একটি বাসাবাড়ির প্রেম

November 7, 2026

7 views

ঢাকা শহরের মানচিত্রে ব্যাচেলরদের জীবন এক চলমান ট্র্যাজেডি। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পাস করার পর একটা চাকরি বা ফ্রিল্যান্সিং করে টিকে থাকা ছেলে বা মেয়েটির জন্য একটা স্বাধীন ফ্ল্যাট বা বাসা ভাড়া নেওয়া মানে যেন খোদ এভারেস্ট জয় করা। বাড়ির মালিকদের একটাই চিরন্তন ডায়লগ—"ব্যাচেলরদের কাছে বাসা ভাড়া দিলে পুলিশে ধরে, না হয় বাসা নষ্ট হয়ে যায়!"

ঘটনাটা শুরু হয়েছিল ধানমন্ডির একটা গলিতে। একটি তিন রুমের ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে অয়ন আর প্রমি দুজনেই দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল। বাড়িওয়ালা কড়া গলায় বলে দিয়েছেন, "অবিবাহিত ছেলে বা মেয়েদের এখানে কোনো জায়গা হবে না। আমরা ফ্যামিলি বিল্ডিং চালাই!"

অয়ন তখন পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছতে মুছতে প্রমির দিকে তাকাল। প্রমিও ঠিক একই রকম হতাশ চোখে দাঁড়িয়ে আছে। দুজনেই অনলাইন গ্রুপে পোস্ট দেখে আলাদাভাবে বাসা দেখতে এসেছিল। সিড়ির কোণে দুজনের দেখা হতেই এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হলো।

প্রমি বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করে বলল, "কী মুশকিল বলুন তো! ঢাকা শহরে কি একা একটা মেয়ে বা ছেলের মাথা গোঁজার কোনো অধিকার নেই?"

অয়ন একটা বাঁকা হাসি দিয়ে পকেটে হাত গুঁজে বলল, "অধিকার আছে, তবে তার জন্য একটা রিং আর একটা ভুয়া কাবিননামার দরকার পড়ে। আচ্ছা মিস... মানে প্রমি, আপনি কি খুব বিপদে আছেন?"

প্রমি চোখ ছোট করে তাকাল, "কেন জিজ্ঞেস করছেন?"

অয়ন ইশারায় বাড়িওয়ালার ফ্ল্যাটের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "বলছিলাম কি, বাড়িওয়ালার তো শুধু একটা ‘ফ্যামিলি স্ট্যাটাস’ চাই। আমরা দুজনেই যদি নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিই, আর এই তিন রুমের ফ্ল্যাটটা অর্ধেক অর্ধেক ভাড়ায় ভাগ করে নিই—তাহলে কেমন হয়? আপনার প্রাইভেসি আপনার কাছে, আমার স্বাধীনতা আমার কাছে।"

প্রমি প্রথমে চমকে উঠেছিল। কিন্তু গত দুই সপ্তাহ ধরে দুই ডজন বাড়িওয়ালার জুতো ক্ষয়ে যে অভিজ্ঞতা তার হয়েছে, তাতে এই পাগলামি প্রস্তাবটাই একমাত্র খড়কুটো মনে হলো। সে একটু ভেবে বলল, "শর্ত একটাই—বাসার ভেতর কোনো নাক গলানো চলবে না। আপনি আপনার রুমে থাকবেন, আমি আমার রুমে। কিচেন আর ড্রয়িংরুম শিয়ারিং হবে, নো ইন্টারফেয়ারেন্স!"

এভাবেই নিউমার্কেট থেকে কুড়ি টাকায় একটা কৃত্রিম আংটি কিনে দুজনে নিজেদের ‘নবদম্পতি’ বানিয়ে ফেলল। বাড়িওয়ালা মজিদ সাহেব খুব খুশি হয়ে চাবিটা তাদের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, "সংসার জীবন ভালোমতো চালান বাবা, ঝগড়াঝাঁটি যেন না শুনি!"

অধ্যায় এক: স্বাধীনতার চুক্তি ও প্রথম ঝামেলা

বাসায় ওঠার প্রথম সপ্তাহটা বেশ ভালোই কাটল। ড্রয়িংরুমে একটা টেপ দিয়ে মাঝ বরাবর দাগ টেনে দেওয়া হলো—এটা অয়নের এলাকা, ওটা প্রমির।

কিন্তু ঝামেলা বাঁধল রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে। একদিন সকালে প্রমি কিচেনে গিয়ে দেখল সিলিন্ডার খালি। সে রাগে গজগজ করতে করতে অয়নের ঘরের দরজায় টোকা দিল।

দরজা খুলতেই অয়ন ঘুমের চোখে চুল এলোমেলো করে দাঁড়াল। প্রমি তেড়েফুড়ে বলে উঠল, "আপনার এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কোনো মানে হয় না! সিলিন্ডার আনার কথা ছিল আপনার, আর এখন গ্যাস শেষ!"

অয়ন হাই তুলতে তুলতে বলল, "আরে প্রমি সাহেবা, সকাল সকাল এত চড়া গলায় কথা বলছেন কেন? সিলিন্ডার তো গতকালই শেষ হওয়ার কথা ছিল, আমি তো ভেবেছিলাম আপনি আপনার কন্ট্রিবিউশনের অংশটা দেবেন। তা ছাড়া, চুক্তি অনুযায়ী কিচেনের লজিস্টিকস তো ফিফটি-ফিফটি!"

প্রমি মুখ গোঁজা করে বলল, "আমার কাছে খুচরা টাকা ছিল না বলে দিতে পারিনি। নিন, এই নাও টাকা, এখনি গ্যাস ম্যানকে ফোন করুন।"

অয়ন মুচকি হেসে বলল, "টাকা লাগবে না। আপনি বরং এক কাপ কড়া চা বানিয়ে দিন, আমি নিজে গিয়ে সিলিন্ডার কাঁধে করে নিয়ে আসছি।"

এভাবেই ছোটখাটো ঝগড়া, বিল দেওয়া নিয়ে কান্নাকাটি আর নিত্যদিনের খুনসুটিতে কেটে গেল প্রথম কয়েক মাস। প্রমি ফ্রিল্যান্সিংয়ে কন্টেন্ট রাইটিং আর গ্রাফিক্সের কাজ করে গভীর রাত পর্যন্ত জাগে, আর অয়ন স্টক মার্কেট ও ক্রিপ্টো এনালাইসিস নিয়ে ল্যাপটপে ডুবে থাকে। দুজনেরই অদ্ভুত এক রুটিন—কেউ কাউকে বিরক্ত করে না, অথচ ছাদের নিচে আরেকটা মানুষের উপস্থিতি অদ্ভুত এক নিরাপত্তার চাদর তৈরি করে।

অধ্যায় দুই: পাড়ার কাকিমা ও বিপদের মেঘ

ঝামেলা আসল যখন পাড়ার কাকিমারা উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করলেন। একদিন বিকেলে প্রমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছিল, ঠিক তখনই নিচ থেকে পাশের ফ্ল্যাটের মাজেদা খালা হাঁক দিলেন, "বউমা! শুনছেন? আপনাদের পাশের বাসার ভাবি বলছিল, আপনাদের নাকি কোনো রেজিস্ট্রি কাবিনপত্র এলাকার মোড়ের মুদির দোকানে নাকি পড়ে থাকতে দেখা গেছে! ব্যাপার কী?"

প্রমির তো হার্টবিট থেমে যাওয়ার উপক্রম! ঠিক সেই মুহূর্তে অয়ন পেছন থেকে এসে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে প্রমির কাঁধে একটা হাত রাখল (যা তাদের ভুয়া নাটকের অংশ ছাড়া কিছু ছিল না)। অয়ন মিষ্টি হেসে বলল, "আরে খালা আম্মা! কাবিনপত্র তো আমাদের লকারেই সেফ আছে। আসলে আমরা তো কোর্ট ম্যারেজ করেছি তো, তাই একটু গোপনীয়তা বজায় রাখি। আপনি চা খেতে একদিন ওপরে আসবেন আসুন না!"

মাজেদা খালা একটু ভড়কে গিয়ে বললেন, "ও আচ্ছা... তা ভালো, সাবধানে থেকো বাবা।"

খালা চলে যাওয়ার পর প্রমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে অয়নের দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনার এই ওভার-অ্যাক্টিংয়ের চক্করে একদিন হার্ট অ্যাটাক করে মরব আমি! কাঁধে হাত দেওয়ার কি দরকার ছিল?"

অয়ন সোফায় রিল্যাক্স ভঙ্গিতে বসে বলল, "নাটক যখন করছি, তখন অস্কার লেভেলের পারফরম্যান্স তো দিতেই হবে, মিস প্রমি! নইলে ওই মাজেদা খালা এক ঘণ্টার মধ্যে পুরো এলাকা ঢোল পিটিয়ে জানিয়ে দিত আমরা ভুয়া কাপল।"

প্রমি চোখ রাঙিয়ে বলল, "বেশি চালাকি করবেন না বলছি!" কিন্তু বলতে বলতেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি লুকিয়ে ছিল, যা অয়নের নজর এড়ায়নি।

অধ্যায় শেষ: পরিণয় থেকে পরিণতি

ধীরে ধীরে সেই সীমানা রেখাগুলো মুছে যেতে শুরু করল। কখন যেন ড্রয়িংরুমের মাঝের ওই টেপটা ছিঁড়ে পড়ে গেছে, কেউ খেয়ালই করেনি।

একদিন রাতে হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। ঢাকায় কালবৈশাখীর ঝড় মানেই বিদ্যুতের লুকোচুরি। হুট করে বাসাটার কারেন্ট চলে গেল। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার।

প্রমি একটু ভয় পায় অন্ধকারে। সে তার রুম থেকে বের হয়ে হাতড়ে হাতড়ে ড্রয়িংরুমে আসতেই কারো শরীরের সাথে ধাক্কা খেল। আঁতকে উঠে সে বলল, "কে?"

অয়নের শান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "ভয় পাবেন না, আমি। মোমবাতি খুঁজছি।"

হঠাৎ জানালার কাচ ভেদ করে এক ঝলক তীব্র বিদ্যুৎ চমকে উঠল। সেই ক্ষণিকের আলোয় প্রমি দেখল অয়ন তার খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরের ঝড়ের শব্দ আর জানালার কাচে বৃষ্টির আছড়ে পড়ার আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।

অয়ন মোমবাতিটা জ্বালল। মোমের নরম হলুদ আলোয় দুজনের মুখ আলোকিত হলো। অয়ন প্রমির চোখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, "প্রমি, একটা কথা বলব?"

প্রমি গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে ফিসফিস করে বলল, "কী কথা?"

অয়ন পকেট থেকে সেই পুরনো, সস্তা প্লাস্টিকের আংটিটা বের করল—যেটা তারা সেদিন নিউমার্কেট থেকে ভুয়া নাটক করার জন্য কিনেছিল। সে আংটিটা প্রমির হাতের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "নাটক তো অনেক হলো। আর কতকাল এই ভুয়া পরিচয়ের আড়ালে থাকা যায় বলুন তো? রিয়েল লাইফে কি এই ভুয়া সম্পর্কটাকে পাকাপাকিভাবে সিলমোহর দেওয়া যায় না?"

প্রমির চোখ দুটো ভেজা। সে বাইরে অবিরাম বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তারপর নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে অয়নের আঙুলে আঙুল মিলিয়ে বলল, "ভুয়া পরিচয়ের শুরুটা ফাইজলামি দিয়ে হলেও, শেষটা কিন্তু বেশ রোমান্টিক হলো, মিস্টার অয়ন!"

ছয় মাস পর সেই বাড়িওয়ালা মজিদ সাহেবকে আর অভিনয় করে বোঝাতে হয়নি। এবার সত্যি সত্যিই মিষ্টির প্যাকেট হাতে নিয়ে মজিদ সাহেব তাদের দরজায় কড়া নেড়েছিলেন। ঢাকার ইট-পাথরের খাঁচায় হারিয়ে যাওয়া হাজারো ব্যাচেলরের ভিড়ে অয়ন আর প্রমি তাদের ভুয়া ঠিকানাকে চিরদিনের মতো নিজেদের আসল ঠিকানা বানিয়ে নিল।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login