পুরান ঢাকার রাত অন্যরকম। দিনের ব্যস্ততা, মানুষের ভিড়, রিকশার ঘণ্টা, গাড়ির শব্দ আর দোকানের আলো যখন ধীরে ধীরে নিভে আসে, তখন শহরটির পুরোনো গলিগুলো যেন নিজেদের আসল চেহারা ফিরে পায়। কোথাও অন্ধকার বারান্দায় ঝুলে থাকে বহু বছরের পুরোনো বাতি, কোথাও ভাঙা দেয়ালের গায়ে জমে থাকে স্যাঁতসেঁতে শ্যাওলা, আবার কোথাও কোনো অচেনা জানালা হঠাৎ খুলে গিয়ে নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে পথের দিকে। দিনের আলোয় যে জায়গাগুলোকে স্বাভাবিক মনে হয়, রাত গভীর হলে সেগুলোর মধ্যেই যেন লুকিয়ে থাকে অন্য এক পৃথিবী। সেই পৃথিবীর দরজা সবার জন্য খোলে না। যারা ভুল করে সেই দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, তারা হয়তো আর আগের মানুষ হয়ে ফিরে আসে না।
পুরান ঢাকার বুকের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে লালবাগ কেল্লা। শত শত বছরের ইতিহাস, রাজনীতি, ক্ষমতার উত্থান-পতন, অসমাপ্ত নির্মাণ, মৃত্যু, রহস্য আর অসংখ্য মানুষের পদচিহ্ন যেন এর দেয়ালের সঙ্গে মিশে আছে। দিনের বেলায় এখানে মানুষ আসে ইতিহাস দেখতে, স্থাপত্য দেখতে, ছবি তুলতে। কেউ পরিবারের সঙ্গে আসে, কেউ বন্ধুবান্ধব নিয়ে, কেউ আসে নিছক কৌতূহল থেকে। তারা ঘুরে বেড়ায়, হাসে, কথা বলে, ছবি তোলে, তারপর বিকেল নামার আগেই ফিরে যায়। কিন্তু ইতিহাসের কিছু জায়গা আছে, যাদের গল্প দিনের আলোয় শেষ হয় না। লালবাগ কেল্লাও হয়তো তেমনই একটি জায়গা।
কেল্লার পুরোনো দেয়ালগুলোকে যদি কথা বলানো যেত, তাহলে হয়তো তারা এমন কিছু গল্প বলত, যেগুলো কোনো ইতিহাসের বইয়ে লেখা নেই। তারা বলত এমন মানুষের কথা, যারা এসেছিল কিন্তু ফিরে যায়নি। বলত এমন কিছু রাতের কথা, যেসব রাতের কোনো সকাল ছিল না। বলত এমন কিছু দরজার কথা, যেগুলো দিনের বেলায় দেখা যায় না, কিন্তু গভীর রাতে হঠাৎ দেয়ালের কোথাও খুলে যায়। আর হয়তো সবচেয়ে ভয়ংকর যে কথাটি তারা বলত, তা হলো—কিছু মানুষ মারা যাওয়ার পরও তাদের অপেক্ষা শেষ হয় না।
এই গল্পটি সেই অপেক্ষার গল্প।
তবে পাঠককে শুরুতেই একটি কথা জানিয়ে রাখা প্রয়োজন। এই বইয়ের চরিত্র, ঘটনা, রহস্য, অতিপ্রাকৃত উপস্থিতি এবং ভয়ংকর ঘটনাগুলোর বড় অংশই লেখকের কল্পনা। ইতিহাসের সঙ্গে গল্পের যেখানে মিল রয়েছে, সেখানে সেই মিলকে কাহিনির আবহ তৈরির অংশ হিসেবে দেখা উচিত। কারণ ইতিহাস আমাদের অতীতের কথা বলে, কিন্তু কল্পনা কখনো কখনো সেই অতীতের অন্ধকার জায়গাগুলোতে আলো নিয়ে যাওয়ার বদলে আরও গভীর অন্ধকার তৈরি করে।
গল্পের শুরু একটি পুরোনো নথি দিয়ে।
নথিটি দেখতে সাধারণ। হলদে হয়ে যাওয়া কয়েকটি কাগজ, প্রান্তে পোকার খাওয়া দাগ, মাঝেমধ্যে কালির ছোপ এবং অস্পষ্ট কিছু হাতের লেখা। কাগজগুলো এত পুরোনো যে স্পর্শ করলেই মনে হয় ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে। কিন্তু সেই নথির শেষ পাতায় লেখা কয়েকটি বাক্যই পরবর্তীতে এক তরুণ গবেষকের জীবনকে এমন এক পথে নিয়ে যাবে, যেখান থেকে ফিরে আসার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
শেষ পাতায় লেখা ছিল—
“যে রাতে শেষ প্রহরের ঘণ্টা বাজবে, তখন কেল্লার উত্তর দিকের দেয়ালের কাছে যেও না। সেখানে যে দরজা আছে, সেটি দিনের আলোয় থাকে না। যদি দরজাটি দেখতে পাও, তবে বুঝবে—তোমার আগে কেউ সেখানে পৌঁছেছে।”
তার নিচে আরও একটি বাক্য ছিল।
“আর যদি দরজার ওপাশ থেকে তোমার নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে পাও, কোনোভাবেই উত্তর দিও না।”
এই কথাগুলো প্রথমবার পড়ার সময় কেউ হয়তো হাসবে। কেউ বলবে, পুরোনো দিনের কুসংস্কার। কেউ বলবে, কোনো পাগলের লেখা। কিন্তু সেই তরুণ গবেষক হাসেনি। কারণ নথিটির শেষ লাইনের নিচে যে স্বাক্ষরটি ছিল, সেটি তার কাছে অপরিচিত হলেও তারিখটি ছিল আশ্চর্যজনকভাবে স্পষ্ট।
আর সেই তারিখের সঙ্গে যুক্ত ছিল তার নিজের পরিবারের একটি পুরোনো ঘটনা।
একটি ঘটনা, যার কথা তার দাদু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাউকে বলতে চাননি।
একটি ঘটনা, যার পর তার পরিবারের একজন মানুষ হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল।
একজন মানুষ, যার কোনো মৃতদেহ পাওয়া যায়নি।
কোনো কবরও ছিল না।
কোনো শেষ বিদায়ও হয়নি।
শুধু তার ঘরের টেবিলের ওপর পাওয়া গিয়েছিল একটি পুরোনো চাবি।
চাবিটির সঙ্গে একটি ছোট কাগজে লেখা ছিল মাত্র তিনটি শব্দ—
“দরজা খুলবে না।”
বহু বছর পর সেই একই ধরনের একটি চাবি আবার পাওয়া যাবে লালবাগ কেল্লার একটি পরিত্যক্ত অংশে।
সেদিন রাতেই প্রথমবার ঘড়ির কাঁটা থেমে যাবে ৩টা ১৭ মিনিটে।
সেদিন রাতেই কেল্লার দীর্ঘ করিডোরে শোনা যাবে ধীর পায়ের শব্দ।
একটি পা।
তারপর আরেকটি।
তারপর আবার।
যেন কেউ অন্ধকারের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হবে—পায়ের শব্দটি কখনো কাছে আসবে না।
শুধু একই দূরত্বে থেকে যাবে।
যতক্ষণ না কেউ পিছন ফিরে তাকায়।
আর যে মানুষটি পিছন ফিরে তাকাবে, সে দেখতে পাবে একজন নারীকে।
সাদা পোশাক।
ভেজা চুল।
মুখ দেখা যাবে না।
শুধু তার হাতের মুঠোয় থাকবে একটি পুরোনো লোহার চাবি।
নারীটি কোনো কথা বলবে না।
শুধু হাত তুলে কেল্লার একটি বন্ধ দেয়ালের দিকে দেখাবে।
তারপর খুব ধীরে মাথা নিচু করবে।
আর দেয়ালের ভেতর থেকে শোনা যাবে তিনবার শব্দ।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
যেন কেউ ভেতর থেকে দরজায় আঘাত করছে।
সেই মুহূর্তে হয়তো পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগবে—দেয়ালের ভেতরে কে আছে?
কেন সে বের হতে পারছে না?
কেন সেই নারী প্রতি রাতে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে?
আর কেন সে অপেক্ষা করে এমন একজন মানুষের জন্য, যে এখনো জানেই না যে তাকে অপেক্ষা করে কেউ?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়।
কারণ লালবাগ কেল্লার এই গল্প শুধু ভূতের গল্প নয়।
এটি একটি অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির গল্প।
একটি ভুলে যাওয়া অপরাধের গল্প।
একজন মৃত মানুষের অপেক্ষার গল্প।
এবং সবচেয়ে বেশি—একটি দরজার গল্প।
এমন একটি দরজা, যেটি একবার খুললে মানুষ শুধু একটি ঘরে প্রবেশ করে না।
সে প্রবেশ করে এমন এক সময়ে, যেখানে অতীত এখনো শেষ হয়নি।
যেখানে মৃতেরা এখনো কথা বলে।
যেখানে স্মৃতি কখনো কখনো বাস্তবের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
আর যেখানে একজন মানুষ নিজের ছায়ার কাছ থেকেও পালাতে পারে না।
গল্পের শুরু হবে এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়।
আকাশ তখন কালো মেঘে ঢাকা। পুরান ঢাকার সরু রাস্তার ওপর বৃষ্টির পানি জমে আছে। দূরে কোথাও আজানের ধ্বনি মিলিয়ে যাচ্ছে গাড়ির হর্নের সঙ্গে। দোকানিরা একে একে শাটার নামাচ্ছে। রাস্তায় মানুষের সংখ্যা কমে এসেছে।
আর লালবাগ কেল্লার বিশাল দেয়ালের ওপারে তখন ধীরে ধীরে নামছে সন্ধ্যা।
সেই সন্ধ্যায় একজন তরুণ কেল্লার সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে।
তার হাতে থাকবে একটি পুরোনো চামড়ার ব্যাগ।
ব্যাগের ভেতরে থাকবে কিছু বই, একটি নোটবুক, একটি রেকর্ডার, একটি টর্চ এবং সেই হলদে হয়ে যাওয়া নথি।
সে জানবে না, তার হাতে ধরা কাগজগুলো আসলে তাকে একটি গল্পের কাছে নিয়ে যাচ্ছে না।
তারা তাকে নিয়ে যাচ্ছে এমন একটি সত্যের কাছে, যেটিকে বহু বছর ধরে মাটির নিচে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল।
সে জানবে না, সেই রাতের পর তার নিজের জীবনের সময়ও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে।
এক ভাগ—দরজা খোলার আগে।
আর অন্য ভাগ—
দরজা খোলার পরে।
আর লালবাগ কেল্লার সেই রাতের গল্প শুরু হওয়ার ঠিক আগে, কেল্লার অন্ধকার কোনো এক কোণে বহু বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকা কেউ একজন হয়তো প্রথমবারের মতো চোখ খুলবে।
কারণ সে বুঝতে পেরেছে—
যে মানুষটির জন্য সে অপেক্ষা করছিল, সে অবশেষে এসে গেছে।
এবং এবার দরজা খুলবেই।