Novel

ছায়ানটের আলো

November 8, 2026

10 views

প্রথম পর্ব: মায়ানগরীর ঘুমন্ত সকাল

শহরের ইট-পাথরের খাঁচায় সকাল নামে ধীর পায়ে। রিকশার টুংটাং শব্দ, পেপারওয়ালার সাইকেলের বেল আর দূরের মসজিদে আজানের ধ্বনি—সব মিলিয়ে ঢাকা শহরের চিরচেনা রূপ। এই শহরেরই এক পুরোনো গলির টিনের চালের আধাপাকা বাড়িতে বাস করে নীলাঞ্জন। বয়স সবে ত্রিশের কোঠায়, অথচ জীবনের সমস্ত রঙ যেন বহু আগেই বিবর্ণ হয়ে গেছে।

নীলাঞ্জনের জীবনটা একটা চলন্ত ঘড়ির মতো, যার কোনো চাবি নেই, কেবল স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিকটিক করে চলছে। সে একটি ছোটখাটো প্রকাশনা সংস্থায় প্রুফ রিডার হিসেবে কাজ করে। মাস শেষের সামান্য বেতনে সংসার চলে না, তবুও সে মুখ বুজে সহ্য করে যায়। তার এই নীরবতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের জমে থাকা এক গভীর অপরাধবোধ ও পারিবারিক গ্লানি। তার স্ত্রী সুরভি বহু বছর আগে তাকে ছেড়ে চলে গেছে অন্য এক উচ্চাভিলাষী মানুষের হাত ধরে, রেখে গেছে কেবল একটি ছোট্ট মেয়ে—ঝিলিককে।

দ্বিতীয় পর্ব: ঝিলিকের পৃথিবী ও বাবার অক্ষমতা

সাত বছরের ঝিলিক যখন স্কুল থেকে ফেরে, তার চোখে থাকে একরাশ প্রশ্ন। অন্য সব বাচ্চার মতো তার মা নেই, খেলনা কেনার আবদার মেটানোর মতো বাবার পকেট ভারী নয়। সেদিন স্কুল থেকে ফিরে ঝিলিক বায়না ধরল একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের পুতুলের।

নীলাঞ্জন পকেট হাতড়ে দেখল, তার মানিব্যাওয়ে ঠিক কয়টি কয়েন পড়ে আছে। পুতুলটার দামের চেয়ে তার পকেটের টান অনেক বেশি ভারী। দীর্ঘশ্বাস চেপে সে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে মিথ্যে সান্ত্বনা দিল, "মা, আজ না, আগামী শুক্রবার তোমাকে ওই পুতুলটা এনে দেবো।"

ঝিলিক অবুঝ চোখে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পেরেছিল বাবা মিথ্যে বলছে। সেই ছোট শিশুটির চোখের চাউনি নীলাঞ্জনের বুকের ভেতরটা খামচে ধরেছিল। রাতে বিছানায় শুয়ে সে বারবার ভাবত, একজন ব্যর্থ পিতা হওয়ার চেয়ে বড় অভিশাপ বুঝি পৃথিবীতে আর কিছু নেই।

তৃতীয় পর্ব: কর্পোরেট টাওয়ারের ছায়া ও অর্ণব বাবু

অফিসে এসে নীলাঞ্জন দেখল থমথমে পরিবেশ। প্রকাশনার মালিক অর্ণব চৌধুরী এলেন। অর্ণব বাবু মানুষটা যেমন ধনী, তেমনি রূঢ় ও অহংকারী। তার মুখের এক একটি কথা যেন চাবুকের ঘা। তিনি এসে টেবিলে একটা নতুন প্রজেক্টের ফাইল ছুড়ে ফেলে বললেন, "আগামী তিন দিনের মধ্যে এই ম্যানুস্ক্রিপ্টের সমস্ত ভুল সংশোধন চাই। যদি একটাও বানান ভুল থাকে, তবে আপনাদের বেতন থেকে টাকা কাটা হবে।"

নীলাঞ্জনের মতো সাধারণ কর্মচারীদের প্রতিবাদ করার কোনো অধিকার থাকে না। মাথা নিচু করে কাজ করা ছাড়া তাদের কোনো পথ নেই। অর্ণব বাবুর এই ক্ষমতার দম্ভ নীলাঞ্জনের মতো হাজারো মানুষের মেরুদণ্ড প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে দেয়। কিন্তু ওই মুহূর্তে নীলাঞ্জনের করার কিছুই ছিল না; কারণ তার মাথার ওপর ঝিলিকের দুবেলা দুমুঠো ভাতের তাড়া ঝুলে আছে।

চতুর্থ পর্ব: অতীতের সেই অন্ধকার গলি

অফিস থেকে ফেরার পথে নীলাঞ্জন হঠাৎ অন্য একটি রুটে হাঁটতে শুরু করল। সে এসে পৌঁছাল সেই পুরোনো গলিতে, যেখানে সে একসময় সুরভির সাথে কাটিয়েছিল তার জীবনের সবচেয়ে রঙিন দিনগুলো। আজ সেই বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে তার কেবল মনে হচ্ছিল, মানুষ কীভাবে এত দ্রুত বদলে যেতে পারে?

সুরভি যখন তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, সে বলেছিল—"নীলাঞ্জন, এই অর্থাভাব, এই নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসারে আমি আর এক মুহূর্তও টিকতে পারব না। আমার শান্তি চাই, স্বাচ্ছন্দ্য চাই।"

সুরভি হয়তো তার কাঙ্ক্ষিত ধনী জীবন খুঁজে পেয়েছিল, কিন্তু সে কি কখনো ভেবে দেখেছে এই ভাঙা ঘরে একটা অবুঝ শিশু কীভাবে মায়ের গন্ধ ছাড়া তিলে তিলে বড় হচ্ছে? পুরনো স্মৃতির সেই স্যাঁতসেঁতে বাতাসে দাঁড়িয়ে নীলাঞ্জনের চোখ দিয়ে অজান্তেই জল গড়িয়ে পড়ল।

পঞ্চম পর্ব: ঋতার এন্ট্রি ও নতুন বাতাসের স্পর্শ

প্রকাশনা সংস্থায় নতুন একজন সম্পাদিকা হিসেবে যোগ দিল ঋতা। ঋতা সম্পূর্ণ অন্যরকম এক মানুষ। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে পাস করা, চোখে আধুনিক শিল্পবোধ আর মনে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। অর্ণব বাবুর দম্ভ বা কর্পোরেট অফিসের নিয়মকানুনকে সে মোটেও ভয় পায় না।

প্রথম দিনই ঋতার সাথে নীলাঞ্জনের দেখা হলো প্রুফ সেকশনের টেবিলে। নীলাঞ্জনের টেবিলে জমে থাকা পুরোনো ফাইল আর ক্লান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে ঋতা মৃদু হেসে বলল, "আপনার চোখের নিচে যে ক্লান্তি জমেছে মিস্টার নীলাঞ্জন, তা কি কাজের চাপে, নাকি জীবনের অতিরিক্ত হিসেব মেলাতে গিয়ে?"

কথাটি অপ্রত্যাশিত ছিল। নীলাঞ্জন চমকে উঠে ঋতার দিকে তাকাল। সেই প্রথম কেউ তার ভেতরের শূন্যতাটাকে এক বাক্যে ধরে ফেলল।

ষষ্ঠ পর্ব: কাজের ফাঁকে জমে ওঠা নীরব সখ্য

দিন গড়ানোর সাথে সাথে ঋতার সাথে নীলাঞ্জনের সম্পর্কটা কেবল কলিগ বা সহকর্মীর গণ্ডি পেরিয়ে এক গভীর মানসিক আদানপ্রদানে রূপ নিল। ঋতা বুঝতে পেরেছিল নীলাঞ্জনের নিঃসঙ্গতার কথা। সে প্রায়ই বাড়ি থেকে অতিরিক্ত খাবার এনে নীলাঞ্জনের টেবিলে রাখত আর বলত, "একা একা এত খাটলে শরীর টিকবে না, খেয়ে নিন।"

প্রথমে নীলাঞ্জন সংকোচ বোধ করত। সে মনে করাত নিজের সামাজিক অবস্থান ও ব্যর্থতার কথা। কিন্তু ঋতার সাবলীল ও সরল আচরণ তার সেই রক্ষণশীল দেয়াল ধীরে ধীরে ভেঙে দিতে লাগল। অফিস ছুটির পর দুজনে মিলে চা খাওয়ার অভ্যাস হলো। সেই চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তারা কথা বলত জীবন, সাহিত্য আর হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন নিয়ে।

সপ্তম পর্ব: ঝিলিকের সাথে ঋতার প্রথম দেখা

একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ঝিলিক স্কুল থেকে ফেরার সময় ভিজে একাকার হয়ে গিয়েছিল। নীলাঞ্জনের সেদিন অফিস থেকে বের হতে একটু দেরি হচ্ছিল। ঋতা যখন দেখল নীলাঞ্জন উৎকণ্ঠায় কাঁপছে, সে নিজের গাড়ি নিয়ে সরাসরি ঝিলিকদের স্কুলে গিয়ে হাজির হলো।

ঝিলিককে যখন ঋতা কোলে তুলে গাড়িতে নিয়ে এল, ঝিলিক প্রথমে একটু ভয় পেয়েছিল। কিন্তু ঋতার ব্যাগে থাকা চকোলেট আর মিষ্টি হাসিতে ঝিলিক নিমেষেই তার সব ভীতি ভুলে গেল। সেদিন সন্ধ্যায় ঋতা ঝিলিকের জন্য একটা নতুন পুতুলও কিনে এনেছিল।

ঝিলিক পুতুলটা বুকে জড়িয়ে ধরে বাবাকে ফিসফিস করে বলল, "বাবা, এই আন্টিকে আমার ভীষণ ভালো লাগে। উনি দেখতে পরীর মতো!" মেয়ের মুখে অনেক দিন পর এমন আনন্দের হাসি দেখে নীলাঞ্জনের বুকটা কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল।

অষ্টম পর্ব: অর্ণব চৌধুরীর গোপন উদ্দেশ্য

কিন্তু সুখের এই মায়াবী ছায়া বেশি দিন স্থায়ী হলো না। প্রকাশনার মালিক অর্ণব চৌধুরী লক্ষ করছিলেন ঋতা ও নীলাঞ্জনের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা। অর্ণব বাবুর মনে একটা অদ্ভুত কুৎসিৎ অহংকার কাজ করত। তিনি মনে করতেন তার অফিসের প্রতিটি জিনিস—এমনকি মানুষের মনও তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে না।

একদিন ঋতাকে কেবিনে ডেকে অর্ণব খুব শীতল গলায় বললেন, "মিস ঋতা, আপনি একজন প্রতিভাবান মানুষ। এই নীলাঞ্জনের মতো একজন ব্যর্থ ও পরিত্যক্ত মানুষের সাথে মিশে নিজের কেরিয়ারটা নষ্ট করবেন না। ওর তো নিজের সংসারই টিকল না, ও আপনাকে কী দেবে?"

ঋতা অর্ণবের চোখে চোখ রেখে খুব দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল, "স্যার, মানুষের সফলতার মাপকাঠি ব্যাংক ব্যালেন্স দিয়ে মাপা যায় না। নীলাঞ্জন বাবু একজন সৎ ও ভালো মানুষ, আর সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় কথা।" অর্ণব চৌধুরীর ফর্সা মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠল।

নবম পর্ব: সুরভির হঠাৎ ফিরে আসা

ঝড়ের মতো ঝড় উঠল নীলাঞ্জনের শান্ত জীবনে। সেদিন রাতে যখন সে বাড়ি ফিরছে, দেখল দরজার সামনে এক নারী দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে দামি সিল্কের শাড়ি, গায়ে সুগন্ধির চড়া গন্ধ। কাছে যেতেই নীলাঞ্জন শিউরে উঠল—এ যে সুরভি!

বহু বছর পর সুরভিকে সামনে দেখে নীলাঞ্জনের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। সুরভি খুব কৃত্রিম হাসিমুখে বলল, "কেমন আছো নীলাঞ্জন? অনেক দিন পর আসলাম। আসলে আমার বর্তমান স্বামীর সাথে বনিবনা হচ্ছে না। আমি ঝিলিককে একবার দেখতে চেয়েছিলাম।"

নীলাঞ্জনের সারা শরীর রাগে ও ঘৃণায় কাঁপতে শুরু করল। যে নারী টাকার লোভে নিজের শিশুকন্যাকে ফেলে চলে গিয়েছিল, আজ সুদিন ফুরিয়ে আসতেই সে আবার অধিকার ফলাতে এসেছে! নীলাঞ্জন দরজা বন্ধ করে দিতে চাইল, কিন্তু ঠিক তখনই ঘর থেকে ঝিলিক বেরিয়ে এল।

দশম পর্ব: মায়ের প্রতি ঝিলিকের অনীহা

ঝিলিক তো তার মাকে চেনেই না। সে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে বাবার পেছনে লুকিয়ে পড়ল। সুরভি যখন স্নেহের সুর ঝিলিকের মাথায় হাত রাখতে গেল, ঝিলিক সরে গিয়ে সরাসরি বলল, "আপনি কে? আমার মা তো নেই। আমার বাবা আমাকে একা বড় করেছে।"

ছোট্ট মেয়ের এই নির্মম অথচ সত্য কথাটি সুরভির বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে বুঝল, সে তার নিজের হাতে সাজানো সংসার এবং মেয়ের ভালোবাসা—দুটোই চিরকালের মতো হারিয়ে ফেলেছে। কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করে এবং নিজের দুর্ভাগ্যের কথা বলে সুরভি সেই রাতে চিরকালের মতো আবার অন্ধকারের গভীরে মিলিয়ে গেল। নীলাঞ্জন বুঝল, সময়ের স্রোতে কিছু ক্ষত শুকিয়ে গেলেও তার দাগ কখনোই মোছে না।

একাদশ পর্ব: প্রকাশনায় নেমে আসা দুর্যোগ

পরের দিন অফিসে এসেই নীলাঞ্জন দেখল এক অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি। অর্ণব চৌধুরী তার পদ থেকে তাকে বরখাস্ত করার নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছেন। কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে—অফিসের গোপনীয় নথি ফাঁস করার মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ।

নীলাঞ্জন বুঝল, এটা অর্ণব চৌধুরীর ব্যক্তিগত আক্রোশের ফল। ঋতার সাথে তার ঘনিষ্ঠতা এবং অর্ণবের কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে অর্ণব এই নোংরা খেলা খেলেছেন। ঋতা যখন এই খবর পেল, সে অফিসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অর্ণব চৌধুরীকে এক হাত নিয়ে সোজা ইস্তফাপত্র ছুড়ে মারল। সে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিল, "যে প্রতিষ্ঠানে মানুষের সততার দাম নেই, সেখানে এক মিনিটও থাকা পাপ।"

দ্বাদশ পর্ব: বেকারত্বের হাহাকার ও হতাশার রাত

চাকরি হারানোর পর নীলাঞ্জনের মাথা থেকে যেন ছাদ সরে গেল। সঞ্চিত বলতে কিছুই ছিল না। সামনের মাসের ঘর ভাড়া, ঝিলিকের স্কুল ফি, খাওয়ার খরচ—সব মিলিয়ে এক অন্ধকার সুড়ঙ্গে গিয়ে সে আটকে পড়ল।

রাতের বেলা ঘরে বসে সে যখন চালের কৌটো খালি দেখল, তখন তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে মনে মনে ভাবল, সে কি সত্যিই এতই দুর্ভাগা যে যাকে ভালোবাসে, তাকেই কেবল কষ্ট দেয়? ঋতা বারবার ফোন করে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও নীলাঞ্জন নিজের পুরুষালি অহংকার ও লজ্জার কারণে ফোন ধরছিল না। সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল এক চরম নিঃসঙ্গতার খোলসে।

ত্রয়োদশ পর্ব: ঋতার সাহসী পদক্ষেপ

নীলাঞ্জন যখন হতাশায় ডুবতে বসেছে, ঠিক তখন ঋতা এসে হাজির হলো তার সেই ছোট্ট টিনের ঘরে। ঋতার হাতে কিছু গ্রোসারি আর ঝিলিকের পছন্দের খাবার।

ঋতা ঘরে ঢুকে সোজা রান্নাঘরে গিয়ে চাল-ডাল নামাতে নামাতে দৃঢ় গলায় বলল, "আপনার এই কাপুরুষের মতো গুটিয়ে থাকাটা আমি একদম পছন্দ করছি না, নীলাঞ্জন বাবু। চাকরি গেছে তো কী হয়েছে? পৃথিবী কি থেমে গেছে? আমি একটা নতুন ছোট অনলাইন প্রকাশনা শুরু করার পরিকল্পনা করছি। আপনি আমার সাথে থাকবেন, সম্পাদক হিসেবে।"

ঋতার এই আত্মবিশ্বাস ও নিঃশর্ত সমর্থন নীলাঞ্জনের হিমশীতল বুকে যেন উষ্ণ জলের ছোঁয়া দিল। সে বুঝতে পারল, জীবনের এই ঝড়ে সে একা নয়; তার পাশে এমন একজন মানুষ আছে যে ঝড়কে ভয় পায় না।

চতুর্দশ পর্ব: নতুন স্বপ্নের বীজ বপন

ঋতা ও নীলাঞ্জন মিলে শুরু করল তাদের নতুন উদ্যোগ—"মুক্তকণ্ঠ প্রকাশনা"। ঘরের এক কোণে ছোট একটা টেবিল, দুটো চেয়ার আর কিছু পাণ্ডুলিপি নিয়ে শুরু হলো তাদের লড়াই।

প্রথম প্রথম কাজ পাওয়া খুব কঠিন ছিল। বড় বড় প্রকাশকরা তাদের বয়কট করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ঋতার যোগাযোগ দক্ষতা আর নীলাঞ্জনের নিখুঁত সম্পাদনা শৈলী অল্পদিনের মধ্যেই মানসম্মত কিছু বই বাজারে নিয়ে এল। তরুণ লেখকরা তাদের লেখনীর সঠিক মূল্যায়ন পেতে শুরু করল এই নতুন প্রকাশনা থেকে। ঝিলিকও তার বাবার মুখে হাসি দেখে আবার আগের মতো প্রাণ খুলে হাসতে শুরু করল।

পঞ্চদশ পর্ব: অর্ণব চৌধুরীর পতনের শুরু

এদিকে অহংকারী অর্ণব চৌধুরীর ব্যবসায় বড় ধস নামল। তার প্রতিষ্ঠানের কিছু দুর্নীতি ও কর ফাঁকি দেওয়ার খবর ফাঁস হয়ে যাওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু হলো। যারা একদিন অর্ণব বাবুর ভয়ে তটস্থ থাকত, তারাই আজ মুখ ফিরিয়ে নিল।

অর্ণব চৌধুরী যখন বুঝতে পারলেন যে তার সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে, তখন তিনি চরম এক মানসিক অবসাদে ভুগে একা হয়ে গেলেন। ক্ষমতার দম্ভ মানুষকে কতটা একা করে দিতে পারে, অর্ণব তার চাক্ষুষ প্রমাণ পেলেন। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে; কেউ আর তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়াল না।

ষোড়শ পর্ব: জীবনের নতুন সমীকরণ

"মুক্তকণ্ঠ প্রকাশনা" আজ শহরের একটি পরিচিত নাম। তাদের প্রকাশিত প্রথম বইটির মোড়ক উন্মোচন উৎসব অনুষ্ঠিত হলো এক মনোরম বিকেলে। সেই অনুষ্ঠানে শহরের অনেক নামী সাহিত্যিক ও কবিরা উপস্থিত ছিলেন।

মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন ঋতা তার বক্তব্যে নীলাঞ্জনের কঠোর পরিশ্রম ও সততার কথা উল্লেখ করল, তখন দর্শকসারিতে বসে থাকা নীলাঞ্জনের চোখ ভিজে এল আনন্দে। ঝিলিক ঋতার হাত ধরে মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সেই মুহূর্তে চারপাশের আলো আর ক্যামেরার ফ্লাশের মাঝে মনে হচ্ছিল—বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা সমস্ত মেঘ কেটে গিয়ে আজ এক নতুন সকালের সূর্য উঠেছে।

সপ্তদশ পর্ব: স্মৃতির পাতা থেকে চিরতরে মুক্তি

উৎসবের পরের দিন সকালে নীলাঞ্জন একা গিয়ে দাঁড়াল সেই পুরোনো ব্রিজের ধারে, যেখানে সুরভি তাকে একদিন একা ফেলে চলে গিয়েছিল। আজ তার বুকের ভেতরে আর কোনো ক্ষোভ বা দীর্ঘশ্বাস ছিল না। সুরভি হয়তো তার নিজের ভুল বা লোভের খেসারত দিচ্ছে দূর কোথাও, কিন্তু নীলাঞ্জন বুঝতে পেরেছিল—অতীতের ছায়া দিয়ে বর্তমানের আলো ঢাকা যায় না।

সে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে শহরের ব্যস্ত রাস্তার দিকে তাকাল। তার জীবনটা এখন আর কোনো নিখোঁজ সংসার নয়; এটি এখন তার নিজের হাতে গড়া ভালোবাসার এক নতুন ঠিকানা।

অষ্টাদশ পর্ব: ঋতার অব্যক্ত স্বীকারোক্তি

সন্ধ্যায় অফিস ফাঁকা হওয়ার পর ঋতা নীলাঞ্জনের টেবিলে এসে বসল। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ঋতা হঠাৎ নীলাঞ্জনের চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, "আচ্ছা নীলাঞ্জন বাবু, আপনি কি সারাজীবন এভাবে কেবল কাজ আর ঝিলিককে নিয়ে কাটিয়ে দেবেন? নিজের কথা কি একটুও ভাববেন না?"

নীলাঞ্জন চমকে উঠে ঋতার দিকে তাকাল। ঋতার গালের রঙ তখন একটু লালচে হয়ে উঠেছে। সে খুব নরম অথচ স্পষ্ট গলায় বলল, "আমি জানি আপনি অতীতে অনেক আঘাত পেয়েছেন। কিন্তু সব মানুষ এক হয় না, নীলাঞ্জন। আমি আর একা থাকতে পারি না... আপনার সাথে এই পথ চলাটা আমার জীবনের সেরা পাওয়া।"

নীলাঞ্জনের গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না। বহু বছর পর তার জমে থাকা বরফ জমা হৃদয়টা আবার নতুন করে স্পন্দিত হতে শুরু করল।

উনবিংশ পর্ব: এক নতুন ছাদের নিচে পরিবার

মাস ছয়েক পর। শরতের এক ভোরে ছিমছাম একটা ফ্ল্যাটে নতুন জীবনের সূচনা হলো। সেই ফ্ল্যাটের নাম দেওয়া হলো—"মেঘের ওপারে সকাল"।

ঋতা এখন কেবল একজন অংশীদার বা সম্পাদিকা নয়, সে ঝিলিকের মা এবং নীলাঞ্জনের অর্ধাঙ্গিনী। ঝিলিক আজ নতুন স্কুলে যায়, তার পরনে নতুন ফ্রক, চুলে লাল ফিতে। স্কুল যাওয়ার সময় সে যখন ঋতাকে জড়িয়ে ধরে "মা" বলে ডাকল, তখন ঋতার চোখ গড়িয়ে আনন্দাশ্রু নেমে এল। নীলাঞ্জন দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল সেই দৃশ্য। তার মনে হলো, নিয়তি হয়তো প্রথমে অনেক নিষ্ঠুর খেলা খেলেছিল তার সাথে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে তার জীবনের সঠিক হিসাবটা ঠিকই মিলিয়ে দিয়েছে।

বিংশ পর্ব: অনন্ত সকালের হাতছানি

আজ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কফিতে চুমুক দিতে দিতে নীলাঞ্জন দেখছে বাইরের খোলা আকাশ। দূর দিগন্তে মেঘের আড়াল থেকে সোনাঝরা রোদ্দুর উঁকি দিচ্ছে।

তার অতীতের সমস্ত ব্যর্থতা, একাকিত্ব, কর্পোরেট গঞ্জনা আর অবহেলার দিনগুলো আজ অতীতের পাতালে তলিয়ে গেছে। সে আর স্রোতের টানে ভেসে চলা কোনো খড়কুটো নয়; সে এখন তার নিজের পরিবারের একজন গর্বিত কান্ডারি। শহরের কোলাহল ভেদ করে ঝিলিকের কলকাকলি আর ঋতার মিষ্টি হাসির শব্দে পুরো ঘরটা মুখরিত হয়ে উঠল। নীলাঞ্জন মৃদু হেসে ডায়েরির পাতায় শেষ লাইনটি লিখে ফেলল—"জীবনের কালো মেঘ যতই গভীর হোক না কেন, সঠিক মানুষের ছায়ায় দাঁড়ালে মেঘের ওপারে ঠিকই সকালের আলো খুঁজে পাওয়া যায়।"

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login