সাল ২০৮৬। ঢাকা মেট্রোপলিস।
বায়ুমণ্ডলে ভাসমান নিয়ন সাইনবোর্ড আর এআই-নিয়ন্ত্রিত ড্রোনগুলোর মৃদু গুঞ্জনে পুরো শহরটা যেন একটা জীবন্ত সার্কিট বোর্ড হয়ে উঠেছে। মিরপুরের পরিত্যক্ত ডেটাসেন্টারের আন্ডারগ্রাউন্ড ল্যাবরেটরিতে বসে ল্যাপটপের নীল আলোয় চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে আরিয়ান-এর। সে একজন ফ্রি ল্যান্স ফিন্যান্সিয়াল কোডার এবং সাইবার সিকিউরিটি রিসার্চার, যে কিনা গত কয়েকদিন ধরে অদ্ভুত কিছু ডেটাসেট নিয়ে গবেষণা করছে।
ঠিক তখনই তার টেবিলে রাখা স্মার্ট-হলো স্ক্রিনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল তার রুমমেট ও পার্টনার নাবিল-এর মুখাবয়ব। নাবিল ল্যাবের দরজায় দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "কিরে আরিয়ান, তুই এখনো কোডিং করছিস? বাইরে যে টাইম-ফ্লাক্স শুরু হয়ে গেছে, শহরের সেন্ট্রাল সিস্টেমের ঘড়িগুলো পেছনের দিকে ঘুরছে! খবর দেখেছিস?"
আরিয়ান কফি কাপে চুমুক দিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল, "সময় পেছনের দিকে ঘুরবে না তো কি সামনে এগোবে, নাবিল? মহাবিশ্ব তো আসলে একটা বিশাল কোড। কেউ একজন এই কোডের সোর্স ফাইলটা হ্যাক করে টাইম-লুপ তৈরি করে দিয়েছে। আজ সকালে আমার ক্রিপ্টো ওয়ালেটে যে ট্রানজেকশনটা হয়েছে, সেটা আগামী সপ্তাহের ডেট স্ট্যাম্প নিয়ে এসেছে!"
নাবিল কপালে হাত দিয়ে বলল, "তোর এই ফালতু সায়েন্স-ফিকশন মার্কা লজিক শোনার সময় এটা না! আমাদের নিচের ফ্লোরের ল্যান্ডলর্ড মাজেদ সাহেব এসে হুমকি দিয়ে গেছেন—আজ রাতের মধ্যে আমাদের কোয়ান্টাম রুমের ভাড়া না দিলে তিনি আমাদের এআই ব্রেন-চিপ ডিসকানেক্ট করে দেবেন! আমরা কি কোডিং খেয়ে বাঁচব?"
ঠিক এই সময় ল্যাবরেটরির ভারী ইস্পাতের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন পাড়ার চিরকুমার বিজ্ঞানী ও শখের মহাকাশ গবেষক জুবায়ের ভাই। জুবায়ের ভাইয়ের পরনে একটা ন্যানো-টেক ল্যাব কোট, চুলগুলো সবসময়ই ইলেকট্রিক শক খাওয়া পাখির মতো উসকোখুসকো। তিনি এসেই হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, "আরিয়ান! সর্বনাশ হয়ে গেছে ভাই!"
অধ্যায় এক: কোয়ান্টাম ডেসটিনি ও ত্রিমাত্রিক ধাঁধা
আরিয়ান স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল, "এবার কী হলো, জুবায়ের ভাই? আপনার তৈরি করা সেই টাইম-ট্রাভেল রকেট কি গাবতলীর বাস টার্মিনালের মোড়ে গিয়ে জ্যামে আটকে গেছে?"
জুবায়ের ভাই হাত নেড়ে উত্তেজিত গলায় বললেন, "আরে না! আমি যে কোয়ান্টাম এআই প্রজেক্টটা বানিয়েছিলাম—‘নিউরন নেটওয়ার্ক লিমিটেড’—সেটার ইনভেস্টররা আজ আমার ল্যাবরেটরিতে কোয়ান্টাম সিলগালা করে দিয়েছে। এখন আমার গার্লফ্রেন্ড ফারিন আমাকে মেসেজ পাঠিয়ে বলেছে সে কোনো বেকার টাইম-ট্রাভেলারকে বিয়ে করবে না। সে নাকি মার্স কলোনির এক উচ্চপদস্থ ডিপার্টমেন্টাল হেডের সাথে এনগেজমেন্ট ঠিক করেছে, যার নাকি গ্যালাক্সির প্রাইভেট হাইওয়েতে তিনটে এয়ার-কার পার্কিং স্টেশন আছে!"
আরিয়ান একটা স্মাইল দিয়ে বলল, "মার্স কলোনির এয়ার-কার স্টেশন তো অনেক দূর, জুবায়ের ভাই। আপনি বরং একটা কাজ করুন—ফারিনকে একটা কোয়ান্টাম মেইল পাঠান যে, মঙ্গল গ্রহের কাঁচের জানালার চেয়ে ঢাকার রিকশার হুডের নিচের বাতাস অনেক বেশি রোমান্টিক। সেখানে অন্তত কৃত্রিম অক্সিজেনের মিটার রিডিং নিয়ে টেনশন করতে হয় না!"
জুবায়ের ভাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে একটা পুরনো প্লাস্টিকের ডিস্ক বের করলেন। ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা এআই প্রজেক্টের মেইনফ্রেম থেকে একটা মৃদু অ্যালার্ম বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত বৈজ্ঞানিক সমীকরণ—যা প্রমাণ করছে যে, বর্তমান মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনা কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়, বরং এটি শতবর্ষ আগে কোঁদাল দিয়ে কাটা কোনো মহাজাগতিক অ্যালগরিদমের হুবহু পুনর্লিখন।
অধ্যায় দুই: মহাকালের সমীকরণ এবং ভবিষ্যতের চাবিকাঠি
নাবিল ল্যাবের জানালায় গিয়ে বাইরে তাকাল। ঢাকার আকাশটা আজ আর স্বাভাবিক নেই—কৃত্রিম মেঘের ফাঁক দিয়ে ভিনগ্রহের উপগ্রহগুলোর সিগন্যাল ঝিকমিক করছে। সে নিচু গলায় বলল, "তাহলে কি আমাদের এই ছুটে চলা, এই কোডিং করা, এই ভালোবাসা আর হতাশা—সবকিছুই আগে থেকেই কোনো সেন্ট্রাল সুপার-কম্পিউটারে কোড করা?"
আরিয়ান ল্যাপটপ ক্লোজ করে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার চোখে এক অদ্ভুত দীপ্তি। সে জুবায়ের ভাই ও নাবিলের দিকে তাকিয়ে বলল, "কোড আগে থেকেই লেখা থাক বা না থাক, আমাদের কাছে একটা সুবিধা সবসময়ই থাকে—সেটি হলো ডিবাগিং করার ক্ষমতা। যদি বর্তমানের পথটা ডেড-লকের দিকে যায়, তবে আমাদেরই নিজের হাতে নতুন লজিক গেট তৈরি করে কোড রিরাইট করতে হবে।"
বাইরে তখন টাইম-ফ্লাক্সের নীল আলো পুরো ঢাকাকে ঢেকে দিয়েছে। মেগাসিটির ট্রাফিক আর কোয়ান্টাম অসীমতার মাঝে দাঁড়িয়ে মনে হলো—জীবন যতই একটা প্রি-প্রোগ্রাম্ড গোলকধাঁধা হোক না কেন, তার ভেতরের প্রতিটা মোড় নিজের মতো করে ডিজাইন করার আনন্দটাই আলাদা।