FF.
৬ গণআদালত Book page

Chapter 6

৬ গণআদালত

Oct 19, 2026 11 min read

নামটা আমি চিনতাম বই থেকে।

মাগুরার লাইব্রেরিতে একটা বই ছিল, ছিয়াশির ছাপা, মলাটে একজন মহিলার নাম। বইটা ডায়েরির মতো, তারিখ ধরে লেখা। একাত্তর সালের ঢাকা — এই বাড়ি, ওই রাস্তা, একটা ছেলে যায় আর ফেরে না।

আমি সেটা পড়েছিলাম আটাশির শীতে, দুই দিনে, আর পড়ার পর দুই রাত ভালো ঘুম হয়নি।

সেই নামটা বিরানব্বইয়ের ফেব্রুয়ারিতে দেয়ালে উঠতে শুরু করল।

○

কমিটিটা হলো ফেব্রুয়ারির এগারো তারিখে।

লম্বা নাম — মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি। এত লম্বা যে কেউ পুরাটা বলত না। সবাই বলত নির্মূল কমিটি।

আহ্বায়ক জাহানারা ইমাম।

মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে পোস্টার পড়তে শুরু করল। শাহবাগের দেয়ালে, ফুলার রোডে, নীলক্ষেতের মোড়ে। মিছিল বেরোত বিকালে, বিশ-পঁচিশজনের, তারপর পঞ্চাশজনের, তারপর গোনার বাইরে।

আজিজের করিডরে আলোচনা ঢুকে গেল, আর ঢুকে পড়ার পর অন্য সব আলোচনা থেমে গেল।

ছাব্বিশে মার্চ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। গণআদালত।

○

পত্রিকার ঘরে সেই তর্কটা হয়েছিল মার্চের মাঝামাঝি, আর আমি সেদিন ভেতরে ছিলাম — দরজায় না, ভেতরে, দেয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে।

একজন বলল, “এইটা তো ঐতিহাসিক ব্যাপার। এইখানে না থাকাটাই অপরাধ।”

আরেকজন বলল, “কোন ঐতিহাসিক ব্যাপার? একটা মঞ্চ, একটা মাইক, আর বিশ হাজার লোক। রায় হবে, তারপর কিছুই হবে না।”

“কিছু না হইলেও প্রশ্নটা উঠবে।”

“প্রশ্ন তো একাত্তরের পর থেকেই উঠতেছে। উঠতেছে আর নামতেছে।”

লাল কলমওয়ালা লোকটা — যিনি প্রুফ দেখেন — বললেন, “নির্মূল কমিটির পিছনে কারা আছে সেইটা তোমরা দেইখা রাইখো। আজকে সবাই একসাথে। কালকে যখন এই জিনিস কোনো দলের হাতে যাবে, তখন কী করবা?”

“তখনকারটা তখন।”

“তখনকারটা তখন কইরাই তো আমরা বাহাত্তর সাল থেকে বইসা আছি।”

কেউ কারও কথা মানল না, আর সবাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

নীলা যাচ্ছে। দীপন যাচ্ছে। প্রেসের বেঞ্চির দলটা পুরাটা যাচ্ছে।

আমি বাইরে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামলাম, আর চায়ের টেবিলে কামরুল ভাই দাঁড়িয়ে ছিলেন।

○

আমি বললাম, “আপনি যাইবেন?”

তিনি গ্লাসে চুমুক দিলেন। “না।”

আমি ভেবেছিলাম কারণটা কাজ। প্রুফের কাজ আসছে, বা সংখ্যার কাজ।

আমি বললাম, “কাজ আছে?”

“কাজ নাই।”

তারপর তিনি চুপ করে রইলেন, আর আমি বুঝলাম যে তিনি নিজে থেকে কিছু বলবেন না, আর যদি জানতে চাই তাহলে আমাকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?”

তিনি গ্লাসটা টেবিলে রাখলেন। মজনু পাশে বসা ছিল, গ্লাস ধুচ্ছিল, আর সে হাত থামাল না।

কামরুল ভাই বললেন, “রাষ্ট্র যেই বিচার করতেছে না, সেই বিচার আমরা কইরা ফেলব?”

আমি বললাম, “রাষ্ট্র তো করতেছে না। একুশ বছর হইয়া গেল।”

“সেইটা রাষ্ট্রের অপরাধ। ওইটা রাষ্ট্রেরই।”

“তাইলে বইসা থাকব?”

“বইসা থাকতে কে কইল?” তিনি আমার দিকে ফিরলেন। “আমি কইতেছি — আদালত বসাইও না। দাবি করো। মিছিল করো। লেখো। কিন্তু আদালত বসাইলে তুমি রাষ্ট্রের কাপড় গায়ে দিতেছ।”

“প্রতীকী আদালত তো।”

“প্রতীকী আদালত মানে প্রতীকী রাষ্ট্র। প্রতীকী রাষ্ট্র বসাইলে প্রতীকী রায় দিতে হয়। আর প্রতীকী রায় দিলে মানুষ প্রতীকী শাস্তি চায় না। মানুষ আসল শাস্তি চায়।”

আমি বললাম, “মানুষের চাওয়াটা কি ভুল?”

“চাওয়াটা ভুল না।” তিনি একটু থামলেন। “ওই চাওয়াটারে মঞ্চে তুইলা দেওয়াটা ভুল। কারণ মঞ্চ পরে অন্য কেউ দখল করব। ওইটার নাম রাজনীতি।”

আমার মুখে কথা এল না।

তিনি সেটা দেখলেন, তারপর বললেন, “তুমি যাও। আমি বারণ করতেছি না। আমি শুধু কইতেছি আমি যাব না।”

“আপনার কি মনে হয় না—”

“আমার অনেক কিছু মনে হয়।” তিনি ঝোলাটা কাঁধে তুললেন। “আমার এইটাও মনে হয় যে আমি ভুল হইতে পারি। তুমি গিয়া দেইখা আসো।”

তিনি চলে গেলেন।

মজনু একটা গ্লাস উপুড় করে রাখতে রাখতে বলল, “কামরুল ভাই কোনো জায়গায় যায় না।”

○

নীলাকে আমি কথাগুলো বললাম পরদিন, চাটাই গুটিয়ে ফেলার পর, মেলা শেষ হয়ে গেছে, আমরা দুইজন আজিজের সামনের রিকশাস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে।

আমি বলছিলাম যুক্তিগুলো এমনভাবে যেন সেগুলো আমার — মানে, আমি বলিনি এইগুলা কামরুল ভাইয়ের, কিন্তু বলিওনি যে আমার।

সে শুনল পুরাটা।

তারপর বলল, “উনি ভুল না।”

আমি অবাক হলাম।

“মঞ্চ দখল হয়। ঠিক কথা। রাজনীতি জিনিসটা এইরকমই।” সে ঝোলার ফিতা কাঁধে ঠিক করল। “কিন্তু উনি যেই জায়গায় দাঁড়ায়া কথাটা বলতেছেন, ওই জায়গাটা দেখছেন?”

“কোন জায়গা?”

“বাইরে। উনি বাইরে দাঁড়ায়া আছেন। বাইরে দাঁড়াইলে সবকিছুরই ভুল দেখা যায়। ভুল দেখাটা তো সহজ।”

“উনি তো লেখেন।”

“লেখেন। বছরে ষোলো পাতা।” সে এইটা ব্যঙ্গ করে বলেনি। “উনার হাতে আর কী আছে বলেন? ওইটুকুই তো আছে। ওইটুকু নিয়া উনি ঠিক থাকতে পারেন। উনার হারানোর কিছু নাই।”

আমি বললাম, “সেইটা তো ভালো।”

“ভালো, কার জন্য?” সে আমার দিকে তাকাল। “যাদের বাপ-চাচারে মাইরা ফেলছে, তাদের কী হবে? তারা তো একুশ বছর ধইরা ঠিক থাকতেছে না। তারা অপেক্ষা করতেছে।”

আমি কিছু বললাম না।

সে বলল, “আমি যাব। ভুল হইলে ভুল হইব। কিন্তু ওইদিন মাঠে না থাকলে আমি সারা জীবন ভাবব ক্যান থাকলাম না।”

তারপর একটা রিকশা ডেকে উঠে পড়ল।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম, আর টের পেলাম যে দুইটা কথাই ঠিক, আর দুইটা কথা একসঙ্গে ঠিক হতে পারে না, আর তবু হচ্ছে।

○

ছাব্বিশে মার্চ সকাল আটটায় আমি দীপনের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করলাম।

আমরা মিলেছিলাম শাহবাগের মোড়ে। দীপনের গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, হাতে কিছু নেই। সে বলল, “নাশতা করছেন?”

করিনি। সে একটা দোকান থেকে দুইটা বন রুটি কিনল, একটা আমাকে দিল, আর দাম দিতে দিল না।

উদ্যানের দিকে যত এগোচ্ছিলাম, ভিড় তত ঘন হচ্ছিল।

তারপর আমরা গেটে গিয়ে থামলাম।

গেট বন্ধ।

সব গেট বন্ধ। তালা না — ভিতর থেকে আটকানো, আর গেটের ওপাশে পুলিশ। শুধু পুলিশ না, বিডিআরও — আলাদা পোশাক, আলাদা দাঁড়ানোর ভঙ্গি। ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ধারে, আর ট্রাকের ভেতরে আরও লোক বসা।

দীপন বলল, “সরকার আটকাইতে চায়।”

“পারবে?”

সে উত্তর দিল না।

গেটের বাইরে মানুষ জমছিল। আমরা এসেছিলাম সকাল নয়টায়, তখন হয়তো দুই হাজার। দশটায় আরও। এগারোটায় রাস্তা ভরে গেল — শাহবাগ থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত, দুই পাশের ফুটপাত, গাছের নিচে, ডিভাইডারের উপর।

গরম পড়েছিল। মার্চের শেষ। কেউ কেউ ছাতা এনেছিল। একটা রিকশাওয়ালা তার রিকশা রাস্তার পাশে রেখে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল, প্যাসেঞ্জারের খোঁজ না করেই।

সামনের দিকে বয়স্ক মানুষ ছিলেন অনেক। এক ভদ্রলোক, সত্তরের কাছাকাছি বয়স, লাঠি হাতে, ঘামে ভিজে গেছেন, তবু সরছেন না। তাঁর পাশে দাঁড়ানো ছেলেটা বারবার বলছিল, “চাচা, ছায়ায় গিয়া বসেন।” তিনি শুনছিলেন না।

স্লোগান উঠছিল, তারপর থেমে যাচ্ছিল, তারপর আরেক জায়গা থেকে উঠছিল।

তিন ঘণ্টা আমরা ওইভাবে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা একটা শারীরিক ব্যাপার। প্রথম ঘণ্টায় কিছু হয় না। দ্বিতীয় ঘণ্টায় হাঁটুর পিছনে টান ধরে। তৃতীয় ঘণ্টায় গলা শুকায়, আর গলা শুকালে মাথা ফাঁকা লাগে।

কেউ পানি এনেছিল। জগ ভরে, বালতি ভরে — কাছের বাড়ি থেকে কেউ, দোকান থেকে কেউ। এক গ্লাস দশজনে ভাগ করে খাচ্ছিল। আমার হাতে একটা গ্লাস এসেছিল, আমি দুই চুমুক দিয়ে পাশের লোককে দিয়েছিলাম, আর সে দুই চুমুক দিয়ে আরেকজনকে।

ভিড়ের ভেতর খবর ঘুরত। কেউ বলল, ভিতরে আর্মি আছে। কেউ বলল, সরকার শেষ মুহূর্তে অনুমতি দিয়া দিছে। কেউ বলল, উনি আসতেছেন না, উনারে আটকাইছে।

প্রতিটা খবর দশ মিনিট পর মিথ্যা হয়ে যেত, আর তারপর নতুন খবর আসত।

সাড়ে এগারোটার দিকে সামনের দিকে একজন মহিলা অজ্ঞান হয়ে গেলেন। ভিড়টা তখন এমন একটা জিনিস করল যেটা আমি ভুলিনি — একটা গোল ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়ে গেল তাঁকে ঘিরে, নিজে নিজে, কেউ কাউকে বলেনি। চারজন তাঁকে তুলে ফুটপাতের দিকে নিয়ে গেল, আর তারপর জায়গাটা আবার ভরে গেল।

লাঠি হাতে সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক তখনো দাঁড়িয়ে।

তাঁর পাশের ছেলেটা এবার ধমক দিল, “চাচা, আপনি বসেন! পড়ে যাবেন!”

ভদ্রলোক ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “একাত্তরে দাঁড়াইছিলাম। আজকে বসব?”

আশপাশের কয়েকজন হেসে ফেলল, আর হাসিটা ভালোবাসার।

আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে ছিলাম আর ভাবছিলাম, একাত্তরে আমার বয়স ছিল শূন্য। আমি জন্মেছি ওই বছরেরই জুলাই মাসে, যুদ্ধের মাঝখানে, আর আমার কোনো স্মৃতি নাই, একটাও না, আর এই মাঠের অর্ধেক মানুষের আছে।

ওইটাই আমার প্রথম মনে হওয়া যে আমি এখানে অতিথি।

○

বেলা বারোটার দিকে গেট ভাঙল।

কীভাবে শুরু হলো আমি দেখিনি। আমি ছিলাম মাঝখানে, আর মাঝখানে থাকলে সামনের কিছু দেখা যায় না।

প্রথমে একটা ধাক্কা লাগল পিছন থেকে। তারপর আরেকটা। তারপর পুরা ভিড়টা একসঙ্গে সামনের দিকে সরল, আর আমার পা মাটি থেকে উঠে গেল — সত্যিই উঠে গেল, দুই কি তিন সেকেন্ডের জন্য আমি বাতাসে ভেসে ছিলাম, চারপাশের শরীরের চাপে।

কারও চিৎকার শোনা গেল। তারপর লোহার উপর লোহার শব্দ।

তারপর ভিড়টা হঠাৎ আলগা হয়ে গেল, কারণ সামনে জায়গা হয়ে গেছে, আর আমরা ভিতরে ঢুকছি।

আমি দৌড়াচ্ছিলাম না। দৌড়ানোর দরকার ছিল না। আমাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।

ঢুকে দেখি পুলিশ সরে যাচ্ছে। প্রতিরোধ না — সরে যাচ্ছে। বিডিআরের লোকগুলো লাইন ভেঙে একদিকে হাঁটছে, দ্রুত, আর কেউ তাদের দিকে তাকাচ্ছেও না।

দীপনকে আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম গেটেই।

○

উদ্যানের ভিতরে মাঠটা ভরে গেল ঘণ্টাখানেকের মধ্যে।

মঞ্চ ছিল এক পাশে, উঁচু। মাইক টাঙানো বাঁশের খুঁটিতে, চারদিকে। আমি মঞ্চ থেকে অনেক দূরে, মানুষের মাথার সারির ওপাশে, আর ওখান থেকে মঞ্চের লোকগুলোকে দেখাচ্ছিল ছোট।

মাইকে গলা শোনা যাচ্ছিল, কিন্তু শব্দগুলো দূরত্বে ভেঙে যাচ্ছিল, আর প্রতিধ্বনি হচ্ছিল, আর কখনো কখনো একটা আস্ত বাক্য কানে আসছিল আর তারপর আবার ভেঙে যাচ্ছিল।

কাজটা শান্তভাবে হলো। এইটা আমি অবাক হয়ে লক্ষ করেছিলাম। গেট ভেঙে যারা ঢুকেছে, তারা ভিতরে ঢুকে চুপচাপ বসে পড়ল। কেউ কিছু ভাঙল না। কোথাও কোনো গোলমাল হলো না।

সাক্ষী এলেন। একজনের পর একজন। তাঁদের গলা মাইকে ভাঙা ভাঙা শোনাচ্ছিল, আর একজন মহিলার গলা মাঝপথে থেমে গেল, আর অনেকক্ষণ থেমে রইল, আর কেউ তাড়া দিল না।

মাঠে বিশ হাজার মানুষ ছিল না। আরও বেশি। কত, আমি জানি না, আর কোনো কাগজের সংখ্যা আমি বিশ্বাস করিনি।

বিকালের দিকে রায় পড়া হলো।

আমি শব্দগুলো পুরোপুরি শুনিনি। কিন্তু শেষ অংশটা যখন এল, তখন মাঠটা একসঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

আর তারপর যে শব্দটা হলো, সেটা কোনো একজনের শব্দ ছিল না।

○

আমি চিৎকার করেছিলাম।

দাঁড়িয়ে, দুই হাত মুঠো করে, আর গলা ছিঁড়ে।

চারদিকে সবাই একই শব্দ বলছিল, একই তালে, আর শব্দটা আমার মুখ দিয়েও বেরোচ্ছিল, আর আমার শরীরের ভেতরটা তখন এমন হয়ে গিয়েছিল যেটা আমি আগে দুইবার টের পেয়েছি — একবার একানব্বইয়ের মে মাসে, ত্রাণের টিন হাতে, ফার্মগেটে।

কিন্তু ওইটা ছিল এইটার একশো ভাগের এক ভাগ।

আমার গলা বসে গিয়েছিল। পাশের একটা ছেলে — চেনা না, তেইশ-চব্বিশ বছর — আমার কাঁধে হাত রেখে ঝাঁকাচ্ছিল, আর হাসছিল, আর তার চোখে পানি ছিল।

আমি তাকে চিনতাম না, আর আমরা দুইজন সেই মুহূর্তে একই জিনিস ছিলাম।

সন্ধ্যা নাগাদ মাঠ ফাঁকা হতে শুরু করল।

○

ফেরার পথে আমি দীপনকে খুঁজে পেলাম, শাহবাগের মোড়ে।

তার পাঞ্জাবির কাঁধের সেলাই ছিঁড়ে গেছে। সে হাসছিল।

“হারায়া ফেলছিলাম আপনারে।”

“গেটে।”

“হ্যাঁ, গেটে।” সে ছেঁড়া সেলাইটা দেখাল। “এইটা বাসায় গিয়া কী বলব ভাবতেছি।”

আমরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। কেউ কিছু বলছিলাম না, কারণ বলার মতো কিছু তখন আমাদের কাছে ছিল না — সব বলা হয়ে গেছে, চিৎকার করে, দুপুরে।

তারপর দীপন রিকশা নিল।

আমি হাঁটতে শুরু করলাম, আর হাঁটতে হাঁটতে আজিজের সামনে দিয়ে গেলাম।

মার্কেট খোলা। নিচতলার আলো জ্বলছে।

সিঁড়ির গোড়ায় মজনু বসে চা বানাচ্ছিল, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে কামরুল ভাই।

তিনি আমাকে দেখলেন।

আমি ভেবেছিলাম তিনি জিজ্ঞেস করবেন — কেমন হলো, কত লোক, কী হলো।

তিনি কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। মাথা নেড়ে বললেন, “চা খাবা?”

আমি বললাম, “না ভাই, আজকে যাই।”

○

মেসে ফিরে আমি অনেকক্ষণ শুয়ে ছিলাম।

গলা ব্যথা করছিল। পায়ের পাতা ফুলে গিয়েছিল। শার্টের বগলের কাছে লবণের সাদা দাগ পড়ে গেছে।

বাদল টিউশনি থেকে ফিরেছিল রাত আটটায়। সে যায়নি। তার সেদিন দুইটা টিউশনি ছিল, আর ছাব্বিশে মার্চ ছুটির দিন, ছুটির দিনে ডবল পড়াতে হয়।

সে আমার অবস্থা দেখে বলল, “গেছিলি?”

“হ্যাঁ।”

“কেমন হইল?”

আমি বলতে শুরু করলাম, আর বলতে গিয়ে টের পেলাম যে আমার গলা দিয়ে ঠিকমতো আওয়াজ বেরোচ্ছে না, আর সেটা নিয়ে আমার গর্ব হচ্ছে।

আমি বললাম গেট ভাঙার কথা, ভিড়ের কথা, পুলিশ সরে যাওয়ার কথা।

সে শুনল, বসে, জুতা খুলতে খুলতে।

তারপর বলল, “রায় তো আর কার্যকর হইব না।”

“হইব না। কিন্তু প্রশ্নটা তো উঠল।”

সে মাথা নাড়ল।

আমি অপেক্ষা করলাম। সে আর কিছু বলল না।

আমি বললাম, “তোর কী মনে হয়?”

সে জুতাজোড়া চৌকির নিচে ঠেলে দিল।

“আমার কিছু মনে হয় না।” তারপর একটু পরে বলল, “আমাদের ওইদিকে জামায়াতের অনেক লোক। আমার মামা—” সে থামল। “থাউক।”

“কী?”

“কিছু না। ভাত খাবি? মোসলেম চাচা রাইখা দিছে।”

সে উঠে গেল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম না। তখন জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল, আর আমি করিনি, কারণ সারাদিনের যে জিনিসটা আমার ভিতরে ছিল সেটা তখনো ছিল, আর আমি চাইছিলাম সেটা নষ্ট না হোক।

○

আর আমার ভিতরে সারাদিনের সেই জিনিসটা তখনো ছিল, আর আমি চাইছিলাম সেটা থাকুক।

আমি কামরুল ভাইয়ের কথাগুলো এক এক করে সাজালাম, আর প্রতিটার বিপরীতে একটা করে উত্তর বানাতে চেষ্টা করলাম।

প্রতীকী আদালত মানে প্রতীকী রাষ্ট্র — এইটার উত্তর: রাষ্ট্র যদি একুশ বছরে কিছু না করে, তাহলে মানুষের হাতে আর কী থাকে?

কিন্তু এইটা উত্তর না। এইটা প্রশ্ন। কামরুল ভাই নিজেও এইটাই বলেছেন — সেইটা রাষ্ট্রের অপরাধ।

মঞ্চ পরে অন্য কেউ দখল করব — এইটার উত্তর: তাহলে কি ভয়ে মঞ্চই বানাব না?

এইটাও উত্তর না। এইটা একটা পাল্টা প্রশ্ন, আর পাল্টা প্রশ্ন দিয়ে কিছু খণ্ডানো যায় না, আর এইটা আমি জানি, কারণ আজিজের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আমি চার মাস ধরে দেখেছি কীভাবে লোকে তর্কে হারে।

আমি উঠে বসলাম, খাতাটা বের করলাম, আর কামরুল ভাইয়ের বাক্যটা লিখে রাখলাম, যাতে ভুলে না যাই।

লিখে ফেলার পর দেখলাম বাক্যটা কাগজে আরও ভালো দেখাচ্ছে।

○

তারপর আরেকটা জিনিস মাথায় এল, আর সেইটা নিয়ে আমি বাতি নিভানোর পরেও শুয়ে রইলাম।

রায় পড়া হওয়ার পর আমি যা চিৎকার করেছিলাম, সেটা একটা নির্দিষ্ট শব্দ ছিল। একটা দাবি। তিন অক্ষরের।

আমি চেষ্টা করলাম মনে করতে যে ওই শব্দটা আমি বলব বলে ঠিক করেছিলাম কি না।

মনে পড়ল না।

মনে পড়ল, চারদিকে সবাই বলছিল, আর তালটা এমন ছিল যে না বললে বেসুরো লাগত, আর আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল।

আমি অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করলাম মনে করতে, কারণ ব্যাপারটা আমার জানা দরকার ছিল।

তারপর ঘুমিয়ে পড়লাম।

Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.