ঘরটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রথম যে জিনিসটি আরিয়ান অনুভব করল, তা হলো নিস্তব্ধতা। এমন নিস্তব্ধতা, যার মধ্যে কোনো শব্দ নেই অথচ সবকিছু শোনা যায়। বাইরে ভোরের পাখির ডাক নেই, দূরের মানুষের কণ্ঠ নেই, এমনকি বাতাসের শব্দও নেই। মনে হচ্ছিল, ঘরটি কেল্লার ভেতরে নেই; বরং সময়ের কোনো অদৃশ্য স্তরের মধ্যে ঝুলে আছে। আরিয়ানের হাতে এখনও সেই পুরোনো ছবিটি। ছবির ভেতরের শিশুটি—যার মুখ তার নিজের—এখন আর চোখ বন্ধ করে নেই। ছবির ক্ষুদ্র মুখটি তার দিকে তাকিয়ে আছে। আরিয়ান নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে ছবিটি মেঝেতে ফেলে দিতে চাইল, কিন্তু তার হাত যেন জমে গেছে। মতিউর চাচা পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপছিলেন। তাঁর ঠোঁট নড়ছিল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। আরিয়ান শেষ পর্যন্ত ফিসফিস করে বলল, “এটা কী?” বৃদ্ধ চোখ না তুলে বললেন, “এটাই সেই রাতের শুরু।” “কোন রাত?” “শেষ প্রহরের রাত।” আরিয়ান ছবিটির দিকে তাকিয়ে বলল, “এই শিশুটি আমি নই।” বৃদ্ধ উত্তর দিলেন, “আপনি নিশ্চিত?” আরিয়ান বলতে গেল, কিন্তু থেমে গেল। কারণ ছবির শিশুটির ডান হাতে একটি ছোট কালো দাগ ছিল। ঠিক একই জায়গায় তার নিজের ডান হাতেও ছোট একটি জন্মদাগ রয়েছে। এতদিন সে সেটাকে সাধারণ জন্মদাগ হিসেবেই জানত। কিন্তু এখন ছবির শিশুটির হাতের দাগটি দেখে তার মনে হলো, যেন কোনো পুরোনো স্মৃতি হঠাৎ শরীরের ভেতর থেকে উঠে আসছে।
মতিউর চাচা ধীরে ধীরে দেয়ালের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, “আপনার দাদা আমাকে একদিন বলেছিলেন, মানুষ জন্মের আগে কোথাও থাকে কি না, সেটা তিনি জানেন না। কিন্তু কিছু মানুষ সময়ের মধ্যে জন্ম নেয়। তারা একবার জন্মায় ক্যালেন্ডারে, আর একবার জন্মায় স্মৃতিতে।” আরিয়ান তাকিয়ে বলল, “এইসব কথা আপনি আগে কেন বলেননি?” “কারণ আমি নিজেও বিশ্বাস করতাম না।” “এখন করেন?” “এখন আমি যা দেখছি, তার পর বিশ্বাস না করে উপায় আছে?” আরিয়ান ছবিটি আবার হাতে নিল। “এই ছবিটি কে তুলেছিল?” “জানি না।” “আপনার দাদা?” “না।” “সালেহ?” “হয়তো।” “তাহলে মেহরু?” বৃদ্ধ চুপ করে রইলেন। আরিয়ান বুঝল, এই প্রশ্নের উত্তর তিনি জানেন না বা বলতে চান না। ছবির পেছনে কিছু লেখা ছিল। সে ছবিটি উল্টে দেখল। পুরোনো কালিতে লেখা—“শেষ প্রহরের আগে চারজনকে একসঙ্গে থাকতে হবে।” নিচে একটি অচেনা চিহ্ন। সেই চিহ্নটি আরিয়ান আগে দেখেছে—প্রথম দরজার কাছে, দ্বিতীয় দরজার পাশে, এমনকি তার দাদার ডায়েরিতেও। সে বলল, “এই চারজন কারা?” বৃদ্ধ উত্তর দিলেন, “আপনার দাদা, মেহরু, সালেহ... আর আপনি।” আরিয়ান ধীরে বলল, “কিন্তু আমি তখন জন্মাইনি।” “সময়ের হিসাবে হয়তো না।” “তাহলে কীভাবে?” বৃদ্ধ এবার তার দিকে তাকালেন। “এই প্রশ্নের উত্তর আপনার দাদা শেষ রাত পর্যন্ত খুঁজেছিলেন।”
হঠাৎ ছবির ভেতর থেকে ক্ষীণ শব্দ এল। “দাদা...” আরিয়ান চমকে ছবির দিকে তাকাল। শিশুটির ঠোঁট নড়ছে। “দাদা...” এবার শব্দটি পরিষ্কার। তারপর শিশুটি বলল, “আমাকে এখানে রেখে যেও না।” আরিয়ান ছবিটি হাত থেকে ফেলে দিল। ছবিটি মেঝেতে পড়তেই ঘরের বাতাস বদলে গেল। লণ্ঠনের আলো কাঁপতে লাগল। দেয়ালের পুরোনো রক্তের দাগ আবার নড়ল। মেঝের ওপর একটি গোলাকার চিহ্ন ফুটে উঠল। মতিউর চাচা পিছিয়ে গেলেন। “পেছনে যান।” কিন্তু আরিয়ান এগিয়ে গেল। গোলাকার চিহ্নের মাঝখানে ধীরে ধীরে একটি সংখ্যা ফুটে উঠল—৩১৭। তারপর সংখ্যাটি বদলে গেল। ৩১৭ থেকে ৩১৬। আবার ৩১৫। সময় যেন উল্টো দিকে গুনতে শুরু করেছে। ৩১৪। ৩১৩। ৩১২। আরিয়ান হাঁ করে তাকিয়ে রইল। “এটা কী?” বৃদ্ধ বললেন, “ঘড়ি।” “কোন ঘড়ি?” “শেষ প্রহরের।” সংখ্যা নামতে নামতে ৩০০-তে এসে থামল। তারপর ঘরের ভেতর একটি ঘণ্টার শব্দ হলো। একবার। তারপর দ্বিতীয়বার। তারপর তৃতীয়বার। আরিয়ান বুঝতে পারল, ঘড়ির কাঁটা নয়, বরং সময় নিজেই তাদের পিছনে নিয়ে যাচ্ছে।
ঘরের দেয়াল হঠাৎ কাঁপতে শুরু করল। মেঝে যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য দুলে উঠল। তারপর সবকিছু শান্ত। আরিয়ান চোখ খুলে দেখল, ঘরটি বদলে গেছে। একই ঘর, কিন্তু নতুন নয়—পুরোনো। দেয়ালের রং অক্ষত। কাঠের টেবিল পরিষ্কার। লণ্ঠন নতুন। বাইরে রাত। আর দরজার পাশে দাঁড়িয়ে একজন তরুণ। তার পোশাক ১৯৮৭ সালের। আরিয়ান তাকিয়ে বুঝতে পারল—এটাই সালেহ। তরুণটি উদ্বিগ্নভাবে ঘরের মধ্যে হাঁটছে। তার হাতে কিছু কাগজ। দরজা খুলে মেহরু ঢুকল। তার মুখে ভয়। সালেহ বলল, “সে আসছে।” মেহরু থেমে গেল। “কে?” “তুমি জানো।” “সে আসতে পারবে না।” “সে ইতিমধ্যেই এসেছে।” “কোথায়?” সালেহ জানালার দিকে তাকাল। “দেয়ালের ওপাশে।” মেহরু মাথা নাড়ল। “না। দরজা এখনও খোলেনি।” সালেহ বলল, “দরজা মানুষকে দেখে খোলে না। সময়কে দেখে খোলে।” মেহরু কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “তুমি যদি দরজা খোলো, সে বেরিয়ে আসবে।” সালেহ বলল, “আমি তাকে বের করতে চাই।” “তুমি জানো না সে কে।” “জানি।” “কে?” সালেহ উত্তর দিল না। সে টেবিলের ওপর একটি ছবি রাখল। ছবিতে সেই শিশুটি। আরিয়ান কাছে গিয়ে দেখল—ছবিটি আগের সেই ছবি। সালেহ ছবির শিশুটির দিকে তাকিয়ে বলল, “সে আমার ছেলে।”
আরিয়ানের বুকের ভেতর যেন কিছু ছিঁড়ে গেল। সে চিৎকার করে উঠতে চাইল, কিন্তু তার কণ্ঠ বের হলো না। মতিউর চাচাও এই দৃশ্য দেখছেন কি না বোঝা গেল না। তিনি যেন জমে গেছেন। মেহরু ছবিটির দিকে তাকিয়ে বলল, “সে তোমার ছেলে নয়।” সালেহ তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। “তুমি আবার এটা বলছ?” “কারণ তুমি জানো সত্যিটা।” “আমি জানি সে আমাকে বাবা বলে ডাকত।” “সে তোমাকে চিনত।” “এটাই যথেষ্ট।” “না।” মেহরুর চোখে জল এসে গেল। “সে মানুষ নয়।” কথাটি শুনে আরিয়ানের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। সালেহ বলল, “তুমি ভুল করছ।” মেহরু বলল, “তোমারও সময় এসেছে সেটা বোঝার।” সালেহ ছবিটি হাতে তুলে বলল, “তাহলে সে কী?” মেহরু উত্তর দিল, “সে একটি দরজা।” আরিয়ান শুনে বুঝতে পারল না। “মানুষের শরীরের মধ্যে দরজা থাকে না,” সালেহ বলল। মেহরু শান্ত স্বরে বলল, “যে মানুষটি দুই সময়ে জন্মায়, তার শরীর আর শুধু শরীর থাকে না।”
আরিয়ান হঠাৎ নিজের বুকের দিকে তাকাল। ঠক... ঠক... ঠক। আবার সেই শব্দ। এখন সে বুঝতে পারছে, শব্দটি কোথা থেকে আসছে। তার বুকের ভেতরে যেন একটি দ্বিতীয় হৃদস্পন্দন। নিজের হৃদস্পন্দনের সঙ্গে মিলছে না। একটি ধীর। আরেকটি একটু পরে। দুটি আলাদা ছন্দ। সে নিজের বুক চেপে ধরল। মতিউর চাচা তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “শুনছেন?” আরিয়ান মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ।” বৃদ্ধ বললেন, “এটাই সেই দরজা।” আরিয়ান বলল, “আমার ভেতরে?” “হ্যাঁ।” “কীভাবে বন্ধ করব?” “জানি না।” “আমার দাদা জানতেন?” “শেষ পর্যন্ত তিনিও জানতেন না।”
দৃশ্যটি আবার বদলে গেল। এবার ঘরে আরিয়ান দেখতে পেল তার দাদাকে। তরুণ বয়সে। তিনি সালেহর সামনে দাঁড়িয়ে। তাঁর হাতে একটি পুরোনো লোহার চাবি। তিনি বললেন, “এটা খুললে তুমি শুধু মেহরুকে মুক্ত করবে না। তুমি তাকে মুক্ত করবে।” সালেহ বলল, “তাহলে?” “তাহলে সে এই সময়ের মধ্যে ঢুকবে।” “সে তো আসবেই।” “তাই তোমাকে থামাতে হবে।” সালেহ হেসে বলল, “আপনি ভয় পাচ্ছেন।” আরিয়ানের দাদা বললেন, “আমি ভয় পাই না। আমি সময়কে ভয় পাই।” সালেহ চুপ করে গেল। দাদা বললেন, “যে জিনিসটা দরজার ওপাশে আছে, সেটাকে তুমি একবার দেখলে আর নিজের মুখ ভুলতে পারবে না।” সালেহ ধীরে বলল, “আমি দেখেছি।” “কী দেখেছ?” সালেহ বলল, “নিজেকে।” আরিয়ানের দাদা চোখ বন্ধ করলেন। “তাহলে অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
হঠাৎ ঘরের ভেতর আরেকটি মানুষ ঢুকল। সাদা পোশাকে মেহরু। কিন্তু তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন। মুখ দেখা যাচ্ছে না। সে স্থির। কোনো নড়াচড়া নেই। আরিয়ান তাকিয়ে বুঝল—এটাই সেই ছায়ামূর্তি। মেহরু বলল, “এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।” তার দাদা বললেন, “দরজা বন্ধ করো।” সালেহ বলল, “না।” ছায়ামূর্তিটি ধীরে মাথা তুলল। তার মুখের জায়গায় অন্ধকার। তারপর সে বলল, “তোমরা সবাই দেরি করেছ।” কণ্ঠটি আরিয়ানের নিজের। তার দাদা হঠাৎ পিছিয়ে গেলেন। “ওকে বাইরে যেতে দেওয়া যাবে না।” সালেহ চিৎকার করে বলল, “সে আমার ছেলে!” ছায়াটি হাসল। “আমি কারও ছেলে নই।” মেহরু কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তুমি সালেহ নও।” ছায়াটি তার দিকে তাকাল। “তুমি এখনও অপেক্ষা করছ?” মেহরু বলল, “আমি তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।” ছায়াটি বলল, “তুমি ভুল মানুষকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ।”
ঘরের ভেতর হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ হলো। দরজা খুলে গেল। কালো অন্ধকারের ভেতর থেকে যেন অসংখ্য মানুষের কান্না ভেসে এল। আরিয়ানের দাদা চিৎকার করে বললেন, “সবাই পেছনে যাও!” সালেহ দরজার দিকে এগিয়ে গেল। মেহরু তাকে থামাতে চেষ্টা করল। কিন্তু সালেহ দরজার ভেতরে ঢুকে গেল। ঢোকার আগে সে একবার পিছনে তাকাল। তার চোখ সরাসরি আরিয়ানের দিকে। যেন সে তাকে দেখতে পাচ্ছে। সে বলল, “তুমি যদি কোনোদিন ফিরে আসো, মনে রেখো—তোমার বাবা তোমাকে ছেড়ে যায়নি।” তারপর দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
আরিয়ান হাঁপাতে হাঁপাতে মেঝেতে পড়ে গেল। দৃশ্যটি মিলিয়ে গেছে। আবার বর্তমানের ঘর। কিন্তু এবার মতিউর চাচা নেই। আরিয়ান একা। ঘরের দরজা খোলা। বাইরে ভোরের আলো। সে উঠে দাঁড়াল। “চাচা?” কোনো উত্তর নেই। “মতিউর চাচা!” নীরবতা। সে বাইরে বের হলো। করিডোর ফাঁকা। বৃদ্ধ কোথাও নেই। মেঝেতে শুধু তাঁর লাঠি পড়ে আছে।
আরিয়ান লাঠিটি তুলে নিল। লাঠির মাথায় খোদাই করা একটি তারিখ।
১২ জুলাই ১৯৮৭।
তার নিচে আরও একটি তারিখ।
৭ অক্টোবর ২০২৬।
আরিয়ানের হাত কেঁপে উঠল।
আজকের তারিখ।
তার মানে মতিউর চাচা শুধু অতীতের ঘটনা জানতেন না। তিনি জানতেন এই দিনটি আসবে।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে কোনো নম্বর নেই।
শুধু একটি শব্দ—
“দাদা”।
আরিয়ান কলটি রিসিভ করল।
ওপাশে প্রথমে নিস্তব্ধতা।
তারপর একটি কণ্ঠ।
তার দাদার।
“আরিয়ান, তুই যদি এই কথা শুনিস, তাহলে বুঝবি আমি মারা যাইনি।”
আরিয়ান চোখ বন্ধ করল।
কণ্ঠটি আবার বলল—
“আমি শুধু ভুল সময়ে আটকে আছি।”
তারপর খুব ধীরে আরেকটি কণ্ঠ তার কানে ফিসফিস করে উঠল।
“আর তুই যে মানুষটাকে তোর দাদা ভাবিস...”
এক মুহূর্ত নীরবতা।
“সে তোর দাদা নয়।”
কল কেটে গেল।
আরিয়ান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার বুকের ভেতর আবার সেই তিনটি শব্দ শুরু হলো—
ঠক।
ঠক।
ঠক।
এবার শব্দের সঙ্গে তার বুকের ভেতর থেকে একটি বাক্যও ভেসে এল।
“তৃতীয় দরজা খুলতে আর মাত্র এক প্রহর।”