Novel

সমান্তরাল সমীকরণ

November 8, 2026

11 views

প্রথম পর্ব: উঁচু ছাদের নিচ ও দুই ভিন্ন আকাশ

ঢাকার অভিজাত এলাকায় শীতের সকালটা আসে বেশ বিলম্বে। পঁচিশ তলার সুদৃশ্য পেন্টহাউসের কাঁচের দেয়াল বেয়ে হালকা কুয়াশার ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। ডাইনিং টেবিলে ধোঁয়া ওঠা কফি, ফ্রেশ জুস আর নিখুঁতভাবে স্লাইস করা টোস্ট সাজানো। কিন্তু সেই টেবিলের দুই প্রান্তে বসে থাকা দুটো মানুষের মাঝের দূরত্বটা কয়েক হাজার মাইলের।

আরিয়ান আহমেদ—দেশের অন্যতম শীর্ষ টেক-কনগ্লোমারেটের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার। আর তার উল্টো পাশে বসে থাকা তার স্ত্রী শায়লা রহমান—একজন প্রখ্যাত আর্কিটেক্ট এবং ইন্টেরিয়র ডিজাইনার। বিয়ের বয়স আট বছর। কিন্তু এই আট বছরে তাদের সম্পর্কের পরিধি কতটুকু বিস্তৃত হয়েছে, তা মেপে দেখার মতো কোনো ফিতা আবিষ্কার হয়নি।

আরিয়ান ট্যাবে চোখ রেখে আইটি ফ্রন্টের নতুন শেয়ার ডাইভেস্টমেন্টের ফাইল রিভিউ করছিল। সে হালকা চালে ডাইনিং চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

"শায়লা, আগামী উইকেন্ডের করপোরেট গালায় তোমাকে দরকার। জাপানি ডেলিগেটসরা থাকবেন," আরিয়ানের গলায় কোনো নির্দেশ বা মিনতি ছিল না, ছিল কেবল কাজের এক পেশাদার স্বর।

শায়লা চায়ের কাপে চামচ নাড়াতে নাড়াতে মুখ তুলে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে কোনো রাগ বা বিরক্তি নেই, কেবল এক অদ্ভুত সমাহিত ভাব।

"আমার ওই দিন একটা ইন্টারন্যাশনাল সেমিনারে কি-নোট স্পিচ আছে, আরিয়ান। আই ক্যাননট মেক ইট।"

আরিয়ান কোনো তর্ক করল না। সামান্য ভুরুও কোঁচকাল না। টেবিল থেকে তার স্যুট ডাবল-ব্রেস্টেড জ্যাকেটটা তুলে নিতে নিতে বলল, "অলরাইট। আই উইল হ্যান্ডেল ইট।"

এই যে কোনো রকমের চিৎকার নেই, গালাগালি নেই, থালা-বাসন ভাঙার শব্দ নেই—বাইরে থেকে দেখলে একে মনে হতে পারে এক আদর্শ দম্পতির পরিপক্ব বোঝাপড়া। কিন্তু সত্যটা হলো, তারা দুজনই খুব ভাল করে জানে তাদের জীবনের সারভাইভাল বা বেঁচে থাকাটা এই সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না। শায়লা রহমান জানে, তার ব্যাংকে যে স্বাধীন ইকুইটি আছে, যে পেশাদার পরিচিতি আছে, এবং তার পেছনে তার বাবা—সাবেক এক জাজ সাহেবের যে সমর্থন আছে, তাতে এই বিয়েটা টিকিয়ে রাখার জন্য তাকে কোনো অপমান বা অস্বস্তিকর পরিবেশ সহ্য করতে হবে না। ভাত-কাপড়ের জন্য তাকে আরিয়ানের মুখাপেক্ষী হতে হয় না।

অন্যদিকে আরিয়ানও বোঝে—কেবল তিন বেলা টেবিলে রান্না করা খাবার তুলে দেওয়া বা কাপড় কাচার জন্য তার কোনো স্ত্রীর প্রয়োজন নেই। তার হাউজ-হেল্প, পার্সোনাল সেফ এবং সার্ভিস টিম সেটা শায়লার চেয়ে শতগুণ ভালো করতে পারে। আরিয়ান জানে, যদি কোনো দিন তারা আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, সে তার অ্যালিমোনি বা কাবিনের কোটি টাকার অঙ্ক এক চেকে সাইন করে দিয়ে বের হয়ে আসতে পারবে।

তাদের মাঝের এই বাঁধনটা অর্থনৈতিক নয়, সারভাইভালেরও নয়। আর ঠিক এই কারণেই, যখন সম্পর্কের মৌলিক চাবিকাঠিটাই হয়ে ওঠে কেবল ‘মানসিক শান্তি’ ও ‘সম্মান’, তখন সামান্য ফাটলও বিশাল এক গিরিখাতের সৃষ্টি করে।

আজ সকালে তাদের আট বছরের একমাত্র সন্তান আরিশ নামল ডাইনিংয়ে। ছয় বছরের আরিশের পরনে স্কুলের ইউনিফর্ম। সে এসে মা আর বাবার মাঝখানে বসল। আরিয়ান এগিয়ে গিয়ে ছেলের মাথায় হাত রাখল, "অল দ্য বেস্ট ফর ইওর সায়েন্স প্রজেক্ট, চ্যাম্প।"

"থ্যাংকস, ড্যাড।"

এই পরিবারে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। কিন্তু বাতাসের মধ্যে একধরণের ভারী হিমশীতল নীরবতা জমে থাকে। আরিশ ছোট হলেও এই আবহাওয়াটা বুঝতে পারে। তবে সে এও দেখেছে যে তার সহপাঠী সাইফের পরিবারে রোজ রাতে বাবা-মায়ের চিৎকার, গালাগালি আর ভাঙচুরের শব্দ হয়। সেই তুলনায় তার বাবা-মা আলাদা দুই মেরুর হলেও তারা তার শিক্ষা, তার স্পোর্টস একাডেমি কিংবা তার মানসিক বিকাশে বিন্দুমাত্র ত্রুটি রাখেনি।

দ্বিতীয় পর্ব: কাদা ছিটানো নাটক ও সামাজিক বিভ্রান্তি

সান্ধ্য পত্রিকার প্রথম পাতায় একটা গসিপ নিউজ ছাপা হয়েছে—"হাই সোসাইটির নতুন ভাঙ্গন: বিলিয়নেয়ার সিইও আর নামজাদা আর্কিটেক্টের সংসার কি তবে শেষ?"

সোশ্যাল মিডিয়ায় এই খবর নিয়ে ট্রোলের বন্যা। কমেন্ট সেকশনে হাজার হাজার মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের মন্তব্য: "টাকা বেশি হলে এই সমস্যা!", "শিক্ষিত আর বড়লোকদের মাথা বিগড়ে গেছে, এদের সংসার বাঁধে না!", "নারী স্বাধীনতার নামে এরা পরিবার প্রথা ভাঙছে!"

একই শহরের অন্য প্রান্তে এক জীর্ণ গলির ভেতরে চারতলা ভবনের মেসে বসে ল্যাপটপে নিউজটা দেখছিল ফয়সাল নামের এক বিনোদন সাংবাদিক। সে মুচকি হাসল। এই ধরনের 'রিচ অ্যান্ড রিচ ফ্রিকআউট' স্টোরিগুলোর ভিউ সবচেয়ে বেশি হয়। আমজনতার কাছে ধনী আর শিক্ষিতদের পারিবারিক অসন্তোষ হলো সবচেয়ে বড় বিনোদন। সাধারণ মানুষ যখন নিজের সংসারের দুবেলা ডাল-ভাতের জোগাড় করতে গিয়ে হিমশীতল বাস্তবতা সামলাচ্ছে, তখন ধনীরা কেন ডিভোর্স দিচ্ছে—এই খবর পড়ে তারা নিজেদের দৈন্য ঢাকতে চায়। তারা ভাবতে ভালোবাসে, "আমরা গরিবে কষ্টে আছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের পরিবার তো টিকে আছে!"

অথচ বাস্তবতা কত নিষ্ঠুর! ওই চারতলা ভবনের নিচের তলায় যে বস্তিসদৃশ কোয়ার্টার, সেখানে রোজ রাতে রিকশাচালক রাজ্জাক তার বউকে মারধর করে। পরকীয়া, শারীরিক নির্যাতন, পুষ্টিহীনতা আর নোংরা পরিবেশ সেখানে নিত্যদিনের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু রাজ্জাকের বউ সংসার ছেড়ে যেতে পারে না। কারণ তার বাপের বাড়ি তাকে আশ্রয় দেবে না, তার নিজস্ব কোনো আয় নেই, আর কাল সকালে না খেয়ে থাকার ভয় তাকে সব নির্যাতন সহ্য করতে বাধ্য করে।

সেখানে সংসার টিকে থাকে ভালোবাসায় নয়, নিতান্তই বেঁচে থাকার অন্ধ বাধ্যবাধকতায়। কিন্তু সেই খবর দিয়ে পেপার বিক্রি হয় না, নাটকের টিআরপি ওঠে না। টিআরপি ওঠে যখন সুশীল সমাজকে দেখানো যায়—"দেখো, ধনীরা কত খারাপ আছে!"

শায়লা তার গুলশানের স্টুডিওতে বসে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল। তার সামনে বসে ছিলেন তার মা, রেহানা রহমান।

"শায়লা, তোদের নিয়ে আবার পেপারে লেখালেখি হচ্ছে। সমাজ কী বলবে? একটু মানিয়ে চললে হয় না? আরিয়ান তো তোকে মারে না, অন্য কোনো নোংরামি নেই ওর।"

শায়লা খুব শান্ত চোখে মায়ের দিকে তাকাল।

"মা, মারধর না করা বা পরকীয়া না করাটাই কি একটা সম্পর্কের সর্বোচ্চ স্ট্যান্ডার্ড? একটা মানুষের সাথে একই ছাদের নিচে থেকে যদি কোনো মানসিক কানেকশন না থাকে, যদি পরস্পরের প্রতি রেসপেক্টটা কেবল লোকদেখানো ফরম্যালিটিতে ঠেকে, তবে সেই নরকে থাকার চেয়ে আলাদা থাকা কি ভালো নয়?"

"কিন্তু আরিশের কথা চিন্তা কর!"

"মা, আরিশ বড় হচ্ছে এমন একটা পরিবেশে যেখানে সে দেখে তার বাবা-মা একে অপরকে সহ্য করছে কেবল লোকলজ্জায়। তারচেয়ে সে জানুক যে তার বাবা-মা আলাদা থাকে, কিন্তু দুজনই তাকে সমান ভালোবাসে এবং সম্মান করে। তিন বেলা গালাগালি আর বরফশীতল হিংসার মাঝে বড় হওয়ার চেয়ে দু জায়গায় সুস্থ পরিবেশে বড় হওয়াটা ওর জন্য অনেক বেশি হেলদি।"

রেহানা রহমান কোনো উত্তর খুঁজে পেলেন না। কারণ তিনি তাঁর নিজের তরুণ বয়সে স্বামীর অনেক অবহেলা আর অপমান সহ্য করেছিলেন কেবল ‘কোথায় যাব, কী খাব’—এই সারভাইভালের ভয়ে। তাঁর কাছে ভালোবাসা বা সম্মান ছিল এক বিলাসিতা। কিন্তু শায়লার কাছে সেটা প্রাথমিক শর্ত।

তৃতীয় পর্ব: কাঠামোর বাইরে রোমান্স

আরিয়ানের অফিসের প্রাইভেট কেবিনে বসে ছিল তার দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং লিগ্যাল অ্যাডভাইজার পারভেজ। ফাইলে সই করতে করতে পারভেজ বলল, "আরিয়ান, ইউ নো ইউ হ্যাভ টু পে এ হিউজ অ্যালিমোনি ইফ দিস গোজ টু কোর্ট। কাবিনের অঙ্কটাও ছোট নয়।"

আরিয়ান একটা হালকা বিদ্রূপের হাসি হাসল।

"পারভেজ, তুমি কি সত্যিই ভাবছ আমি কাবিনের কয়েক কোটি টাকার জন্য আটকে থাকব? মানি ইজ নেভার দ্য ইস্যু হেয়ার। শায়লা নিজের যোগ্যতায় যা আয় করে, সেটা দিয়ে সে চমৎকার বাঁচতে পারে। আমিও আমার ফাইনান্সিয়াল ইমপ্যাক্ট সামলাতে পারি। দ্য রিয়েল প্রবলেম ইজ, উই ডোন্ট নিড ইচ আদার ফর সারভাইভাল।"

আরিয়ান জানালা দিয়ে বাইরের ঢাকার ট্রাফিকের দিকে তাকিয়ে রইল।

"যে সমাজে খাওয়া-পরা আর একটু যৌন চাহিদার ঠেকা মেটাতে বিয়ে করা লাগে, সেখানকার মানুষের কাছে রোমান্সের ডেফিনিশন আলাদা। কিন্তু আমাদের মতো জায়গায়, যেখানে শারীরিক বা আর্থিক চাহিদা মেটানো কোনো সমস্যাই নয়, সেখানে সম্পর্কটা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা ডাইমেনশনে চলে যায়। সেখানে সামান্য মানসিক অসঙ্গতি বা আত্মসম্মানের ঘাটতিতেই স্পার্ক শেষ হয়ে যায়। সেখানে বিয়ে কোনো 'মহাওষুধ' হতে পারে না।"

ঠিক এই সত্যিটাই আমজনতা বুঝতে পারে না। তারা মনে করে ধনী বা শিক্ষিতদের অহংকার বেশি। তারা বোঝে না যে, সারভাইভালের চেইন থেকে মুক্ত হওয়ার পর একজন মানুষের চাওয়ার ক্যানভাসটা কতখানি বদলে যায়।

সেদিন বিকেলে আরিয়ান শায়লার স্টুডিওতে গেল। কোনো হইচই নেই, কোনো ড্রামা নেই।

"শায়লা, আরিশের স্কুলের ট্রাস্টি বোর্ডের মিটিংয়ে আমি যাব, নাকি তুমি যাচ্ছ?"

"আমি যাচ্ছি আরিয়ান। তবে তুমি চাইলে জয়েন করতে পারো। মিটিং শেষে আমরা তিনজন একসাথে ডিনার করতে পারি।"

"দ্যাট উড বি গ্রেট। আই উইল পিকে আপ এটে সিক্স।"

তারা যখন পাশাপাশি কথা বলছিল, বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে এরা বিচ্ছেদের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। কোনো হিংসা নেই, কেবল দুটো স্বাধীন ও স্বাবলম্বী মানুষের আত্মসম্মানজনক অবস্থান।

ফয়সাল দূর থেকে ক্যামেরা দিয়ে তাদের ছবি তুলছিল। সে তার কভার স্টোরির হেডলাইন ভাবছিল—"বিচ্ছেদের মুখেও ধনীদের দামি নাটক!"

ফয়সাল নিজের অসচ্ছল জীবনের ক্ষোভ থেকেই এই যুক্তি দাঁড় করাচ্ছে। সে স্বীকার করতে চায় না যে, এই দুটো মানুষের মানসিক স্বাধীনতা আর সারভাইভালের ক্ষমতা তাকে আর তার চিন্তা ভাবনাকে বহুদূর পেছনে ফেলে এসেছে।

চতুর্থ পর্ব: সারভাইভালের বিষাক্ত ফাঁদ

একই শহরের মিরপুরের এক গলি। ঝুম বৃষ্টিতে গলিটা কাদা-পানিতে থৈ থৈ করছে। চারতলার এক ফ্ল্যাটে থাকেন সরকারি কেরানি রফিক সাহেব ও তাঁর পরিবার। তাঁদের ঘরের ভেতরে প্রচণ্ড চিৎকার-চেঁচামেচি চলছে।

রফিক সাহেবের স্ত্রী সেলিনা বেগম কাঁদো কাঁদো গলায় চেঁচাচ্ছেন, "আজ বিশ বছর ধরে তোমার গালিগালাজ সহ্য করে যাচ্ছি! একদিনের জন্য একটু শান্তিতে ভাত খেতে পারলাম না। আমার জীবনের সব সুখ তুমি শেষ করে দিলে!"

রফিক সাহেব আরও জোরে টেবিল চাপড়ে উঠলেন, "পড়াশোনা তো করিসনি! বাবার বাড়ি গিয়ে ওঠ দেখি, দুই দিন পর ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে! খাইয়ে-পরিয়ে রাখছি এই তো বেশি। বেশি নাটক করবি তো তালা মেরে ঘরে আটকে রাখব!"

সেলিনা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়লেন, কিন্তু ঘর ছেড়ে বের হওয়ার সাহস তাঁর হলো না। কারণ তিনি জানেন, বাইরে গিয়ে দাঁড়ানোর মতো কোনো জমানো টাকা তাঁর অ্যাকাউন্টে নেই। বাপের বাড়ির আর্থিক অবস্থা এমন নয় যে তাঁকে সারাজীবন বসিয়ে খাওয়াবে। তাঁর সারভাইভাল আটকে আছে রফিক সাহেবের চার অঙ্কের বেতনের ওপর। প্রতিদিনের মানসিক নির্যাতন, গায়ে হাত তোলা—সবকিছু তিনি হজম করেন কেবল এই কারণে যে, কাল সকালে তাঁর মাথার ওপরের ছাদটা চলে যাবে।

ফয়সাল এই রফিক সাহেবের দূরসম্পর্কের ভাগ্নে। সে এই দৃশ্য দেখে বড় হয়েছে। সে মনে করে—বিয়ে মানেই তো সহ্য করা, বিয়ে মানেই তো যেভাবেই হোক টিকে থাকা!

ফয়সাল যখন টিভিতে আরিয়ান আর শায়লার সংবাদের বিশ্লেষণ করছিল, সে ব্লগে লিখল: "শিক্ষা আর অত্যাধুনিক লাইফস্টাইল মানুষের সহ্যক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। সামান্য কারণে ভাঙছে পরিবার।"

অথচ ফয়সাল কিংবা রফিক সাহেবের মতো মানুষেরা এটা বুঝতে অন্ধ যে, সেলিনা বেগমের এই 'সহ্য করা' কোনো মহৎ ত্যাগ নয়, এটা একধরণের অসহায় বন্দিদশা। শায়লা বা আরিয়ানের মতো মানুষ সেই বন্দিদশাকে 'জীবন' বলে মেনে নিতে অস্বীকার করে।

সন্ধ্যায় শায়লা তার বাবার ড্রয়িংরুমে বসে ছিল। জাজ রহমান সাহেব মেয়েকে কফি এগিয়ে দিলেন।

"শায়লা, আরিয়ানের সাথে সব ফাইনাল করে ফেলেছ?"

"হ্যাঁ, বাবা। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি মিউচুয়াল সেপারেশনে যাব। কোনো কাদা ছোড়াছুড়ি হবে না। আরিশ যৌথ কাস্টডিতে থাকবে।"

জাজ রহমান মুচকি হাসলেন। "তোমাকে দেখে ভালো লাগছে যে তুমি নিজের ভালো থাকাটাকে কোনো অযৌক্তিক সামাজিক ভয়ের কাছে বলি দিচ্ছ না। আমি আমার সারা জীবনে বহু কেস দেখেছি শায়লা। নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে বিচ্ছেদ কম হয় ভালোবাসার জন্য নয়, বরং আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে। তারা একে অপরকে বিষিয়ে তোলে, কিন্তু ছেড়ে যেতে পারে না। সেটা একটা জীবন্ত নরক।"

শায়লা চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিল। "অনেকে বলে আমরা নাকি অহংকারী, আমাদের সহমর্মিতা নেই। কিন্তু তারা এটা বোঝে না যে, গালাগালি আর বিষাক্ততার মধ্যে সন্তানকে বড় করার চেয়ে সুস্থভাবে আলাদা হওয়াটাই প্রকৃত সহমর্মিতা।"

পঞ্চম পর্ব: দুটি ভিন্ন পৃথিবীর ভারসাম্য

আরিয়ান ও শায়লা একসাথে একটি রেস্তোরাঁয় বসল। সাথে আরিশ।

রেস্তোরাঁর পরিবেশটা মার্জিত। আরিশ রঙিন পেন্সিল দিয়ে খাতায় ছবি আঁকছিল। আরিয়ান আর শায়লা শান্ত গলায় পেপারওয়ার্ক নিয়ে কথা বলছিল।

"আরিয়ান, বনানীর অ্যাপার্টমেন্টটা আমি নিচ্ছি না। দ্যাট ইজ ইওর প্রপার্টি। আই হ্যাভ অলরেডি বুকড এ নিউ প্লেস নিয়ার আরিশস স্কুল।"

"নো শায়লা, দ্যাট প্রপার্টি ইজ ফর আরিশ। তুমি সেটাতে থাকতে পারো যত দিন খুশি। আর ট্রাস্টের ফান্ডের দায়িত্বটা আমি একাই কনট্রিবিউট করব।"

"থ্যাংকস, কিন্তু আই ওয়ান্ট টু কন্ট্রিবিউট ফিফটি পার্সেন্ট। আরিশের দায়িত্বে আমি সমান পার্টনার।"

আরিয়ান শায়লার দিকে তাকাল। এই স্পষ্টভাষী, আত্মমর্যাদাশীল নারীটিকে সে একসময় ভালোবেসেছিল। আজ ভালোবাসার রূপ বদলেছে, কিন্তু শ্রদ্ধাবোধ কমেনি। তারা জানে তারা আর স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সফল নয়, কিন্তু তারা চমৎকার দুজন সুস্থ মানুষ এবং বাবা-মা হিসেবে দায়িত্বশীল থাকতে চায়।

পরদিন অনলাইনে আরিয়ান ও শায়লার যৌথ স্টেটমেন্ট প্রকাশিত হলো: "আমরা আমাদের আট বছরের দাম্পত্য জীবনের সমাপ্তি টানছি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সমঝোতার মাধ্যমে। আমাদের সন্তান আরিশের প্রতি আমাদের যৌথ দায়িত্ব অব্যাহত থাকবে।"

এই স্টেটমেন্টটা দেখার পর ফয়সালের নিউজরুমে আবার শোরগোল।

"আরে ভাই! এরা কোনো ঝগড়া করল না? মারামারি করল না? কোনো স্ক্যান্ডাল নাই? কেস-কামারি নাই? এমন বোরিং ডিভোর্স দিয়ে নিউজ কেমনে হবে!" ফয়সাল বিরক্ত হয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করল।

কারণ মিডিয়া আর আমজনতা তৈরি হয়েছিল একটা নোংরা ড্রামা দেখার জন্য। তারা দেখতে চেয়েছিল ধনী ও শিক্ষিতদের পতন। কিন্তু তারা দেখতে পেল এক পরম আত্মমর্যাদাশীল বিদায়।

রাত্রে শায়লা তার নতুন ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঢাকার নিয়ন আলোর দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানে, সামনের পথটা সহজ নয়। একা থাকা বা সন্তানকে নিয়ে আলাদা জীবন শুরু করার নিজস্ব কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জগুলো তার আত্মসম্মান ও মানসিক শান্তির চেয়ে বড় নয়।

অন্যদিকে আরিয়ান তার অফিসে একা বসে ছিল। সে জানত, কাল থেকে কেউ তাকে ড্রয়িংরুমে দেখে আনুষ্ঠানিক সম্ভাষণ জানাবে না। কিন্তু প্রতিদিনের সেই হিমশীতল নীরবতার নাটক থেকেও সে মুক্ত।

শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি এটাই—মানুষ নিজের ভালো থাকার সংজ্ঞায় অন্য কারও দয়া বা বাধ্যবাধকতার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে না। বেঁচে থাকা আর মানবেতরভাবে টিকে থাকার তফাতটা যারা বোঝে, তারা শেষ পর্যন্ত নিজের ভালো থাকাটাকেই বেছে নেয়, সমাজের তৈরি করে দেওয়া কোনো বিষাক্ত ছকের কাছে মাথা নত করে না।

ষষ্ঠ পর্ব: আমজনতার মানসিকতা ও বিনোদনের খোরাক

অনলাইন পোর্টাল ‘সত্যের আলো’-এর অফিসে বসে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল ফয়সাল। তার সামনের স্ক্রিনে আরিয়ান আর শায়লার সেপারেশন স্টেটমেন্টের নিচে ওঠা ভিউ কাউন্টারটা থমকে গেছে। মানুষের হতাশার সীমা নেই—কোনো কেলেঙ্কারি নেই, পরকীয়ার সরাসরি অডিও ফাঁস নেই, কাবিন নিয়ে মারামারি নেই!

ফয়সালের বস হাবিব সাহেব টেবিলে নক করলেন, "ফয়সাল, এই বোরিং নিউজে ভিউ আসবে না। কিছু একটা ‘মসলা’ ঢোকাও। লেখো যে শায়লার অন্য কারো সাথে চ্যাট হিস্ট্রি পাওয়া গেছে, অথবা আরিয়ান গোপনে টাকা সরিয়ে ফেলছে। জনগণ এসব দেখতে চায়!"

ফয়সাল চশমাটা ঠিক করে বলল, "বস, ওরা তো মিউচুয়ালি আলাদা হইছে। লিগ্যাল নোটিশেও কোনো অ্যালিগেশন নেই। দুজনেই হাই-প্রোফাইল কর্পোরেট আর লিগ্যাল ব্যাকগ্রাউন্ডের। উল্টাপাল্টা লিখলে ডিফামেশন কেস ঠুকে দেবে। কোটি টাকার লিগ্যাল নোটিশ সামলাতে পারবেন?"

হাবিব সাহেব দমে গেলেন, কিন্তু বিরক্তি লুকালেন না। "ধুর মিয়া! এই বড়লোকদের ডিভোর্সও এত নীরস হয় কেন? এদের কোনো আবেগ-অনুভূতি নাই? গালাগালি নাই, মারামারি নাই! এত ভদ্রতা দিয়ে কিসের সংসার?"

ফয়সাল মনে মনে ভাবল, আসলে সাধারণ মানুষ এটাই দেখতে চায় না। সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় আরামের জায়গা হলো—"আমি বস্তিতে আছি, গরিব আছি, কিন্তু আমার নীতি নৈতিকতা আছে, আর ওই ধনী-শিক্ষিতরা ভেতরে ভেতরে পচে গেছে!" এই ধারণাটার ওপর ভিত্তি করে পুরো সমাজ একটা অদ্ভুত আত্মতুষ্টির মধ্যে বাস করে। তারা ভাবে, টাকা আর শিক্ষা মানুষকে ভালোবাসাহীন, স্বার্থপর আর নিষ্ঠুর করে তোলে।

অথচ ফয়সাল নিজে দেখেছে, তার পাশের মেসের ছেলেটি প্রতি মাসে তার স্ত্রীকে গ্রামের বাড়িতে অল্প টাকা পাঠায় আর ফোনে কথায় কথায় গালি দেয়। সেই স্ত্রীর কোনো বিকল্প নেই বলে সে সহ্য করে। কিন্তু এই সমাজ সেই অসহায়ত্বকে নাম দিয়েছে 'পারিবারিক ঐতিহ্য' আর শায়লা-আরিয়ানের আত্মসম্মানকে নাম দিয়েছে 'অহংকার'।

বিকেলে এক কফি শপে ফয়সালের দেখা হলো তার বন্ধু ফারহানের সাথে। ফারহান একজন সমাজবিজ্ঞান গবেষক।

কথা প্রসঙ্গে ফয়সাল বলল, "আচ্ছা ফারহান, এই হাই-ক্লাস সোসাইটিতে এত দ্রুত ডিভোর্স হয়ে যায় কেন বল তো? এদের কি সহমর্মিতা বলতে কিছু নেই?"

ফারহান কফিতে সুগার কিউব ফেলতে ফেলতে হাসল। "তোর দেখাটাই ভুল, ফয়সাল। সহমর্মিতা নেই বলে ডিভোর্স হচ্ছে না। বরং তারা বোঝে যে, এক ছাদের নিচে বিষাক্ততা ছড়ানোর চেয়ে আলাদা হয়ে থাকাটাই চূড়ান্ত সহমর্মিতা। সাধারণ মানুষের সারভাইভালের লড়াই এত কঠিন যে, তারা পেটের খিদের কাছে মন আর মানসিক স্বাস্থ্যকে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। শায়লা বা আরিয়ানের সেই খিদের বাধ্যবাধকতা নেই। যখন একজন মানুষের ভাত-কাপড়ের চিন্তা থাকে না, তখন তার জীবনের প্রাথমিক চাহিদা হয়—মানসিক শান্তি ও রেসপেক্ট। সেখানে কম্প্রোমাইজ না করাটা কোনো অপরাধ নয়, ওটা সচেতনতা।"

ফয়সাল চুপ করে রইল। তার মাথায় তখনও ঘুরছিল কীভাবে এই নিউজে আরও কিছুটা ভিউ বাড়ানো যায়।

সপ্তম পর্ব: নতুন ভোরের প্রস্তুতি

শায়লার নতুন ফ্ল্যাটটি বনানীর একটা নিরিবিলি গলিতে। পঁচিশ তলার সেই বিশাল পেন্টহাউস থেকে এটা আকারে কিছুটা ছোট, কিন্তু এর চারপাশ জুড়ে আলো-বাতাসের খেলা। শায়লা নিজের হাতে ঘরের রঙ বেছে নিয়েছে।

আরিশ তার নতুন রুমে নিজের খেলনাগুলো সাজাচ্ছিল।

"মা, ড্যাড কি আজ রাতে আমাদের সাথে খাবে?" আরিশ সহজ গলায় জিজ্ঞেস করল।

শায়লা এগিয়ে গিয়ে ছেলের পাশে বসল। "আজ না বাবা। তবে ড্যাড কাল বিকেলে তোমাকে নিয়ে সায়েন্স মিউজিয়ামে যাবে। অ্যান্ড নেক্সট উইকেন্ডে তুমি ড্যাডের সাথে ওর ফার্মহাউসে যাচ্ছ।"

আরিশ একটু ভেবে বলল, "ওকে। কিন্তু ড্যাড আর তুমি কি আর একসাথে একই ঘরে থাকবে না?"

শায়লা আরিশের দুই হাত নিজের হাতে নিল। সে কোনো অস্পষ্টতা বা মিথ্যার আশ্রয় নিল না, যা সাধারণত মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে করা হয়—‘বাবা কাজে গেছে’ বা ‘মা নানুর বাড়ি গেছে’ বলে শিশুদের বিভ্রান্ত করা।

"না আরিশ। আমি আর তোমার ড্যাড সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা বন্ধু হিসেবে থাকব, কিন্তু আলাদা ঘরে থাকব। এতে আমরা দুজনই বেশি শান্তিতে থাকতে পারি। তবে তোমার জন্য আমরা দুজনই সবসময় একসাথেই আছি। তোমার কোনো কিছুতেই কমতি হবে না।"

ছয় বছরের আরিশের মুখে কোনো কান্নার রেখা দেখা গেল না। সে কিছু সময় শান্ত থেকে মাথা নাড়ল। কারণ সে তার বাবা-মায়ের মাঝে কখনো কোনো বিষাক্ত সংঘাত দেখেনি। সে দেখেছে দুইজন অত্যন্ত মার্জিত মানুষকে, যারা তাকে সমানভাবে ভালোবাসে।

সেই রাতেই আরিয়ান শায়লাকে কল করল।

"শায়লা, আরিশ কি নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে পেরেছে?"

"হ্যাঁ আরিয়ান। ও বেশ কমফোর্টেবল। কালকের মিউজিয়াম ট্রিপের জন্য ও এক্সাইটেড।"

"গ্রেট। বাই দ্য ওয়ে, শায়লা... তোমার নতুন স্টুডিওর ফাইন্যান্সিয়াল রি-স্ট্রাকচারিংয়ের ফাইলটা দেখলাম। তুমি যদি চাও, আমার লিগ্যাল টিমকে দিয়ে পেপারওয়ার্কগুলো রিভিউ করিয়ে দিতে পারি।"

"থ্যাংকস আরিয়ান, বাট আই হ্যাভ অলরেডি হায়ারড এ সলিসিটর। আই ক্যান ম্যানেজ।"

"আই নো ইউ ক্যান। জাস্ট অফার করলাম। টেক কেয়ার।"

"ইউ টু, আরিয়ান।"

কলটা কেটে দিয়ে আরিয়ান তার বিশাল ফাঁকা ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। তার হাতে কোনো মদের গ্লাস ছিল না, চোখে কোনো কান্নার জল ছিল না। ছিল কেবল এক গভীর উপলব্ধি। এই দূরত্বটা তাকে মুক্তি দিয়েছে। যে সম্পর্ক এতদিন কেবল এক সামাজিক বাধ্যবাধকতার নাম ছিল, তা থেকে বের হয়ে এসে সে এখন নিজের কাজ এবং নিজের শান্তিতে মনোযোগ দিতে পারছে।

অষ্টম পর্ব: তৃতীয় শ্রেণীর নাটক ও বাস্তবতার ধাক্কা

এক মাস পর। টেলিভিশনের একটা জনপ্রিয় ড্রামা সিরিয়ালের শুটিং চলছে। নাটকের দৃশ্যটা এরকম—এক ধনীর দুলীন ও শিক্ষিত নারী তার গরিব কিন্তু নীতিবান স্বামীকে ডিভোর্স দিচ্ছে, কারণ সে আধুনিক জীবনযাপন করতে চায়। অন্যদিকে গরিব স্বামীটি অশ্রুসজল চোখে ত্যাগের মহিমা দেখাচ্ছে।

সেটের কোণে দাঁড়িয়ে স্ক্রিপ্ট রাইটারের সাথে কথা বলছিলেন বিখ্যাত প্রডিউসার খোরশেদ সাহেব।

"বুঝলেন স্ক্রিপ্টরাইটার, এই যে বড়লোকের মেয়েদের অহংকার আর ডিভোর্সের গল্প, এটা ইমোশনকে টাচ করে। দর্শক কান্নাকাটি করবে, বড়লোকদের গালি দেবে, আর আমাদের সিরিয়ালের ভিউ হু হু করে বাড়বে!"

সেখানে উপস্থিত ফয়সাল কভারের কাজে এসেছিল। সে আর চুপ থাকতে পারল না।

"খোরশেদ সাহেব, বাস্তব জীবনে কি এমনটাই ঘটে? নাকি আপনারা নিজেদের মতো করে একটা কাল্পনিক গল্প বানিয়ে গরিবদের সান্ত্বনা দেন?"

খোরশেদ সাহেব অদ্ভুত চোখে ফয়সালের দিকে তাকালেন। "আরে ফয়সাল সাহেব! সত্য ঘটনা দিয়ে কি ব্যবসা করা যায়? মানুষ যা দেখতে চায়, আমাদের তা-ই দেখাতে হবে। আমজনতা দেখতে চায় ধনীরা সুখে নেই। আমরা যদি দেখাই যে ধনীরা ডিভোর্স দিয়েও শান্তিতে আছে, সুন্দরভাবে সন্তান মানুষ করছে, তবে দেশের আশি ভাগ মানুষ ওই নাটক দেখা বন্ধ করে দেবে! তাদের মানসিক স্বস্তির জন্যই এই 'তৃতীয় শ্রেণীর নাটক'গুলো বানানো দরকার।"

খোরশেদ সাহেবের এই স্বীকারোক্তি ফয়সালের গালে যেন এক চড় বসিয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, এই সমাজ আসলে এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রান্তির মধ্যে বাস করে। তারা ধনী ও শিক্ষিতদের স্বাধীন সিদ্ধান্তকে 'অহংকার' আর 'পাপ' বলে প্রচার করে, যাতে নিজেদের অক্ষমতা আর বিষাক্ত বাধ্যবাধকতাকে 'মহৎ ত্যাগ' বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।

সেদিন রাতে ফয়সাল তার ব্লগে একটা নতুন লেখা পোস্ট করল। শিরোনাম দিল: "সারভাইভালের ছায়া ও স্বাবলম্বী সম্পর্কের ক্যানভাস"।

সেখানে সে লিখল:

"আমরা মনে করি মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তের সংসারগুলো টিকে থাকে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহমর্মিতায়, আর ধনীদের সংসার ভাঙে অহংকারে। কিন্তু সত্যটা সম্পূর্ণ উল্টো। দরিদ্রের সংসার অধিকাংশ ক্ষেত্রে টিকে থাকে 'সারভাইভাল' বা বেঁচে থাকার বাধ্যবাধকতায়—যেখানে বিচ্ছেদ মানেই অনাহার আর সামাজিক ধ্বংস। আর শিক্ষিত স্বাবলম্বী মানুষের সংসার টিকে থাকে স্বতঃস্ফূর্ত সম্মান ও মানসিক শান্তির ওপর। যখন সেই সম্মান থাকে না, তখন মানবেতরভাবে টিকে থাকার চেয়ে বের হয়ে আসাটাই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা।"

ব্লগটি পোস্ট হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় উঠল। হাজার হাজার মানুষ ফয়সালকে গালি দিতে শুরু করল, তাকে 'ধনী ও উগ্র আধুনিকতার দালাল' আখ্যা দিল।

ফয়সাল কমেন্টগুলো পড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানত, সত্যটা স্বীকার করার সাহস এই ভণ্ড সমাজের কখনোই হবে না।

নবম পর্ব: শৈশবের ক্যানভাস ও অফস্প্রিংয়ের ভবিষ্যৎ

পাঁচ বছর পর।

লন্ডনের এক স্বনামধন্য বোর্ডিং স্কুলের বিশাল সবুজ মাঠে ফুটবল খেলছিল এগারো বছরের আরিশ। তার পরনে স্কুলের স্পোর্টস কিট। সে দুর্দান্ত একটা গোল করার পর মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুজনের দিকে হাত নেড়ে চিৎকার করে উঠল—"ড্যাড! মাম!"

মাঠের পাশে গ্যালারিতে পাশাপাশি বসে হাততালি দিচ্ছিল আরিয়ান আর শায়লা।

তাদের চেহারায় বয়সের কিছুটা ছাপ পড়েছে, কিন্তু দুজনের চোখেই এক অদ্ভুত প্রশান্তি। এই পাঁচ বছরে তাদের জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। শায়লার আর্কিটেকচারাল ফার্ম এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আরিয়ান তার কোম্পানির গ্লোবাল এক্সপ্যানশন সম্পন্ন করেছে। তারা দুজনই নিজেদের জীবনে নতুন করে চিন্তা করেছে, কিন্তু আরিশের প্রতি তাদের যৌথ অভিভাবকত্বে বিন্দুমাত্র চিড় ধরেনি।

আরিশের গ্রীষ্মের ছুটিতে তারা দুজনই প্রতি বছর লন্ডনে আসে। তারা আলাদা হোটেলে থাকে, কিন্তু দিনের একটা বড় সময় আরিশকে নিয়ে একসাথে কাটায়।

ডিনারে বসে আরিশ তার বাবা-মাকে বলল, "মাই ফ্রেন্ড টম ওয়াজ আসকিং মি লাস্ট উইক, যে আমার বাবা-মা আলাদা থাকে জেনেও আমি এত হ্যাপি কীভাবে? আই টোল্ড হিম, মাই প্যারেন্টস আর মাই বেস্ট ফ্রেন্ডস। দে জাস্ট লিভ ইন ডিফারেন্ট হাউসেস।"

আরিয়ান শায়লার দিকে তাকাল। শায়লা মুচকি হাসল।

এই সেই আরিশ, যার ভবিষ্যৎ নিয়ে সমাজের মানুষ কত আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল! "ভাঙা পরিবারের

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login