন ডলারের একটা অংশ বিশ্বের কয়েক হাজার এতিমখানা, গরিব গবেষণা কেন্দ্র এবং ওপেন সোর্স সিকিউরিটি প্রজেক্টে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডোনেট করে দিল। আর বাকি অংশটি এমন এক ডেমোক্রেটিক ক্রিপ্টো ট্রাস্ট ওয়ালেটে লক করে দিল, যা ভাঙার ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো ব্যাংকের নেই।

সবশেষে, সে নোভাটেকের সেন্ট্রাল সার্ভারে একটি মাত্র মেসেজ রেখে দিল:

> “তোমাদের সিস্টেম নিরাপদ নয়। শুভেচ্ছাান্তে—ফ্যান্টম জিরো।”

>

অধ্যায় ৩: সকালেই বদলে যাওয়া দুনিয়া

পরের দিন সকাল আটটা।

রনি যখন ঘুম থেকে জেগে উঠল, তখন তার আর আগের মতো সেই স্যাঁতসেঁতে মেসে থাকার কোনো প্রয়োজন ছিল না। সে তার মোবাইল ফোনটি অন করতেই স্ক্রিনজুড়ে নোটিফিকেশনের বন্যা বয়ে গেল।

বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স—বিশ্বের সমস্ত প্রধান সংবাদমাধ্যমের ব্রেকিং নিউজ:

> “গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেমে অভূতপূর্ব সাইবার হ্যাকিং! রহস্যময় হ্যাকার ‘ফ্যান্টম জিরো’-র এক ক্লিকেই উল্টে গেল বিশ্বের শীর্ষ ৫ কর্পোরেশনের অর্থনীতি। নোভাটেক সার্ভার সম্পূর্ণ ক্র্যাশ।”

>

শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে। কর্পোরেশনগুলোর কর্তাব্যক্তিরা দিশেহারা। ইন্টারপোল এবং এফবিআই ইন্টারনেটের কোণায় কোণায় ‘ফ্যান্টম জিরো’-কে খুঁজতে শুরু করেছে। কিন্তু কেউ জানে না এই মহাশক্তিধর হ্যাকারটি আসলে কে বা কোথায় থাকে।

রনি তার ল্যাপটপটি বন্ধ করে ব্যাগে ভরল। সে আর সেই পুরোনো মেসে নেই। আধঘণ্টার মধ্যে সে তার সমস্ত ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট মুছে ফেলে একটি প্রাইভেট এয়ারপোর্টের দিকে রওনা দিল।

অধ্যায় ৪: নতুন জীবন ও পরিচয়

ছয় মাস পরের কথা।

সুইজারল্যান্ডের জুরিখে লেকসাইডের একটি অত্যন্ত বিলাসবহুল গ্লাস পেন্টহাউস। বাইরে বরফ পড়ছে। রুমের ভেতরে ফায়ারপ্লেসের মৃদু আগুন জ্বলছে।

সোফায় বসে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন এক তরুণ। পরিপাটি স্যুট পরা, চোখে আধুনিক স্মার্ট গ্লাস। তিনি আর কেউ নন—স্বয়ং রনি। এখন তিনি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সাইবার সিকিউরিটি ফার্ম ‘জিরো-ট্রাস্ট ডিফেন্স’-এর মালিক ও প্রধান নির্বাহী। বিশ্বজুড়ে বড় বড় ব্যাংক ও সরকার এখন তাদের সিস্টেম নিরাপদ রাখার জন্য কোটি কোটি ডলার দিয়ে রনির পরামর্শ নেয়।

কেউ আর জানে না যে এই সফল ব্যবসায়ীই একসময় পুরান ঢাকার এক অন্ধকার মেসে বসে পুরো পৃথিবীর ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেমকে এক রাতে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

রনি পেন্টহাউসের বিশাল কাচের জানালার বাইরে তুষারপাতের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। জীবন সত্যিই এক রাতের মধ্যে বদলে যেতে পারে—যদি আপনার হাতে সঠিক কোড এবং সেই কোড খেলার সাহস থাকে।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login