ভর্তির খরচ চারশো বিশ টাকা।
ফরমটা আনতে গিয়ে আমি সংখ্যাটা দেখলাম, নোটিশ বোর্ডে টাইপ করা কাগজে, আর সংখ্যাটা দেখে আমি বোর্ডের সামনে থেকে সরে এলাম না, কারণ সরে এলে আবার আসতে হত।
তিতুমীর কলেজের মাঠে সেদিন রোদ ছিল। লাইনে দাঁড়ানো ছেলেমেয়েদের বেশিরভাগ এসেছে অভিভাবকসহ। বাবারা লাইনের বাইরে দাঁড়িয়ে, হাতে কাগজপত্রের ফাইল, আর মাঝে মাঝে ছেলের কানে কী যেন বলছেন। একজন মহিলা ছাতা ধরে ছিলেন মেয়ের মাথার উপর।
আমি সন্ধ্যায় খালুর বাসা থেকে চিঠি লিখলাম। চিঠিতে লিখলাম, ভর্তি ফি চারশো বিশ, বইপত্র লাগবে, আর একটা কথা লিখলাম না — যে খালুর বাসায় আমার আর থাকা যাবে না।
○
কথাটা খালু বলেছিলেন আগের রাতে, ভাত খেতে খেতে।
“মেসে থাকলে তোমার পড়ার সুবিধা হইত। কলেজের কাছে। এইখান থেকে যাওয়া-আসায় তোমার দিনটাই তো চলে যাবে।”
তিনি ঠিকই বলেছিলেন। যাওয়া-আসায় আমার দিন যেত। আর তিনি এমনভাবে বললেন যে কথাটার ভেতর কোনো কাঁটা ছিল না, আর কাঁটা না থাকাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি লাগল।
খালা কিছু বললেন না। তিনি শুধু পরদিন সকালে আমার হাতে একটা প্লাস্টিকের মগ দিলেন, নতুন, আর বললেন, “মেসে গেলে নিজের মগ লাগে। সবার সাথে মগ শেয়ার করবা না।”
তিনদিন পর মানি অর্ডার এল। পাঁচশো টাকা।
মানি অর্ডারের ফরমের নিচে ছোট্ট জায়গাটায় বাবা লিখেছিলেন — সে জায়গায় বেশি লেখা যায় না, দুই-তিন লাইন — “টাকা বুঝিয়া পাইলে চিঠি দিও। শরীরের যত্ন লইও।”
আর তার নিচে, আরও ছোট করে: “মাস্টারের ছেলের হাত পাতিতে নাই।”
আমি কাগজটা ভাঁজ করে ট্রাংকে রেখে দিলাম। বহুদিন ছিল।
○
মেসটা নাখালপাড়ায়। তিনতলা বাড়ির দোতলা, পুরোটাই মেস, চারটা ঘর।
সিট ভাড়া মাসে দুইশো পঞ্চাশ। মিল আলাদা — দিনে দুই বেলা, প্রতি মিল সাত টাকা, মাসের শেষে খাতা দেখে হিসাব। ম্যানেজার একজন আছেন, বয়স্ক, নাম মোসলেম মিয়া, তিনি খাতা রাখেন আর বাজার করেন আর কারও সঙ্গে বেশি কথা বলেন না।
আমার ঘরে ছয়টা সিট। ছয়টা চৌকি, দেয়াল ঘেঁষে, মাঝখানে হাঁটার মতো জায়গা। প্রতিটা চৌকির নিচে একটা করে টিনের ট্রাংক। জানালার কাছের সিটটা সবচেয়ে ভালো এবং সেটা পায় যে সবচেয়ে পুরনো, আর আমি সবচেয়ে নতুন, তাই আমার সিট দরজার পাশে, যেখানে সারারাত লোক ঢোকে বেরোয়।
প্রথম রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি। শব্দের জন্য না। বিছানার জন্য না।
ছয়জন মানুষ একটা ঘরে ঘুমালে ঘরটা শ্বাস নেয়। ফ্যানটা ঘুরছিল, আর ফ্যানের শব্দের নিচে ছয়জনের নিঃশ্বাসের শব্দ, একেকজনের একেক তালে, আর মাঝে মাঝে কেউ পাশ ফিরলে চৌকির কাঠ ক্যাঁচ করে উঠছিল।
আমি চোখ খুলে অন্ধকারে ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম আর ভাবছিলাম, এখানে আমি একা হতে পারব কখন।
উত্তরটা হলো: কখনো না। আর সেটা জেনে ফেলার পর ঘুমটা এসে গিয়েছিল।
○
বাদল থাকত আমার পাশের চৌকিতে।
শেরপুরের ছেলে। আমার চেয়ে এক বছরের বড়, কিন্তু একই ক্লাসে — তারও দুই বছর গেছে। মুখটা লম্বাটে, চুল ছোট করে ছাঁটা, আর কথা বলার সময় সে একটু আগে ভাবত, তারপর বলত। মেসে সে সবচেয়ে কম কথা বলা লোকদের একজন ছিল।
প্রথম সপ্তাহে সে আমাকে দুইটা জিনিস শিখিয়েছিল।
এক, মিলের খাতায় নাম কাটানোর নিয়ম। সকালে সাতটার আগে ম্যানেজারকে বলে রাখলে দুপুরের মিল কাটা যায়, তাহলে সাত টাকা বাঁচে। যারা টিউশনির বাসায় খেয়ে আসে তারা এটা করে।
দুই, নাশতা না করা। মেসে নাশতা নেই, নাশতা বাইরে। বাদল নাশতা করত না। বলত, “সকালে খাইলে বেলা এগারোটায় আবার খিদা লাগে। না খাইলে একবারেই দুপুর।”
আমি প্রথম দিকে ভেবেছিলাম এটা তার একটা তত্ত্ব। পরে বুঝলাম, এটা তত্ত্ব না, এটা হিসাব। বাদল মাসে তিনশো টাকার টিউশনি করত, আর তার থেকে দুইশো টাকা বাড়িতে পাঠাত।
তার বাবা নেই। মা আর দুই বোন।
এই কথাটা সে আমাকে বলেনি। আমি জেনেছিলাম আরও দুই মাস পরে, অন্য একজনের কাছ থেকে, আর জেনে আমার এমন লাগল যেন আমি তার ট্রাংক খুলে দেখে ফেলেছি।
○
টিউশনি খুঁজতে আমার লাগল একত্রিশ দিন।
খোঁজার নিয়ম হলো: বৈদ্যুতিক খাম্বায় সাঁটা কাগজ দেখা, আর মুদি দোকানে খবর রাখা, আর যারা টিউশনি ছাড়ছে তাদের সঙ্গে খাতির রাখা।
দুইটা জায়গা থেকে ফিরিয়ে দিয়েছিল।
প্রথম জায়গায় ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় পড়ো?”
“তিতুমীর কলেজ।”
তিনি মাথা নাড়লেন, তারপর বললেন, “আমরা আসলে ভার্সিটির ছেলে খুঁজতেছিলাম। ওরা তো সিলেবাসটা ভালো জানে।”
ছেলেটা ক্লাস সেভেনে পড়ে। সেভেনের অঙ্ক জানার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় লাগে না। আমি এই কথাটা বললাম না, আর বাইরে বেরিয়ে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো কথাটা বলা উচিত ছিল, আর তারপর মনে হলো বললে টিউশনিটা তো আরও যেত।
দ্বিতীয় জায়গায় কারণ বলেনি। শুধু বলেছিল, “আমরা জানাব।”
তৃতীয় জায়গায় হলো। মহাখালীর দিকে, ক্লাস সিক্সের এক মেয়ে, সপ্তাহে তিন দিন, মাসে তিনশো। মেয়েটার মা প্রতিদিন এক কাপ চা আর দুইটা বিস্কুট দিতেন। বিস্কুট দুইটা আমি প্রথম দিন খেয়ে ফেলেছিলাম, তারপর থেকে একটা খেতাম আর একটা পকেটে নিয়ে আসতাম।
সেটা তিনি একদিন দেখে ফেলেছিলেন। কিছু বলেননি। পরের দিন থেকে প্লেটে চারটা করে বিস্কুট আসত।
আমি তারপর আর পকেটে নিতাম না।
○
রোজার মাসটা মেসে অদ্ভুত।
মোসলেম মিয়া সেহরির জন্য রাত তিনটায় ডাকতেন, ঘরে ঘরে দরজায় টোকা দিয়ে। যারা রোজা রাখত তারা উঠত, যারা রাখত না তারাও উঠে যেত, কারণ ছয়জনের ঘরে একজন উঠলে সবাই ওঠে।
ইফতারের সময় ছাদে বসা হত। মুড়ি, ছোলা, পেঁয়াজু — মিলের বাইরে, চাঁদা করে। চাঁদা মাথাপিছু পাঁচ টাকা।
ঈদে মেস প্রায় খালি হয়ে গেল।
বাড়ি যাওয়ার ভাড়া মাগুরা পর্যন্ত বত্রিশ টাকা, আসা-যাওয়া চৌষট্টি, আর ঈদের সময় বাসের ভাড়া বাড়ে, আর বাড়ি গেলে খালি হাতে যাওয়া যায় না — বোনের ছেলের জন্য কিছু, মায়ের জন্য কিছু। সব মিলিয়ে দেড়শোর কম না।
আমি যাইনি।
বাদলও যায়নি।
ঈদের দিন সকালে আমরা দুইজন মেসের ছাদে বসে ছিলাম। নিচে গলিতে বাচ্চারা নতুন জামা পরে ঘুরছিল। দূরে কোথাও মাইকে গান বাজছিল।
বাদল বলল, “মা'রে চিঠি দিছি, লিখছি পরীক্ষা আছে।”
“তোমার তো পরীক্ষা নাই।”
“নাই।”
আমরা আর কিছু বললাম না। দুপুরে মোসলেম মিয়া যারা ছিলাম তাদের জন্য সেমাই রেঁধেছিলেন, নিজের টাকায়, আর হিসাবের খাতায় লেখেননি।
○
উনত্রিশে এপ্রিল রাতে ঝড়টা হয়।
আমরা টের পাইনি। ঢাকায় সে রাতে বৃষ্টি হয়েছিল, একটু বাতাস, ব্যস। মেসের কেউ জানালা বন্ধ করতে ওঠেনি।
সকালে রেডিওতে খবরটা এল, আর প্রথম খবরটা ছোট ছিল। উপকূলে ঘূর্ণিঝড়, ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যাচ্ছে।
তারপর সংখ্যাটা বাড়তে থাকল।
দুপুরে একরকম, বিকালে আরেকরকম, পরদিন সকালে আরেকরকম। সংখ্যাটা এমনভাবে বাড়ছিল যে কোনো একটা সংখ্যায় বিশ্বাস করা যাচ্ছিল না, আর সংখ্যাটা যত বাড়ছিল ততই সেটা সংখ্যা হয়ে যাচ্ছিল।
চট্টগ্রামের উপকূল, সন্দ্বীপ, হাতিয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালী। নামগুলো আমি মানচিত্রে দেখেছিলাম, ক্লাস নাইনের ভূগোল বইয়ে, আর নামগুলোর সঙ্গে আমার আর কোনো সম্পর্ক ছিল না।
কাগজে ছবি বেরোল তিন দিন পরে। একটা ছবিতে একটা গাছের ডালে কাপড় ঝুলছিল।
○
কলেজ থেকে ত্রাণ সংগ্রহের দল বেরোল মে মাসের প্রথম সপ্তাহে।
আমি যাইনি প্রথম দিন। যাওয়ার কথাও ছিল না। ক্লাসের এক ছেলে করিডরে আমাকে দেখে বলল, “এই, তুমি ফ্রি আছো না? চলো।”
আমি ফ্রি ছিলাম।
মাঝারি সাইজের বিস্কুটের টিন, ঢাকনায় ফুটো কেটে, গায়ে সাদা কাগজে লেখা — ঘূর্ণিঝড় দুর্গতদের সাহায্যার্থে। আর একটা ব্যানার, দুইজনে ধরতে হয়, বাঁশের সঙ্গে বাঁধা।
আমরা দশ-বারোজন। ফার্মগেটের ওভারব্রিজের নিচে দাঁড়ালাম।
প্রথম আধঘণ্টা আমার হাত-পা চলছিল না। আমি টিনটা ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আর লোকজন পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিল আর আমি কাউকে ডাকতে পারছিলাম না। ডাকতে হলে গলা তুলতে হয়, আর গলা তুললে সবাই তাকায়।
তারপর একজন লোক নিজে এসে দশ টাকা ফেললেন।
তিনি কিছু বললেন না, টাকাটা ফুটোয় ঢুকিয়ে চলে গেলেন, আর টিনের ভেতর কাগজের নোটের কোনো শব্দ হয় না, কিন্তু আমার কানে একটা শব্দ হলো।
তারপর আমি ডাকতে শুরু করলাম।
○
আমরা সেদিন ফার্মগেট থেকে হেঁটে কারওয়ানবাজার, তারপর বাংলামোটর, তারপর শাহবাগ।
শাহবাগে গিয়ে আমরা মোড়ের চার কোণে ছড়িয়ে পড়লাম। আমি পড়লাম জাদুঘরের দিকটায়।
বিকেল হয়ে আসছিল। রিকশার জট, বাসের হর্ন, আর আমি ব্যানারের একটা মাথা ধরে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে ডাকছিলাম, আর সিগন্যালে গাড়ি থামলে জানালা দিয়ে হাত বেরিয়ে আসছিল।
একটা বেবিট্যাক্সি থেকে এক ভদ্রমহিলা পঞ্চাশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিলেন। পঞ্চাশ।
আমার হাতে টিন, ব্যানারের বাঁশটা কাঁধে ঠেকানো, গলা বসে গেছে, শার্ট ঘামে ভেজা — আর আমি ঠিক তখন খেয়াল করলাম যে লোকজন আমাকে দেখছে।
তাকিয়ে দেখছে। থেমে দেখছে। পকেটে হাত দিচ্ছে।
চার মাস আগে আমি এই মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম আর কেউ আমাকে দেখেনি। ফুলের দোকানের ছেলেটা দেখেছিল, দাম বলেছিল, তারপর আঙুল চালাতে লেগে গিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তায় ছেলেমেয়েরা আমার ভেতর দিয়ে হেঁটে গিয়েছিল।
আজ আমার হাতে একটা টিন ছিল, আর টিনের গায়ে একটা কাগজ, আর কাগজে লেখা ছিল আমি কেন এখানে দাঁড়িয়ে আছি।
সন্ধ্যায় আমরা কলেজে ফিরে টাকা গুনলাম। মেঝেতে বসে, নোট আলাদা করে, কয়েন আলাদা করে। এগারোজনের সাত টিনে উঠেছিল চার হাজার তিনশো বিরাশি টাকা পঞ্চাশ পয়সা।
কেউ একজন হাততালি দিল, তারপর সবাই দিল।
○
রাতে মেসে ফিরে দেখি বাদল চৌকিতে বসে আছে, সামনে খোলা ট্রাংক।
সে টাকা গুনছিল। টিউশনির তিনশো, তার থেকে আলাদা করে রেখেছে দুইশো — মানি অর্ডারের জন্য।
আমি বললাম, “আজকে চার হাজারের উপরে উঠছে। এগারোজনে।”
সে মাথা নাড়ল। তারপর বাকি একশো টাকা থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করে আলাদা রাখল।
“এইটা কী?”
“কালকে দিমু। তোদের ওই টিনে।”
আমি কিছু বললাম না।
সারাদিন আমি ওই টিনটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সাত ঘণ্টা। গলা বসে গিয়েছিল, পায়ের পাতা ব্যথা করছিল, আর ফেরার পথে আমার খিদা লাগেনি।
টিনের ভেতর আমার নিজের একটা পয়সাও ছিল না।
কথাটা আমার মাথায় সন্ধ্যায় আসেনি, টাকা গোনার সময়ও আসেনি, হাততালির সময়ও না।
এল বাদলের ট্রাংকের সামনে দাঁড়িয়ে।