মহাকালের অলিখিত লিপি: যে কথাগুলো আগেই বলা হয়ে গেছে
ধূসর মার্বেল পাথরে বাঁধানো সেই কক্ষটির বাতাসে এক অদ্ভুত প্রাচীন গন্ধ—যেন শত শত বছরের পোড়ানো মোমবাতি আর শুকনো চামড়ার পাতার সুবাস মিশে আছে। মেঝের ঠিক মাঝখানে রাখা রয়েছে একটি বিশাল, লোহার বর্মের মতো ভারী কিতাব। কিতাবের নাম—"আল-মাখতুতুল আযল" (চিরন্তন পাণ্ডুলিপি)।
এই সেই কিতাব, যার পাতাগুলো মানুষের হাতের স্পর্শে উল্টায় না; সময়ের অদৃশ্য নিশ্বাসে নিজে থেকেই পাতা উল্টে যায়। আর তাতে যা লেখা আছে, তা কোনো কল্পনা নয়—তা হলো নিখুঁত ইতিহাস, যা অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের এক অবিচ্ছেদ্য স্রোতধারা।
কক্ষটির এক কোণে বসে আছেন বয়োবৃদ্ধ ইতিহাসবিদ ও ঋষি। তার চোখের দৃষ্টিতে হাজার বছরের ক্লান্তি। সামনে দাঁড়িয়ে এক তরুণ গবেষক, যার চোখে বিস্ময় আর মনে ভয়ের কাঁপুনি।
তরুণটি কাঁপাপায়ে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, "হযরত... এ কেমন কিতাব? এখানে যা দেখছি, তা তো ঠিক আজ সকালে ঢাকা শহরের ব্যস্ত মোড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা! আবার একটু পর উল্টে গিয়ে এমন এক ভবিষ্যতের কথা বলছে, যা এখনো আসেনি। এ কেমন ধাঁধা?"
বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন। তার কণ্ঠস্বর যেন কোনো গভীর গুহা থেকে ভেসে আসা প্রতিধ্বনির মতো শোনাল:
> "বৎস, মানুষ ভাবে সময় সামনে এগোয়। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো—সময় একটি বৃত্ত। যা ঘটে গেছে, তা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং তা আগেই এই পাতার কালিতে খোদাই করা ছিল। অতীত যা ছিল, বর্তমান যা দেখছ, আর ভবিষ্যৎ যা ঘটার অপেক্ষায় আছে—সবই এক মহাকালীন লিপির পুনরাবৃত্তি।"
>
তরুণটি কৌতূহলী ও আতঙ্কিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, "তাহলে কি আমাদের কোনো নিজস্ব ইচ্ছে বা স্বাধীনতা নেই? সবকিছুর স্ক্রিপ্ট কি আগেই লেখা?"
বৃদ্ধ কিতাবের একটি পাতা আলতোভাবে স্পর্শ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে পাতায় সোনালী হরফে ফুটে উঠল কিছু বাক্য। বৃদ্ধ পড়তে লাগলেন:
অধ্যায় এক: যা ঘটে গেছে (অতীতের প্রতিধ্বনি)
> "আকাশে যখন ধূলার ঝড় উঠবে, মানুষের হাতের স্ক্রিনগুলো হয়ে উঠবে তাদের একমাত্র উপাস্য, তখন কেউ একজন প্রথম ডিজিটাল মুদ্রার বীজ রোপণ করবে। মানুষ অন্ধের মতো দৌড়াবে অদৃশ্য সম্পদের পিছে, বিশ্বাস করবে না কোনো মাটির ব্যাংককে। কাগজের নোট হয়ে যাবে ইতিহাস, আর মানুষ পরিণত হবে কোডের ছায়ায়।"
>
তরুণটি চমকে উঠল। সে ফিসফিস করে বলল, "এটা তো ঠিক সেই সময়কার কথা, যখন মানুষ প্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সি আর ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল মার্কেটে সর্বস্ব ঢেলে দিয়েছিল... আমাদের পূর্বপুরুষরা তো ঠিক এভাবেই নিঃস্ব হয়েছিল!"
বৃদ্ধ গম্ভীর গলায় উত্তর দিলেন, "ঠিক তাই। আজ যাকে তুমি আধুনিক প্রযুক্তি বলো, তা হাজার বছর আগেই এই কিতাবের কোনো এক কোণে সতর্কবাণী হিসেবে লেখা ছিল। যারা তখন হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল, তারা আজ ইতিহাসের পাতায় শুধুই এক একটি ধূলিকণা।"
অধ্যায় দুই: যা এখন ঘটছে (বর্তমানের আয়না)
পাণ্ডুলিপির পাতাটি নিজে থেকেই আবার উল্টে গেল। এবার সেখানে ভেসে উঠল বর্তমানের একটি জীবন্ত চিত্র।
> "শহরের ইট-পাথরের খাঁচায় বসে মানুষ যখন ভাববে সে বিশ্বজয় করেছে, ঠিক তখনই সে নিজের ছায়া দেখে ভয় পাবে। প্রতিটি মুখের আড়ালে থাকবে এক গভীর দূরত্ব; মানুষ ভিড়ের মধ্যে থেকেও চরম একা হয়ে পড়বে। তারা একে অপরের চোখের ভাষা পড়বে না, পড়বে শুধু ইমোজি আর রিঅ্যাকশন। দালানকোঠা আকাশ ছুঁয়ে ফেলবে, কিন্তু মানুষের হৃদয় নেমে যাবে অন্ধকার গহ্বরে।"
>
তরুণটি তার নিজের পকেটে থাকা স্মার্টফোনের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, এই বাক্যগুলো যেন ঠিক এই মুহূর্তে তার নিজের জীবনের ওপরই লেখা হচ্ছে। সে থমকে গেল।
"তাহলে কি আমাদের এই একাকীত্ব, এই সামাজিক দূরত্ব, আর সবকিছুকে সমান চোখে দেখার উদাসীনতা—সবকিছুই আগে থেকেই নির্ধারিত?"—তরুণটির গলা ধরে এল।
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন, "যখন কেউ ভালোবাসার বদলে হিসাব কষতে শুরু করে, সম্পর্কের খাতায় সমান সমান হিসেব মেলায়, তখন সমাজ এভাবেই থমকে যায়। আজ তোমরা যা করছ, তা আজ থেকে শতক বছর আগে কেউ লিখে রেখে গেছে বলেই তোমরা তা হুবহু অনুসরণ করছ।"
অধ্যায় শেষ: যা ভবিষ্যতেও ঘটবে (আগামীকালের লিপি)
হঠাৎ কিতাবের শেষ পাতাটি তীব্র নীল আলোয় জ্বলে উঠল। কোনো মানুষের হাত ছাড়াই পাতাটি কাঁপতে লাগল। বাতাসে যেন এক অদৃশ্য সাইরেন বাজতে শুরু করল।
বৃদ্ধ ও তরুণ দুজনেই ঝুঁকে পড়লেন সেই আলোর দিকে। সেখানে ফুটে উঠল ভবিষ্যতের সেই অবধারিত সত্য:
> "একদিন এই ধাতব নগরীগুলো স্তব্ধ হয়ে যাবে। মানুষ তার তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে নতি স্বীকার করবে। আকাশ থেকে নেমে আসবে এক তীব্র নীরবতা, যা সমস্ত অহংকার ধুয়ে মুছে সাফ করে দেবে। নদীগুলো আবার ফিরে চাইবে তাদের হারানো যৌবন, আর প্রকৃতি তার নিজের জমিন পুনরুদ্ধার করবে। সেদিন মানুষের তৈরি কোনো কোড, কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা কোনো ভার্চুয়াল সাম্রাজ্য টিকবে না—শুধুমাত্র টিকে থাকবে সত্য, মাটি আর মহাশূন্যের অন্তহীন নীরবতা।"
>
তরুণটি শিউরে উঠে পাণ্ডুলিপির পাতা থেকে পিছিয়ে এল। তার বুক কাঁপছে। সে রুদ্ধশ্বাসে বলল, "তাহলে কি আমাদের এই প্রচেষ্টা, এই পড়াশোনা, এই গবেষণা, এই সম্পদ জমানোর লড়াই—সবই কি অর্থহীন?"
বৃদ্ধ কিতাবটি বন্ধ করে দিলেন। ভারী লোহার প্রচ্ছদটি বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে পুরো কক্ষের আলো নিভে গেল, কেবল একটি মোমবাতির শিখা টিমটিম করে জ্বলতে লাগল।
বৃদ্ধ নরম কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন:
> "অর্থহীন কেবল তখনই হয়, যখন তুমি এই লিপিকে অভিশাপ মনে করো। কিন্তু যদি বোঝো যে এটি একটি চক্র, তবে তুমি বর্তমানের প্রতিটি মুহূর্তকে নতুনভাবে সাজাতে পারো। ভবিষ্যৎ লেখা হয়ে গেছে মানে এই নয় যে তুমি পুতুল; ভবিষ্যৎ লেখা হয়েছে এইজন্য, যাতে তুমি বুঝতে পারো—যে পথটি অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে, সেই পথে আর পা না বাড়িয়ে অন্য কোনো পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ কি তোমার আছে?"
>
কক্ষটিতে গভীর নীরবতা নেমে এল। তরুণটি জানালার দিকে তাকাল। বাইরে ঢাকার ব্যস্ত রাজপথের আলো জ্বলছে—ঠিক যেমনটি এই কিতাব শত বছর আগে বলে গেছিল, এবং আজও ঘটে চলেছে।
> একটি ছোট্ট প্রশ্ন: এই মহাকালের যাত্রায়, আপনি কি মনে করেন আপনার আজকের সিদ্ধান্তটি কেবলই আপনার নিজের, নাকি এটি হাজার বছর আগেকার কোন লেখারই নিখুঁত পুনরাবৃত্তি?