Novel

মায়াবৃত্ত

November 8, 2026

10 views

প্রথম পর্ব: স্মৃতির সরণি ও শহরের ব্যস্ত ট্রাফিক

ঢাকা শহরের মতিঝিল এলাকার বহুতল বাণিজ্যিক ভবনগুলোর কাঁচের দেওয়ালে যখন দুপুরের কড়া রোদ এসে পড়ে, তখন চারপাশটা কেমন যেন এক অলীক মায়াবী আলোয় ঝলমল করে ওঠে। এই তীব্র রোদের মাঝেও ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখে থাকে অন্তহীন ক্লান্তি আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক অদ্ভুত আকুতি। তাদেরই ভিড়ে ট্রাফিক সিগন্যালে জ্যামে আটকে থাকা একটা পুরোনো প্রাইভেটকারের পেছনের আসনে বসে আছেন অর্ঘ্য সেনগুপ্ত। বয়স পঞ্চাশের কোঠায় ছুঁইছুঁছুই, অথচ চোখের কোণের গভীর বলিরেখা আর মাথার পেকে যাওয়া চুলগুলো তাকে বয়সের চেয়ে অনেক বেশি পরিপক্ব ও ক্লান্ত করে তুলেছে।

অর্ঘ্য সেনগুপ্ত আজকের দিনে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ‘বেঙ্গল গ্রুফ অব ইন্ডাস্ট্রিজ’-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট। তার ব্যাংক ব্যালেন্স, কোম্পানির শেয়ার, গুলশানের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিংবা গাড়ির হর্ন—কোনো কিছুরই কমতি নেই। কিন্তু এই বাহ্যিক সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষটা প্রতিদিন নিজের ভেতরের এক শূন্যতার সাথে লড়াই করে চলেছেন। গাড়ির জানালার কাঁচ নামিয়ে বাইরে তাকিয়ে অর্ঘ্য ভাবছিলেন, ঠিক কুড়ি বছর আগে এই শহরের অন্য এক কোণে তার জীবনটা কেমন ছিল। তখন পকেটে টাকা না থাকলেও বুকে ছিল বিশাল আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন, আর আজ পকেটে টাকা আছে, অথচ আকাশ দেখার সময়টুকু আর কারো জন্য অবশিষ্ট নেই।

তার এই সফলতার চূড়ায় পৌঁছানোর পথটি কখনোই ফুল বিছানো ছিল না। শৈশবের সেই অভাবের দিনগুলো, কুষ্টিয়ার ছোট্ট এক মফস্বল শহরের খটখটে মাটি, বাবার সামান্য কেরানির চাকরি আর মায়ের হাতের নুন-ভাত দিয়ে ডাল খাওয়ার স্মৃতিগুলো আজও তার মগজের কোটরে কড়া নাড়ে। সেদিনের সেই অর্ঘ্য আর আজকের এই অর্ঘ্যের মাঝে বিস্তর ফারাক। কিন্তু মাঝখানের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে তিনি হারিয়ে ফেলেছেন এমন কিছু অমূল্য সম্পদ, যা দিয়ে পৃথিবীর সমস্ত সোনা বা হীরা কিনেও আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। গাড়ির ড্রাইভার যখন হর্ন বাজিয়ে গাড়িটি সামনের দিকে এগিয়ে দিল, অর্ঘ্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেছনের সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। তার মনের পর্দায় ভেসে উঠল অতীতের সেই প্রথম ভালোবাসার মুখটি—যে মুখটি তিনি নিজের হাতে তিলে তিলে মুছে দিয়েছিলেন এক অন্ধ উচ্চাভিলাষের নেশায়।

শহরের কোলাহল ভেদ করে গাড়ি যখন গুলশানের অভিজাত এলাকায় প্রবেশ করল, অর্ঘ্যের মন তখন অতীতের সেই গুমোট অন্ধকার ঘরে ফিরে গেছে। সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল ঝমঝম করে, আর তার বুক কাঁপছিল অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের ভয়ে। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডির বীজ রোপিত হয়েছিল। অর্ঘ্যের জীবনে তখন রাইসা ছাড়া আর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। রাইসার মায়াবী চোখ, তার হাসির আভা আর তার নিঃশর্ত ভালোবাসা ছিল অর্ঘ্যের বেঁচে থাকার একমাত্র অক্সিজেন। অথচ অর্ঘ্য নিজেই নিজের হাতে সেই অক্সিজেন বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সমাজের তথাকথিত সাফল্য, বড় পদ, কাঁচের ঘরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ আর বিত্তশালী হওয়ার মোহে তিনি রাইসাকে একা ফেলে এসেছিলেন এক ঝড়ো রাতে। কুড়ি বছর আগের সেই বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন আজও তার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে যায়—তুমি সফল হয়েছ অর্ঘ্য, কিন্তু তুমি হেরে গেছ মানুষ হিসেবে। গাড়ির দরজা খুলে যখন দারোয়ান স্যালুট দিয়ে তাকে রিসিভ করল, অর্ঘ্য এক পা দু পা করে লিফটের দিকে এগিয়ে গেলেন। তার অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খোলা মাত্রই যে শূন্যতা তাকে গ্রাস করল, তা তার সমস্ত সফলতার অহংকারকে নিমেষে ধুলিস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

দ্বিতীয় পর্ব: কাঁচের দেয়ালের ওপারে একাকী রাত

গুলশানের পঁচিশ তলার এই ফ্ল্যাটটির ভেতরের পরিবেশ সবসময়ই এক অদ্ভুত হিমশীতল নীরবতায় মোড়ানো থাকে। এখানে কোনো কোলাহল নেই, কোনো অপ্রয়োজনীয় শব্দের অবকাশ নেই। সবকিছু একেবারে নিখুঁত, একদম মাপা। বসার ঘরের বিশাল সোফায় বসে অর্ঘ্য যখন তার সুদৃশ্য স্যুটকেসটা খুললেন, তখন টেবিলের ওপর রাখা তার স্ত্রীর ছবিটার ওপর চোখ পড়ল। অর্ঘ্যের বর্তমান স্ত্রী মৈত্রেয়ী। মৈত্রেয়ী একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী করপোরেট ল’ইয়ার, যার নিজস্ব ব্যস্ততা, নিজস্ব সামাজিক বৃত্ত এবং নিজস্ব অহংকার রয়েছে। তাদের এই দাম্পত্য জীবনটা আসলে কোনো ভালোবাসার বন্ধন নয়, বরং দুটি উচ্চাভিলাষী মানুষের পারস্পরিক সুবিধার এক চুক্তিভিত্তিক সহাবস্থান।

মৈত্রেয়ী যখন রাতে বাড়ি ফেরেন, ততক্ষণে অর্ঘ্য ঘুমিয়ে পড়েন কিংবা ডেস্কে ল্যাপটপ নিয়ে লড়েন। তাদের মধ্যে কথার আদানপ্রদান কেবল অফিসিয়াল প্রজেক্ট, শেয়ার বাজারের গতিপ্রকৃতি কিংবা উইকেন্ডের কোনো ফরমাল ডিনারের নিমন্ত্রণ রক্ষা পর্যন্ত সীমিত। অর্ঘ্য আজও স্পষ্ট মনে করতে পারেন মৈত্রেয়ীর সাথে তার বিয়ের সেই দিনটির কথা। সেটা ছিল তার ক্যারিয়ারের এক বড় টার্নিং পয়েন্ট। বেঙ্গল গ্রুপের ডিরেক্টরের একমাত্র কন্যা মৈত্রেয়ীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অর্থই ছিল অর্ঘ্যের জন্য রাতারাতি আকাশচুম্বী পদোন্নতি এবং সমাজের উচ্চবিত্ত মহলে পাকাপাকি জায়গা করে নেওয়া। সেদিনের সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার মনে কোনো দ্বিধা ছিল না; কারণ তার লক্ষ্য ছিল একটাই—যাই হোক না কেন, তাকে বড় হতে হবে, বিত্তশালী হতে হবে।

কিন্তু আজ এই মধ্যরাতে কাঁচের জানালার ধারে দাঁড়িয়ে নিচের সুদৃশ্য শহরের নিয়ন আলোর দিকে তাকাতে তাকাতে অর্ঘ্যের মনে হলো, এই পঁচিশ তলার উচ্চতা তাকে মাটি থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সে কি সত্যিই কোনো স্বর্গের কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছে? নাকি সে নিজের হাতে তৈরি এক নিখুঁত কারাগারে আজীবনের জন্য বন্দি হয়ে গেছে? মৈত্রেয়ীর সাথে তার কোনো শারীরিক বা মানসিক দূরত্ব না থাকলেও, অদৃশ্য এক দেওয়াল তাদের সবসময় আলাদা করে রাখে। অর্ঘ্য গ্লাসে হুইস্কি ঢালতে গিয়ে থেমে গেলেন। গত কয়েক বছর ধরে অ্যালকোহল তার একমাত্র রাতের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। এই কাঁচের গ্লাসের স্বচ্ছ তরল ছাড়া তার ভেতরের জমে থাকা হিমশীতল হাহাকার কেউ দূর করতে পারে না।

হঠাৎ করেই তার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখলেন কোম্পানির সিইও’র ফোন। এত রাতে কোম্পানির জরুরি ফোন মানেই কোনো বড় ডিজাস্টার কিংবা নতুন কোনো আন্তর্জাতিক প্রজেক্টের চাপ। অর্ঘ্য ফোনটা রিসিভ করলেন এবং তার মুখে সেই পরিচিত করপোরেট হাসি ও ঠান্ডা কণ্ঠস্বর ফিরে এল—"ইয়েস স্যার, বলুন, আমি শুনছি।" ভেতরে তখন সুনসান নীরবতা আর হাহাকার চললেও, বাইরের দুনিয়ার কাছে অর্ঘ্য সেনগুপ্ত মানেই এক অটল পাহাড়, যে কখনো ভেঙে পড়ে না। ফোন রেখে অর্ঘ্য ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালেন। রাতের ঠান্ডা বাতাস তার চুলে এসে লাগল। ঠিক এই রকমই এক রাতে কুষ্টিয়ার সেই মেঠো পথে তিনি রাইসার হাত ধরে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, একদিন তিনি এই পৃথিবীকে তাদের পায়ের নিচে এনে ফেলবেন। কিন্তু পৃথিবী তো পায়ের নিচে এল না, বরং অর্ঘ্য নিজেই হারিয়ে গেলেন সেই পৃথিবীর ভিড়ে।

তৃতীয় পর্ব: কুষ্টিয়ার মেঠো পথ ও অতীতের গন্ধ

অর্ঘ্যের মনের গভীরে কুষ্টিয়ার সেই দিনগুলো সবসময় একটা নরম তুলতুলে সুতোর মতো জড়িয়ে থাকত। আজকের এই অভিজাত জীবন, কোটি টাকার গাড়ি আর এসি রুমের আরাম তাকে কখনোই সেই ফেলে আসা মেঠো পথের সুবাস ভুলিয়ে দিতে পারেনি। কুষ্টিয়ার কপ্রদকহীন এক সাধারণ পরিবারে তার জন্ম। বাবা ছিলেন স্থানীয় এক স্কুলের থার্ড ক্লাস ক্লার্ক। সামান্য বেতনের টাকায় চার সদস্যের সংসার চালানোই যেখানে ছিল প্রতিদিনের যুদ্ধ, সেখানে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা ছিল এক বিলাসিতা। কিন্তু অর্ঘ্যের মাথাটা ছোটবেলা থেকেই খুব প্রখর ছিল। সে অঙ্কের খাতায় ১০০ তে ১০০ পেত, আর তার সেই প্রতিভাকে দেখে স্কুলের হেডস্যার নিজেই উদ্যোগ নিয়ে তাকে কলেজ পর্যন্ত পড়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

সেই কলেজে পড়ার সময়ই রাইসার সাথে তার পরিচয় হয়। রাইসা ছিল স্থানীয় এক স্কুল শিক্ষকের একমাত্র কন্যাসন্তান। রাইসার চুলগুলো ছিল হাঁটু পর্যন্ত লম্বা, আর তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত মায়া। প্রথম দেখাতেই অর্ঘ্য তার প্রেমে পড়েছিলেন। সেই প্রেম কোনো আধুনিক কর্পোরেট রোমান্স ছিল না; সেটা ছিল কদম ফুলের সুবাস মেশানো, গোধূলি বেলার স্নিগ্ধ এক অনুভূতি। তারা দুজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছে পদ্মার চরের বালুচরে বসে। রাইসা তার পুরোনো ডায়েরির পাতায় কবিতা লিখে শোনাত, আর অর্ঘ্য তাকে শোনাত কীভাবে সে একদিন অনেক বড় চাকরি করবে, ঢাকা শহরে বাড়ি বানাবে এবং রাইসাকে রানি বানিয়ে রাখবে।

রাইসা তখন সরল মনে অর্ঘ্যের সেই কথাগুলো বিশ্বাস করত। সে বলত, "অর্ঘ্য, আমার এত বড় প্রাসাদের দরকার নেই। তুমি শুধু আমার পাশে থেকো, কুটির হলেও আমার কোনো দুঃখ থাকবে না।" কিন্তু অর্ঘ্যের উচ্চাভিলাষী মন সেই ছোট কুটিরে আটকে থাকার মানুষ ছিল না। সে জানত, দারিদ্র্য কী জিনিস। সে প্রতিদিন দেখেছে তার মায়ের শাড়ির তালি দেওয়া অংশটুকু কীভাবে লুকিয়ে রাখতে হয়, আর বাবার ভাঙা চশমার লেন্স ঠিক করার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে কীভাবে হিমশিম খেতে হয়। এই চরম অভাবই অর্ঘ্যের মনে জন্ম দিয়েছিল এক তীব্র ক্ষোভ এবং তা থেকেই তৈরি হয়েছিল অদম্য এক উচ্চাভিলাষ।

কলেজ শেষ করে যখন অর্ঘ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে চান্স পেল, তখন সেটা ছিল পুরো এলাকায় এক বিরাট খবর। গ্রামবাসী সবাই বাহবা দিয়েছিল। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেই রাইসার চোখে প্রথম জলের ফোঁটা দেখা গিয়েছিল। রাইসা বুঝতে পেরেছিল, ঢাকা শহর তার অর্ঘ্যকে ধীরে ধীরে বদলে দেবে। অর্ঘ্য তখন রাইসাকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাজারটা কসম কেটে বলেছিল, "তুমি একটুও ভেবো না রাইসা। আমি সেটেল হওয়ামাত্রই তোমাকে নিয়ে আসব।" কিন্তু ঢাকা শহরের চাকচিক্য, বড় বড় করপোরেট অফিসের গ্ল্যামার এবং মৈত্রেয়ীর মতো প্রভাবশালী পরিবারের সান্নিধ্য অর্ঘ্যের সেই প্রতিশ্রুতির ভিতগুলোকে খুব দ্রুত নড়বড়ে করে দিয়েছিল। সেদিনের সেই মেঠো পথ আর আজকের এই গুলশানের পিচঢালা রাস্তার ব্যবধান কেবল ভৌগোলিক নয়, এটা ছিল নীতি ও স্বপ্নের এক করুণ পতন।

চতুর্থ পর্ব: বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলি ও মৈত্রেয়ীর এন্ট্রি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার পর অর্ঘ্যের জীবনের গতিপথ একেবারে পাল্টে গেল। কুষ্টিয়ার খাদি পাঞ্জাবি পরা সেই লাজুক ছেলেটি খুব দ্রুত নিজেকে বদলে ফেলল শহরের আধুনিক সংস্কৃতির সাথে। সে বুঝতে পেরেছিল, এই কর্পোরেট দুনিয়ায় টিকে থাকতে হলে কেবল মেধা যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন স্মার্টনেস, সঠিক যোগাযোগ এবং অবশ্যই অর্থ বা ক্ষমতার ব্যাকগ্রাউন্ড। অর্ঘ্য হলের রুমে বসে রাত জেগে পড়াশোনা করার পাশাপাশি বিভিন্ন ডিবেটিং ক্লাবে যোগ দিল, করপোরেট ইন্টার্নশিপের সুযোগ খুঁজতে লাগল এবং খুব সুকৌশলে তার চারপাশের চেনাজানা বৃত্তটা বড় করতে শুরু করল।

এই বদলের পালে সবচেয়ে বড় হাওয়া দিল মৈত্রেয়ীর আগমন। মৈত্রেয়ী তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনমিকসেরই ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী, আর অর্ঘ্য সেকেন্ড ইয়ার। মৈত্রেয়ী ছিলেন জন্মসূত্রে অভিজাত পরিবারের সন্তান। তার পরনে সবসময় ব্রান্ডেড পোশাক, চলাফেরায় আত্মবিশ্বাসের এক দারুণ প্রকাশ এবং শিক্ষকদের মহলেও তার ব্যাপক প্রভাব ছিল। একটা ন্যাশনাল লেভেল বিজনেস কেস স্টাডি প্রতিযোগিতায় অর্ঘ্য ও মৈত্রেয়ী একই গ্রুপে পড়েছিল। সেই প্রতিযোগিতায় তাদের টিম ফার্স্ট হয়েছিল, আর সেটাই ছিল অর্ঘ্যের জীবনের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। মৈত্রেয়ী প্রথম দেখাতেই অর্ঘ্যের লজিক্যাল থিংকিং ও প্রেজেন্টেশন স্কিলের প্রেমে পড়েছিলেন।

মৈত্রেয়ীর সাথে বন্ধুত্ব হওয়া মানে অর্ঘ্যের জন্য এক বিরাট সুযোগের দরজা খুলে যাওয়া। মৈত্রেয়ীর বাবা মেঘনাদ রায় চৌধুরী ছিলেন বেঙ্গল গ্রুপের তখনকার এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর। মৈত্রেয়ীর হাত ধরেই অর্ঘ্য প্রথমবার সেই বিশাল করপোরেট হাউসের অন্দরমহলে প্রবেশ করার সুযোগ পেয়েছিল। গ্র্যাজুয়েশন শেষ হওয়ার আগেই অর্ঘ্য বেঙ্গল গ্রুপে একটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার পদে চাকরি পেয়ে যায়, যা ছিল তার ব্যাচের যে কারো কল্পনার বাইরে। কিন্তু এই সাফল্যের সিঁড়িতে চড়ার সময় অর্ঘ্যের পকেট থেকে ধীরে ধীরে ঝরে পড়তে লাগল তার অতীতের সেই না বলা প্রতিশ্রুতিগুলো।

কুষ্টিয়া থেকে রাইসার লেখা চিঠিগুলোর উত্তর দেওয়া অর্ঘ্য আস্তে আস্তে কমিয়ে দিল। প্রথমে চিঠির উত্তর দিতে সপ্তাহ খানেক লাগত, তারপর মাস, আর একসময় সেই চিঠিগুলো আসা বন্ধ হয়ে গেল বা অর্ঘ্য নিজে থেকেই সেগুলোর জবাব দেওয়া বন্ধ করে দিল। রাইসা যখন ফোন করত, অর্ঘ্য তখন মিটিংয়ে থাকার অজুহাত দিত। সে নিজেকে বোঝাত, রাইসার সাথে তার এই সম্পর্ক হলো তার অতীতে আটকে থাকা একটা ভুল অধ্যায়, যা বর্তমানের এই বর্ণিল সাফল্যের সাথে কোনোভাবেই বেমানান নয়। মৈত্রেয়ী যখন অর্ঘ্যের সাথে কফি শপে বসত বা লং ড্রাইভে যেত, অর্ঘ্য তখন ইচ্ছাকৃতভাবেই তার গ্রামের ব্যাকগ্রাউন্ড বা রাইসার কথা সম্পূর্ণ মুছে ফেলত নিজের স্মৃতি থেকে। সে এক নতুন অর্ঘ্য হয়ে উঠতে চেয়েছিল—যে অর্ঘ্যের কোনো অতীত নেই, কেবল একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে।

পঞ্চম পর্ব: সম্পর্কের ভাঙন ও রাইসার শেষ চিঠি

অর্ঘ্যের জীবনের সেই নিষ্ঠুরতম অধ্যায়টি লেখা হয়েছিল তার চাকরির প্রথম বর্ষের শেষের দিকে। মৈত্রেয়ীর সাথে তার সম্পর্ক তখন আর কেবল বন্ধুত্বের জায়গায় সীমাবদ্ধ ছিল না; সেটা একটা সুনির্দিষ্ট পরিণতির দিকে এগোচ্ছিল। মৈত্রেয়ীর পরিবারও এই সম্পর্কটিকে মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল, কারণ অর্ঘ্য ছিল কোম্পানির অন্যতম মেধাবী ও বিশ্বস্ত তরুণ কর্মী। কিন্তু এই সমস্ত কিছুর মাঝেও কুষ্টিয়ার সেই ছোট্ট ঘরের কোণে বসে থাকা রাইসা তো জানত না যে তার পৃথিবীটা তলে তলে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।

সেদিন বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পর অর্ঘ্য তার ডেস্কে একটা খাম দেখতে পেল। খামটা এসেছে কুষ্টিয়া থেকে। রাইসার হাতের সেই চেনা বাঁকা হরফে লেখা। অর্ঘ্যের হাত দুটো সামান্য কেঁপে উঠেছিল খামটা হাতে নেওয়ার সময়। সে খামটা ছিঁড়ে চিঠিটা বের করল। রাইসা লিখেছিল—"অর্ঘ্য, তুমি অনেক দিন আমার কোনো চিঠির উত্তর দাওনি। আমি জানি তুমি অনেক বড় মানুষ হয়ে গেছ, অনেক ব্যস্ত তুমি। কিন্তু আমার মন মানে না। গত রাতে আমার খুব জ্বর এসেছিল, সারারাত তোমার কথা মনে হচ্ছিল। পাড়ার সবাই বলাবলি করে তুমি নাকি আর কুষ্টিয়ায় ফিরবে না, বড়লোকের কোনো মেয়েকে বিয়ে করছ। আমি তাদের মুখে ছাই দিয়ে বলি আমার অর্ঘ্য অমন হতে পারে না। একবার শুধু একটা ফোন করো অর্ঘ্য, এসে বলো যে তুমি আমারই আছ। নয়তো এই বুকফাটা কান্নায় আমি একদিন সত্যি মরে যাব।"

চিঠিটা পড়ার পর অর্ঘ্যের বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসেছিল। সে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। কিন্তু তার সেই নরম অনুভূতি খুব দ্রুত কর্পোরেট স্বার্থপরতার কাছে হেরে গেল। সে মনে মনে ভাবল, আজ যদি সে রাইসার টানে কুষ্টিয়ায় ফিরে যায়, তবে তার এই দু বছরের সমস্ত পরিশ্রম, বেঙ্গল গ্রুপের বড় পদ, মৈত্রেয়ীর ভালোবাসা এবং তার স্বপ্নের রাজপ্রাসাদ—সবকিছু এক নিমিষে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। সে কি পারবে আবার সেই নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসারে ফিরে যেতে? তার উত্তর ছিল—না, কিছুতেই না।

অর্ঘ্য সেদিন রাতে আর কোনো দ্বিধা না করে রাইসাকে একটা দীর্ঘ চিঠি লিখল এবং সাথে কিছু টাকা পোস্টাল অর্ডারের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিল। সেই চিঠিতে সে কোনো রাখঢাক না করে সরাসরি লিখে দিয়েছিল যে তাদের এই সম্পর্কটার কোনো ভবিষ্যৎ নেই, সমাজ এবং তাদের সামাজিক অবস্থানের ব্যবধান এতটাই বেশি যে তাদের পক্ষে এক হওয়া অসম্ভব। সে লিখেছিল, "রাইসা, তুমি আমাকে ভুলে যাও এবং নিজের মতো করে জীবন গুছিয়ে নাও। আমার এই কঠিন সিদ্ধান্তকে তুমি ক্ষমা করে দিও।" চিঠিটা পোস্ট করার পর অর্ঘ্যের মনে হয়েছিল সে যেন তার জীবনের একটা বড় বোঝা নামিয়ে ফেলেছে। কিন্তু সে জানত না, এই বোঝা নামানোর মূল্য তাকে সারাজীবন তিলে তিলে পরিশোধ করতে হবে। এর ঠিক এক সপ্তাহ পর কুষ্টিয়া থেকে আরেকটি ছোট চিঠি এসেছিল, যা পাঠিয়েছিলেন রাইসার বাবা। সেখানে কেবল লেখা ছিল—"বাবা অর্ঘ্য, আমার মেয়েটি আর বেঁচে নেই। গত পরশু রাতে সে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। মরার আগে সে কেবল তোমার নামটাই মুখে নিয়েছিল। ভালো থেকো বাবা, তোমার ওই বিশাল সাফল্যের দুনিয়ায়।"

ষষ্ঠ পর্ব: কর্পোরেট সিঁড়িতে অর্ঘ্যের দ্রুত আরোহণ

রাইসার সেই মৃত্যুর খবরটি অর্ঘ্যের করপোরেট জীবনের শুরুর দিকে এক বিরাট মানসিক আঘাত হেনেছিল বটে, কিন্তু সেই আঘাত তাকে থামাতে পারেনি, বরং তাকে আরও বেশি নিষ্ঠুর ও লক্ষ্যভেদী করে তুলেছিল। সে তার সমস্ত অপরাধবোধ, সমস্ত অনুশোচনাকে নিজের বুকের গভীরে কবর দিয়ে দিল এবং শতভাগ মনোযোগ দিল কেবল তার ক্যারিয়ারের ওপর। সে নিজেকে এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল—এই পৃথিবীতে দুর্বলদের কোনো জায়গা নেই, হয় তোমাকে জয়ী হতে হবে, না হয় পিষে যেতে হবে।

বেঙ্গল গ্রুপে অর্ঘ্যের কাজের গতি দেখে কোম্পানির তৎকালীন এমডি মেঘনাদ রায় চৌধুরী ভীষণ মুগ্ধ হয়েছিলেন। অর্ঘ্যের মধ্যে কাজের প্রতি যে নিষ্ঠা ও নির্ভুল হিসাব-নিকাশ করার ক্ষমতা ছিল, তা খুব কম কর্মীর মধ্যেই দেখা যেত। বড় বড় প্রজেক্টের ফিন্যান্সিয়াল প্ল্যানিং, আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে দরকষাকষি এবং করপোরেট ট্যাক্স অপ্টিমাইজেশনের ক্ষেত্রে অর্ঘ্য যেন এক প্রকার জাদুকর হয়ে উঠেছিল। মেঘনাদ বাবু প্রায়ই বলতেন, "অর্ঘ্য সেনগুপ্ত হলো আমাদের কোম্পানির রত্ন, ও খুব দ্রুত অনেক দূর যাবে।"

এরই ধারাবাহিকতায় ঠিক এক বছর পর মৈত্রেয়ীর সাথে অর্ঘ্যের জাঁকজমকপূর্ণ বিবাহানুষ্ঠান সম্পন্ন হলো। সেই বিয়েতে শহরের মন্ত্রী, শিল্পপতি, উচ্চপদস্থ আমলা এবং বিদেশি অতিথিরা উপস্থিত হয়েছিলেন। পাঁচতারা হোটেলের সেই বর্ণিল আলোয় যখন অর্ঘ্য ও মৈত্রেয়ী একসঙ্গে ক্যামেরার সামনে পোজ দিচ্ছিল, তখন অর্ঘ্যের চোখ দুটো অজান্তেই ভিজে উঠেছিল। কিন্তু সে জল রাইসার স্মৃতির জন্য নয়, সেটা ছিল তার চূড়ান্ত বিজয়ের আনন্দাশ্রু। সে কুষ্টিয়ার সেই কুঁড়েঘর থেকে উঠে এসে আজ এই বাংলার শীর্ষস্থানীয় ধনকুবেরের জামাই এবং কোম্পানির অন্যতম শীর্ষ কর্তা—এই প্রাপ্তি তার কাছে রাইসার মৃত্যুর সমস্ত অপরাধবোধকে ঢেকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

বিয়ের পর অর্ঘ্যের পদোন্নতির গতি আরও বেড়ে গেল। মাত্র দশ বছরের ব্যবধানে সে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার থেকে সরাসরি জেনারেল ম্যানেজার এবং পরবর্তীতে কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে উন্নীত হলো। গুলশানের এই পঁচিশ তলার ফ্ল্যাটটি তারা কিনেছিল নগদ টাকায়। গাড়ি বদলাতে বদলাতে সে এখন লেটেস্ট মডেলের জার্মান মার্সিডিজে চড়ে। কোম্পানির প্রতিটি মিটিংয়ে তার মুখের কথাই ছিল শেষ কথা। জুনিয়র কর্মীরা তাকে ভয়ে ও ভক্তিতে দেবতা জ্ঞান করত। কিন্তু এই সমস্ত ক্ষমতার শিখরে পৌঁছেও অর্ঘ্য কখনো তার সেই পুরোনো ভয় কাটিয়ে উঠতে পারেনি—যে ভয়টা মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে তাকে তাড়া করে বেড়াত, তা হলো রাইসার সেই শূন্য দৃষ্টি আর তার বাবার পাঠানো সেই চিঠির শেষ দুটি লাইন।

সপ্তম পর্ব: মৈত্রেয়ীর সাথে শীতল দূরত্ব ও একাকী জীবন

বাইরের দুনিয়ার কাছে অর্ঘ্য ও মৈত্রেয়ীর সংসার ছিল এক আদর্শ ও সফল দম্পতির প্রতীক। ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে তাদের ছবি ছাপা হতো, সমাজিক অনুষ্ঠানে তারা একসঙ্গে উপস্থিত হয়ে নিখুঁত হাসিমুখে পোজ দিতেন। কিন্তু ঘরের ভেতরের চার দেওয়ালের চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। বিয়ের প্রথম কয়েক বছর তাদের মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়া থাকলেও, সন্তান না হওয়ার পর থেকেই সেই সম্পর্কে ফাটল ধরতে শুরু করে। মৈত্রেয়ী চেয়েছিল তার ক্যারিয়ারের পাশাপাশি সংসারটাও তার নিজের শর্তে চলবে, আর অর্ঘ্য চেয়েছিল তার প্রথাগত পুরুষতান্ত্রিক অহংকার ও করপোরেট এক্সিকিউটিভসুলভ মেজাজ ঘরেও বজায় রাখতে।

তাদের কোনো সন্তান হয়নি, যা মৈত্রেয়ীর চেয়ে অর্ঘ্যের কাছেই বেশি হতাশার ছিল। অর্ঘ্য মাঝে মাঝে ভাবত, তার এই বিশাল সম্পত্তি, এই সাম্রাজ্য কার জন্য সে তিলে তিলে গড়ে তুলল? তার মৃত্যুর পর এই কোটি কোটি টাকার মালিক কে হবে? মৈত্রেয়ী নিজের ল ফার্ম নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকতেন যে তিনি মাসের পর মাস দেশের বাইরে কিংবা কোর্ট কেস নিয়ে পড়ে থাকতেন। তাদের শোবার ঘরের বিছানায় দুটো আলাদা কোলবালিশ আর মাঝখানে এক বিশাল অদৃশ্য দূরত্ব সবসময় রাজত্ব করত। তারা একে অপরের সাথে কথা বলত কেবল কাজের প্রয়োজনে কিংবা কোনো সামাজিক সৌজন্য রক্ষার খাতিরে।

এক রাতে মৈত্রেয়ী বসার ঘরে ওয়াইন গ্লাস হাতে নিয়ে ল্যাপটপে কাজ করছিলেন। অর্ঘ্য অফিস থেকে ফিরে কোট খুলতে খুলতে বললেন, "মৈত্রেয়ী, আগামী সপ্তাহে বোর্ড মিটিংয়ের পর ডিনার পার্টিতে কোম্পানির জাপানি ডেলিগেটসরা আসছে, তোমাকে থাকতে হবে।" মৈত্রেয়ী ল্যাপটপ থেকে চোখ না তুলেই ঠান্ডা গলায় বললেন, "অর্ঘ্য, ওই জাপানি ডেলিগেটসদের ডিনারে আমার থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আমার সেদিন সুপ্রিম কোর্টের একটা হাই-প্রোফাইল হিয়ারিং আছে। তুমি একা সামলে নিও, যেমনটা সবসময় করে থাকো।"

অর্ঘ্য বিরক্ত হয়ে সোফায় বসে বললেন, "সমাজ বা কোম্পানির চোখে আমাদের একটা ইমেজ আছে মৈত্রেয়ী। তুমি এভাবে সবসময় নিজেকে গুটিয়ে রাখলে মানুষ কী ভাববে?" মৈত্রেয়ী তখন খিকখিক করে হেসে উঠেছিলেন—সেদিনের সেই হাসিটার মধ্যে এক ধরনের তীব্র বিদ্রূপ ছিল। তিনি অর্ঘ্যের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, "ইমেজের কথা তুমি বলো না অর্ঘ্য! আমাদের এই বিয়ের ভিত্তিটাই তো একটা নিখুঁত মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তুমি আমাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলে, নাকি বেঙ্গল গ্রুপের চেয়ারের লোভ ছিলে—তা তোমার চেয়ে ভালো আর কে জানে? তাই ইমেজের নাটকটা অন্য কারো সামনে করো, আমার সামনে নয়।"

মৈত্রেয়ীর সেই কথাগুলো সেদিন অর্ঘ্যের বুকে তীরের মতো বিঁধেছিল। কারণ মৈত্রেয়ী শতভাগ সত্য কথাটাই উচ্চারণ করেছিলেন। অর্ঘ্য তো কাউকেই ভালোবাসেনি; সে কেবল ভালোবাসার ভান করেছে নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। রাইসাকে সে ভালোবেসেও লোভের বলি দিয়েছিল, আর মৈত্রেয়ীকে সে ভালোবাসেনি জেনেশুনেই কেবল পদ ও ক্ষমতার লোভে বিয়ে করেছিল। সে জীবনে সবকিছু অর্জন করেছে, কেবল ভালোবাসা ছাড়া।

অষ্টম পর্ব: কর্পোরেট সাম্রাজ্যের নতুন ঝড় ও বয়সের ভার

বয়স বাড়ার সাথে সাথে অর্ঘ্যের শরীরেও তার ছাপ পড়তে শুরু করল। ব্লাড প্রেসার অনিয়মিত হয়ে গেল, ডায়াবেটিসের ওষুধ এখন তার পকেটে সবসময় থাকে, আর রাতের ঘুম তো কবেই তার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে। করপোরেট দুনিয়ার এই ইঁদুর দৌড়ে বয়স বাড়া মানেই হলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া। তরুণ প্রজন্মের এমবিএ গ্র্যাজুয়েশন করা স্মার্ট ছেলেরা এখন বেঙ্গল গ্রুপের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে যোগ দিচ্ছে, যারা অর্ঘ্যের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী, অনেক বেশি টেক-স্যাভি এবং অনেক কম আবেগপ্রবণ। অর্ঘ্য বুঝতে পারছিল তার সাম্রাজ্যের সিংহাসনে টান পড়ার সময় এসে গেছে।

কোম্পানির বর্তমান চেয়ারম্যান মেঘনাদ বাবু মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। এখন কোম্পানির প্রধান কর্ণধার হলেন মৈত্রেয়ীর ভাই তথা অর্ঘ্যের শ্যালক রোহন রায় চৌধুরী। রোহন আমেরিকা থেকে পড়াশোনা শেষ করে আসার পর থেকেই অর্ঘ্যের সাথে তার একটা ঠান্ডা লড়াই শুরু হয়েছিল। রোহন চাচ্ছিল কোম্পানির পুরনো রীতিনীতি বদলে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড এবং আমেরিকান মডেলে সবকিছু চালাতে, যেখানে অর্ঘ্যের মতো পুরনো দিনের পরীক্ষিত এক্সিকিউটিভদের আর খুব একটা প্রয়োজন ছিল না।

সেদিন বোর্ডের এক দীর্ঘ মিটিং শেষে রোহন অর্ঘ্যের কেবিনে এসে বসল। তার মুখে এক কৃত্রিম সৌজন্যমূলক হাসি। রোহন কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল, "অর্ঘ্য দুলাভাই, আপনার বয়স তো হলো। আর কত এভাবে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ফাইলের পর ফাইল সই করবেন বলুন তো? কোম্পানির বোর্ড ভাবছে আপনাকে এবার একটু প্রি-রিটায়ারমেন্ট বা কনসালট্যান্ট হুডে পাঠিয়ে দেওয়া যাক। আপনারা পুরনো মানুষ, আপনাদের একটু বিশ্রাম নেওয়া দরকার।" কথাটার অন্তর্নিহিত অর্থ অর্ঘ্যের বুঝতে এক মুহূর্তও দেরি হলো না। তাকে সসম্মানে সরিয়ে দেওয়ার এক সুকৌশল ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে।

অর্ঘ্য নিজের সিটে সোজা হয়ে বসে এক চিলতে শীতল হাসি দিয়ে বললেন, "রোহন, অর্ঘ্য সেনগুপ্তকে কনসালট্যান্ট বানিয়ে বাড়ি পাঠানোর আগে কোম্পানির ব্যালেন্স শিটের দিকে একবার ভালো করে তাকিয়ে নিও। যে দিন এই অর্ঘ্য বেঙ্গল গ্রুপ থেকে বের হয়ে যাবে, সেদিন তোমার এই কাঁচের টাওয়ারের শেয়ারের দাম কত নিচে নামবে, তা তোমার চেয়ে তোমার ফিন্যান্স ডিরেক্টর ভালো বলতে পারবেন।" রোহনের মুখটা সেদিন ফ্যাকাশে হয়ে গেছিল। সে অর্ঘ্যের শক্তির জায়গাটা ভালো করেই জানত। কিন্তু অর্ঘ্য নিজে বুঝতে পেরেছিল যে তার পায়ের নিচের মাটি আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। যে সাম্রাজ্য গড়ার জন্য সে নিজের জীবন, নিজের প্রেম, নিজের বিবেক সব বিসর্জন দিয়েছিল, সেই সাম্রাজ্যই আজ তাকে লাথি মেরে বের করে দিতে চাইছে।

নবম পর্ব: সেই চিরচেনা মুখ ও আকস্মিক ধাক্কা

অফিস থেকে সেদিন একটু আগেই বের হয়ে এসেছিলেন অর্ঘ্য। মাথার ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে আসছিল। গাড়িতে বসে তিনি ড্রাইভারকে বললেন ধানমন্ডি লেকের দিকে যেতে। লেকের পাড়ে একটু হাঁটলে হয়তো এই দমবন্ধ করা করপোরেট মানসিক চাপ থেকে কিছুটা মুক্তি পাওয়া যাবে। গোধূলির আলোয় লেকের জলের ওপর মায়াবী ঝিলিক খেলছে। চারপ

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login