Story

মিসকিন আলী

November 7, 2026

8 views

ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম আর ভ্যাপসা গরমে বসে জীবন কাটানোর চেয়ে বড় কোনো তপস্যা স্বর্গেও আছে বলে আমার মনে হয় না। সেদিন দুপুরের দিকে বাসার টিনের চালে একটা কাক এমন ক্যাঁচক্যাঁচ করছিল, যেন সে আমাকে তার নানার বাড়ির সম্পত্তি লিখে দিতে বলছে।

ঠিক তখনই আমার রুমমেট বাদল তার স্বভাবসুলভ ফ্যাচফেচে গলায় বলে উঠল, "কিরে মজিদ টাইপের লোক, তোর পকেটে কি একটা টাকাও আছে? মেসে কিন্তু আজ চাল শেষ। বুড়োবাবু আধা ঘণ্টা আগে মুদির দোকান থেকে তেড়ে এসেছে!"

আমি সোফায় একটা পা তুলে দিয়ে অত্যন্ত দার্শনিক ভঙ্গিতে বললাম, "বাদল, চাল ফুরিয়ে যাওয়া মানেই জীবনের শেষ নয়। মানুষের মন যখন শূন্য থাকে, তখন চালের বস্তাও শূন্য থাকাটাই তো প্রকৃতির নিয়ম। তুই একটা কাজ কর, বারান্দায় গিয়ে ওই কাকটার সাথে একটু রাজনৈতিক আলোচনা শুরু কর দেখবি ও তোকে দুমুমুঠো চাল ধার দিলেও দিতে পারে।"

বাদল দাঁত কিড়মিড় করে বলল, "তোর এই ফালতু ফিলোসফির চোটে আমার পেটের নাড়িভুঁড়ি সব এক হয়ে গেছে। আজ যদি তুই একটা চাকরি বা কোনো উপার্জনের ব্যবস্থা না করিস, তবে কথা দিলাম—এই মেস থেকে তোর লাশ বের হবে অথবা তোর এই হলুদ পাঞ্জাবিটা আমি ছিঁড়ে বেগুন খেতের scarecrow বানিয়ে দেব।"

হলুদ পাঞ্জাবি নিয়ে মানুষের এত সমস্যা কেন আমি বুঝি না। এই রঙটা তো সূর্যোদয়ের রঙ, হতাশার রঙ নয়! ঠিক এই সময় দরজায় টোকা পড়ল। দরজা খুলতেই দেখা গেল আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ল্যান্ডলর্ড সোবহান সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। তার পরনে চেক লুঙ্গি আর গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি। মুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে তিনি বললেন, "কী মিয়া মিসকিন? গত তিন মাসের ভাড়া বাকি। তোমার কি দয়া মায়া বলে কিছু নেই? আমি কি ব্যাংক চালাই?"

আমি অত্যন্ত বিনীতভাবে সোবহান সাহেবের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করার একটা ভান করে বললাম, "সোবহান ভাই, আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। ব্যাংক তো আপনি চালান না, চালান স্বয়ং আল্লাপাক। আর মানুষের জীবনের আয়-ব্যয়ের হিসাব তো ফেরেস্তারা রাখে, আপনি কেন অকারণে উচ্চ রক্তচাপ বাড়াচ্ছেন বলুন তো?"

সোবহান সাহেব চোখ গোল গোল করে বললেন, "ফেরেস্তা বুঝি এসে আমার হাতে ক্যাশ ভাড়ার টাকা দিয়ে যাবে? আগামীকালের মধ্যে ভাড়া না পেলে তোমার বিছানাপত্র রাস্তায় ফেলে দেব, বলে দিলাম!"

সোবহান সাহেব চলে যাওয়ার পর বাদল হতাশ হয়ে খাটে শুয়ে পড়ল। ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা আমার পুরনো নকিয়া ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখি—আমাদের পাড়ার চিরকুমার ব্যাচেলর লতিফ ভাই ফোন করেছেন। লতিফ ভাই হলেন এমন একজন মানুষ যিনি সারাদিন প্রেমের কবিতা লেখেন আর ডালিম গাছের নিচে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে কান্নার রোল ভেসে এল:

"মিসকিন ভাই! সর্বনাশ হয়ে গেছে ভাই!"

আমি শান্ত গলায় বললাম, "লতিফ ভাই, পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আগে মানুষ সাধারণত এভাবেই বলে সর্বনাশ হয়ে গেছে। বলুন, এবার কোন পাত্রী আপনার চিঠি ছিড়ে ডাস্টবিনে ফেলেছে?"

লতিফ ভাই নাক টানতে টানতে বললেন, "আরে না ভাই! পাত্রী চিঠি ফেলে দেয়নি। আমি যে একটা নতুন স্টার্টআপ কোম্পানি শুরু করেছিলাম—‘বিনা পয়সায় পেঁয়াজ সরবরাহ লিমিটেড’—সেটার ইনভেস্টররা আজ আমাদের অফিসে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। এখন আমার গার্লফ্রেন্ড পারভীন আমাকে বলছে সে নাকি কোনো বেকার কবিকে বিয়ে করবে না, সে বিয়ে করবে জাপানি প্রবাসীর এক দূরসম্পর্কীয় চাচাতো ভাইকে যার নাকি টোকিওতে তিনটে সিএনজি স্টেশন আছে!"

আমি বললাম, "লতিফ ভাই, জাপানি সিএনজি স্টেশন তো অনেক দূর, আপনি বরং একটা কাজ করুন। পারভীনকে একটা চিঠি লিখে পাঠান যে, টোকিওর সিএনজির চেয়ে ঢাকার রিকশার সিট অনেক বেশি রোমান্টিক। রিকশায় বসলে কাঁধে মাথা রাখার সুবিধা আছে, সিএনজিতে তো কাঁচের জানালা বন্ধ থাকে!"

লতিফ ভাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "তুই খালি ফাইজলামি করিস! আমার মাথা কাজ করছে না। আয় তো একটু মকবুলের চায়ের দোকানে বসবি, একটা লাল চা খাব আর জীবন নিয়ে একটু হতাশা প্রকাশ করব।"

আমি বললাম, "আসছি। তবে শর্ত একটা—চা খাওয়ার বিলটা কিন্তু ওই চায়ের দোকানদারের খাতায় আমার নামে যোগ করে দিবি। কারণ আমার পকেটে এখন আছে কেবল একটা লজেন্সের খোসা আর একটা ভাঙা দেশলাই কাঠি।"

মেস থেকে বের হয়ে রিকশায় উঠলাম। ঢাকার রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হলো, এই শহরে সবাই যেন কোনো এক অদৃশ্য কারণে খুব তাড়ার মধ্যে আছে। রিকশাচালক কাসেম মিয়া প্যাডেল মারতে মারতে ঘাম মুছতে মুছতে বলল, "স্যার, এই শহরে বেঁচে থাকা বড় দায়। চালের দাম যা বাড়ছে, পোলাপান নিয়ে কি খামু আল্লায় জানে।"

আমি কাসেম মিয়ার কাঁধে হাত রেখে বললাম, "কাসেম ভাই, চিন্তা করবেন না। চালের দাম বাড়লে মানুষ কম খাবে, কম খেলে শরীর ভালো থাকবে, ডাক্তার দেখাতে হবে না। এটাকে উল্টো সরকারের একটা স্বাস্থ্যসম্মত পলিসি হিসেবে ধরে নিতে পারেন।"

কাসেম মিয়া আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন সে ভাবল আমি পাগল না হয় কোনো বড় বিপদের লক্ষণ।

দোকানে গিয়ে দেখি লতিফ ভাই একটা প্লাস্টিকের টুল বসে বিড়ি টানছেন। তার চোখ দুটো লাল। আমাকে দেখেই তিনি বলে উঠলেন, "মিসকিন, বল তো এই দুনিয়ায় ভালোবাসার দাম কিচ্ছু নাই?"

আমি একটা বিস্কুট মুখে পুরে দিয়ে বললাম, "ভালোবাসার দাম যদি থাকত লতিফ ভাই, তবে নিউমার্কেটের হকাররা সেটা কেজি দরে বিক্রি করত। ভালোবাসার কোনো দাম নাই বলেই তো এটা এত সুন্দর।"

এমন সময় দোকানের রেডিওতে একটা পুরোনো গান বেজে উঠল—"কহো না পেয়ার হ্যায়..."

লতিফ ভাই গানের তালে আরেকটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আমি চায়ে চুমুক দিয়ে আকাশটার দিকে তাকালাম। ঢাকা শহরের আকাশটা আজ কেমন যেন ঘোলাটে—ঠিক মানুষের মনের মতো। পকেট শূন্য, বাসা থেকে খেদিয়ে দেওয়ার নোটিশ ঝুলছে, তবু কেন যেন মনে হলো—আজকের বিকেলটা মন্দ নয়।

হয়তো জীবন মানেই এই গোলকধাঁধা, যেখানে উত্তর পাওয়ার কোনো দরকার নেই, শুধু গোলকধাঁধায় ঘুরে বেড়াতেই একটা অদ্ভুত আনন্দ আছে।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login