Story

স্মৃতির বারান্দা

November 7, 2026

5 views

পুরান ঢাকার এক শ্যাওলা পড়া পুরোনো বাড়ির নাম ‘স্মৃতি নিবাস’। এই বাড়ির লম্বা বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়ালে একটা অদ্ভুত মন কেমন করা গন্ধ পাওয়া যায়—বৃষ্টি ভেজা মাটি আর পুরোনো বইয়ের পাতার গন্ধ। এই বাড়ির প্রতিটি কোণে এখনো খোদাই করা আছে দুটি মানুষের অদৃশ্য ছায়া—যামিনীর বাবা অধ্যাপক রহমান সাহেব আর মা সুরাইয়া বেগম।

যামিনীর যখন দশ বছর বয়স, এক মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-মা দুজনেই একসঙ্গে এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যান। তারপর থেকে যামিনীর পৃথিবীটা যেন একটা থমকে যাওয়া ঘড়ি। নানু আর খালামনির আদরে সে বড় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে শূন্যতা বুকের বাঁপাশে তৈরি হয়েছিল, তা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।

আজ অনেক বছর পর, যামিনী এখন ছাব্বিশ বছরের এক তরুণী। সে লেখালেখি করে, ছোটখাটো ফ্রিল্যান্স কাজ করে। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় অভ্যাস হলো—প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাবার পুরনো ডায়েরিটা কোলে নিয়ে বসা আর মায়ের ফেলে যাওয়া সিল্কের শাড়ির আঁচলটা ছোঁয়া।

অধ্যায় এক: শূন্যতার মেলবন্ধন

সেদিনের বিকেলটা ছিল বড় থমথমে। আকাশে কালো মেঘ জমে ঢাকা শহরের আকাশটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠেছে। যামিনী তার পড়ার টেবিলে বসে একটা উপন্যাস লেখার চেষ্টা করছে, কিন্তু কলমের কালি যেন আর কাগজ ছুঁতে চাইছে না। মনের ভেতরটা কেমন যেন হু হু করে উঠছিল। আজ ছিল তার বাবা-মায়ের বিবাহবার্ষিকী।

জীবিত থাকলে আজ তাদের তিরিশতম বছর পূর্ণ হতো। যামিনী আলমারির এক কোণ থেকে একটা পুরোনো ক্যাসেট প্লেয়ার বের করল। বহু কষ্টে এটার স্প্রিং ঠিক করা হয়েছে। ক্যাসেটটা অন করতেই ঝিরঝির শব্দের পর ভেসে এল একটা চেনা কণ্ঠস্বর—

"যামু রে... বড় হয়ে তুই কী হবি জানিস না তো? তুই আমাদের ঘরের আলো হবি।"

সেটা ছিল তার বাবার গলা। আর ঠিক তার পরেই ভেসে এল মায়ের মিষ্টি হাসির শব্দ—"মেয়েকে একা রেখে কোথাও যাওয়ার জো নেই রহমান সাহেব, ও তো সবসময় আমাদের সাথেই থাকবে।"

ক্যাসেটের আওয়াজটা ঘরের চারপাশের বাতাসে ছড়িয়ে পড়তেই যামিনীর চোখ গলে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল টেবিলে রাখা নোটবুকে। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। টেবিলের ওপর মুখ গুঁজে সে এমনভাবে কেঁদে উঠল, যেন সেই দশ বছরের ছোট্ট যামিনী মেয়েটি আজও ঘরের এক কোণে মা-বাবার জন্য পথ চেয়ে বসে আছে।

"বাবা... মা... কেন চলে গেলে তোমরা একসঙ্গে? এই পৃথিবীতে আমি এত একা কেন?"—তার কান্নার আওয়াজটা ঘরের শূন্য দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল।

অধ্যায় দুই: ছায়ার সাথে কথোপকথন

কান্না থামার পর যামিনী বারান্দায় এসে দাঁড়াল। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঢাকার রিকশাগুলোর রঙিন হুড বৃষ্টির জলে চকচক করছে। ঠিক তখনই তার মনে হলো, পেছনের বারান্দার দরজাটা যেন কে আলতো করে টোকা দিল।

সে চমকে পেছন ফিরে তাকাল। কেউ নেই। শুধু বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ।

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেই নিঝুম অন্ধকারেও যামিনী যেন স্পষ্ট টের পেল—তার ঠিক পেছনে দুটি মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মায়ের হাতের সেই চেনা চন্দ্রমল্লিকা ফুলের সুবাস ভেসে এল বাতাসে। আর বাবার গম্ভীর কিন্তু স্নেহের স্পর্শ যেন তার মাথার চুলে আলতো করে বুলিয়ে গেল।

যামিনী অবশ হয়ে ফিসফিস করে বলল, "মা... তুমি কি এসেছ? বাবা, তোমরা কি আমাকে দেখতে পাও?"

বাতাসটা যেন আরও একটু জোড়ালো হলো। তার কানের কাছে কেউ যেন ফিসফিস করে বলে গেল—"পাগলি মেয়ে! আমরা কি কখনো কোথাও যাই নাকি? বাবা-মা কি কখনো মরে যায়? মানুষ তো শুধু রূপ বদলায়, আর ভালোবাসার শক্তি হয়ে বেঁচে থাকে তার সন্তানের চোখের জলে আর হাসিতে।"

যামিনীর বুকটা এক নিমিষে হালকা হয়ে গেল। তার মনে হলো, এতদিনের জমে থাকা সমস্ত কষ্ট, সমস্ত নিঃসঙ্গতা নিমেষে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে। সে আর একা নয়। তার দুই পাশে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দুটি হাত অদৃশ্য চাদরের মতো তাকে আগলে রেখেছে।

অধ্যায় শেষ: স্মৃতির প্রদীপ

ঝড় থেমে গেছে। ঢাকার আকাশে মেঘ কেটে গিয়ে এক ফালি সোনালী রোদ উঁকি দিয়েছে।

যামিনী ঘরের ভেতর ফিরে এল। তার চেহারায় আর কোনো বিষাদের ছায়া নেই; বরং চোখে এক অদ্ভুত দীপ্তি। সে টেবিলের সামনে বসল এবং তার ল্যাপটপটা খুলল। নতুন উপন্যাসের প্রথম পাতায় সে টাইপ করল:

> "মানুষ ভাবে মৃত্যুর পর সব শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যে ভালোবাসা রেখে যাওয়া হয় মানুষের হৃদয়ে, তা কোনোদিন মরে না। তারা আমাদের চোখের আড়ালে থাকে ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি বিপদে, প্রতিটি সাফল্যের মুহূর্তে তারা ঠিক ছায়ার মতো পাশে এসে দাঁড়ায়। মা-বাবা হলো সেই ধ্রুবতারা, যাদের আলো নিভে যাওয়ার নয়।"

>

যামিনী জানালার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। টেবিলের ওপর রাখা বাবা-মায়ের বাঁধানো ছবিটার দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে বলল—"তোমরা চিন্তা কোরো না বাবা-মা, তোমাদের মেয়ে এখন আর একা নয়। আমি শক্ত হয়ে বেঁচে আছি, তোমাদেরই মতো ভালোবেসে।"

বাইরে তখন বিকেলের নরম রোদে ভিজে থাকা শহরটা হাসছে—যেন মহাকালের এক অপূর্ব নাটকের অপরূপ এক পরিণতি।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login