আরিয়ান ফোনটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। কল কেটে যাওয়ার পরও তার কানে দাদার কণ্ঠ বাজছিল—“আমি মারা যাইনি। আমি শুধু ভুল সময়ে আটকে আছি।” কথাটার অর্থ বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে তার মাথা যেন আরও ভারী হয়ে উঠছিল। তার জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত সত্যগুলোর একটি ছিল তার দাদার মৃত্যু। সে নিজে দাফনে উপস্থিত ছিল, আত্মীয়স্বজন সবাই দেখেছিল, মৃত্যুসনদ ছিল, কবর ছিল। অথচ এখন একটি কণ্ঠ দাবি করছে, সেই মানুষটি মারা যায়নি। আর তার থেকেও ভয়ংকর ছিল শেষ কথাটি—“সে তোর দাদা নয়।” আরিয়ান নিজের শ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। কেল্লার করিডোরে ভোরের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল আলো যত বাড়ছে, অন্ধকার তত ঘন হচ্ছে। সে নিজের মনে বলল, “আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?” সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতর থেকে তিনটি শব্দ এল—ঠক, ঠক, ঠক। সে বুক চেপে ধরল। শব্দটি থামল না। বরং এবার তার সঙ্গে একটি ক্ষীণ কণ্ঠ মিশে গেল—“তুই দেরি করেছিস।” আরিয়ান চোখ বন্ধ করল। কণ্ঠটি তার নিজের। কিন্তু একই সঙ্গে মনে হলো বহু দূর থেকে কেউ তাকে ডাকছে। সে চারপাশে তাকাল। মতিউর চাচার কোনো চিহ্ন নেই। তাঁর লাঠি পড়ে আছে, কিন্তু মানুষটি নেই। কয়েক মিনিট আগেও বৃদ্ধ তার পাশে ছিলেন। এখন যেন তিনি কখনো ছিলেনই না।
আরিয়ান লাঠিটি হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে করিডোর ধরে এগোল। লাঠির মাথায় খোদাই করা দুটি তারিখ তার মাথায় ঘুরছিল—১২ জুলাই ১৯৮৭ এবং ৭ অক্টোবর ২০২৬। দুই তারিখের মধ্যে উনচল্লিশ বছর। এত দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানের সঙ্গে এই কেল্লার রহস্য কীভাবে যুক্ত? সে নিজের দাদার ডায়েরিটি বের করল। এতক্ষণে ডায়েরিটির ওজনও যেন বদলে গেছে। আগে এটি ছিল পুরোনো কাগজের একটি বই। এখন মনে হচ্ছে এর ভেতরে তার নিজের জীবনের কোনো অংশ আটকে আছে। সে প্রথম পাতা থেকে আবার পড়তে শুরু করল। অনেক পাতা সে আগেই পড়েছে, কিন্তু এবার শব্দগুলো যেন নতুন অর্থ নিয়ে সামনে আসতে লাগল। “প্রথম দরজা সময়ের স্মৃতি দেখায়। দ্বিতীয় দরজা স্মৃতিকে বর্তমানের মধ্যে ফিরিয়ে আনে। তৃতীয় দরজা মানুষকে তার নিজের সময়ের মুখোমুখি দাঁড় করায়।” এই কথাগুলো সে আগে পড়েছিল, কিন্তু তখন বুঝতে পারেনি। এবার বুঝল—তৃতীয় দরজা কোনো নির্দিষ্ট ঘরে নেই। সেটি তার নিজের ভেতরে। তার নিজের জন্ম, তার দাদা, সালেহ, মেহরু—সবকিছু যেন সেই দরজার অংশ। ডায়েরির পরের পাতায় লেখা ছিল, “যে শিশুকে আমি ১৯৮৭ সালের রাতে দেখেছিলাম, সে আমার নাতি ছিল না। কিন্তু সে আমার নাতির মুখ নিয়ে এসেছিল।” আরিয়ান পড়তে পড়তে থেমে গেল। “তাহলে আমি কে?” সে নিজের কাছেই প্রশ্ন করল। কোনো উত্তর এল না। শুধু দূরের কোনো দেয়াল থেকে মৃদু শব্দ—ঠক... ঠক... ঠক।
সে ডায়েরির পরের পাতা উল্টাল। একটি জায়গায় কালির দাগ এত ঘন যে মনে হয় লেখক ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু মুছে ফেলেছেন। কিন্তু কাগজের উল্টো পাশে চাপের দাগ ছিল। আরিয়ান পেন্সিল দিয়ে হালকা করে ঘষতেই নিচের লেখা ফুটে উঠল—“সত্যিটা লিখতে হলে আমাকে নিজের নাম মুছে ফেলতে হবে।” তার নিচে আরেকটি বাক্য—“যে মানুষটি আমার পাশে আছে, সে আমার ছদ্মবেশ।” আরিয়ান থমকে গেল। “ছদ্মবেশ?” তারপর আরেকটি লাইন—“আমি যদি ফিরে না আসি, তবে যে বৃদ্ধকে সবাই আমার নামে চিনবে, তাকে বিশ্বাস করো না।” আরিয়ানের বুক কেঁপে উঠল। তার দাদা কি জীবনের কোনো সময় নিজের পরিচয় বদলেছিলেন? নাকি কেউ তার জায়গা নিয়েছিল? হঠাৎ তার মনে পড়ল ছোটবেলার একটি ঘটনা। দাদার মুখ সে খুব ভালোভাবে মনে করতে পারে। কিন্তু তার দাদার ডান গালে একটি ছোট দাগ ছিল—এটা সে নিশ্চিতভাবে মনে করতে পারে। অথচ পুরোনো ছবিগুলোতে দাগটি নেই। কেন? সে ব্যাগ থেকে দাদার একটি পুরোনো ছবি বের করল। ছবিটি বহুদিনের। ছবিতে তরুণ দাদা দাঁড়িয়ে আছেন। ডান গাল সম্পূর্ণ পরিষ্কার। কিন্তু তার স্মৃতিতে দাগটি ছিল। আরেকটি ছবিতে দাগ আছে। ছবিটির পেছনে তারিখ—১৯৯১। অর্থাৎ ১৯৮৭ থেকে ১৯৯১-এর মধ্যে কোনো এক সময়ে তার দাদার মুখে সেই দাগ তৈরি হয়েছে। আরিয়ান ছবির পেছনে লেখা একটি বাক্য পড়ল—“দ্বিতীয়বার জন্মের দাগ।”
সে করিডোরের একটি ভাঙা পাথরের ওপর বসে পড়ল। মাথার ভেতর এত প্রশ্ন জমে গেছে যে কোনো একটি প্রশ্নও সম্পূর্ণভাবে ভাবতে পারছে না। ঠিক তখনই তার ফোনে আবার একটি মেসেজ এল। এবার মেসেজটি কোনো নম্বর থেকে নয়। লেখা—“পুরোনো রেজিস্টারের শেষ পৃষ্ঠা দেখো।” আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণের কক্ষের দিকে ফিরে গেল। সেখানে রেজিস্টারটি এখনও টেবিলের ওপর। সে দ্রুত শেষ পৃষ্ঠাগুলো উল্টাতে লাগল। বেশিরভাগ পৃষ্ঠা ফাঁকা। তারপর একেবারে শেষে একটি পৃষ্ঠা। কোনো তারিখ নেই। কোনো নাম নেই। শুধু চারটি হাতের ছাপ। একটি বৃদ্ধের। একটি নারীর। একটি তরুণ পুরুষের। আর একটি শিশুর। শিশুর হাতের ছাপটি দেখে আরিয়ানের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। কারণ সেই আঙুলের পাশে একটি ছোট দাগ আছে। ঠিক তার নিজের ডান হাতের জন্মদাগের জায়গায়। সে নিজের হাতটি রেজিস্টারের ওপর রাখল। মাপ প্রায় একই। তারপর নিচে একটি লেখা ফুটে উঠল—“চারজন প্রবেশ করেছিল। তিনজন ফিরে এসেছিল। কিন্তু যে ফিরে এসেছিল, সে একই মানুষ ছিল না।”
আরিয়ান নিজের হাত সরিয়ে নিল। তার মনে হলো ঘরটি আবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। রেজিস্টারের পাতায় ধীরে ধীরে নতুন কালি ফুটে উঠল। প্রথমে একটি অক্ষর। তারপর আরেকটি। শেষে একটি নাম—সালেহ। তার নিচে লেখা—“প্রবেশ: ৩:১৭। প্রত্যাবর্তন: নেই।” তারপর আরও একটি নাম—মেহরু। “প্রবেশ: ৩:১৭। প্রত্যাবর্তন: নেই।” তারপর তার দাদার নাম। “প্রবেশ: ৩:১৭। প্রত্যাবর্তন: ৩:১৮।” আর সবশেষে একটি নাম লেখা শুরু হলো। আরিয়ান তাকিয়ে রইল। অক্ষরগুলো ধীরে ধীরে ফুটে উঠল—আরিয়ান। তার নিচে সময় লেখা হলো—“প্রবেশ: ৩:১৭।” কিন্তু “প্রত্যাবর্তন” অংশটি ফাঁকা। আরিয়ান পিছিয়ে গেল। সে বলল, “না।” তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। “আমি তো ফিরে এসেছি।” ঘরের ভেতর কোনো উত্তর নেই। তারপর রেজিস্টারের পাতায় শেষ শব্দটি ফুটে উঠল—“এখনও নয়।”
আরিয়ান রেজিস্টারটি বন্ধ করে দিল। সে বুঝতে পারছিল না কী করবে। সে বেরিয়ে এসে কেল্লার খোলা জায়গায় দাঁড়াল। সূর্যের আলো এখন অনেকটা বেড়েছে। দর্শনার্থীরা এখনও আসেনি। কিছু কর্মচারী দূরে চলাফেরা করছে। সবকিছু স্বাভাবিক। এত স্বাভাবিক যে রাতের ঘটনাগুলো যেন অসম্ভব কোনো স্বপ্ন। সে নিজের মুখে হাত বুলিয়ে দেখল। শরীর বাস্তব। মাটি বাস্তব। বাতাস বাস্তব। কিন্তু বুকের ভেতরের দ্বিতীয় শব্দটি বাস্তব। ঠক... ঠক... ঠক। সে চোখ বন্ধ করল। তখনই একটি স্মৃতি ফিরে এল। ছোটবেলায় দাদা তাকে একবার বলেছিলেন, “মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল হলো সে নিজের মুখকে নিজের বলে বিশ্বাস করে।” তখন সে কথাটার অর্থ বুঝতে পারেনি। এখন মনে হচ্ছে কথাটি তার জন্যই ছিল।
তারপর তার মনে পড়ল আরও একটি ঘটনা। দাদার মৃত্যুর আগের রাত। তিনি তখন অসুস্থ। আরিয়ান তাঁর পাশে বসেছিল। ঘরে খুব অল্প আলো। দাদা হঠাৎ তার হাত ধরে বলেছিলেন, “তুই যদি কখনো আমার মুখে ভয় দেখিস, আমার কাছে আসবি না।” তখন আরিয়ান ভেবেছিল জ্বরের ঘোরে কথা বলছেন। সে হেসেছিল। দাদা হাসেননি। তিনি বলেছিলেন, “আর যদি আমাকে দুই জায়গায় একসঙ্গে দেখিস, তাহলে যাকে কাছে পাবি, তাকে বিশ্বাস করিস না।” আরিয়ান তখন শিশুর মতো হেসে বলেছিল, “দাদা, আপনি একসঙ্গে দুই জায়গায় থাকবেন কীভাবে?” বৃদ্ধ উত্তর দিয়েছিলেন, “এই কেল্লায় অসম্ভব বলে কিছু নেই।” সেই স্মৃতিটি এত পরিষ্কারভাবে ফিরে এল যে আরিয়ানের শরীর শীতল হয়ে গেল।
সে দৌড়ে আবার দক্ষিণের ঘরে ফিরল। ডায়েরিটি নিয়ে দ্রুত শেষ পাতাগুলো উল্টাতে লাগল। একেবারে শেষ পাতায় লেখা—“আজ ১২ জুলাই ১৯৮৭। আমি জানি, আমি হয়তো ফিরে আসব না। কিন্তু যদি ফিরে আসি, তবে আমি আমি থাকব না। সালেহ দরজা খুলেছে। মেহরু জানে সত্যি। শিশুটি এখনও আমাদের সঙ্গে। শিশুটিকে বাঁচাতে হলে আমাকে নিজের পরিচয় ছেড়ে দিতে হবে।” তারপর কয়েকটি লাইন ছেঁড়া। শেষের অংশে শুধু লেখা—“যে আমাকে দাদা বলে ডাকবে, তাকে বিশ্বাস করো না। কারণ সে হয়তো আমার নাতি নয়। কিন্তু সে আমার নাতির মতোই ভালোবাসবে আমাকে।”
আরিয়ান ডায়েরিটি বন্ধ করে চোখ বন্ধ করল। তার ভেতরে যেন দুটি স্মৃতি যুদ্ধ করছে। একটিতে তার দাদা তাকে কোলে নিয়ে গল্প বলছেন। অন্যটিতে একজন অচেনা বৃদ্ধ তাকে বলছেন, “তুই আমার নাতি।” কোনটি সত্যি? সে জানে না। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার—কেউ একজন বহু বছর ধরে তার পরিচয়কে নিয়ন্ত্রণ করেছে।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল।
“আরিয়ান।”
সে চমকে উঠল।
কণ্ঠটি তার দাদার।
সে ধীরে দরজার দিকে এগোল। করিডোরের শেষ মাথায় একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে। ধূসর পাঞ্জাবি। সাদা দাড়ি। কাঁধ সামান্য ঝুঁকে আছে। মুখটি ঠিক তার দাদার মতো। আরিয়ান কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল। বৃদ্ধ বললেন, “তুই আমাকে চিনতে পারছিস?” আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না। বৃদ্ধ হাসলেন। “আমি জানতাম তুই একদিন আসবি।” আরিয়ান ধীরে বলল, “আপনি কে?” বৃদ্ধ বললেন, “আমি তোকে ছোটবেলায় যে গল্পগুলো বলতাম, মনে আছে?” আরিয়ানের চোখে জল এসে গেল। “আপনি আমার দাদা?” বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন। “হ্যাঁ।” তারপর বললেন, “কিন্তু আমাকে বিশ্বাস করিস না।”
আরিয়ান স্থির হয়ে গেল।
বৃদ্ধ বললেন, “কারণ আমি যে মানুষটি তোর দাদা ছিলাম, সে এখন এখানে নেই।”
“তাহলে আপনি কে?”
বৃদ্ধের মুখের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
“আমি তার শেষ স্মৃতি।”
হঠাৎ চারপাশের আলো নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে মেহরুর কণ্ঠ শোনা গেল।
“আরিয়ান, তার দিকে তাকিও না।”
আরিয়ান চোখ বন্ধ করে ফেলল।
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
কারণ অন্ধকারে বৃদ্ধের কণ্ঠ বদলে গেছে।
প্রথমে দাদার কণ্ঠ।
তারপর সালেহর।
তারপর মেহরুর।
শেষে—
আরিয়ানের নিজের কণ্ঠ।
“তুই আমাকে চিনিস।”
আরিয়ান চোখ খুলল।
তার সামনে কেউ নেই।
শুধু মেঝেতে একটি পুরোনো ডায়েরি পড়ে আছে।
সে ডায়েরিটি তুলে নিল।
প্রথম পাতায় লেখা—
“মৃত মানুষের ডায়েরি।”
আর তার নিচে লেখকের নাম—
আরিয়ান।
সে কাঁপতে কাঁপতে শেষ পাতাটি খুলল।
সেখানে মাত্র একটি বাক্য—
“আমি এই ডায়েরি লিখেছিলাম ১৯৮৭ সালে।”
আরিয়ান আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।
তার চারপাশের দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে গেল।
দূরে কোথাও ঘণ্টা বাজল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
তারপর কেল্লার গভীরতা থেকে একটি ঘোষণা ভেসে এল—
“শেষ প্রহর শুরু হয়েছে।”