Novel

নিঃসঙ্গতার অন্তহীন চরে

November 8, 2026

10 views

প্রথম পর্ব: ঘড়ির টিকটিক শব্দ ও শূন্যতার চাদর

রাতের ঘড়িতে যখন কাঁটা দুটো একে অপরের ওপর এসে মায়াবী এক সরল রেখা তৈরি করে, তখন ঢাকা শহরের কোলাহলপূর্ণ আকাশেও নেমে আসে এক অদ্ভুত, ভারী নীরবতা। গুলশানের এই অভিজাত সুউচ্চ ভবনের এগারো তলার ফ্ল্যাটে বসে তৌসিফ আহমেদ তাকিয়ে থাকে জানালার বাইরে। রাস্তার ধারের নিয়ন বাতিগুলো নিভে গেছে বহু আগেই। কেবল কিছু দূরপাল্লার ট্রাক আর ক্লান্ত রিকশার চাকার আওয়াজ রাতের নিস্তব্ধতাকে টুকরো টুকরো করে দিয়ে যায়। তৌসিফের দুচোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। গত প্রায় ছয় মাস ধরে তার রাতের এই রুটিনটা খুব চেনা—বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকা, মাথার ভেতর হাজারটা অহেতুক চিন্তার খেই হারিয়ে ফেলা এবং ঘড়ির টিকটিক শব্দ গোনা।

দিনের বেলাটা একরকম কেটে যায়। মাল্টিন্যাশনাল ব্যাংকের করপোরেট ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের হেড হিসেবে তার কাজের চাপ পাহাড়সমান। সকাল আটটায় ঘুম থেকে উঠে গোসল, ব্রেকফাস্ট, তারপর গাড়িতে উঠে সোজা মতিঝিল বা গুলশানের অফিস। সারাদিন মিটিং, এক্সেল শিট, ব্যালেন্স শিট, ক্লায়েন্ট কল আর বসের কড়া নজরদারি। কথা বলার মানুষ তো বটেই, এমনকি নিজের জন্য আধা কাপ চা খাওয়ার ফুরসতটুকুও তার থাকে না। সহকর্মীদের সাথে কথা হয়, কিন্তু সে কথাগুলো সম্পূর্ণ প্রফেশনাল—যান্ত্রিক, হিসेবি এবং উদ্দেশ্যমূলক। সেখানে কোনো আবেগ নেই, হৃদয়ের কোনো উষ্ণতা নেই।

কিন্তু যখন সন্ধ্যা নামে, অফিস থেকে ক্লান্ত পায়ে গাড়িতে ফিরে এই এগারো তলার ফ্ল্যাটে পা রাখতেই বুকটা কেমন যেন খালি হয়ে আসে। দরজা খোলার সাথে সাথে জমাট বাঁধা অন্ধকার তাকে জাপটে ধরে। কেউ নেই। এই বিশাল ফ্ল্যাটে সে একদম একা। একটা সময় এই একাকিত্ব তার পছন্দ ছিল, সে এটিকে বলত ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’ বা ‘প্রাইভেসি’। কিন্তু এখন এই স্বাধীনতা এক জেলের মতো তাকে পিষে মারছে। সারাদিন কাজের ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়লেও বিছানায় শুলেই মাথাটা সজাগ হয়ে ওঠে। ঘুম যেন তার সাথে এক নিষ্ঠুর লুকোচুরি খেলায় মেতেছে।

তৌসিফ বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে। বালিশে মুখ গুঁজে সে ভাবতে চেষ্টা করে—কোথায় গেল তার সেই পুরোনো বন্ধুরা? কোথায় হারিয়ে গেল সেই দিনগুলো, যখন রাতের পর রাত চায়ের কাপে ঝড় তুলে আড্ডা দেওয়া যেত? আজ কেরিয়ারের ইঁদুর দৌড়ে সবাই এত ব্যস্ত যে কারো সাথে কারো দেখা হয় না। টাকা পয়সা এসেছে প্রচুর, ব্যাংক ব্যালেন্সের গ্রাফ উর্ধ্বমুখী, কিন্তু মনের ভেতরের ভাণ্ডার একেবারে শূন্য। রাতের এই প্রহরগুলো যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। মনে হয় সময় বুঝি আর সামনে এগোচ্ছে না, এক জায়গায় আটকে থেকে তাকে প্রতি মুহূর্তে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। এই স্থবিরতা থেকে মুক্তির কোনো পথ কি সত্যিই নেই?

দ্বিতীয় পর্ব: করপোরেট মেশিনের ভেতরে একটি ক্লান্ত প্রাণ

সকালের অ্যালার্মটা যখন বেজে ওঠে, তখন তৌসিফের মনে হয় আজকের দিনটা বুঝি সে পার করতে পারবে না। সারা রাতের অনিদ্রায় শরীরটা ভেঙে আসছে, মাথার ভেতর চিনচিনে একটা ব্যথা করছে। তবুও ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে তাকে তৈরি হতে হয়। ইস্ত্রি করা শার্ট, নিখুঁত টাই, স্যুট—সব মিলিয়ে সে কর্পোরেট দুনিয়ার এক নিখুঁত সেনাপতি। কিন্তু এই নিখুঁত খোলসের ভেতরে যে মানুষটা লুকিয়ে আছে, সে ভেতরে ভেতরে পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে গেছে।

গাড়িতে ওঠার পর ড্রাইভার কুদ্দুস ভাই আয়না দিয়ে তৌসিফের দিকে তাকিয়ে বললেন, "স্যার, আপনার শরীর কি খারাপ লাগছে? চোখ দুটো খুব লাল হয়ে আছে।"

তৌসিফ একটা ক্ষীণ হাসি টেনে বলল, "না কুদ্দুস ভাই, রাতে একটু কম ঘুম হয়েছে। ঠিক হয়ে যাবে।"

অফিসে ঢোকার সাথে সাথে তার চারপাশের পরিবেশটা আবার সেই যান্ত্রিক গতিতে চলতে শুরু করে। অ্যাসিস্ট্যান্ট তানিয়া একগাদা ফাইল টেবিলে রেখে বলল, "স্যার, দুটোর সময় রিজার্ভ ব্যাংকের সাথে জুম মিটিং আছে। আর ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টের ড্রাফটটা এখনো ফাইনাল হয়নি।"

তৌসিফ শুধু মাথা নাড়ল। সে যেন একটা রোবট, যাকে কোড করে দেওয়া হয়েছে সারাদিন কেবল কাজ করার জন্য। মিটিংয়ে সে অনর্গল ইংরেজি বলে গেল, প্রজেক্টের ত্রুটি ধরিয়ে দিল, নতুন স্ট্র্যাটেজি বুঝিয়ে দিল। সবাই তাকে সমীহ করে, তার বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করে। কিন্তু কেউ কি কোনো দিন জানতে চেয়েছে যে এই মানুষটার নিজের ভেতর কী পরিমাণ ঝড় বয়ে চলেছে?

দুপুরের খাওয়ার বিরতিতে ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণে একা বসে তৌসিফ কফিতে চুমুক দিচ্ছিল। পাশের টেবিলে কোম্পানির দুজন জুনিয়র এক্সিকিউটিভ নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করে আড্ডা দিচ্ছিল। তাদের চোখেমুখে কী এক অদ্ভুত সজীবতা! তৌসিফ তাদের দিকে তাকিয়ে নিজের বিশ বছর আগের দিনগুলোর কথা মনে করার চেষ্টা করল। তখন পকেটে টাকা ছিল না, মেসে থাকতে হতো, ভবিষ্যৎ নিয়ে হাজারটা অনিশ্চয়তা ছিল—কিন্তু মনের ভেতর এক ধরনের শান্তি ছিল, কারো সাথে মনের কথা বলার মানুষ ছিল। আজ পকেটে টাকা আছে, গাড়ি আছে, পদমর্যাদা আছে, কিন্তু সেই প্রাণের ছোঁয়াটুকু কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

কাজের চাপে সারাদিনের এই ব্যস্ততাটুকু তৌসিফকে এক ধরণের কৃত্রিম ব্যস্ততা উপহার দেয়, যা তাকে সাময়িকভাবে একাকিত্ব ভুলিয়ে রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু সে খুব ভালো করেই জানে, সূর্য ডোবার সাথে সাথেই এই করপোরেট নাটকের পর্দা নেমে যাবে এবং তাকে আবার ফিরে যেতে হবে সেই নিঃসঙ্গ প্রহরগুলোর মুখোমুখি হতে। এই যান্ত্রিক জীবন তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? সে কি কেবলই অর্থের একটা মেশিন হয়ে বেঁচে থাকবে? এই প্রশ্নটার উত্তর তার জানা নেই, আর হয়তো এই উত্তর খোঁজার মতো শক্তিটুকুও তার অবশিষ্ট নেই।

তৃতীয় পর্ব: ছায়ার সাথে কথোপকথন ও স্মৃতির বারান্দা

অফিস শেষ করে রাতে যখন তৌসিফ আবার তার এগারো তলার ফ্ল্যাটে ফিরে এল, তখন ঘড়ির কাঁটা রাত দশটা ছুঁইছুঁই। দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই সেই পূর্বপরিচিত ভারী অন্ধকার তাকে চারপাশ থেকে জড়িয়ে ধরল। সারাদিনের করপোরেট দৌড়ঝাঁপ, মিটিংয়ের বকবকানি এবং সহকর্মীদের হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্লান্তিগুলো যেন ঘরে ঢোকার সাথে সাথে একবারে তার ওপর চেপে বসল। তৌসিফ জুতোটা খুলে ডেস্কে ছুড়ে ফেলল, কোটের বোতামগুলো একে একে খুলে সোফায় বসে পড়ল। তার গায়ে আর এক ফোঁটাও শক্তি নেই।

আজ সে রাতের খাবার অর্ডার করতেও ভুলে গেছে। ডাইনিং টেবিলে কোনো খাবার নেই, ফ্রিজ খুললে কেবল কিছু কোল্ড ড্রিংকস আর জলের বোতল পাওয়া যাবে। তৌসিফের খিদেও নেই। খিদের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে মনের ভেতরকার এক অদ্ভুত শুষ্কতা। সে বসার ঘরের সোফায় বসে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। ফ্যানের ব্লেডগুলো ঘুরছে এক তালে, আর সেই শব্দটা ছাড়া ঘরে আর কোনো শব্দ নেই।

এই নিঃশব্দতাকে ভাঙার জন্য তৌসিফ রিমোট হাতে নিয়ে টিভি অন করল। নিউজের চ্যানেলগুলোতে চলছে দেশ বিদেশের নানা চাঞ্চল্যকর খবর, টকশোতে রাজনৈতিক নেতাদের চটজলদি মন্তব্য আর বিজ্ঞাপনের কর্কশ শব্দ। তৌসিফ কিছুক্ষণের জন্য তাকিয়ে থাকল পর্দার দিকে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, টিভির এই কোলাহল তার ভেতরের শূন্যতাকে আরও বাড়িয়ে দিল। মনে হলো এই স্ক্রিনের ভেতরের মানুষগুলো সব যেন এক একটা ছায়া, যাদের সাথে বাস্তব জীবনের কোনো যোগসূত্র নেই। সে বিরক্ত হয়ে টিভিটা বন্ধ করে দিল। ঘরটা আবার আগের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

নিজের সাথে কথা বলার অভ্যাস মানুষের চিরকালের। কিন্তু তৌসিফ লক্ষ্য করল, সে গত কয়েক মাস ধরে নিজের সাথে কথা বলাও বন্ধ করে দিয়েছে। সে একা একা ঘরের এ মাথা থেকে ও মাথা হেঁটে বেড়ায়, আর আয়নায় নিজের ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবে—এটা কি সে নিজে, নাকি অন্য কেউ? তার অতীতের সেই চঞ্চল মনটা কোথায় হারিয়ে গেল? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় যে ছেলেটা হলের রুম কাঁপিয়ে কবিতা আবৃত্তি করত, বন্ধুদের সাথে মধ্যরাতে রিকশায় ঘুরে বেড়াত, আজ সে কোটি টাকার স্যুটের ভেতরে নিজেকে বন্দि করে ফেলেছে।

তৌসিফ ড্রয়িংরুমের দেওয়ালের এক কোণে ঝুলে থাকা একটা পুরোনো ছবি ফ্রেমে চোখ রাখল। সেটা ছিল তার ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েশন ডে-র ছবি। সেখানে তার সাথে ছিল তার তৎকালীন বান্ধবী মেহজাবিন আর কয়েকজন কাছের বন্ধু। মেহজাবিনের সাথে তার দীর্ঘ সাত বছরের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু উচ্চশিক্ষার জন্য মেহজাবিন যখন কানাডা চলে গেল এবং তৌসিফ করপোরেট কেরিয়ার গড়ার লোভে ঢাকায় রয়ে গেল, তখন দূরত্বের ব্যবধান সেই সম্পর্কে ফাটল ধরাতে বেশি সময় নেয়নি। আস্তে আস্তে যোগাযোগ কমে গেল, তারপর একসময় সব শেষ। মেহজাবিন এখন টরন্টোতে সেটেলড, তার স্বামী আছে, সন্তান আছে। সে তার জীবনে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আর তৌসিফ? সেও অনেক দূর এগিয়ে গেছে বটে, কিন্তু কেবল অর্থের হিসেবে, অনুভূতির হিসেবে সে দেউলিয়া হয়ে গেছে।

ফেমটার দিকে তাকিয়ে তৌসিফ ফিসফিস করে বলল, "কেমন আছো মেহজাবিন? তুমি কি কখনো মনে রেখেছো সেই পুরোনো দিনগুলোকে?" ঘরের অন্ধকার সেই কথার কোনো প্রতিধ্বনি ফিরিয়ে দিল না। কেবল তৌসিফের নিজের দীর্ঘশ্বাসটাই ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল। এই ছায়ার সাথে কথা বলা কোনো সমাধান নয়, বরং এটি তার ক্ষতগুলোকে আরও বেশি উসকে দিচ্ছে। কিন্তু তবুও এই গভীর রাতে নিজের অতীতের সেই মায়াবী দিনগুলোর স্মৃতি ছাড়া তার আকড়ে ধরার মতো আর কোনো খড়কুটো অবশিষ্ট নেই।

চতুর্থ পর্ব: অনিদ্রার দীর্ঘ প্রহর ও থমকে যাওয়া সময়

রাত যখন গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে, তৌসিফের বুকের ভেতরের হাহাকারটাও তত বাড়তে থাকে। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দটা তার কাছে মনে হয় এক একটা বড় পাথরের আঘাত। টিক... টাক... টিক... টাক... সময় যেন আর সামনে এগোতে চাইছে না। সে বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাথার ভেতর অজস্র চিন্তার জট পাকিয়ে যায়। কাল অফিস আছে, সকাল আটটায় উঠতে হবে, একটা বড় প্রজেক্টের প্রেজেন্টেশন আছে—এই সমস্ত লজিক্যাল কথাগুলো তার মস্তিষ্ককে বারবার মনে করিয়ে দিলেও, শরীর ও মন যেন সেই নির্দেশ মানতে চায় না।

অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়া আজকাল তার জীবনের এক স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ডাক্তার ঘুমের ওষুধ দিয়েছিলেন। প্রথম কিছুদিন সেই ওষুধ খেয়ে সাত-আট ঘণ্টা টানা ঘুম হতো। কিন্তু কিছুদিন যাওয়ার পর দেখা গেল ওষুধের ডোজ বাড়িয়েও আর আগের মতো কাজ হচ্ছে না। সকালে ওঠার পর মাথাটা কেমন যেন ভারী হয়ে থাকে, সারাদিন ঝিমুনি ভাব থাকে এবং কাজের মনোযোগ নষ্ট হয়। তাই তৌসিফ নিজেই ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ঘুমের ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এখন সে রাতের এই প্রহরগুলোর সাথে একা একা যুদ্ধ করে।

এই যুদ্ধ বড় অদ্ভুত। এখানে কোনো শত্রু নেই, কোনো প্রতিপক্ষ নেই—কেবল রয়েছে নিজের মন, যা নিজের সাথেই লড়াই করে চলেছে। তৌসিফ ভাবে, কেন তার এই অবস্থা হলো? সে কি মানুষের সাথে মিশতে ভুলে গেছে? নাকি সে এত বেশি সফল হতে গিয়ে মানুষের সান্নিধ্য পাওয়ার সমস্ত রাস্তা নিজের হাতে বন্ধ করে দিয়েছে? সে তো পারত সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে একটু জিমে যেতে, কিংবা কোনো ক্লাবে আড্ডা দিতে, অথবা কোনো বইয়ের দোকানে গিয়ে সময় কাটাতে। কিন্তু তার শরীর এতটাই ক্লান্ত থাকে যে কাজের বাইরে আর কোনো এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি করার এনার্জি তার অবশিষ্ট থাকে না।

সে বিছানা ছেড়ে উঠে পায়ে পায়ে ড্রয়িংরুমে এল। রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা জল ঢেলে সে সেটা এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেলল। বারান্দার দরজাটা খুলে সে বাইরে এসে দাঁড়াল। এগারো তলার ওপর থেকে রাতের ঢাকাকে দেখতে বেশ সুন্দর লাগে। নিচ দিয়ে দু একটা গাড়ি ফাস করে চলে যাচ্ছে, কিছু পথকুকুর রাস্তার মোড়ে বসে আছে। এই শহরটা কখনো ঘুমায় না। কিন্তু এই ঘুম না ঘুমানো শহরের ভিড়ে তৌসিফের মতো এমন হাজারো মানুষ রয়েছে, যারা চারপাশের কোলাহলের মাঝেও চরম একা। তাদের কষ্টের কথা শোনার মতো কেউ নেই, তাদের জড়িয়ে ধরে একটু কাঁদার মতো কোনো বুক নেই।

বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তৌসিফের মনে হলো, এই থমকে যাওয়া সময়টাকে পার করার জন্য তার কি কাউকে প্রয়োজন? নাকি এই একাকিত্বই তার জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি? সে তো চাইলে আজই এই করপোরেট চাকরি ছেড়ে দিয়ে কোথাও দূরে চলে যেতে পারত—যেখানে কোনো ইঁদুর দৌড় নেই, কোনো টার্গেট নেই, কেবল রয়েছে সবুজ প্রকৃতি আর সহজ সরল মানুষের জীবন। কিন্তু পরক্ষণেই সে হেসে ওঠে নিজের এই অবাস্তব ভাবনায়। সে তো আর কুড়ি বছরের তরুণ নয় যে হুট করে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে সব ছেড়েছুড়ে পালিয়ে যাবে। তার কাঁধে যেমন রয়েছে বড় পদের দায়িত্ব, তেমনি রয়েছে একটা স্থিতিশীল জীবনের অভ্যস্ততা। সে এই গোলকধাঁধা থেকে বের হতে চায়, কিন্তু এই গোলকধাঁধার দেওয়ালগুলো এত শক্ত যে সে চাইলেও সেগুলোকে ভাঙতে পারে না। রাতের ঠান্ডা বাতাস তার গায়ে এসে লাগে, আর সে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে সেই অনিদ্রার অন্তহীন সমুদ্রে।

পঞ্চম পর্ব: অতীতের ছায়া ও বর্তমানের মরুভূমি

ভোর হতে এখনও বেশ কিছুটা দেরি। তৌসিফ বারান্দা থেকে ফিরে এসে আবার বিছানায় বসল। ঠিক ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে না, আবার জেগে থাকার শক্তিও ফুরিয়ে এসেছে। এই হাড়ভাঙা ক্লান্তির মাঝে তার মনে পড়তে লাগল তার শৈশবের কথা। ঢাকার পুরান ঢাকার এক ব্যস্ত অলিগলিতে তার কেটেছিল ছোটবেলা। তখন জীবন এত জটিল ছিল না। বাবার ছোট কাপড়ের দোকান ছিল, মা সারাদিন রান্নাবান্না আর সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। দুই ভাই এক বোন মিলে সেই ছোট্ট ঘরে কত না খুনসুটি করেছি ছোটবেলায়।

তখনকার দিনে রাতের বেলা কারেন্ট চলে গেলে সবাই মিলে বাড়ির ছাদে মাদুর পেতে শুয়ে থাকত। আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা গোনা, নানারকম রূপকথার গল্প শোনা—সে এক অন্য পৃথিবী ছিল। আজ তৌসিফ গুলশানের এগারো তলার এই পেন্টহাউসে এসির মৃদু বাতাসে শুয়ে থাকে, যেখানে কোনো গরম নেই, কোনো মশার উপদ্রব নেই, আধুনিক সমস্ত সুযোগ-সুবিধা হাতের নাগালে রয়েছে—কিন্তু সেই ছাদের সেই তারাভরা আকাশের আকাশ ছোঁয়া আনন্দটুকু আজ কোথায় হারিয়ে গেছে? মানুষ যখন বড় হতে চায়, তখন সে অনেক কিছু অর্জন করে বটে, কিন্তু সেই অর্জনের মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে সে তার শৈশবের সরলতা আর মনের ভেতরের আনন্দগুলোকে একে একে বিসর্জন দিয়ে দেয়।

তৌসিফের বড় ভাই এখন আমেরিকায় সেটেলড, বোন থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। বাবা-মা দুজনেই বহু বছর আগে মারা গেছেন। পৈতৃক সেই পুরোনো বাড়িটা বিক্রি করে দেওয়ার পর পুরান ঢাকার সাথে তৌসিফের সমস্ত নাড়ির টান চিরকালের মতো চুকে গেছে। এখন সে এই নতুন ঢাকার এক যান্ত্রিক বাসিন্দা। সে ছুটির দিনে মাঝে মাঝে একা একা ড্রাইভ করতে করতে পুরান ঢাকার সেই অলিগলির পাশ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে নিজেকে এক সম্পূর্ণ অপরিচিত পর্যটকের মতো অনুভব করে। চারপাশের সেই চিরচেনা গলিগুলো পাল্টে গেছে, পুরোনো বাড়িগুলো ভেঙে সেখানে বড় বড় রড-সিমেন্টের ফ্ল্যাট উঠেছে। তার চেনার মানুষগুলো সব হারিয়ে গেছে বা বদলে গেছে।

এই বর্তমানের মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে তৌসিফ বুঝতে পারে যে তার শেকড়গুলো অনেক আগেই শুকিয়ে গেছে। সে এখন এমন একটা গাছ, যার পাতাগুলো হয়তো বহাল তবিয়তে রয়েছে, কিন্তু মাটির গভীরে তার কোনো জলের উৎস আর অবশিষ্ট নেই। যেকোনো মুহূর্তে সামান্য ঝড়েই সে ভেঙে পড়তে পারে। এই ভাবনাটা তার মনের ভেতর একটা অজানা ভয় তৈরি করে। সে বিছানায় শুয়ে কম্বলটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিল। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত তিনটে পার করে চারটের দিকে এগোচ্ছে। বাইরে দূরের কোনো মসজিদ থেকে ফজরের আজানের সুর ভেসে এল। সেই পবিত্র ধ্বনিটা রাতের এই গাঢ় অন্ধকারের বুক চিরে এক স্নিগ্ধ শান্তির পরশ বুলিয়ে দিল। তৌসিফ চোখ বন্ধ করে সেই আজানের সুর শুনতে শুনতে বহু দিন পর একটু স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হয়তো এই অন্তহীন রাতেরও একটা সকাল আছে, যে সকাল তার এই থমকে যাওয়া সময়টাকে আবার সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নতুন কোনো পথ দেখিয়ে দেবে।

ষষ্ঠ পর্ব: অফিসের চঞ্চল মুখগুলোর আড়ালে জমাট বাঁধা হাহাকার

সকালের প্রথম আলো যখন গুলশানের বহুতল কাঁচের টাওয়ারগুলোর গায়ে এসে আছড়ে পড়ে, তখন তৌসিফ আহমেদের জীবন আবার সেই চিরচেনা করপোরেট ছকে ফিরে আসে। রাতের সেই অনিদ্রা, বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘ নিঃশ্বাস আর পুরান ঢাকার শৈশবের স্মৃতিগুলো যেন এক নিমেষে কুয়াশার মতো মিলিয়ে যায়। তৌসিফ এখন ব্যাংকের হেড অব করপোরেট ফাইন্যান্স—একজন ক্ষুরধার মস্তিষ্কের, অত্যন্ত সফল মানুষ। তার প্রতিটি পদক্ষেপে আত্মবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট।

অফিসে ঢোকার সাথে সাথেই তার অ্যাসিস্ট্যান্ট তানিয়া একগুচ্ছ ফাইল নিয়ে তার কেবিনে প্রবেশ করল।

"স্যার, আজকে এগারোটার সময় ক্রেডিট কমিটির মিটিং আছে। আর চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার আপনার সাথে আলাদাভাবে একটু বসতে চেয়েছেন, বাজেট অ্যাপ্রুভালের ব্যাপারে।"

তৌসিফ ল্যাপটপ অন করতে করতে অত্যন্ত শীতল ও পেশাদার গলায় বলল, "ঠিক আছে তানিয়া। সিইও স্যারের সাথে মিটিংটা দশটায় শিফট করা যায় কি না দেখো, এগারোটার মিটিংয়ের আগে আমার কিছু ডেটা ক্রস-চেক করার আছে।"

তানিয়া ফাইলগুলো রেখে যাওয়ার সময় হাসিমুখে বলল, "স্যার, আপনি এত নিখুঁত কাজ কীভাবে করেন বলুন তো? আপনার এনার্জি দেখে আমাদের জুনিয়ররা অবাক হয়ে যায়।"

তৌসিফ মনে মনে একটা মৃদু তিক্ত হাসি হাসল। সে তো জানে না এই নিখুঁত কাজের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক জ্যান্ত লাশ, যার ভেতরটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। কিন্তু করপোরেট দুনিয়া তো দুর্বলতা দেখার জায়গা নয়। এখানে উইকনেস দেখা মানেই নিজের ধ্বংস ডেকে আনা। তাই সে বাইরে এক দুর্ভেদ্য চাদর জড়িয়ে রাখে, যাতে কেউ তার ভেতরের ভাঙনটুকু টের না পায়।

মিটিং শুরু হলো। বড় বড় কনফারেন্স টেবিলে কোম্পানির ডিরেক্টররা বসে আছেন। তৌসিফ তার প্রেজেন্টেশন স্লাইডগুলোর মাধ্যমে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ব্যাংকের এই কোয়ার্টারের প্রফিট মার্জিন এবং রিস্ক ম্যানেজমেন্টের মডেল বুঝিয়ে দিল। সবাই হাততালি দিল, সিইও নিজে পিঠ চাপড়ে বললেন, "এক্সিলেন্ট জব, তৌসিফ! তুমি না থাকলে আমাদের এই ফাইনান্সিয়াল স্ট্রাকচার এত স্মুথ হতো না।"

সবাই প্রশংসা করল, বাহবা দিল। কিন্তু এই বাহবাগুলো তৌসিফের কান পর্যন্ত পৌঁছালেও তার হৃদয়ে কোনো দাগ কাটতে পারল না। এগুলো যেন এক একটা ইকো বা প্রতিধ্বনি মাত্র। দুপুরের দিকে লাঞ্চ ব্রেকে ক্যাফেটেরিয়ায় বসল তৌসিফ। তার টেবিলে এসে বসল তার জুনিয়র কলিগ নাবিল। নাবিল বেশ হাসিখুশি একটা ছেলে, মাস ছয়েক আগে জয়েন করেছে।

নাবিল কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, "স্যার, কাল রাতে একটা অদ্ভুত বই পড়ছিলাম। একা থাকার সাইকোলজি নিয়ে। রাইটার বলছিলেন, মানুষ যখন সফলতার চূড়ায় পৌঁছায়, তখন নাকি সে সবচেয়ে বেশি একা হয়ে যায়। কথাটা কি সত্যি স্যার?"

তৌসিফ কফির কাপে চামচ নাড়তে নাড়তে নাবিলের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল এক ধরনের কৌতূহল ও সরলতা। তৌসিফ খুব শান্ত গলায় উত্তর দিল, "না নাবিল, মানুষ সফল হওয়ার কারণে একা হয় না; মানুষ একা হওয়ার ভয়েই সফল হওয়ার অন্ধ দৌড়ে নামে।" নাবিল কথাটা ঠিক বুঝতে পারল না, সে একটু হেসে বিষয়টার মোড় ঘুরিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল। কিন্তু তৌসিফ বুঝতে পেরেছিল নাবিল অজান্তেই এমন এক সত্যি কথা বলে ফেলেছে, যা তার নিজের জীবনের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।

সপ্তম পর্ব: উইকেন্ডের নিঃসঙ্গ কারাগার এবং শপিং মলের ভিড়

সপ্তাহের পাঁচটা দিন কাজের ব্যস্ততায় কোনোমতে কেটে গেলেও বিপত্তি ঘটে শুক্র ও শনিবার—উইকেন্ডের ছুটির দিনগুলোতে। যখন গুলশান বা বনানীর অফিসপাড়াগুলো হঠাৎ করে শান্ত হয়ে যায়, রাস্তাঘাটে গাড়ির চাপ কমে যায়, ঠিক তখনই তৌসিফের একাকিত্ব তার সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ নিয়ে তাকে আক্রমণ করে। শুক্রবার সকালটা সাধারণত তৌসিফ কাটিয়েছে বিছানায় শুয়ে বা অনলাইনে সিনেমা দেখে। কিন্তু একটানা চার দেয়ালের মধ্যে একা থাকতে থাকতে যখন দমবন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়, তখন সে বাধ্য হয়ে ঘর থেকে বের হয়।

সেদিন বিকেলে তৌসিফ তার গাড়ি নিয়ে সোজা চলে গেল বনানীর একটা নামী শপিং মলে। মলের ভেতরে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। কাপড়ের দোকানগুলোতে চলছে ডিসকাউন্টের অফার, কাপলরা হাত ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ছোট ছোট বাচ্চারা বেলুন হাতে ছুটোছুটি করছে। চারপাশের এই কোলাহল, হাসি-ঠাট্টা আর মানুষের হর্ষোল্লাসের মাঝে তৌসিফ একা একা হেঁটে বেড়াচ্ছে। সে একটা বড় ব্র্যান্ড শপ থেকে দুটো শার্ট পছন্দ করে বিলিং কাউন্টারে দাঁড়াল। তার সামনের ভদ্রলোক তার স্ত্রীর সাথে নানা রঙের শাড়ি নিয়ে খুনসুটি করছিলেন। ক্যাশিয়ার যখন তৌসিফকে বিলের টাকা চাইল, সে দ্রুত কার্ড swipes করে ব্যাগটা হাতে নিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে এল।

এই জনসমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে তৌসিফের নিজেকে এক অদ্ভুত ভিনগ্রহের প্রাণী বলে মনে হচ্ছিল। সবাই এখানে জোড়ায় জোড়ায় এসেছে, কারোর না কারোর সাথে কথা বলার মানুষ আছে, শেয়ার করার মতো আনন্দ আছে। আর তৌসিফ? সে কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্সের মালিক হয়েও এই বিশাল মলে এমন একজন মানুষ খুঁজে পেল না, যার সাথে সে একটু দাঁড়িয়ে নিরিবিলিতে দুটো ভালো কথা বলতে পারে। মানুষের ভিড় যত বাড়ে, একাকিত্বের অনুভূতিটা যেন তত বেশি তীক্ষ্ণ ও ভারী হয়ে ওঠে। এটি এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক প্যারাডক্স—চারপাশে হাজারো মানুষ থাকা সত্ত্বেও যখন ভেতরের মনটা একেবারে একা, তখন সেই ভিড় মানুষকে আরও বেশি পঙ্গু করে দেয়।

মলের ফুড কোর্টে গিয়ে তৌসিফ এক কোনায় একটা টেবিলে বসল। সে কফি আর একটা স্যান্ডউইচ অর্ডার করল। টেবিলে বসে সে চারপাশের মানুষের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। কেউ খাচ্ছে, কেউ সেলফি তুলছে, কেউ বা ভবিষ্যৎ প্ল্যান নিয়ে কথা বলছে। তৌসিফের মনে হলো, সে যেন এই পৃথিবীর কোনো গল্পের চরিত্র নয়, সে কেবল একজন দর্শক, যে বাইরে থেকে একটা নাটক দেখছে মাত্র। তার নিজের জীবনের কোনো দৃশ্যপট বা স্ক্রিপ্ট আর অবশিষ্ট নেই। খাবার শেষ করে সে যখন মল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে এসে বসল, তখন তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করছিল। সে মল থেকে বের হয়ে এল ঠিকই, কিন্তু তার সেই নিঃসঙ্গ কারাগারটা তার ছায়ার মতো তার সাথেই রয়ে গেল। গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফেরার পথে সে রেডিও অন করল, কিন্তু এফএম চ্যানেলের চটুল গানগুলো তার এই ভারী মনটাকে এক ফোঁটাও হালকা করতে পারল না।

অষ্টম পর্ব: পুরনো বন্ধুর অপ্রত্যাশিত ফোন কল

রবিবার রাতের ঘটনা। তৌসিফ তখন ডেস্কে বসে ল্যাপটপে অফিসের কিছু বাকি কাজ শেষ করছিল। এমন সময় তার টেবিলের ওপর রাখা মোবাইল ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সে দেখল একটা অচেনা নম্বর, কিন্তু নম্বরটির কান্ট্রি কোড দেখে সে বুঝল এটি আমেরিকা বা কানাডা থেকে আসছে। তৌসিফ একটু অবাক হয়ে ফোনটা রিসিভ করল।

"হ্যালো, তৌসিফ বলছি।"

ওপাশ থেকে একটা পরিচিত, বহু পুরোনো অথচ চেনা হাসির স্বর ভেসে এল, "কী রে তৌসিফ, আমাকে কি একেবারে ভুলেই গেছ নাকি দোস্ত?"

তৌসিফ এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তারপর তার গলা দিয়ে অবয়ব বেরিয়ে এল, "আরে... সুমিত! তুই? এতদিন পর?"

সুমিত হলো তৌসিফের সেই পুরোনো দিনের বন্ধু, যার সাথে সে ঢাকা ইউনিভার্সিটির হলের রুমে চার বছর কাটিয়েছিল। পাস করার পর সুমিত আমেরিকা চলে গিয়েছিল কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্স করতে, তারপর সেখানেই সেটেলড হয়ে গেছে। গত আট-দশ বছরে তাদের মধ্যে কদাচিৎ ফেসবুকে দুয়েকটা কমেন্ট বা নিউ ইয়ারের মেসেজ ছাড়া আর কোনো যোগাযোগ ছিল না।

সুমিত ওপাশ থেকে বেশ ফুরফুরে মেজাজে বলল, "আরে ভাই, আমি তো গত সপ্তাহে ঢাকায় এসেছি অফিসিয়াল কাজে। ভাবলাম আমার সেই পুরোনো রুমমেট ও বন্ধুকে একটু ফোন করে সারপ্রাইজ দিই। বল কেমন আছিস? শুনলাম তুই এখন ব্যাংকের বিশাল বড় বিগ বস হয়ে গেছিস!"

তৌসিফের মুখে বহু দিন পর একটা সত্যিকারের হাসি ফুটল। সে নড়েচড়ে বসে বলল, "আরে সুমিত, তুই ঢাকায় আছিস আর আমাকে একবারও জানাসনি? কোথায় আছিস এখন?"

"আমি গুলশানের একটা হোটেলে আছি। কাল রাতে আমার ফ্লাইট আমেরিকা ব্যাক করার আগে ভাবলাম তোর সাথে একটু দেখা করি। আজ রাতে কি তোর সময় হবে? বা কাল সকালে ব্রেকফাস্টে?" সুমিত বলল।

তৌসিফ সামান্যতম দ্বিধাও করল না। সে সঙ্গে সঙ্গে বলল, "আজ রাতে অফিস থেকে ফিরেই আমি তোর হোটেলে আসছি। প্লিজ কোথাও যাবি না, আমরা আজ রাতে লম্বা আড্ডা দেবো।"

ফোন রাখার পর তৌসিফের ঘরের সেই জমাট বাঁধা অন্ধকার যেন একটু হালকা হয়ে এল। বহু দিন পর কারো সাথে মন খুলে কথা বলার একটা সুযোগ এসেছে। সে দ্রুত ল্যাপটপ বন্ধ করে স্যুটটা পরে গাড়ি নিয়ে সোজা বেরিয়ে পড়ল সুমিতের হোটেলের উদ্দেশ্যে। গুলশানের সেই পাঁচতারা হোটেলের লবিতে যখন সুমিতের সাথে তার দেখা হলো, তখন দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরল। সুমিতের চুলগুলো কিছুটা পেকেছে, চেহারায় বয়সের ছাপ এসেছে, কিন্তু তার সেই চনমনে স্বভাবটা একটুও বদলায়নি। হোটেলের কফি শপে বসে তারা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো দিনগুলোর গল্প শুরু করল, তখন তৌসিফ যেন এক ঝটকায় কুড়ি বছর পেছনে ফিরে গেল। কে কোন হলে থাকত, কোন স্যারের ক্লাস থেকে পালিয়ে টিএসসি আড্ডা দিত, কে কার প্রেমিকা ছিল—সব স্মৃতির রোমন্থন হতে লাগল। তৌসিফ বুঝতে পারল, মানুষের জীবনের সবচেয়ে দামি সম্পদ হলো এই ধরনের পুরোনো সম্পর্কগুলো, যা কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স দিয়ে কেনা যায় না। সেই রাতে তৌসিফের মনে হয়েছিল সময় যেন আর থমকে নেই, সে আবার তার প্রাণের স্পন্দন ফিরে পাচ্ছে।

নবম পর্ব: পুরোনো স্মৃতির সুড়ঙ্গ ও বাস্তবতার ধাক্কা

সুমিতের সাথে সেই রাতের আড্ডাটা তৌসিফের মনের ভেতর এক অদ্ভুত আলোড়ন তৈরি করেছিল। বহু দিন পর সে উপলব্ধি করল যে তার ভেতরেও হাসার, কৌতুক করার এবং প্রাণ খুলে কথা বলার ক্ষমতাটুকু এখনো মরে যায়নি—সেগুলোকে কেবল অবহেলা আর কাজের চাপে সে মাটির নিচে চাপা দিয়ে রেখেছিল। সুমিত যখন বিদায় নেওয়ার সময় তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, "তৌসিফ, তুই তো বিশাল সফল হয়েছিস ঠিকই, কিন্তু নিজের যত্ন নিস দোস্ত। টাকা দিয়ে জীবন চলে, কিন্তু জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে মানুষের ছোঁয়া লাগে," তখন সেই কথাগুলো তৌসিফের হৃদয়ের গভীরে গিয়ে আঘাত করেছিল।

পরের দিন অফিসে যাওয়ার পরও তার মনের ভেতর সেই রেশটুকুই কাজ করছিল। সে তার কেবিনে বসে ভাবছিল, কেন সে এতদিন কেবল নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল? কেন সে একটু সামাজিক হওয়ার চেষ্টা করেনি? মানুষের সাথে মেশার রাস্তা তো বন্ধ হয়ে যায়নি, সে নিজেই সেই রাস্তাগুলোতে কংক্রিটের দেওয়াল তুলে দিয়েছিল। তৌসিফ সিদ্ধান্ত নিল যে সে এবার নিজের জীবনযাত্রার এই একঘেয়ে রুটিনটা ভাঙবে। সে ঠিক করল উইকেন্ডে সে আর ঘরে বসে একা সময় কাটাবে না, সে কোনো না কোনো সোশ্যাল গ্যাদারিং বা ক্লাবে যাবে, পুরোনো বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ বাড়াবে।

কিন্তু মানুষের অভ্যাস এত সহজে বদলায় না। সেই সপ্তাহের শেষের দিকে আবার যখন কাজের চাপ বাড়ল, ব্যাংকের একটা বড় অডিট এসে হাজির হলো, তখন তৌসিফ আবার সেই আগের চক্রে ফিরে গেল। কাজের প্রচণ্ড চাপে সে সুমিতকে দেওয়া কথাও রাখতে পারল না যে সে তাকে উইকেন্ডে ডিনারে ইনভাইট করবে। আবার সেই রাত জাগা, আবার সেই এগারো তলার ফ্ল্যাটের নিঃসঙ্গতা এবং সেই ঘড়ির টিকটিক শব্দ। বাস্তব জীবন বড় নিষ্ঠুর; সে মানুষের সুন্দর সিদ্ধান্তগুলোকে খুব সহজেই নিজের করপোরেট চাহিদার নিচে পিষে ফেলে।

তৌসিফ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বুঝল, সমস্যাটা কেবল পরিবেশের নয়, সমস্যাটা তার নিজের ভেতরেও রয়েছে। সে করপোরেট সংস্কৃতির এমন এক অপূরণীয় অংশে পরিণত হয়েছে যে, সে চাইলেও হুট করে সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারে না। তার এই সফলতার দাম হিসেবে তাকে তার ব্যক্তিগত জীবন, তার আনন্দ এবং তার মানসিক শান্তিকে পুরোপুরি কিস্তি হিসেবে চুকিয়ে দিতে হয়েছে। এই অনুধাবনটি তার ভেতরের হতাশাটাকে আরও বাড়িয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, একা থাকার এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো সহজ শর্টকাট রাস্তা নেই; এর জন্য তাকে নিজের পুরো জীবন দর্শন এবং কর্মপদ্ধতিকে নতুন করে সাজাতে হবে, যার জন্য বর্তমানের এই ক্লান্ত শরীর ও মন মোটেও প্রস্তুত নয়।

দশম পর্ব: মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ও থেরাপিস্টের শরণাপন্ন

মাস খানেক ধরে যখন এই অনিদ্রা, অতিরিক্ত উদ্বেগ এবং তীব্র একাকিত্ব কোনোভাবেই কমছিল না, তখন তৌসিফ উপলব্ধি করল যে সে আর একা একা এই পরিস্থিতি সামলাতে পারছে না। তার মাথার ভেতর কেমন যেন একটা বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছিল, সে নিজের কাজের প্রতি মনোযোগ হারাচ্ছিল এবং সামান্যতেই মেজাজ হারিয়ে ফেলছিল। সেদিন অফিসেই একটা জুনিয়র কলিগের সামান্য ভুলে সে এমনভাবে চটে গেল যে পুরো অফিস ফ্লোর নিস্তব্ধ হয়ে গেছিল। পরে অবশ্য সে নিজেই নিজের ওপর লজ্জিত হয়েছিল। সে বুঝতে পারল যে তার এই মানসিক অবস্থা যদি আরও কিছুদিন চলতে থাকে, তবে সে কেবল মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে না, তার করপোরেট কেরিয়ারটাও ধসে পড়বে।

অনেক ভেবেচিন্তে তৌসিফ ঢাকার একজন খ্যাতনামা সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনস্তত্ত্ববিদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিল। গুলশানের একটা ডিসেন্ট ক্লিনিকের চেম্বারে যখন সে ডাক্তারের সামনে বসল, তখন তার গলাটা কেমন যেন শুকিয়ে আসছিল। একজন করপোরেট বস হয়ে ডাক্তারের কাছে নিজের মানসিক সমস্যার কথা বলতে তার একটা পুরুষালি অহংকারে বাধে। কিন্তু ডাক্তার জামিল যখন খুব শান্ত ও স্নেহময় গলায় বললেন, "বলুন তৌসিফ সাহেব, আপনার ভেতরে কী চলছে? এখানে আপনি একজন রোগী নন, কেবল একজন ক্লান্ত মানুষ," তখন তৌসিফ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।

সে তার গত কয়েক বছরের জমে থাকা সমস্ত কষ্টের কথা, রাতের সেই অন্তহীন নিঃসঙ্গতা, অনিদ্রা এবং করপোরেট ইঁদুর দৌড়ের যান্ত্রিকতার কথা এক নিঃশ্বাসে বলে গেল। ডাক্তার জামিল খুব মন দিয়ে সব শুনলেন। তারপর তিনি চশমাটা খুলে টেবিলে রেখে বললেন, "তৌসিফ সাহেব, আপনার শারীরিক কোনো মারাত্মক রোগ নেই। আপনি যেটা ভুগছেন সেটা হলো আধুনিক যুগের এক অদৃশ্য মহামারী—‘ক্রনিক লোনিলিনেস’ বা দীর্ঘস্থায়ী নিঃসঙ্গতা সিন্ড্রোম। আপনি আপনার মনকে এমন একটা জেলখানায় বন্দি করেছেন, যার চাবি আপনার নিজের হাতেই রয়েছে, কিন্তু আপনি জেলখানার দরজা খুলতে ভয় পাচ্ছেন।"

ডাক্তার তাকে কিছু রিল্যাক্সেশনের এক্সারসাইজ দিলেন, ঘুমের ওষুধ খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে মেডিটেশন বা মাইন্ডফুলনেস চর্চা করার পরামর্শ দিলেন এবং সবচেয়ে বড় কথা—সপ্তাহে অন্তত একদিন অফিসের বাইরে নিজের পছন্দের কোনো ক্রিয়েটিভ কাজে সময় দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। চেম্বার থেকে বের হয়ে আসার সময় তৌসিফের মনে হলো তার বুকের ওপর থেকে কয়েক মণ ওজনের একটা ভারী পাথর নেমে গেছে। সে বুঝতে পারল, তার এই রোগটি কোনো ট্যাবু বা লজ্জার বিষয় নয়; এটি তার শরীরের মতো তার মনেরও একটা স্বাভাবিক আর্তনাদ, যাকে সে এতদিন অবহেলা করে আসছিল। এই সেশনটি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম একটা বড় এবং অত্যন্ত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হয়ে দাঁড়াল।

একাদশ পর্ব: ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ও মনের নতুন জানালায় কড়া নাড়া

গুলশানের সেই ক্লিনিক থেকে বের হয়ে আসার পর তৌসিফ আহমেদের পা দুটো যেন কিছুটা হালকা মনে হচ্ছিল। ডাক্তারের সেই কথাটি—"আপনার মনের জেলখানার চাবি আপনার নিজের হাতেই রয়েছে"—তার মস্তিষ্কে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। এতদিন সে বিশ্বাস করে নিয়েছিল যে তার এই নিঃসঙ্গতা কেবল তার করপোরেট পেশা বা পরিস্থিতির তৈরি করা এক অনিবার্য পরিণতি, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো রাস্তা নেই। কিন্তু আজ সে বুঝতে পারল, সে নিজেই নিজের চারপাশে অদৃশ্য দেওয়াল তুলে রেখেছিল।

গাড়িতে ওঠার পর ড্রাইভার কুদ্দুস ভাই পেছন ফিরে তাকালেন, "স্যার, আজ তো আপনাকে বেশ ফ্রেশ লাগছে। ডাক্তার সাহেব কি ভালো কোনো ওষুধ দিয়েছেন?"

তৌসিফ মুচকি হেসে বলল, "হ্যাঁ কুদ্দুস ভাই, ওষুধ তো দিয়েছেন, তবে তার চেয়েও বড় ব্যাপার হলো উনি মাথার অনেকগুলো জট খুলে দিয়েছেন।"

বাসায় ফিরে তৌসিফ তার এগারো তলার ফ্ল্যাটের দরজা খুলল। বরাবরের মতোই সেই নীরবতা তাকে অভ্যর্থনা জানাল, কিন্তু আজকের নীরবতাটি তার কাছে আগের মতো ভারী বা ভীতিজনক মনে হলো না। সে কোট খুলে সোফায় ছুড়ে ফেলে সোজা বারান্দায় চলে গেল। সন্ধ্যার হালকা বাতাসে গুলশানের আকাশটা তখন নীল থেকে ধূসর হয়ে আসছে। ডাক্তার জামিল তাকে একটা হোমওয়ার্ক দিয়েছিলেন—প্রতিদিন অন্তত পনেরো মিনিট কোনো গ্যাজেট বা ল্যাপটপ ছাড়া শুধু নিজের সাথে সময় কাটানো, চারপাশে যা ঘটছে তা কোনো বিচার বা হিসাব ছাড়া কেবল অনুভব করা।

তৌসিফ বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে নিচের রাস্তার রিকশার টুংটাং শব্দ আর মানুষের হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে লাগল। সে লক্ষ্য করল, এতদিন সে কেবল নিজের ভেতরে ডুবে ছিল, বাইরের পৃথিবীকে সে তো দেখেইনি। তার জীবনের অর্জিত সমস্ত অর্থ, সমস্ত সফলতার হিসাব-নিকাশ তাকে কেবল ভবিষ্যতের নিরাপত্তাই দিতে পেরেছে, কিন্তু বর্তমানের এই ছোট্ট সুন্দর মুহূর্তগুলোকে উপভোগ করার আনন্দ সে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিল। সে মনে মনে ঠিক করল, ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সে আর কেবল অফিসের ফাইলপত্রে ডুবে থাকবে না। সে তার নিজের ভেতরে জমে থাকা সেই অবদমিত শখগুলোকে আবার জাগিয়ে তুলবে, যেগুলো করপোরেট ইঁদুর দৌড়ে পিষে মারা গেছিল। একসময় সে খুব ভালো ছবি আঁকত এবং বই পড়ত। সেই শখের ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলে আবার নতুন করে শুরু করার সময় বোধহয় এবার এসে গেছে।

দ্বাদশ পর্ব: ক্যানভাসে রঙের আঁচড় ও বহুদিনের সুপ্ত শখ

পরের দিন ছুটির দিন ছিল—শনিবার। তৌসিফ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়ল। গত কয়েক মাসের তুলনায় আজকের সকালটা তার কাছে বেশ আলাদা মনে হলো। রাতের সেই অন্তহীন ছটফটানি বা অনিদ্রার ক্লান্তি আজ যেন অনেকটাই কম। সে কফি কাপ হাতে নিয়ে ড্রয়িংরুমে বসল এবং তার সেই পুরোনো মাল্টিপারপাস ড্রয়ারটা খুলল। ড্রয়ারের এক কোণে ধুলো জমা একটা পুরনো ড্রয়িং প্যাড আর কিছু ওয়াটার কালার বক্স বেরিয়ে এল। সেগুলোর ওপর বেশ কয়েক বছরের পুরু ধুলার আস্তরণ পড়ে গেছে।

তৌসিফ সেগুলো বের করে টেবিলে রাখল। ব্রাশগুলোর হ্যালেন্ড শক্ত হয়ে গেছে, রঙের টিউবগুলোও কেমন যেন শুকিয়ে গেছে। সে একটা ব্রাশ হাতে নিয়ে জল দিয়ে ধুয়ে সেটা নরম করার চেষ্টা করল। তারপর সে ড্রয়িং প্যাডের একটা সাদা পাতা সামনে টানল। অনেক বছর আগে যখন সে ইউনিভার্সিটি লাইফে ছিল, তখন সে প্রায়ই অবসর সময়ে ক্যানভাসে বা পেপারে অ্যাক্রিলিক বা ওয়াটার কালার দিয়ে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করত। আজ এতদিন পর আবার সেই ব্রাশটা হাতে নিতেই তার হাত দুটো কেমন যেন একটু কেঁপে উঠল। সে কী আঁকবে বুঝতে পারছিল না।

প্রথমে সে এলোমেলো কিছু রেখা টানল। তারপর ব্রাশে একটু নীল আর সাদার মিশ্রণ নিয়ে জানালার বাইরের সেই আকাশটা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল। ব্রাশের আঁচড় যখন কাগজের ওপর পড়তে লাগল, তৌসিফ লক্ষ্য করল তার সমস্ত মনোযোগ তখন কেবল সেই রঙের বিন্যাসের ওপর নিবদ্ধ হয়ে গেছে। অফিসের টার্গেট, ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট, ক্লায়েন্টের চাপ—কোনো কিছু তখন তার মাথার মধ্যে কাজ করছিল না। সে যেন এক অন্য জগতে হারিয়ে গিয়েছিল, যেখানে কেবল সে আর তার সামনে ছড়ানো কিছু রঙের রেখা রয়েছে।

ছবি আঁকতে আঁকতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। তৌসিফ খেয়ালই করেনি যে সে একটানা তিন ঘণ্টা ওই টেবিলের সামনে বসে কাটিয়ে দিয়েছে। তার পেটের ভেতর হালকা খিদে টের পাওয়ার পরই সে ঘড়ির দিকে তাকাল। একটা ছবি পুরোপুরি শেষ হয়নি হয়তো, কিন্তু সেই ছবি আঁকার প্রক্রিয়ার ভেতরে যে এক ধরনের সুগভীর মানসিক শান্তি ও থেরাপিউটিক পাওয়ার লুকিয়ে ছিল, তা তৌসিফকে ভেতর থেকে পুরোপুরি চনমনে করে দিয়েছিল। সে বুঝল, মানুষের মন কেবল লজিক বা অর্থের হিসাব দিয়ে চলে না; মনের খোরাক জোগাতে হলে তার ভেতরের সুপ্ত সৃজনশীলতাকেও বাঁচিয়ে রাখতে হয়। এই ছোট্ট ব্রেকটা তার একঘেয়ে করপোরেট জীবনের দেয়ালে যেন এক বিশাল জানালা খুলে দিল।

ত্রয়োদশ পর্ব: সামাজিক যোগাযোগের ছোট ছোট পদক্ষেপ

ডাক্তার জামিলের দ্বিতীয় থেরাপি সেশনে যাওয়ার পর জামিল সাহেব তৌসিফের এই ছবি আঁকার শখ ফিরে পাওয়ার কথা শুনে বেশ খুশি হলেন। তিনি বললেন, "বাহ, তৌসিফ সাহেব! আপনি তো বেশ ভালো প্রোগ্রেস করছেন। এখন আমাদের দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরু করতে হবে—মানুষের সাথে যোগাযোগের গণ্ডিটা একটু একটু করে বাড়াতে হবে।"

তৌসিফ একটু দ্বিধাদ্বন্দ্বের সুরে বলল, "ডাক্তার সাহেব, আমি তো এতদিন সবার সাথে কেবল প্রফেশনাল দূরত্ব বজায় রেখেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি। হুট করে কারো সাথে মিশতে আমার কেমন যেন অস্বস্তি লাগে।"

ডাক্তার হেসে বললেন, "আপনাকে তো কেউ হুট করে গিয়ে বড় কোনো পার্টিতে বা ক্লাবে যোগ দিতে বলেনি। ছোট ছোট স্টেপ নিন। যেমন ধরুন, আপনার অফিসের কোনো জুনিয়র কলিগকে একদিন কফি খাওয়ার জন্য ইনভাইট করলেন, কিংবা আপনার বিল্ডিংয়ের কোনো প্রতিবেশীর সাথে লিফটে দেখা হলে একটা সুন্দর হাসি দিয়ে কুশল বিনিময় করলেন। সম্পর্ক তৈরি হয় ছোট ছোট বরফ গলানোর মধ্য দিয়ে।"

অফিসে ফিরে তৌসিফ ডাক্তারের সেই পরামর্শটা কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিল। পরদিন সকালে সে যখন ব্যাংকের লিফটে উঠছিল, তখন তার সাথে লিফটে এসে দাঁড়াল তাদের ডিপার্টমেন্টের নতুন রিক্রুট হওয়া এক তরুণ ইন্টার্ন—রাকিব। রাকিব একটু নার্ভাস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল, কারণ সে সেদিনই প্রথম বড় বসের সাথে একই লিফটে উঠেছে। তৌসিফ তার দিকে তাকিয়ে এক চিলতে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, "গুড মর্নিং রাকিব! কেমন চলছে তোমার প্রজেক্টের কাজ?"

রাকিব প্রথমে একটু চমকে গিয়ে হকচকিয়ে গেল, তারপর সামলে নিয়ে বলল, "জি... জি স্যার, ভালো চলছে। আজ ডেটা এন্ট্রি শেষ হয়ে যাবে।"

তৌসিফ খুব উৎসাহব্যঞ্জক গলায় বলল, "বাহ, খুব ভালো! কাজ শেষ হলে আমার কেবিনে একবার নিয়ে এসো, দেখব। অল দ্য বেস্ট।"

রাকিবের মুখে যে স্বস্তির ও আনন্দের হাসিটা ফুটে উঠল, তা তৌসিফের চোখ এড়াল না। সে বুঝতে পারল, তার এই সামান্য কয়েকটা চতুর বা শীতল করপোরেট শব্দের বাইরে এসে একটা সাধারণ মানবিক উষ্ণতা দেখানো কতখানি জাদুকরী প্রভাব ফেলতে পারে। দুপুরের দিকে সে তার জুনিয়র কলিগ নাবিলকে ডেকে বলল, "নাবিল, আজ কি তোমার লাঞ্চের পর ফ্রি টাইম আছে? একটু ছাদের ক্যাফেটেরিয়াতে গিয়ে কফি খাওয়া যাক।" নাবিল তো অবাক! সে কখনো ভাবেনি ব্যাংকের এত বড় একটা পদের বস তাকে নিজ থেকে কফি খাওয়ার জন্য ডাকবে। সেই কফি খাওয়ার সময় তারা কেবল অফিসের কাজ নয়, বরং সাধারণ বই, মিউজিক এবং ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম নিয়ে খোশগল্প করল। তৌসিফ আবিষ্কার করল যে মানুষের সাথে কথা বলাটা আসলে এতটাও কঠিন কিছু নয়, কেবল মনের ভেতরের সেই ভয়ের দেওয়ালটা ভাঙতে হয়।

চতুর্দশ পর্ব: পুরনো বন্ধুদের সাথে নতুন করে সংযোগ

অফিসের গণ্ডির বাইরে নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোর দিকেও তৌসিফ এবার নজর দিতে শুরু করল। সুমিতের সাথে সেই হোটেলের আড্ডার পর তাদের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে নিয়মিত টুকটাক চ্যাট হতো। সুমিত আমেরিকা যাওয়ার আগেও তাকে কয়েকবার টেক্সট করেছিল, কিন্তু তৌসিফ ব্যস্ততার অজুহাতে এড়িয়ে গেছিল। এবার সে নিজে থেকেই সুমিতকে একটা ভয়েস নোট পাঠাল।

যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো থেকে সুমিত যখন সেই ভয়েস নোটের রিপ্লাই দিল, তখন তার গলায় ছিল উপচে পড়া উচ্ছ্বাস। সুমিত বলল, "দোস্ত, তুই যে নিজে থেকে আমাকে টেক্সট করলি, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ! বল কবে তুই আমেরিকা আসবি, আমার বাসায় তোর ফিক্সড রুম রেডি আছে।"

তৌসিফ হাসতে হাসতে বলল, "ভাই, আমেরিকা যাওয়ার প্ল্যান তো এখনই নেই, তবে আমি ঠিক করেছি আগামী মাসে আমাদের ইউনিভার্সিটির সেই পুরোনো বন্ধুদের একটা গেটটুগেদার বা রিইউনিয়নের আয়োজন করব। তুই কি অনলাইনে জুম কলে আমাদের সাথে কানেক্ট হতে পারবি?"

সুমিত সাথে সাথে রাজি হয়ে গেল, "অবশ্যই পারব! তুই জাস্ট ডেট ফিক্স কর।"

তৌসিফ এরপর তার ইউনিভার্সিটি জীবনের আরও চার-পাঁচজন ঘনিষ্ট বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করল, যারা বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় চাকরি বা ব্যবসা করছে। প্রথমে সবাই একটু অবাক হয়েছিল, কারণ গত দশ বছরে তৌসিফ ছিল সবচেয়ে অধরা মানুষ—কারো বিয়ের দাওয়াতে সে যেত না, কোনো গেটটুগেদারে তার দেখা মিলত না। সবাই ভাবত অর্ঘ্য বা তৌসিফ বড় অফিসার হয়ে যাওয়ার পর পুরোনো বন্ধুদের ভুলে গেছে। কিন্তু যখন তৌসিফ নিজে ফোন করে তাদের বলল যে সে সবার সাথে দেখা করতে চায়, সবার সাথে একটু সময় কাটাতে চায়, তখন কেউ আর না করতে পারল না।

শুক্রবার সন্ধ্যায় ধানমন্ডির লেকের ধারের একটা ছিমছাম রেস্তোরাঁয় তাদের সেই বহু প্রতীক্ষিত ছোটখাটো আড্ডা বসল। তৌসিফ যখন রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করল, তখন তার বন্ধুরা টেবিলে বসে পুরোনো দিনের মতো হইচই করছিল। তাকে দেখেই সবাই টেবিল ছেড়ে উঠে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। কারো চুলে পাক ধরেছে, কেউ কিছুটা মুটিয়ে গেছে, কিন্তু চোখের সেই দীপ্তি আর মুখের সেই পুরোনো হাসিটা একটুও বদলায়নি। সারারাত তারা খাওয়া-দাওয়া করল, পুরনো দিনের বোকা বোকা ক্যারেক্টারগুলোর কথা মনে করে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেল। সেদিন রাতে বাসায় ফেরার সময় তৌসিফের মনে হলো, তার বুকের সেই জমে থাকা বরফগুলো পুরোপুরি গলে গেছে। সে আর একা নয়; তার চারপাশের এই মানুষগুলো তার শক্তি, তার শেকড়।

পঞ্চদশ পর্ব: অতীতের ক্ষত সারানোর মানবিক প্রয়াস

বন্ধুদের সাথে এই মেলামেশা এবং নিজের ভেতরে আসা ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো তৌসিফের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছিল। রাতের সেই অনিদ্রা এখন আর আগের মতো তাকে পেয়ে বসে না। বিছানায় শুলেই এখন তার মাথার মধ্যে আর কেবল নেগেটিভ চিন্তা বা কাজের চাপ ঘোরে না, বরং সে কোনো সুন্দর স্মৃতির কথা ভাবতে ভাবতে বা কোনো ভালো বই পড়তে পড়তে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু তার মনের কোটরে একটা পুরোনো না-বলা কথা বা অপরাধবোধ দীর্ঘদিন ধরে সুপ্ত অবস্থায় রয়ে গেছিল—সেটা হলো তার পুরান ঢাকার সেই ফেলে আসা অতীত এবং মেহজাবিনের সাথে সেই তিক্ত বিচ্ছেদ।

যদিও মেহজাবিন এখন কানাডায় নিজের পরিবার নিয়ে সুখে আছে এবং তাদের সেই অধ্যায়টি বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে, তবুও তৌসিফ কোনো এক অজানা কারণে সবসময় নিজের ভেতর একটা গিল্ট বা অপরাধবোধ বয়ে বেড়াত যে সে সম্পর্কের শেষ সময়ে খুব একটা স্বার্থপরের মতো আচরণ করেছিল। সে একদিন সিদ্ধান্ত নিল যে এই অপ্রকাশিত অপরাধবোধের বোঝাটা সে আর বয়ে বেড়াবে না। সে মেহজাবিনের ফেক বা অফিশিয়াল ফেসবুক আইডিতে একটা ছোট মেসেজ টাইপ করল—કોনা ধরনের অধিকার বা ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা ছাড়াই, কেবল একটা পরিষ্কার মন নিয়ে।

সে লিখল: "হাই মেহজাবিন, আশা করি তুমি ভালো আছ। জানি বহু বছর আমাদের যোগাযোগ নেই। আজ হঠাৎ করেই পুরোনো কিছু কথা মনে পড়ল। অতীতে আমাদের সম্পর্কের শেষ সময়ে আমার তরফ থেকে কিছু ভুল বোঝাবুঝি বা স্বার্থপরতা হয়েছিল, যার জন্য আমি আজ আন্তরিকভাবে দুঃখিত। তুমি তোমার জীবনে ভালো আছ জেনে খুব ভালো লাগে। তোমার ও তোমার পরিবারের জন্য অনেক শুভকামনা রইল।"

মেসেজটা সেন্ড করার পর তৌসিফের মনে এক অদ্ভুত হালকা অনুভুতি হলো। সে কোনো রিপ্লাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছিল না, সে কেবল নিজের ভেতরের সেই ভারি পাথরটা নামিয়ে রাখতে চেয়েছিল।

এর দুদিন পর অফিসে কাজ করার সময় হঠাৎ তার মেসেঞ্জারে একটা নোটিফিকেশন এল। মেহজাবিন রিপ্লাই দিয়েছে।

মেহজাবিন লিখেছে: "হাই তৌসিফ, তোমার মেসেজটা দেখে সত্যিই খুব অবাক হলাম এবং ভালোও লাগল। জীবনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মানুষ অনেক কিছু পেছনে ফেলে আসে, অনেক ভুল বোঝাবুঝি ক্ষমা করে দিতে হয়। আমিও তোমাকে বহু আগেই ক্ষমা করে দিয়েছি। শুনলাম তুমি ব্যাংকে অনেক বড় পজিশনে আছ, দেখে খুব খুশি হয়েছি। নিজের যত্ন নিয়ো।"

মেসেজটার দিকে তাকিয়ে তৌসিফের চোখ দুটো সামান্য ভিজে উঠল। কোনো রাগ নেই, কোনো ক্ষোভ নেই—কেবল দুই পরিপক্ব মানুষের পারস্পরিক সম্মান ও ক্ষমা। জীবনের অনেক না-বলা হিসেব এভাবে খুব সহজে মিলে যায়, কেবল একটু সৎ সাহসের প্রয়োজন হয়। এই মেসেজটি পাওয়ার পর তৌসিফের ভেতরের সেই অপরাধবোধের শেষ অবশিষ্ট অংশটুকুও চিরকালের মতো ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল।

ষোড়শ পর্ব: পরিবর্তনের হাওয়া ও নতুন কর্মপদ্ধতি

তৌসিফ আহমেদের জীবনে গত কয়েক মাসে যে মানসিক রূপান্তর ঘটেছে, তার প্রভাব সরাসরি পড়তে শুরু করেছে তার পেশাদার জীবনেও। ব্যাংকের করপোরেট ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের হেড হিসেবে তিনি আগে ছিলেন অত্যন্ত রাশভারী, কঠোর এবং সময় সচেতন এক বস। তার টিম সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকত কখন কোন ফাইলে তিনি ভুল ধরে বসেন। কিন্তু থেরাপি সেশন, ক্যানভাসে রঙের আঁচড় আর পুরোনো বন্ধুদের সান্নিধ্য তার ভেতরের সেই কাঠিন্যটাকে অনেকটাই নরম করে দিয়েছিল।

সেদিন সকালে ফাইন্যান্স মিটিংয়ে জুনিয়র এক্সিকিউটিভ তানভীর একটা ছোট্ট গাণিতিক ভুল করে বসল ব্যালেন্স শিটের প্রজেকশনে। অতীতে হলে তৌসিফ হয়তো সবার সামনে তাকে কড়া ভাষায় তিরস্কার করতেন। কিন্তু আজ তিনি তানভীরকে একা ডেকে কেবিনে বসালেন। তানভীর ভয়ে কাঁপছিল, সে ভেবেছিল আজ বুঝি তার চাকরিটা থাকবে না। তৌসিফ খুব শান্ত গলায় ফাইলে আঙুল রেখে বললেন, "তানভীর, এই ভুলটা তোমার বেসিক কনসেপ্টের নয়, তাড়াহুড়োর কারণে হয়েছে। ডেটা এন্ট্রি করার সময় একটু সাবধানে করবে। নেক্সট টাইম থেকে এটা মাথায় রেখো।"

তানভীর হাঁফ ছেড়ে বাঁচার সুরে বলল, "থ্যাংক ইউ সো মাচ স্যার, আমি আর ভুল করব না।"

কেবিন থেকে বের হওয়ার সময় তানভীর যখন দরজা বন্ধ করছিল, তৌসিফ লক্ষ্য করল তার মুখের সেই কৃতজ্ঞতার অভিব্যক্তি। করপোরেট দুনিয়ায় ভয় দেখিয়ে কাজ আদায়ের চেয়ে সম্মান ও সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ আদায় করাটা যে কত বেশি ফলপ্রসূ, তা তৌসিফ আজ হাতেনাতে টের পেল। সে তার কাজের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এনেছে। এখন সে আর রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত অফিসে বসে থাকে না। সন্ধ্যার মধ্যে কাজ গুছিয়ে সে সময়মতো অফিস থেকে বের হয়। গুলশানের এগারো তলার সেই ফ্ল্যাটে ফেরার পর তার মনে আর আগের মতো সেই জমাট বাঁধা অন্ধকার ভীতি জাগায় না; বরং সে জানে বাসায় ফেরার পর তার জন্য এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা, ড্রয়িং প্যাড আর তার নতুন গোছানো জীবন অপেক্ষা করছে।

সপ্তদশ পর্ব: শীতের সকাল ও প্রকৃতির সান্নিধ্য

নভেম্বর মাসের শেষ দিক। ঢাকার বাতাসে এখন হালকা শীতের আমেজ। সকালের দিকে গুলশানের লেকটার পাড় দিয়ে হাঁটার সময় চারপাশের স্নিগ্ধ পরিবেশ মনটাকে এক নিমেষে জুড়িয়ে দেয়। তৌসিফ ডাক্তারের আরেকটি পরামর্শ নিখুঁতভাবে পালন করতে শুরু করেছে—সপ্তাহে অন্তত দুদিন সকালের দিকে আধ ঘণ্টা লেকের পাড়ে মর্নিং ওয়াক করা।

আজ রবিবার ছুটির সকালে তৌসিফ ট্র্যাকস্যুট পরে লেকের পাড়ের ওয়াকিং ট্র্যাকে হাঁটছিল। চারপাশের গাছগুলোর পাতাগুলো হালকা হলুদ হয়ে ঝরে পড়তে শুরু করেছে। একটু দূরে কিছু বয়স্ক মানুষ একসঙ্গে গোল হয়ে ইয়োগা করছেন, আর কিছু তরুণ-তরুণী জগার্স পরে দৌড়াচ্ছে। তৌসিফ একপাশে একটা কাঠের বেঞ্চে বসল। তার হাতে ধরা একটা থার্মাস ফ্লাস্ক থেকে সে এক কাপ ব্ল্যাক কফি ঢেলে চুমুক দিল। মাথার ওপরে খোলা নীল আকাশ, মৃদু শীতের বাতাস আর লেকের জলের ওপর রোদ পড়ার চকচকে দৃশ্য—এই ছোট্ট সাধারণ বিষয়গুলো যে এত সুন্দর হতে পারে, এতদিন সে তা খেয়ালই করেনি।

বেঞ্চের ঠিক পাশেই একটা ছোট বিড়াল ছানা রোদে বসে পিঠ এলিয়ে দিচ্ছিল। তৌসিফ পকেট থেকে একটু বিস্কুট ভেঙে তার সামনে ফেলল। বিড়ালটা প্রথমে একটু ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল, তারপর খুব সন্তর্পণে এসে বিস্কুটটা খেতে শুরু করল। এই ছোট্ট একটা প্রাণীর সাথে তার এই নিরব মিথস্ক্রিয়া তৌসিফের মুখে একটা অজান্তেই মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে তুলল। একসময় সে মনে করত পৃথিবীর সবকিছুর পেছনে একটা বড় করপোরেট লজিক বা অর্থের হিসাব থাকা দরকার। আজ সে বুঝতে পারল, জীবনের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে এই তুচ্ছাতিতুচ্ছ সাধারণ মুহূর্তগুলোর ভেতরেই। সে অনেক দূরে সফলতার পাহাড় জয়ের নেশায় ছুটেছিল, কিন্তু ভুলে গেছিল যে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার চেয়ে পথের ধারের ঘাসফুলগুলোর গন্ধ নেওয়াটা অনেক বেশি আনন্দের।

অষ্টাদশ পর্ব: নিজের হাতে রান্না ও ঘর সাজানোর আনন্দ

গুলশানের এই বিশাল এগারো তলার পেন্টহাউস ফ্ল্যাটটাতে এতদিন কেবল আসবাবপত্র আর শোভাবর্ধক জিনিসপত্রই ছিল, কিন্তু সেখানে কোনো ‘হোম’ বা ঘরের উষ্ণতা ছিল না। সেটা ছিল একটা ফাইভ স্টার হোটেলের কামরার মতো ঠান্ডা ও বানিজ্যিক। তৌসিফ এবার ঠিক করল সে তার এই বাসভূমিকে নিজের মনের মতো করে সাজাবে।

ছুটির দিনে সে নিজে সুপার মার্কেটে গিয়ে গ্রোসারি শপিং করল। চাল, ডাল, তাজা শাকসবজি আর মশলাপাতি কিনে সে সোজা রান্নাঘরে ঢুকল। গত দশ বছরে সে কোনো দিন রান্নাঘরে ঢোকেনি, তার সব খাবার বা তো রান্নার লোক এনে দিত কিংবা রেস্তোরাঁ থেকে অর্ডার হতো। আজ সে ইউটিউব দেখে নিজেই নিজের জন্য খিচুড়ি আর ডিম ভুনা বানানোর সিদ্ধান্ত নিল। পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে চোখে জল এল, মশলার মাপে একটু এদিক-সেদিক হলো, কিন্তু কড়াইয়ে যখন সেই রান্না করা খাবারের সুবাস ছড়িয়ে পড়ল, তখন তৌসিফের বুকটা এক অদ্ভুত আত্মতৃপ্তিতে ভরে গেল। ডাইনিং টেবিলে একা একা বসে নিজের হাতে রান্না করা সেই গরম খিচুড়ি খাওয়ার আনন্দ পৃথিবীর যেকোনো দামি রেস্তোরাঁর কাবাব-বিরিয়ানির চেয়েও শতগুণ বেশি সুস্বাদু মনে হলো।

শুধু রান্নাই নয়, সে ড্রয়িংরুমের সোফার কুশনগুলো বদলে ফেলল, বসার ঘরের এক কোণে একটা ইনডোর প্লান্ট বা মানিপ্লান্টের টব এনে রাখল এবং দেওয়ালে তার নিজের আঁকা সেই ওয়াটার কালার পেইন্টিংটা একটা সুন্দর ফ্রেমে বাঁধিয়ে ঝুলিয়ে দিল। এগারো তলার সেই নিস্তব্ধ ফ্ল্যাটটা ধীরে ধীরে একটা ছিমছাম, প্রাণবন্ত এবং উষ্ণ বাসায় রূপ নিতে শুরু করল। ঘর তো কেবল ইট-পাথরের দেওয়াল দিয়ে তৈরি হয় না, ঘর তৈরি হয় মানুষের ভালোবাসা, যত্ন আর পরিচর্যা দিয়ে। তৌসিফ বুঝতে পারল, সে এতদিন যে একাকিত্বের অজুহাতে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল, সে আসলে নিজের ঘরটাকে নিজের মতো করে সাজানোর চেষ্টাই কখনো করেনি।

উনবিংশ পর্ব: নতুন সম্ভাবনার হাতছানি ও সমাজসেবা

জীবনের এই নতুন রূপান্তরের পর তৌসিফের ভেতরের শূন্যতা যখন পুরোপুরি পূরণ হয়ে গেছে, তখন তার মনে হলো তার এই অর্জিত শান্তি ও অভিজ্ঞতা কেবল নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ব্যাংকের করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলটি (CSR) প্রজেক্টের বাইরেও সে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সমাজের কিছু করার কথা ভাবতে শুরু করল।

তার অফিসের এক জুনিয়র কলিগ তাকে একদিন বনানীর একটা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অবৈতনিক স্কুলের কথা বলেছিল, যেখানে উইকেন্ডে বাচ্চারা পড়তে আসে এবং স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের আঁকা ও বেসিক ম্যাথ শেখান। তৌসিফ যোগাযোগ করল সেই স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে। সে ঠিক করল প্রতি শনিবার সকালে সে দুই ঘণ্টা সময় ওই বাচ্চাদের সাথে কাটাবে।

প্রথম যেদিন সে সেই স্কুলে গেল, ছোট ছোট আট-দশটা বাচ্চা তাকে ঘিরে ধরে কৌতূহলী চোখে তাকাতে লাগল। তৌসিফ তাদের হাতে রঙের বাক্স আর খাতা তুলে দিয়ে বলল, "আজ আমরা সবাই মিলে সুন্দর একটা আকাশ আর নদী আঁকব।" বাচ্চারা আনন্দে হইচই করে উঠল। এক ছোট মেয়ে তৌসিফের কোটের হাত ধরে ফিসফিস করে বলল, "স্যার, আপনি খুব ভালো ছবি আঁকেন, আমাদের একটা পরি এঁকে দেবেন?"

তৌসিফ সেই ছোট্ট মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে হাসিমুখে বলল, "অবশ্যই দেবো সোনা।"

বাচ্চাগুলোর সেই নিষ্পাপ হাসি, তাদের খলবলিয়ে ওঠা কলকাকলি আর চোখের কোণে জমে থাকা উজ্জ্বল স্বপ্নগুলো তৌসিফের ভেতরের সমস্ত অবশিষ্ট গ্লানি ও ক্লান্তি ধুয়ে মুছে সাফ করে দিল। সে বুঝতে পারল, মানুষের জীবন সার্থক হয় তখন, যখন সে নিজের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে অন্য কারো মুখে একটু হাসি ফোটাতে পারে। একাকিত্বের যে অন্তহীন চরে সে এতদিন আটকে পড়েছিল, সেখানে আজ ভালোবাসার এক সবুজ অরণ্য গড়ে উঠেছে।

বিংশ পর্ব: নিঃসঙ্গতার অন্তহীন চরে আলোর সকাল

আজ বছরের শেষ দিন—থার্টি ফার্স্ট নাইট। গুলশানের আকাশজুড়ে হালকা কুয়াশা আর শীতের আমেজ। শহরের বিভিন্ন অভিজাত হোটেল ও ক্লাবে চলছে জাঁকজমকপূর্ণ পার্টি, আতশবাজির আলোয় রাতের আকাশ আলোকিত হওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তৌসিফ আহমেদ আজ আর তার এগারো তলার ফ্ল্যাটে একা বসে ছাদের দিকে তাকিয়ে ঘড়ির টিকটিক শব্দ শুনছেন না।

তিনি আজ বিকেলে তার কয়েকজন পুরোনো ইউনিভার্সিটি বন্ধু, তাদের পরিবার এবং সেই সুবিধাবঞ্চিত স্কুলের কিছু ছোট বাচ্চাকে নিয়ে গুলশানের লেকের ধারের একটা খোলা মাঠে একটা ছোট্ট বারবিকিউ ও পিকনিক পার্টির আয়োজন করেছেন। চারদিকে মৃদু মিউজিক বাজছে, বারবিকিউর গ্রিলে চিকেন পোড়ার সুবাস ছড়াচ্ছে, আর বাচ্চারা বেলুন নিয়ে ছোটাছুটি করছে। তৌসিফের পুরোনো বন্ধু সুমিত আমেরিকা থেকে ভিডিও কলে যুক্ত হয়ে সেই আনন্দ উপভোগ করছে। সুমিত স্ক্রিন থেকে হাত নেড়ে বলল, "দোস্ত তৌসিফ, তোকে আজ এই লুকে দেখে মনে হচ্ছে তুই তোর বিশ বছর বয়স আবার ফিরে পেয়েছিস!"

তৌসিফ হাসতে হাসতে বলল, "হ্যাঁ সুমিত, জীবন তো একটাই, কেবল একে সঠিক উপায়ে উপভোগ করার দৃষ্টিভঙ্গিটাই বদলাতে হয়।"

রাত যখন বারোটার কাছাকাছি পৌঁছাল, চারপাশের আতশবাজির শব্দে আকাশ মুখরিত হয়ে উঠল। সবাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাল। তৌসিফ তার এগারো তলার সেই ফ্ল্যাটের বারান্দায় এসে একা দাঁড়াল না; সে দাঁড়িয়ে আছে এই উন্মুক্ত আকাশের নিচে, মানুষের ভিড়ে, ভালোবাসার মানুষের সান্নিধ্যে।

সে আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, কিন্তু সে দীর্ঘশ্বাস আগের মতো হাহাকারের ছিল না; সেটা ছিল এক পরম শান্তির ও কৃতজ্ঞতার দীর্ঘশ্বাস। সে বুঝতে পেরেছে, নিঃসঙ্গতা কোনো অভিশাপ নয়; এটি হলো মানুষের ভেতরের নিজের সাথে নিজের দেখা করার একটা সুবর্ণ সুযোগ। যে মানুষ নিজের সাথে বন্ধু হতে পারে, সে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে থেকেও কখনো একা হতে পারে না। সময়ের সেই থমকে যাওয়া চরের ওপর আজ সোনালী রোদের এক নতুন সকাল এসে উঁকি দিয়েছে, আর তৌসিফ আহমেদের জীবন তার নিজস্ব চেনা ছন্দে, এক অনবদ্য সুন্দরের পানে চিরকালের মতো এগিয়ে চলেছে।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login