পকেটে তেইশ টাকা নিয়ে বেরিয়েছিলাম।
গোনা ছিল। চারদিন ধরেই গোনা ছিল। বাড়ি থেকে আসার সময় বাবা পঁচাত্তর টাকা দিয়েছিলেন, তার থেকে মাগুরা-ঢাকার বাসভাড়া গেছে বত্রিশ, আরিচার ফেরিতে চা-বিস্কুট গেছে চার, গাবতলী থেকে আগারগাঁও রিকশায় গেছে বারো — সেটা নিয়ে খালা এখনো খোঁটা দেন, বারো টাকা দিয়ে রিকশা, তোমার নাকি বাপের গদি আছে — আর একটা লজেন্সের প্যাকেট, চার টাকা। বাকি তেইশ।
তেইশ টাকা নিয়ে আমি চারদিন ধরে হিসাব করছিলাম কত দিন এটা দিয়ে চলে। উত্তরটা নির্ভর করছিল আমি কী কী করব না তার উপর।
○
বাবা আমাকে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন কারণ মাগুরায় আমার আর কিছু করার ছিল না।
এইচএসসি দিয়েছিলাম উনআশিতে — আটাশিতে ইশকুল, উনআশিতে কলেজ, তারপর দুই বছর। দুই বছরে কী করেছি সেই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলাম, দুইবার। হয়নি। প্রথমবার হয়নি কারণ প্রস্তুতি ছিল না, দ্বিতীয়বার হয়নি কারণ দ্বিতীয়বারও প্রস্তুতি ছিল না, আর ততদিনে বাড়িতে বলা হয়ে গেছে যে ও ভালো ছাত্র, ও হবে, আর সেই কথাটা বাড়িতে যতবার বলা হয়েছে ততবার আমার পড়তে বসা কঠিন হয়েছে।
দুই বছরে আমি বাজারের লাইব্রেরিতে বসে থাকতাম। বসে থাকতাম মানে বই পড়তাম, কিন্তু কোনো কাজের বই না। যা পাওয়া যেত। সেবার অনুবাদ, পুরনো দেশ পত্রিকা, একটা ছেঁড়া সঞ্চয়িতা। লাইব্রেরিয়ান আমাকে চিনে গিয়েছিলেন, চাঁদা নিতেন না।
বাবা প্রাইমারিতে পড়ান। তেইশ বছর ধরে পড়ান। বাড়িতে বই আছে, বেশি না, কিন্তু আছে, আর সেই বইগুলো আমি সব পড়ে ফেলেছিলাম ক্লাস নাইনের মধ্যে। বাবা এটা নিয়ে কোনোদিন গর্ব করেননি, কিন্তু বাইরের লোকের সামনে একবার বলেছিলেন, আর আমি শুনে ফেলেছিলাম, আর সেটা আমার মনে আছে।
উননব্বুইয়ের শেষে বড় বোনের বিয়ে হলো। যা ছিল তা সেখানে গেল। তারপর নব্বই সালটা গেল হরতালে আর মিছিলে, কলেজ বন্ধ, ট্রেন বন্ধ, আর ডিসেম্বরে লোকটা চলে গেল।
জানুয়ারিতে বাবা বললেন, “ঢাকায় যাও। ন্যাশনালে ভর্তি হও। ওইখানে টিউশনি পাওয়া যায়।”
কথাটার প্রথম অংশ ছিল পরামর্শ। দ্বিতীয় অংশটা ছিল হিসাব।
মা কিছু বলেননি। যাওয়ার আগের রাতে ব্যাগে তিনটা শার্ট গুছিয়ে দিলেন, আর একটা কাগজের ঠোঙায় নারকেলের নাড়ু, আর বললেন খালাকে যেন সালাম দেই।
○
খালুর কোয়ার্টারটা শেরেবাংলা নগরে, দোতলা, নিচতলার দুই কামরা তাঁদের। সরকারি অফিসে কী একটা পদে আছেন, নামটা লম্বা, আমি মনে রাখতে পারিনি। আশপাশে তখনো অনেকটা ফাঁকা। কোয়ার্টারের সারি শেষ হলেই ঘাসজমি, তার ওপাশে ইটভাটার চিমনি, সকালে ধোঁয়া উঠত। রাতে শিয়াল ডাকত। ঢাকা শহর বলতে যা বুঝতাম, এ তার কিছুই না।
সকালে খালা তিনটা রুটি আর সবজি দিলেন। আমি রুটি ছিঁড়ে খেতে খেতে ভাবছিলাম, মাগুরায় আমি কী খেতাম।
“আজ কী করবা?” খালু জিজ্ঞেস করলেন, শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে।
আমি বললাম, কলেজে যাব। ভর্তির ফরম আনতে।
মিথ্যা না। তিতুমীর কলেজে আমার ভর্তির কাগজপত্র বাকি ছিল, ফরম আনতে হত, তারিখও ছিল। কিন্তু সেটা মহাখালী, আর মহাখালী যাওয়ার পথ আমি জানতাম না, আর সেদিন সকালে আমার কলেজের ফরম আনার কোনো ইচ্ছাই ছিল না।
খালু কী ভেবে পাঁচ টাকার একটা নোট বের করে দিলেন। “বাসে যাইও। রিকশায় যাইও না।”
আটাশ।
○
আগারগাঁও থেকে ফার্মগেট আসতে বাসে লাগল সোয়া টাকা, আর লাগল প্রায় চল্লিশ মিনিট, যদিও দূরত্ব কিছুই না। বাসটা প্রতিটা মোড়ে দাঁড়াচ্ছিল, দাঁড়িয়ে থেকে হেলপার ছেলেটা গলা ফাটিয়ে ডাকছিল, তারপর কেউ না উঠলে গাড়িটা আবার নড়ত।
ফার্মগেটে নেমে আমি একটা কথা বুঝলাম যেটা আগের চারদিনে বুঝিনি: ঢাকা শহরে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না।
কেউ দাঁড়িয়ে ছিল না। ওভারব্রিজের নিচে যারা বসে ছিল তারাও বসে ছিল কোনো কাজে — কলা বিক্রি করছিল, দাঁতের মাজন বিক্রি করছিল, একজন কানের ময়লা পরিষ্কার করে দিচ্ছিল আরেকজনের। আমি একটা খাম্বার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম, আর পনেরো সেকেন্ডের মধ্যে টের পেলাম আমি রাস্তার মাঝখানে আছি, লোকজন আমাকে ঘুরে যাচ্ছে, আর একজন কাঁধে ধাক্কা দিয়ে গেল, ফিরেও তাকাল না।
খবরের কাগজের স্ট্যান্ডটা ছিল ফুটপাতে, ইট চাপা দিয়ে কাগজ সাজানো। সব কাগজের প্রথম পাতাজুড়ে দুইটা জিনিস। উপরে বড় করে যুদ্ধের খবর — স্থল অভিযান শুরু হয়-হয়, মরুভূমির ছবি, ট্যাংক। আর নিচে ভোটের খবর, প্রতীক, কে কোথায় দাঁড়িয়েছে।
দেয়ালে ভোটের পোস্টার এমনভাবে সাঁটা ছিল যে দেয়ালটা আর দেখাই যাচ্ছিল না। একটার উপর আরেকটা, তার উপর আরেকটা। কোথাও কোথাও নিচের পোস্টারের মুখটা ছিঁড়ে গিয়ে উপরের পোস্টারের মুখের ভেতর ঢুকে গেছে, দুইজনের চোখ মিলে একজনের হয়ে গেছে।
তিন মাস আগে টেলিভিশনে আমরা দেখেছিলাম এরশাদ লোকটা চলে যাচ্ছে। আমাদের বাজারে তখন সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়েছিল, লাইব্রেরির সামনে, রঙিন টিভিটার সামনে। বাবা যাননি। বাবা বলেছিলেন, দেখো গিয়ে, আমি এসব অনেক দেখছি।
আমি একটা বাসে উঠে পড়লাম।
কেন উঠলাম, তার কোনো ভালো কারণ নেই। বাসটা দাঁড়িয়ে ছিল, হেলপার ছেলেটা দরজায় ঝুলে ডাকছিল, আর তার ডাকের ভেতর একটা ছন্দ ছিল যেটা শুনতে ভালো লাগছিল। আর ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে ভিড়ের মধ্যে চলতে থাকা সহজ।
○
বাসের ভেতরটা মানুষে ঠাসা। আমি সিট পাইনি, মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, একহাতে রড ধরে। ফেব্রুয়ারির শেষ, তবু ভেতরটা গরম, কারণ জানালাগুলো অর্ধেক বন্ধ ছিল আর তিরিশজন লোক নিঃশ্বাস ফেলছিল।
আমার পাশে দাঁড়ানো লোকটার বগলের কাছে আমার মুখ। তার শার্টে সাবানের গন্ধ। সামনের সিটে বসা এক মহিলা কোলের বাচ্চাটাকে ঘুম পাড়াচ্ছিলেন, বাচ্চাটা ঘুমাচ্ছিল না, আর কেউ বিরক্ত হচ্ছিল না।
হেলপার ছেলেটা প্রতিটা স্টপেজে দরজায় ঝুলে নামগুলো বলছিল। নামগুলোর কোনোটাই আমি চিনতাম না, কিন্তু বলার ভঙ্গিটা এমন ছিল যে মনে হচ্ছিল চিনি।
কারওয়ানবাজার। বাংলামোটর। মগবাজার — না, মগবাজার এই গাড়ি যায় না, ওটা অন্য গাড়ি। রূপসী বাংলা।
তারপর সে বলল, “শাহবাগ। জাদুঘর। শাহবাগ, জাদুঘর।”
আমি নেমে পড়লাম।
জাদুঘর শব্দটা আমি বইয়ে পড়েছিলাম। ক্লাস এইটে আমাদের বাংলা বইয়ে একটা রচনা ছিল, “জাদুঘরে একদিন” — আমি সেটা মুখস্থ করে পরীক্ষায় লিখেছিলাম, তেইশ পেয়েছিলাম পঁচিশে। রচনাটায় লেখা ছিল জাদুঘরে গেলে অতীতকে চোখের সামনে দেখা যায়। আমি কোনোদিন জাদুঘরে যাইনি। আমাদের মাগুরায় জাদুঘর নেই।
বাসটা চলে যাওয়ার পর আমি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে বুঝলাম, আমি জানি না জাদুঘর কোন দিকে।
○
শাহবাগ জায়গাটা আসলে কোনো জায়গা না, একটা মোড়। চারদিক থেকে রাস্তা এসে মিশেছে, আর মাঝখানে কিছু নেই। এইটা আমার প্রথম বোঝা।
দ্বিতীয় বোঝাটা হলো ফুল।
মোড়ের এক কোণে সারি দিয়ে ফুলের দোকান, কাঠের চৌকির উপর, প্লাস্টিকের বালতিতে পানি, আর পানির ভেতর ফুল। রজনীগন্ধা লম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে, গোলাপ ছোট ছোট গোছায় বাঁধা, গাঁদা মালা হয়ে ঝুলছে। একটা ছেলে বসে বসে সুতোয় বেলি গাঁথছিল, তার আঙুল এত দ্রুত চলছিল যে আমি তাকিয়ে থেকে গেলাম।
গন্ধটা রাস্তার গন্ধের সঙ্গে মিশে ছিল। ডিজেল, আর ফুল। দুইটা আলাদা করা যাচ্ছিল না।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “মামা, জাদুঘর কোনটা?”
ছেলেটা মাথা না তুলে হাত দিয়ে দেখাল। রাস্তার ওপারে।
বিল্ডিংটা বড়। সাদা, আর চারকোনা, আর সামনে খানিকটা খোলা জায়গা। গেটের ভেতরে ঢুকে গেলে বাঁ দিকে একটা কাউন্টার। কাউন্টারের কাচের ওপারে একজন লোক বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। কাচের গায়ে সাদা কাগজে হাতে লেখা: টিকেট — ২ টাকা। ছাত্র — ১ টাকা।
আমার পকেটে তখন সাতাশ টাকার কিছু কম।
আমি কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কতক্ষণ, জানি না।
এর মধ্যে একটা ইশকুলের দল এল। ছেলেমেয়ে মিলে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশজন, সাদা-নীল ইউনিফর্ম, দুইজন শিক্ষক। শিক্ষকদের একজন মহিলা, তিনি গুনছিলেন — এক, দুই, তিন — আর গুনতে গুনতে বিরক্ত হচ্ছিলেন কারণ বাচ্চাগুলো নড়ছিল। পুরুষ শিক্ষক কাউন্টারে টাকা গুনে দিলেন, কাগজের নোট, আর একগাদা টিকিট নিলেন।
তারপর ওরা ভেতরে ঢুকে গেল।
ঢোকার সময় একটা মেয়ে পিছন ফিরে বন্ধুকে কী যেন বলল, আর দুইজনেই হেসে উঠল, আর সামনের দরজাটা তাদের গিলে নিল।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
কাউন্টারের লোকটা একবার কাগজ থেকে চোখ তুলে আমাকে দেখলেন, তারপর আবার কাগজে চোখ নামালেন। তিনি কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। আমারও মনে হলো, তিনি জিজ্ঞেস করলে আমি ঢুকে পড়তাম।
কিন্তু তিনি করলেন না, আর আমি ঘুরে বেরিয়ে এলাম।
বাইরে এসে আমি নিজেকে বললাম, ফেরার ভাড়া লাগবে। মহাখালী হয়ে আগারগাঁও, দুইবার গাড়ি বদলাতে হবে। আর দুপুরে কিছু খেতে হবে, খালার বাসায় ফিরে খাওয়ার প্রশ্নই আসে না, দুপুরে ওখানে আমার ভাত থাকে না।
হিসাবটা মিথ্যা ছিল না। শুধু হিসাবটা টিকিটের দুই টাকা আটকাতে পারত না, আর আমি সেটা জানতাম।
গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আমি বিল্ডিংটার দিকে তাকালাম। জানালা নেই, বা আছে কিন্তু ছোট। ভেতরে কী থাকে, সেটা বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় রাখা হয়নি। আমার পড়া রচনাটায় লেখা ছিল, জাদুঘরে অতীত সাজানো থাকে। কীভাবে সাজানো থাকে, কাচের বাক্সে না দেয়ালে, তা রচনাটায় লেখা ছিল না, কারণ যিনি রচনাটা লিখেছিলেন তিনি সম্ভবত কোনোদিন জাদুঘরে যাননি।
○
আমি হাঁটতে শুরু করলাম, কোনো দিক ঠিক না করে।
মোড় থেকে একটা রাস্তা ঢুকে গেছে বাঁয়ে, আর সেই রাস্তায় ঢোকামাত্র শহরটা বদলে গেল। গাড়ির শব্দ পিছনে পড়ে রইল। দুই পাশে বড় বড় গাছ, ছায়া, আর ফুটপাতে ইট বসানো। এইখানে লোকজন হাঁটছিল, কিন্তু হাঁটার একটা অন্য ভঙ্গি — কেউ তাড়াহুড়া করছিল না।
সবাই আমার বয়সী। আমার চেয়ে দুই-চার বছরের বড়, কিন্তু আমারই বয়সী।
মেয়েরা দল বেঁধে যাচ্ছিল, কাঁধে ব্যাগ, হাতে বই। ছেলেরা রাস্তার ধারে বসে ছিল, একজনের হাতে সিগারেট, আরেকজন কিছু বলছিল আর হাত নাড়ছিল। একটা দল রাস্তার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে তর্ক করছিল, তিনজন, আর তাদের গলা এত উঁচু ছিল যে দশ হাত দূর থেকে শোনা যাচ্ছিল, কিন্তু আমি একটা বাক্যও বুঝলাম না। শব্দগুলো বাংলা ছিল। আলাদা করে প্রতিটা শব্দ আমি চিনি। জোড়া লাগালে কিছু বোঝা যাচ্ছিল না।
একজন বলছিল, তুই তো একদমই ধরতে পারিস নাই, ব্যাপারটা তো ফর্মের না।
আরেকজন বলল, ফর্মের না মানে? ফর্ম ছাড়া তোর আছেটা কী?
আমি ধীরে হাঁটলাম, যাতে আর দুইটা বাক্য শুনতে পাই। শুনলাম। তাতেও কিছু হলো না।
তারপর আমি একটা জিনিস খেয়াল করলাম যেটা খেয়াল করা উচিত হয়নি: ওরা আমাকে দেখছিল না। ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছিল না, ফার্মগেটের মতো না। কিন্তু দেখছিলও না। আমি ওদের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম আর কিছুই ঘটছিল না।
আমার প্যান্টটা বাড়ি থেকে বানানো, বাজারের দর্জি, আর প্যান্টের নিচের দিকটা একটু চওড়া, আর সেটা এতদিন আমি জানতাম না।
○
গাছের নিচে একটা ছেলে আমাকে থামাল।
“এই ভাই, ম্যাচ হবে?”
আমি বললাম, “না, আমি খাই না।”
সে মাথা নাড়ল, তারপর যাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করল, “কোন ডিপার্টমেন্ট?”
সে এমনভাবে জিজ্ঞেস করল যেভাবে সময় জিজ্ঞেস করে। উত্তরটা তার দরকার ছিল না।
আমি কিছু বললাম না। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড। তারপর বললাম, “আমি এইখানে না।”
“ও।” সে দাঁড়াল না। কয়েক পা গিয়ে আরেকজনকে থামিয়ে ম্যাচ চাইল, পেয়ে গেল, সিগারেট ধরাল।
আমি হাঁটতে থাকলাম, আর হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম আমার আসলে কী বলা উচিত ছিল। তিতুমীর কলেজ বলা যেত। এখনো ভর্তিই হইনি, ফরমই আনিনি — সেটাও বলা যেত। কিংবা কিছু না বলে হেসে চলে যাওয়া যেত, সেটাই সবচেয়ে সহজ ছিল।
“আমি এইখানে না” — এই কথাটা আমি কেন বললাম, আর কথাটা যে সত্যি, সেটা ছেলেটার কাছে কোনো খবরই ছিল না।
○
হাঁটতে হাঁটতে আমি একটা লোহার রেলিং পেরিয়ে একটা চত্বরে ঢুকে পড়লাম।
সাদা থাম, তিনটা না চারটা, মাঝেরটা বাঁকা হয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে। পিছনে লাল একটা বৃত্ত। আমি ছবিতে দেখেছি হাজারবার — বইয়ের মলাটে, ক্যালেন্ডারে, ইশকুলের দেয়ালে চুন দিয়ে আঁকা।
বেদির উপর ফুল ছিল। অনেক ফুল।
দুই দিন আগের ফুল। একুশে ফেব্রুয়ারি গেছে দুই দিন আগে। মালাগুলো তখনো ওখানেই পড়ে ছিল, স্তূপ হয়ে, আর পচতে শুরু করেছে। গাঁদাগুলো বাদামি হয়ে গেছে। রজনীগন্ধার ডাঁটাগুলো শুকিয়ে নেতিয়ে পড়েছে। নিচের দিকের ফুলগুলো, যেগুলোর উপর সারা রাত আরও ফুল পড়েছে, সেগুলো কালো হয়ে গিয়ে বেদির পাথরে লেগে গেছে।
গন্ধটা মিষ্টি, আর মিষ্টির নিচে আরেকটা গন্ধ।
দুইটা ছেলে বেদির এক কোণে বসে বিড়ি খাচ্ছিল, পা ঝুলিয়ে। একজন ঝাড়ুদার লোক অন্য পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, হাতে ঝাড়ু, কিন্তু ঝাড় দিচ্ছিলেন না। কেউ ফুলগুলো সরাচ্ছিল না। আমি খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবলাম, এগুলো কে সরায়, আর কবে সরায়, আর তারপর ভাবলাম এইটা ভাবার মতো কথা না।
আমি বেদিতে উঠলাম না। জুতা খুলতে হয় কি না জানতাম না, আর জিজ্ঞেস করার মতো কাউকে পাচ্ছিলাম না, আর ভুল করে উঠে পড়লে কেউ কিছু বললে আমার কী উত্তর থাকবে সেটা ভাবতে গিয়ে আমি আর উঠলাম না।
○
দুপুরের দিকে আমি একটা টং দোকানে দাঁড়িয়ে একটা রুটি আর কলা খেলাম। তিন টাকা। চা আরও পঞ্চাশ পয়সা, খেলাম।
তারপর হাঁটতে হাঁটতে আবার সেই মোড়ে ফিরে এলাম। ঘুরে ঘুরে হেঁটে যে আমি একই জায়গায় ফিরেছি, সেটা বুঝতে আমার সময় লাগল, কারণ মোড়টা অন্য দিক থেকে দেখতে অন্যরকম।
মোড় থেকে কাছেই একটা মার্কেট ছিল, দোতলা-তিনতলা, সামনে রিকশা দাঁড়িয়ে। ভেতরে লোকজন ঢুকছিল বেরোচ্ছিল। কী আছে ওখানে আমি জানতাম না, আর জানার কোনো কারণও ছিল না, আর আমি ওটার সামনে দিয়ে হেঁটে চলে গেলাম।
একটু পরে দেখলাম কয়েকজন হেঁটে যাচ্ছে হাতে বই নিয়ে। নতুন বই, দোকানের কাগজে মোড়ানো না, খোলা। একজনের হাতে চার-পাঁচটা। ওরা কোথা থেকে আসছে বুঝলাম না। সেদিকে একটা ভিড় ছিল, গেটের মতো কিছু, আর ভেতরে মানুষ।
আমি সেদিকে গেলাম না। বিকেল হয়ে আসছিল আর আমার ফেরার পথটা এখনো ঠিক করা হয়নি।
○
ফুলের দোকানের সামনে আমি আবার দাঁড়ালাম।
সেই ছেলেটা তখনো বেলি গাঁথছে। বালতিতে পানি বদলানো হয়েছে, ফুলগুলো তাজা দেখাচ্ছে।
“এইটা কত?” আমি একটা রজনীগন্ধার আঁটির দিকে দেখিয়ে বললাম।
“বারো।”
“আর একটা?”
“একটা এক টাকা। কম নিলে দাম বেশি পড়ে।”
আমি হাত বাড়ালাম না। ছেলেটা আমার দিকে একবার তাকাল, তারপর আবার আঙুল চালাতে লাগল। সে বুঝে গিয়েছিল, আর বুঝে যাওয়াটা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা ছিল না, আর সেটাই সবচেয়ে খারাপ ছিল।
আমি একটা কথা ভাবলাম যেটা ভেবে লাভ নেই: এই ফুল কিনে আমি দেব কাকে।
○
ফেরার পথটা আমি ভুল করলাম।
শাহবাগ থেকে যে গাড়িতে উঠলাম সেটা ফার্মগেটের দিকে গেল না, উল্টো দিকে গেল, আর আমি সেটা বুঝলাম পাঁচ মিনিট পর, যখন হেলপার একটা নাম বলল যেটা আমি সকালে শুনিনি। নেমে গেলাম। ভাড়া দিতে হলো এক টাকা, যদিও আমি কোথাও পৌঁছাইনি।
তারপর রাস্তা পার হয়ে উল্টো দিকের গাড়িতে উঠলাম, আর সেটা ঠিক গাড়ি ছিল, কিন্তু ততক্ষণে সন্ধ্যা।
আগারগাঁও যখন নামলাম, অন্ধকার হয়ে গেছে। কোয়ার্টারের সারির ওপাশে ঘাসজমিটা তখন কালো, আর ইটভাটার চিমনির মাথায় একটা লাল আলো জ্বলছিল।
খালা দরজা খুললেন। “এত দেরি?”
“কলেজে লাইন ছিল।”
“ফরম পাইছ?”
“কাল দিবে।”
তিনি আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। খালু তখনো ফেরেননি।
○
শোয়ার ব্যবস্থা ছিল বাইরের ঘরে। একটা সোফা কাম বেড।
শুয়ে আমি হিসাবটা করলাম, অন্ধকারে, আঙুল গুনে।
সকালে ছিল তেইশ। খালু দিলেন পাঁচ, হলো আটাশ। আগারগাঁও থেকে ফার্মগেট সোয়া এক। ফার্মগেট থেকে শাহবাগ দুই। রুটি-কলা তিন, চা আট আনা। ভুল গাড়ির এক। ফেরার দুইটা গাড়ি মিলে তিন টাকা।
আটাশ থেকে দশ টাকা সাড়ে আট আনা গেছে। থাকে সতেরো টাকা সাড়ে সাত আনা।
হিসাবটা তিনবার মিলিয়ে দেখলাম, কারণ মিলছিল না, তারপর মিলল।
হিসাবের মধ্যে দুই টাকা নেই। কারণ দুই টাকা খরচ হয়নি।
বাইরে একটা কুকুর ডাকছিল, দূরে, তারপর আরেকটা। ঘাসজমির দিক থেকে বাতাস আসছিল আর সেটা ইটভাটার গন্ধে ভরা।
জাদুঘরের ভেতরে কী আছে, আমি জানি না।