আরিয়ান অনেকক্ষণ মেঝেতে বসে রইল। তার বুকের ভেতর যে শব্দটি সে শুনেছিল, সেটি যেন এখনও থামেনি। বাইরে ভোরের আলো ধীরে ধীরে বাড়ছিল, কিন্তু ঘরের ভেতর অদ্ভুত এক অন্ধকার জমে ছিল। জানালা দিয়ে আলো ঢুকছে, অথচ সেই আলো ঘরের মাঝখানে এসে যেন থেমে যাচ্ছে। মতিউর চাচা তার পাশে বসে ছিলেন, কিন্তু বৃদ্ধের মুখে কোনো কথা নেই। তাঁর চোখ বারবার আরিয়ানের বুকের দিকে চলে যাচ্ছিল। আরিয়ান নিজের বুকের ওপর হাত রাখল। হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক। কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর আবার সেই শব্দ শোনা গেল—ঠক... ঠক... ঠক। এবার শব্দটি এত স্পষ্ট যে মতিউর চাচাও শুনলেন। তিনি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে তাকালেন। আরিয়ান ফিসফিস করে বলল, “শব্দটা আমার ভেতর থেকে আসছে।” মতিউর চাচা মাথা নাড়লেন। “না।” “তাহলে?” “আপনার ভেতর থেকে নয়।” বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন, “আপনার ভেতরের কোনো জায়গা থেকে।” আরিয়ান বুঝতে পারল না। “এ দুটির মধ্যে পার্থক্য কী?” মতিউর চাচা উত্তর দিলেন না। তিনি শুধু বললেন, “চলুন। এই ঘরে আর থাকা যাবে না।” “কোথায় যাব?” “যেখানে আপনার দাদা শেষবার গিয়েছিলেন।” “দক্ষিণের পুরোনো কক্ষে?” বৃদ্ধ বললেন, “হ্যাঁ। সেখানে হয়তো উত্তর আছে।” আরিয়ান উঠে দাঁড়াল। কিন্তু দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তার পায়ের নিচে কিছু একটা শক্ত জিনিসে চাপ পড়ল। নিচে তাকিয়ে সে দেখল একটি ছোট ধাতব বাক্স। বাক্সটি এত পুরোনো যে তার গায়ে মরিচা জমে আছে। অথচ সে নিশ্চিত, কয়েক মিনিট আগেও বাক্সটি সেখানে ছিল না।
মতিউর চাচা বাক্সটি দেখে স্থির হয়ে গেলেন। “এটা এখানে কীভাবে এল?” আরিয়ান নিচু হয়ে বাক্সটি তুলল। তালা নেই। ঢাকনা নিজে থেকেই খুলে গেল। ভেতরে একটি পুরোনো কাপড়, একটি কালো পাথরের টুকরো এবং একটি ছোট কাগজ। কাগজটি ভাঁজ করা। আরিয়ান খুলতেই দেখল তার দাদার হাতের লেখা। লেখা মাত্র একটি বাক্য—“রক্তের দাগ যেখানে শুকিয়ে যায়, স্মৃতি সেখানে শুকায় না।” আরিয়ানের বুক কেঁপে উঠল। নিচে একটি তারিখ—১২ জুলাই ১৯৮৭। আর তার নিচে একটি নাম—“সালেহ।” মতিউর চাচা কাগজটি দেখে চোখ বন্ধ করলেন। “আমি জানতাম এই দিনটা আসবে।” আরিয়ান বলল, “আপনি সালেহকে দেখেছিলেন।” বৃদ্ধ এবার আর অস্বীকার করলেন না। “হ্যাঁ।” “কীভাবে?” “সেই রাতে আমি তাকে দরজার কাছে দেখেছিলাম। কিন্তু তার আগেও তাকে দেখেছিলাম।” “কোথায়?” “দক্ষিণের কক্ষে।” “কী করছিল?” “দেয়ালের রক্ত পরিষ্কার করছিল।” আরিয়ান থমকে গেল। “রক্ত?” “হ্যাঁ। তখনও দেয়ালে রক্ত ছিল।” “কার?” বৃদ্ধ বললেন, “সেটা আমরা কেউ জানতাম না।” “কিন্তু আপনি বলেছিলেন সালেহ নিখোঁজ হয়েছিল।” “হয়েছিল।” “তাহলে সে রক্ত পরিষ্কার করছিল কেন?” মতিউর চাচা ধীরে বললেন, “কারণ রক্তটি তার নিজের ছিল না।”
দুজন দক্ষিণের পুরোনো অংশের দিকে এগিয়ে গেল। ভোর হয়ে গেছে, কিন্তু কেল্লার সেই অংশে আলো যেন অন্য জায়গার তুলনায় কম। পথের পুরোনো দেয়ালগুলো স্যাঁতসেঁতে। কোথাও কোথাও গাছের শেকড় পাথরের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। আরিয়ান হাঁটতে হাঁটতে অনুভব করছিল, যেন কেউ তাদের পেছন থেকে অনুসরণ করছে। সে একবার পিছনে তাকাল। করিডোর ফাঁকা। দ্বিতীয়বার তাকালেও কেউ নেই। কিন্তু তৃতীয়বার তাকানোর সময় সে দেখল করিডোরের শেষ মাথায় সাদা পোশাকের একজন নারী দাঁড়িয়ে আছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না। চুল সামনে ঝুলে আছে। আরিয়ান থেমে গেল। মতিউর চাচা তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী হলো?” আরিয়ান আঙুল তুলে দেখাল। কিন্তু করিডোরের শেষ প্রান্ত তখন খালি। নারীটি নেই। মেঝেতে শুধু কয়েকটি ভেজা পায়ের ছাপ। পায়ের ছাপগুলো তাদের সামনে নয়, বরং তাদের পেছনে। আরিয়ান ধীরে বলল, “সে আমাদের সঙ্গে এসেছে।” মতিউর চাচা কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু দ্রুত হাঁটতে শুরু করলেন।
দক্ষিণের পুরোনো কক্ষটির দরজা বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলো। কাঠের দরজা, লোহার পুরোনো কপাট। কিন্তু দরজার মাঝখানে ছোট একটি খোদাই—৩১৭। আরিয়ান আঙুল দিয়ে সংখ্যাটি স্পর্শ করতেই তার শরীরের ভেতর দিয়ে বরফের মতো ঠান্ডা কিছু বয়ে গেল। সে হাত সরিয়ে নিল। মতিউর চাচা বললেন, “এই দরজা আপনার দাদা কখনো খুলতে পারেননি।” “কেন?” “কারণ চাবি ছিল না।” আরিয়ান পকেট থেকে নিজের চাবিটি বের করল। “এখন আছে।” বৃদ্ধ তার দিকে তাকালেন। “ওটা ব্যবহার করবেন না।” “কেন?” “কারণ দরজাটা একবার খুললে আপনি হয়তো আর একই মানুষ থাকবেন না।” আরিয়ান মৃদু হাসল। “আমি কি এখনও একই মানুষ আছি?” বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিলেন না। আরিয়ান চাবিটি তালায় ঢোকাল। আশ্চর্যের বিষয়, তালা ছিল না। তবু চাবি ঢুকে গেল। সে ঘুরিয়ে দিল। দরজা খুলল না। বরং দরজার কাঠের ওপর লালচে একটি দাগ ফুটে উঠল। প্রথমে একটি বিন্দু। তারপর আরেকটি। তারপর কয়েকটি দাগ মিলিত হয়ে মানুষের হাতের ছাপ তৈরি করল। মতিউর চাচা পিছিয়ে গেলেন। “এটা আগেও হয়েছে।” “কখন?” “সেই রাতে।” “তারপর?” “তারপর সালেহ দরজার ওপর হাত রেখেছিল।” “তারপর দরজা খুলেছিল?” বৃদ্ধ বললেন, “না। দরজা তার হাতের ছাপ নিয়ে নিয়েছিল।”
আরিয়ান দরজার ওপর হাত রাখল না। কিন্তু তার হাত নিজে থেকেই উঠতে শুরু করল। সে থামাতে চাইল, পারল না। যেন তার হাতের পেশিগুলো অন্য কারও নির্দেশ মানছে। মতিউর চাচা তাকে ধরে ফেললেন। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার ভেতর থেকে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। তারপর খুব নিচু স্বরে কেউ বলল, “এত দেরি করলে কেন?” আরিয়ান কেঁপে উঠল। কণ্ঠটি তার দাদার। সে দরজার দিকে ঝুঁকে বলল, “দাদা?” ভেতর থেকে উত্তর এল, “আমি তোমার দাদা নই।” আরিয়ান পিছিয়ে গেল। মতিউর চাচা ফিসফিস করে বললেন, “শুনেছেন?” “হ্যাঁ।” “তাহলে বুঝেছেন।” “কী?” “এই ঘরে যে আছে, সে মানুষের কণ্ঠ ধার করে কথা বলে।”
দরজা হঠাৎ নিজে থেকেই খুলে গেল। ভেতরে কোনো মানুষ নেই। ছোট একটি ঘর। মাঝখানে কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপর ধুলো জমা একটি লণ্ঠন, কিছু পুরোনো কাগজ এবং একটি মোটা রেজিস্টার। দেয়ালের ডানদিকে একটি বড় বাদামি দাগ। দেখে মনে হয় বহু বছর আগে সেখানে রক্ত ছিটকে পড়েছিল। আরিয়ানের চোখ আটকে গেল সেই দাগে। দাগটি পুরোনো হলেও অদ্ভুতভাবে তাজা মনে হচ্ছে। সে কাছে গিয়ে তাকাল। রক্তের দাগটি আসলে কোনো এলোমেলো ছিটে নয়। কয়েকটি দাগ মিলিয়ে একটি শব্দ তৈরি করেছে। শব্দটি পড়তে তার কয়েক সেকেন্ড লাগল।
“ফিরে এসো।”
আরিয়ান পিছিয়ে এল। মতিউর চাচা বললেন, “এই কথাটাই সালেহ বলেছিল।” “কাকে?” “মেহরুকে।” “সে কি তাকে ভালোবাসত?” বৃদ্ধের চোখে অদ্ভুত বিষণ্ণতা ফুটে উঠল। “হয়তো।” “হয়তো?” “কিছু সম্পর্কের নাম দেওয়া যায় না। সালেহ মেহরুকে মুক্ত করতে চেয়েছিল। আপনার দাদা তাকে থামাতে চেয়েছিলেন।” “কেন?” “কারণ আপনার দাদা জানতেন, মেহরুকে মুক্ত করার অর্থ শুধু তাকে দরজা থেকে বের করে আনা নয়। তার সঙ্গে যে জিনিসটি বাঁধা আছে, সেটাকেও মুক্ত করা।” আরিয়ান বলল, “কী জিনিস?” বৃদ্ধ বললেন, “সময়।” “সময়?” “হ্যাঁ। মেহরু একা বন্দি ছিল না। তার সঙ্গে একটি অসমাপ্ত সময় আটকে ছিল।” আরিয়ান কিছু বলল না। হঠাৎ তার চোখ পড়ল রেজিস্টারের ওপর। রেজিস্টারটি খোলা। পাতার ওপর অনেক নাম। পুরোনো পাহারাদার, কর্মচারী, গবেষক, দর্শনার্থী। সে দ্রুত পাতা উল্টাতে লাগল। ১৯৮৭ সালের জুলাই মাসের একটি পাতায় এসে থেমে গেল। সেখানে তিনটি নাম থাকার কথা। কিন্তু দুটি নাম লেখা—একটি তার দাদার, অন্যটি মতিউর রহমান। তৃতীয় জায়গাটি খালি।
তার নিচে একটি মন্তব্য—“তৃতীয় ব্যক্তি প্রবেশ করেছে। পরিচয় নিশ্চিত নয়।” আরিয়ানের বুক ধক করে উঠল। সে বৃদ্ধের দিকে তাকাল। “এখানে আপনার নাম কেন?” মতিউর চাচা বললেন, “কারণ আমি সেদিন পাহারায় ছিলাম।” “আর সালেহর নাম নেই কেন?” “কারণ তার কোনো পরিচয় ছিল না।” “তাহলে আপনি জানলেন সে সালেহ?” বৃদ্ধ বললেন, “মেহরু তাকে ওই নামে ডাকত।” আরিয়ান আবার রেজিস্টারের দিকে তাকাল। পাতার একেবারে নিচে খুব হালকা কালি দিয়ে আরেকটি বাক্য লেখা—“তৃতীয় ব্যক্তি একা প্রবেশ করেনি।” আরিয়ান বলল, “তার সঙ্গে কে ছিল?” মতিউর চাচা চুপ। “বলুন।” বৃদ্ধ বললেন, “একটি শিশু।” আরিয়ানের বুকের ভেতর যেন কেউ মুষ্টি দিয়ে আঘাত করল। “কোন শিশু?” “আমি জানি না।” “আপনি দেখেছিলেন?” “হ্যাঁ।” “ছেলেটি কে?” বৃদ্ধ এবার তার দিকে তাকালেন। “আপনি।”
আরিয়ান কয়েক মুহূর্ত বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হেসে ফেলল। সেই হাসি আনন্দের নয়, অবিশ্বাসের। “আমি তখন শিশু ছিলাম?” “হ্যাঁ।” “কিন্তু ১৯৮৭ সালে আমি...” সে থেমে গেল। তার নিজের জন্মতারিখ মনে পড়ল। হিসাব মিলছে না। সে জন্মেছিল ১৯৯০ সালে। তার গলা শুকিয়ে গেল। “এটা অসম্ভব।” মতিউর চাচা বললেন, “আমি জানি।” “তাহলে?” “এই কারণেই আপনার দাদা কখনো আপনাকে সত্যিটা বলেননি।” আরিয়ান টেবিলের ওপর হাত রাখল। “আমি ১৯৯০ সালে জন্মেছি।” “মানুষের ক্যালেন্ডারে।” “মানে?” “এই কেল্লার সময়ের হিসাবে আপনি তারও আগে ছিলেন।” আরিয়ান কিছু বুঝতে পারল না। কিন্তু তার মাথার ভেতর আবার সেই শব্দ শুরু হলো।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
এইবার শব্দটি তার বুক থেকে নয়।
ঘরের দেয়ালের ভেতর থেকে।
দেয়ালের পুরোনো রক্তের দাগ কাঁপতে শুরু করল। দাগগুলো যেন তরল হয়ে নিচে নামছে। মেঝেতে পড়ে একটি রেখা তৈরি করল। রেখাটি ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোল। আরিয়ান ও মতিউর চাচা তাকিয়ে রইলেন। রক্তের রেখাটি দরজার সামনে গিয়ে থামল। তারপর সেখানে একটি হাতের ছাপ তৈরি হলো। সেই হাতের ছাপের আঙুল পাঁচটি নয়—ছয়টি।
মতিউর চাচা কাঁপা গলায় বললেন, “এটা মানুষের হাত নয়।”
আরিয়ান কিছু বলার আগেই ঘরের লণ্ঠন নিজে থেকেই জ্বলে উঠল। হলুদ আলোয় দেয়ালের এক পাশে একটি পুরোনো ছবি দেখা গেল। ছবিটি এত ধুলোয় ঢাকা ছিল যে আগে বোঝা যায়নি। আরিয়ান কাপড় দিয়ে ধুলো সরাল। ছবিতে চারজন মানুষ। তার দাদা। মেহরু। সালেহ। এবং একটি ছোট শিশু।
শিশুটির মুখ স্পষ্ট।
আরিয়ান ছবিটি হাত থেকে ফেলে দিল।
কারণ শিশুটির মুখ তার নিজের।
কিন্তু ছবির তারিখ লেখা—
১২ জুলাই ১৯৮৭।
মতিউর চাচা ছবিটির দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। “আপনার দাদা বলেছিলেন, যদি কখনো এই ছবিটি আপনি দেখতে পান, তবে আপনাকে একটা কথা বলতে হবে।”
আরিয়ান ধীরে বলল, “কী কথা?”
বৃদ্ধ উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের ভেতর থেকে আরেকটি কণ্ঠ ভেসে এল।
এবার কণ্ঠটি মেহরুর।
“তাকে বলো।”
মতিউর চাচা কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “কী?”
মেহরুর কণ্ঠ আরও কাছে এল।
“সালেহ হারিয়ে যায়নি।”
আরিয়ান নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
মেহরু বলল, “সালেহ ফিরে এসেছে।”
তারপর ঘরের দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।
আরিয়ানের হাতে থাকা ছবির শিশুটি যেন হঠাৎ চোখ খুলে তাকাল।
এবং ছবির ভেতর থেকে খুব ক্ষীণ একটি শব্দ শোনা গেল—
“আরিয়ান... আমাকে বের করো।”
সেই মুহূর্তে আরিয়ান বুঝল, যে মানুষটিকে এতদিন সে মৃত ভেবেছিল, সে হয়তো বাইরে ফিরে আসেনি।
বরং সে এখনও সেই ১৯৮৭ সালের ছবির ভেতরেই আটকে আছে।