রাত যত গভীর হচ্ছিল, লালবাগ কেল্লা ততই যেন তার পরিচিত রূপ হারিয়ে ফেলছিল। বাইরে বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল, কিন্তু বাতাসে এখনো ভেজা মাটির গন্ধ। কেল্লার পুরোনো দেয়ালগুলো বৃষ্টির পানি ধরে রেখেছিল; মাঝে মাঝে কোনো অদৃশ্য ফাটল থেকে একফোঁটা পানি নিচে পড়ে পাথরের মেঝেতে মিলিয়ে যাচ্ছিল। দিনের বেলায় যে জায়গাটাকে স্থির ও নির্জীব মনে হয়, রাতের গভীরে সেখানে সবকিছুর মধ্যেই যেন সামান্য নড়াচড়া আছে—দেয়ালের ছায়া একটু সরে যায়, দরজার ফাঁক দিয়ে বাতাস ঢোকে, কোনো পুরোনো কাঠের দরজা নিজের অজান্তে কেঁপে ওঠে, আর সেইসব ক্ষুদ্র শব্দ একত্রিত হয়ে এমন একটি অনুভূতি তৈরি করে যেন পুরো কেল্লা জেগে আছে। আরিয়ান একটি পুরোনো কক্ষে বসে ছিল। সামনে কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপর তার দাদার পুরোনো নথি, লোহার চাবি, হাতে আঁকা নকশা এবং সেই ছোট কাগজটি—যাতে লেখা ছিল, “তুমি দেরি করে ফেলেছ।” তার মাথার ভেতর গত কয়েক ঘণ্টার প্রতিটি ঘটনা ঘুরছিল। সাদা পোশাকের নারী, উত্তর দেয়াল, দেয়ালের ভেতর থেকে আসা তিনটি আঘাত, রেজিস্টার থেকে দাদার নাম অদৃশ্য হয়ে যাওয়া, অদৃশ্য করিডোর, নিজের নাম লেখা দরজা এবং সেই কণ্ঠ—“তোমার দাদা তোমাকে এখানে পাঠিয়েছিল।” যুক্তিবাদী মন দিয়ে এসবের ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হচ্ছিল। কিন্তু সে এখনো নিজেকে বোঝাতে চাইছিল যে কোনো না কোনো বাস্তব কারণ অবশ্যই আছে। পুরোনো স্থাপত্যের গোপন পথ থাকতে পারে, নথি পরিবর্তিত হতে পারে, অন্ধকারে চোখ ভুল দেখতে পারে, অতিরিক্ত ক্লান্তিতে মানুষের শ্রবণ বিভ্রম হতে পারে। কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর কোনো যুক্তিই দিতে পারছিল না—তার নাম সেই দেয়ালে কে লিখেছিল?
মতিউর চাচা কিছুক্ষণ আগে তাকে ওই ঘরে রেখে বাইরে গিয়েছিলেন। যাওয়ার আগে শুধু বলেছিলেন, “এখানে থাকুন। আমি একটু পরে আসছি।” আরিয়ান জিজ্ঞেস করেছিল, “কোথায় যাচ্ছেন?” বৃদ্ধ বলেছিলেন, “যেখানে আপনার দাদা শেষবার গিয়েছিলেন।” কথাটা বলেই তিনি অন্ধকার করিডোরে চলে গিয়েছিলেন। তারপর প্রায় চল্লিশ মিনিট হয়ে গেছে। তিনি আর ফেরেননি। আরিয়ান কয়েকবার দরজা খুলে বাইরে তাকিয়েছে। প্রতিবারই করিডোর ফাঁকা। দূরে ম্লান আলো। কোনো মানুষের ছায়া নেই। সে ফোনে সময় দেখল—রাত ১২টা ৪৮ মিনিট। এখনও ৩টা ১৭ মিনিট হতে অনেক দেরি। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার মনে হচ্ছিল সময় যেন স্বাভাবিক গতিতে চলছে না। কখনো কয়েক মিনিট কয়েক ঘণ্টার মতো দীর্ঘ লাগছিল, আবার কখনো হঠাৎ মনে হচ্ছিল অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। সে টেবিলে রাখা ঘড়িটার দিকে তাকাল। ঘড়ির কাঁটা ১২টা ৪৮ মিনিটেই আটকে আছে। আরিয়ান ঘড়িটা তুলে নাড়াল। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। ব্যাটারি থাকার কথা নয়, কারণ এটি বহু বছরের পুরোনো যান্ত্রিক ঘড়ি। সে পকেট থেকে নিজের ঘড়ি বের করল। ১২টা ৪৯। এক মিনিট এগিয়েছে। আবার কিছুক্ষণ পর দেখল ১২টা ৪৯। সময় যেন থেমে থেমে এগোচ্ছিল।
হঠাৎ তার মনে হলো, ব্যাগের ভেতর কিছু নড়েছে। সে চমকে উঠে ব্যাগ খুলল। কোনো প্রাণী নেই। কিন্তু নথির নিচে একটি কালো চামড়ার ছোট ডায়েরি দেখা গেল। সে নিশ্চিত ছিল, ডায়েরিটি সেখানে ছিল না। অন্তত সে যখন কিছুক্ষণ আগে কাগজগুলো বের করেছিল, তখন এমন কোনো ডায়েরি দেখেনি। সে ধীরে ধীরে ডায়েরিটা হাতে নিল। চামড়ার ওপর কোনো নাম নেই। কেবল একটি ছোট ধাতব চিহ্ন—একটি বৃত্তের ভেতরে ৩ এবং ১ এবং ৭-এর মতো তিনটি রেখা। আরিয়ানের বুকের ভেতর আবার ধক করে উঠল। সে ডায়েরির প্রথম পাতা খুলল। পাতাটি প্রায় ফাঁকা। শুধু নিচে একটি তারিখ—১২ জুলাই ১৯৮৭। তার হাত কেঁপে উঠল। তার দাদার সেই সময়ের সঙ্গে তারিখটি মিলে যাচ্ছে। পরের পাতায় লেখা—“আজ আমি এমন কিছু দেখেছি, যা লিখে রাখলে হয়তো একদিন কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু না লিখে রাখলেও আমি নিজেকে বিশ্বাস করতে পারব না।” আরিয়ান নিঃশ্বাস বন্ধ করে পড়তে শুরু করল।
ডায়েরির লেখাগুলো তার দাদার হাতের লেখা। সে ছোটবেলা থেকে সেই হাতের লেখা দেখেছে। পুরোনো চিঠি, জমির কাগজ, পারিবারিক হিসাব—সব জায়গায় একই অক্ষর। এখানে কোনো সন্দেহ নেই। প্রথম কয়েকটি পাতা ছিল স্থাপত্য নিয়ে। পুরোনো দেয়াল, নির্মাণের ধরণ, বিভিন্ন কক্ষের অবস্থান, পুরোনো নকশার সঙ্গে বর্তমান কাঠামোর অমিল। তারপর একটি পাতায় লেখা—“নকশায় উত্তর-পশ্চিম অংশে একটি দেয়াল আছে। কিন্তু পুরোনো নথিতে একই জায়গায় একটি করিডোরের উল্লেখ রয়েছে। বর্তমান কাঠামোয় করিডোর নেই। গত তিন দিন ধরে আমি জায়গাটি পরীক্ষা করছি।” পরের পাতায়—“আজ দেয়ালের ভেতর থেকে শব্দ পেয়েছি।” আরিয়ান সেখানে এসে থেমে গেল। তার দাদা লিখেছেন—“তিনবার। ঠক। ঠক। ঠক। শব্দটি সবসময় একই ব্যবধানে আসে। দেয়াল পরীক্ষা করে কোনো ফাঁকা অংশ পাইনি। কিন্তু শব্দটি আবার এসেছে।” তার নিচে একটি বাক্য—“শব্দটি যেন দেয়ালের ভেতর থেকে নয়, দেয়ালের ওপাশের সময় থেকে আসে।”
আরিয়ান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। তারপর পরের পাতা খুলল। সেখানে লেখা—“রাত ৩টা ১৭ মিনিটে প্রথমবার দরজাটি দেখা যায়।” আরিয়ানের আঙুল কাগজের ওপর থেমে গেল। সে সময়টার দিকে তাকিয়ে রইল। তার দাদা লিখেছেন—“দরজাটি দিনের বেলায় নেই। সন্ধ্যায় নেই। রাত ২টা পর্যন্ত নেই। কিন্তু ৩টা ১৭ মিনিটে দেয়ালের মাঝখানে একটি দরজা দেখা যায়। দরজার কোনো তালা নেই, কোনো হাতল নেই। তবু ওপাশ থেকে বাতাস আসে। দরজার ওপাশে আলো নেই। কিন্তু মনে হয় কেউ দাঁড়িয়ে আছে।” আরেকটি পাতায়—“আজ আমি দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। ওপাশ থেকে একজন নারী আমার নাম ধরে ডাকল।” আরিয়ান শ্বাস আটকে পড়ল। তার দাদা কীভাবে জানলেন? সে পরের লাইন পড়ল—“আমি উত্তর দিইনি। কিন্তু সে বলল, ‘তুমি আবার এসেছ।’ আমি জীবনে ওই নারীকে কখনো দেখিনি।” আরিয়ান ডায়েরিটা বন্ধ করে কয়েক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল। একই ঘটনা আজ তার সঙ্গে ঘটছে। পার্থক্য শুধু একটাই—এবার নারীটি তার নাম ধরে ডাকছে।
সে আবার ডায়েরি খুলল। পরের পাতায় লেখা—“আমি বুঝতে পারছি, এই দরজা অতীতের কোনো জায়গায় যায় না। এটি এমন একটি জায়গায় যায় যেখানে সময় সম্পূর্ণ হয়নি।” আরিয়ান বাক্যটির অর্থ বুঝতে চেষ্টা করল। তার দাদা আরও লিখেছেন—“কেউ যদি ওই দরজার ওপাশে যায়, সে হয়তো একই জায়গায় ফিরে আসে না। সময় তাকে নিজের মতো করে নেয়।” এরপর কয়েকটি পাতা ছেঁড়া। যেন ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ তুলে ফেলেছে। তারপর আবার লেখা—“আজ আমি ভুল করেছি। আমি দরজার ওপাশে গিয়েছিলাম।” আরিয়ানের বুকের মধ্যে কেমন একটা চাপ অনুভূত হলো। তার দাদা কি সত্যিই সেই দরজার ওপাশে গিয়েছিলেন? পরের লাইন—“ওপাশে একটি করিডোর। করিডোরের দেয়ালে পুরোনো তেলের বাতি। বাতিগুলো জ্বলছে, কিন্তু কোনো আগুন নেই। মেঝেতে পানি। দূরে একজন নারী দাঁড়িয়ে ছিল। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল—‘আপনার নাতি আসবে।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’ সে বলল—‘কারণ আপনি তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’” আরিয়ান ডায়েরিটা শক্ত করে ধরে ফেলল। তার দাদা কি সত্যিই তার কথা জানতেন? তখন তো আরিয়ান ছোট শিশু। অথবা হয়তো জন্মই হয়নি। সে আবার পড়ল—“আমি তাকে বললাম, আমি কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিইনি। সে হাসল। তারপর বলল, ‘আপনি ভুলে গেছেন।’”
ডায়েরির পরের পাতাগুলো আরও অস্বাভাবিক। “আমি আজ কেল্লা থেকে বেরিয়ে এসেছি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, আমি একা বের হইনি। কেউ আমার সঙ্গে এসেছে।” তারপর—“বাড়ি ফিরে আয়নায় নিজের পেছনে একজন নারীকে দেখেছি।” আরিয়ান পড়তে পড়তে হঠাৎ থেমে গেল। তার মনে পড়ে গেল সেই রাতের কথা, যখন দাদার মৃত্যুর কয়েক বছর আগে তিনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়েছিলেন। তখন আরিয়ান শিশুমাত্র। সেই স্মৃতি এত অস্পষ্ট যে সে কখনো গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, দাদা হয়তো তখনও কিছু দেখতেন। পরের পাতায় লেখা—“আমি আর কেল্লায় যাব না। কিন্তু আমি জানি, সে আমাকে যেতে দেবে না।” তারপর বড় অক্ষরে—“যদি কোনোদিন আমার নাতি এই নথি পায়, তাকে অবশ্যই থামাতে হবে।” নিচে লেখা—“তাকে বলবে, উত্তর দেয়ালের কাছে যেন না যায়। ৩টা ১৭ মিনিটে যেন কোনো দরজার উত্তর না দেয়। আর যদি সে ইতিমধ্যে দরজাটি দেখে থাকে, তবে সব শেষ।” আরিয়ান শেষ বাক্যটির দিকে তাকিয়ে রইল। “সব শেষ।” কী শেষ? তার দাদার সতর্কতা? নাকি এমন কিছু যা বহু বছর ধরে অপেক্ষা করছে?
হঠাৎ বাইরে করিডোরে পায়ের শব্দ হলো। আরিয়ান ডায়েরি বন্ধ করল। কেউ হাঁটছে। ধীরে। খুব ধীরে। এক পা। তারপর বিরতি। আবার এক পা। শব্দটা দরজার কাছে এসে থামল। আরিয়ান উঠে দাঁড়াল। “মতিউর চাচা?” কোনো উত্তর নেই। সে দরজার কাছে গেল। হাতল ধরল। ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে খুব মৃদু শব্দ—“আরিয়ান।” সে হাত সরিয়ে নিল। কণ্ঠটা নারীর। সেই একই কণ্ঠ। কয়েক সেকেন্ড পরে আবার—“দরজা খোলো।” আরিয়ান কিছু বলল না। কণ্ঠটি এবার আরও কোমল হলো। “তুমি তো আমাকে খুঁজছ।” সে চোখ বন্ধ করল। ডায়েরিতে দাদার সতর্কতা মনে পড়ল—“কোনো দরজার উত্তর দেবে না।” সে পিছিয়ে এল। দরজার ওপাশে নীরবতা। তারপর খুব ধীরে দরজায় তিনটি আঘাত। ঠক। ঠক। ঠক। আরিয়ান অনুভব করল তার শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেছে। সে ঘড়ির দিকে তাকাল। ১টা ১৭ মিনিট।
এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে কিছু ঘটল না। নারীটি আর ডাকল না। করিডোরও নীরব। আরিয়ান আবার ডায়েরি খুলল। এবার শেষের দিকের পাতাগুলো পড়তে শুরু করল। একটি পাতায় লেখা—“৩টা ১৭ মিনিট শুধু সময় নয়। এটি একটি দরজা খোলার মুহূর্ত। প্রতিবার যখন এই সময় আসে, কেল্লার ভেতরে একটি পুরোনো ঘটনা আবার ঘটতে শুরু করে।” তার নিচে—“যে ঘটনা একবার ঘটেছিল, তা প্রতি রাতে পুনরাবৃত্তি হয় না। বরং অপেক্ষা করে।” আরেকটি লাইন—“অপেক্ষা করা মানুষটি জীবিত নয়।” আরিয়ান গিলল। এরপর লেখা—“সে একজন নারী। তার নাম আমি জানতে পারিনি। কিন্তু তার হাতে সবসময় একটি চাবি থাকে।” আরিয়ানের হাত হঠাৎ থেমে গেল। তার পকেটে থাকা চাবিটি যেন আরও ঠান্ডা হয়ে উঠল। দাদার ডায়েরিতে আরও লেখা—“চাবিটির গায়ে ৩১৭ খোদাই করা। আমি একবার চাবিটি নিয়েছিলাম। পরদিন সেটা আমার টেবিলে ফিরে আসে। আমি যতবার ফেলে দিয়েছি, ততবার আবার ফিরে এসেছে।” আরিয়ান নিজের পকেট থেকে চাবিটি বের করল। কয়েক মুহূর্ত সেটার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর হঠাৎ তার মনে হলো, চাবিটা একটু আগের তুলনায় অন্যরকম। সে চোখের সামনে ধরল। ৩১৭-এর নিচে খুব ক্ষীণ একটি নতুন দাগ। যেন সেখানে আরেকটি সংখ্যা লেখা হচ্ছে। সে চমকে চাবিটা মেঝেতে ফেলে দিল।
চাবিটি মেঝেতে পড়ে ছোট্ট শব্দ করল। টং। কিন্তু শব্দটা স্বাভাবিক ছিল না। মনে হলো, লোহার মেঝের ওপর নয়, অনেক গভীর কোনো কূপের মধ্যে পড়েছে। শব্দের প্রতিধ্বনি কয়েক সেকেন্ড ধরে চলল। তারপর ঘরের বাতি নিভে গেল। সম্পূর্ণ অন্ধকার। আরিয়ান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে বাতাসের শব্দ নেই। বৃষ্টির শব্দ নেই। যেন পুরো পৃথিবী থেমে গেছে। তারপর তার সামনে খুব ক্ষীণ একটি আলো দেখা গেল। ঘরের মাঝখানে। আলোটি ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। আরিয়ান বুঝতে পারল, সেটি কোনো বাতি নয়। সেটি একটি দরজার ফাঁক দিয়ে আসা আলো। অথচ ঘরের দেয়ালে কোনো দরজা ছিল না। সে পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু পা নড়ল না। আলো বাড়তে বাড়তে একটি সরু আয়তক্ষেত্র তৈরি করল। তারপর সেই আয়তক্ষেত্রের চারপাশে পুরোনো কাঠের ফ্রেম দেখা গেল। একটি দরজা। ঠিক তার সামনে। দরজাটি এত পুরোনো যে কাঠে ফাটল। নিচের অংশ ভেজা। আর দরজার মাঝখানে একটি লোহার হাতল।
আরিয়ান জানত, তাকে হাতলটি স্পর্শ করা উচিত নয়। তবু মানুষের কৌতূহল কখনো কখনো ভয়কেও পরাজিত করে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। হাত বাড়াল। তার আঙুল হাতলের কাছাকাছি পৌঁছাতেই দরজার ওপাশ থেকে একটি নারীকণ্ঠ এল—“তুমি দেরি করেছ।” আরিয়ান থেমে গেল। কণ্ঠটি এবার আগের চেয়ে স্পষ্ট। “তোমার দাদা সময়মতো এসেছিল।” আরিয়ান ফিসফিস করে বলল, “আপনি কে?” সঙ্গে সঙ্গে নীরবতা। তারপর কণ্ঠটি বলল, “আমি সেই মানুষ, যাকে তোমার দাদা রেখে গিয়েছিল।” আরিয়ান বুঝতে পারল না। “কোথায়?” কণ্ঠটি বলল, “তোমার সময়ের বাইরে।”
তারপর দরজার নিচ দিয়ে ধীরে ধীরে পানি বেরিয়ে এল। পানি কালো নয়, রক্তও নয়—স্বচ্ছ পানি। কিন্তু তার সঙ্গে ভেসে এল একটি ছোট কাগজ। আরিয়ান নিচু হয়ে কাগজটি তুলল। কাগজে লেখা—“১২ জুলাই ১৯৮৭ — রাত ৩টা ১৭ মিনিট।” নিচে আরও একটি লাইন—“তৃতীয় দরজা খোলা হয়েছিল।” আরিয়ান মাথা তুলল। দরজাটি তখন আর নেই। ঘরের দেয়াল আগের মতো। বাতি জ্বলে উঠেছে। চাবিটি মেঝেতে পড়ে আছে। ডায়েরি টেবিলের ওপর। কিন্তু ডায়েরির শেষ পাতাটি এখন খোলা। সেখানে তার দাদার হাতের লেখায় একটি নতুন বাক্য ফুটে উঠেছে, যা কয়েক সেকেন্ড আগেও সেখানে ছিল না—“সে তোমাকে দেখেছে। এখন সে তোমাকে ডাকবে।”
আরিয়ান ঘড়ির দিকে তাকাল।
রাত ৩টা ১৬ মিনিট।
তার বুকের ভেতর যেন কেউ মুঠো করে ধরল। মাত্র এক মিনিট বাকি।
সে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই। তারপর দেয়ালের ভেতর থেকে খুব মৃদু একটি শব্দ এল।
ঠক।
আরিয়ান চোখ বন্ধ করল।
দ্বিতীয়বার—
ঠক।
তার শ্বাস বন্ধ হয়ে এল।
তারপর তৃতীয়বার—
ঠক।
ঘড়ির কাঁটা ৩টা ১৭ মিনিটে পৌঁছাল।
সেই মুহূর্তে পুরো লালবাগ কেল্লার কোথাও যেন একটি বিশাল দরজা খুলে যাওয়ার শব্দ হলো। শব্দটি এত গভীর, এত পুরোনো, যেন বহু শতাব্দী ধরে বন্ধ থাকা কোনো কক্ষের ভারী কাঠের পাল্লা ধীরে ধীরে সরছে। মেঝে সামান্য কেঁপে উঠল। দেয়ালের ভেতর থেকে একসঙ্গে অসংখ্য মানুষের ফিসফিসানি ভেসে এল। কেউ কাঁদছে, কেউ প্রার্থনা করছে, কেউ আর্তনাদ করছে। তাদের মধ্যে একটি কণ্ঠ খুব স্পষ্ট।
তার দাদার কণ্ঠ।
“আরিয়ান, দরজা খুলো না।”
আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কারণ তার ঠিক পেছনে তখন একটি দরজা খুলে গিয়েছিল।
আর সেই দরজার ওপাশ থেকে তার নিজের কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
“দাদা, আমি এসে গেছি।”