FF.
৩ আজিজের সিঁড়ি Book page

Chapter 3

৩ আজিজের সিঁড়ি

Oct 19, 2026 14 min read

সপ্তাহে চার দিন আমার কিছু করার ছিল না।

টিউশনি সপ্তাহে তিন দিন — শনি, সোম, বুধ, বিকাল পাঁচটা থেকে সাড়ে ছয়টা। কলেজে ক্লাস হত না, বা হত, কিন্তু গেলেও যা না গেলেও তা। মেসে দিনের বেলা থাকা যেত না, কারণ দিনের বেলা মেসের ঘরে থাকলে যারা ঘুমায় তারা বিরক্ত হয়, আর যারা ঘুমায় না তারা কথা বলতে চায়।

তাই আমি বেরিয়ে পড়তাম।

মে মাসে ত্রাণের টিন হাতে হেঁটে হেঁটে আমি রাস্তাগুলো শিখে গিয়েছিলাম। ফার্মগেট থেকে কারওয়ানবাজার, বাংলামোটর, তারপর শাহবাগ — হাঁটলে চল্লিশ মিনিট, বাসে দুই টাকা। হাঁটলে দুই টাকা বাঁচে, আর সময়টা এমনিতেই আমার কাছে বাড়তি ছিল।

জুলাইয়ের মাঝামাঝি আমার বিশ বছর হলো। মেসে কেউ জানত না। বাড়ি থেকে চিঠি এসেছিল, তাতে মা লিখিয়েছিলেন — মা নিজে লেখেন না, বাবা লিখে দেন — “তোমার জন্মদিনে দোয়া করি।” আমি চিঠিটা ট্রাংকে রাখলাম আর সেদিন বিকালে হেঁটে শাহবাগ গেলাম।

জাদুঘরটা তখনো একইরকম। সাদা, চারকোনা, ছোট জানালা। আমি গেটের সামনে দিয়ে হেঁটে গেলাম।

○

কলেজটা নিয়ে বলার মতো কিছু ছিল না, আর সেটাই ছিল সমস্যা।

তিতুমীরে ক্লাস হত সকালে। বিশাল একটা হলঘর, দুইশো ছেলেমেয়ে, স্যার সামনে দাঁড়িয়ে নোট ডিকটেশন দিতেন। আমরা লিখতাম। যারা লিখত না তারা পিছনের বেঞ্চে বসে গল্প করত, আর সামনের দিকে বসা মেয়েরা লিখত, আর মাঝখানে আমরা কেউ কেউ অর্ধেক লিখতাম।

প্রথম দুই মাস আমি নিয়ম করে যেতাম। খাতা নিতাম, লিখতাম।

তারপর একদিন খেয়াল করলাম যে যা লেখাচ্ছেন তা গাইড বইতে হুবহু আছে, শব্দে শব্দে, আর গাইড বইটার দাম চব্বিশ টাকা, আর সেটা মেসে দুইজনের কাছে আছে।

তারপর থেকে আমার যাওয়া কমে গেল।

কলেজে আমার বন্ধু হয়নি। হওয়ার কথাও না — মেসে ফেরার তাড়া, টিউশনির তাড়া, আর ক্যান্টিনে বসতে হলে খেতে হয়। যারা ক্যান্টিনে বসত তারা মাসে দুইশো-আড়াইশো টাকা ওখানেই খরচ করত, আর সেটা তারা করত কারণ তারা পারত।

একদিন করিডরে দাঁড়িয়ে দুইজন কথা বলছিল, আমার সামনেই, আমাকে না দেখে।

একজন বলল, “তুই ভার্সিটিতে ট্রাই করবি না আর?”

আরেকজন বলল, “এইখানে যখন ভর্তি হয়াই গেলাম। এখন আর কী।”

“হইলে হইতে পারত।”

“হইলে তো হইতই।”

তারা হেসে ফেলল, দুইজনেই, আর হাসিটা কার দিকে ছিল সেটা আমি বুঝতে পারলাম না, আর বুঝতে না পারাটাই আমাকে সারাদিন ধরে খেল।

আমি বেরিয়ে এসেছিলাম, আর মহাখালী থেকে হেঁটে ফার্মগেট গিয়েছিলাম, আর সেখান থেকে হেঁটে শাহবাগ।

○

আজিজ মার্কেটটা আমি প্রথম দেখেছিলাম ফেব্রুয়ারিতে, ঢোকার কথা মাথায় আসেনি।

দোতলা-তিনতলা একটা মার্কেট, এলিফ্যান্ট রোডের গোড়ায়, শাহবাগের মোড় থেকে হাঁটাপথ। সামনে রিকশার সারি। নিচতলায় দোকানপাট, খাবারের দোকান, ফটোকপির দোকান। বাইরে থেকে দেখলে আর দশটা মার্কেটের মতোই — সাইনবোর্ড, ঝুলন্ত তার, দেয়ালে পোস্টারের উপর পোস্টার।

জুলাইয়ের এক বিকালে আমি ভেতরে ঢুকলাম, কারণ বৃষ্টি এসেছিল।

ঢুকে প্রথমে একটা করিডর। ফ্লুরোসেন্ট বাতি, দুই পাশে দোকান, মেঝেতে ভেজা পায়ের ছাপ। বাতাসে ফটোকপির টোনারের গন্ধ, আর তার সঙ্গে সিগারেট, আর তার নিচে ভেজা কংক্রিটের গন্ধ।

আমি করিডর ধরে হেঁটে গেলাম, একবারও না থেমে।

না থামার একটা কারণ ছিল। থামলে দোকানদার জিজ্ঞেস করে — কী লাগবে? আর কী লাগবে প্রশ্নের উত্তরে যদি বলতে হয় কিছু না, তাহলে পরের বাক্যটা আসে: তাইলে দাঁড়ায়া আছেন ক্যান।

করিডরের শেষে সিঁড়ি। সিঁড়িটা চওড়া, আর মাঝখানে ঘোরানো, আর সিঁড়ির রেলিংয়ে হেলান দিয়ে তিনজন লোক দাঁড়িয়ে কথা বলছিল।

আমি পাশ কাটিয়ে উপরে উঠে গেলাম।

দোতলায় আরেকটা করিডর, একইরকম, কিন্তু এখানে দোকানের চরিত্র আলাদা। কাপড়ের দোকান কম। বইয়ের দোকান আছে। একটা প্রেস — ভেতরে মেশিন চলছিল, ছাপার কালির গন্ধ বেরোচ্ছিল। একটা দরজার উপর কাঠের ফলকে একটা পত্রিকার নাম লেখা, আর দরজাটা খোলা, আর ভেতরে দুইজন লোক বসে চা খাচ্ছিল।

আমি সব দেখলাম হাঁটতে হাঁটতে, চোখ সোজা রেখে, যেন কোথাও যাচ্ছি।

তারপর দোতলার শেষ মাথায় বইয়ের দোকানটার সামনে এসে আমি থেমে গেলাম।

থেমে গেলাম কারণ ভেতরে আলো ছিল আর আলোর নিচে বই ছিল, আর বইগুলো সাজানো ছিল এমনভাবে যে মলাটগুলো দেখা যাচ্ছিল, মেরুদণ্ড না।

মাগুরার লাইব্রেরিতে বই থাকত আলমারিতে, তালা দেওয়া, আর তালার চাবি লাইব্রেরিয়ানের পকেটে, আর বই চাইলে তিনি উঠে গিয়ে বের করে দিতেন। বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকার কোনো ব্যবস্থা ওখানে ছিল না।

○

দোকানটার ভেতরে আমি প্রথম দিন ঢুকিনি। বাইরে থেকে দেখেছিলাম, দশ মিনিট, তারপর বৃষ্টি ধরে গেলে বেরিয়ে গিয়েছিলাম।

দ্বিতীয় দিন ঢুকলাম।

ভেতরটা ছোট, কিন্তু ছোট মনে হয় না, কারণ দেয়ালের গা বেয়ে ছাদ পর্যন্ত তাক। মাঝখানে টেবিলের উপর নতুন বই। একপাশে কাউন্টার, কাউন্টারের পিছনে একজন লোক বসে, বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, চশমা, আর তিনি একটা খাতায় কী যেন লিখছিলেন।

আমি ঢুকলাম আর দাঁড়িয়ে রইলাম।

তিনি একবার তাকালেন। শুধু তাকালেন। কিছু বললেন না।

আমি একটা বই তুললাম। কেন ওইটাই তুললাম জানি না — হাতের কাছে ছিল। উপন্যাস। লেখকের নাম আমি চিনি, মাগুরার লাইব্রেরিতে তাঁর বই ছিল।

মলাটটা উল্টে ভেতরের ফ্ল্যাপে দাম লেখা: পঁয়ষট্টি টাকা।

পঁয়ষট্টি টাকা মানে নয়টা মিল। সাড়ে চার দিন।

আমি বইটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে শুরু করলাম।

প্রথম পাতা পড়লাম, তারপর দ্বিতীয়, তারপর তৃতীয়। বারো-চৌদ্দ পাতা পড়ার পর আমার হাত ব্যথা করতে লাগল, কারণ বই হাতে ধরে দাঁড়িয়ে পড়লে কব্জিতে চাপ পড়ে, আর এইটা আমি সেদিনই প্রথম জানলাম।

আমি বইটা বন্ধ করে যেখান থেকে নিয়েছিলাম সেখানেই রেখে দিলাম।

বেরোনোর সময় কাউন্টারের লোকটা মাথা তুললেন না।

তৃতীয় দিন গিয়ে আমি একই বই তুললাম, আর চোদ্দ পাতা থেকে শুরু করলাম।

○

এইভাবে আমার একটা নিয়ম তৈরি হয়ে গেল।

সপ্তাহে চার দিন — রবি, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শুক্র। শুক্রবার মার্কেট দেরিতে খোলে, তাই শুক্রবার আমি বিকালে যেতাম।

দোকানে ঢুকে আমি বাঁ দিকের তাকের সামনে দাঁড়াতাম, কারণ ওই জায়গাটা দরজা থেকে দেখা যায় না, আর কাউন্টার থেকেও আধা-আড়াল। বই নিতাম, দাঁড়িয়ে পড়তাম, চল্লিশ-পঞ্চাশ পাতা, তারপর রেখে দিতাম।

সমস্যা হলো জায়গা মনে রাখা।

পাতার কোণ মোড়ানো যায় না। কাগজের টুকরো গুঁজে রাখা যায় না, কারণ পরের দিন এসে দেখব কেউ বইটা কিনে নিয়ে গেছে বা সরিয়ে রেখেছে। তাই আমি মুখস্থ রাখতাম — পাতার নম্বর না, শেষ বাক্যটা।

মাসখানেকের মধ্যে আমার মাথায় সাত-আটটা বইয়ের শেষ বাক্য থাকত একসঙ্গে।

দুইবার আমার বই হারিয়ে গেছে। একবার কেউ কিনে নিয়েছিল, আরেকবার তাকের জায়গা বদল হয়েছিল আর আমি নতুন জায়গায় খুঁজে পেয়েছিলাম দুই সপ্তাহ পরে, ততদিনে শেষ বাক্যটা ভুলে গেছি, আর তিরিশ পাতা আবার পড়তে হয়েছিল।

কাউন্টারের লোকটা কোনোদিন কিছু বলেননি।

এইটা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। তিনি নিশ্চয়ই দেখতেন। প্রতি সপ্তাহে চার দিন একটা ছেলে এসে দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বই পড়ে যায় আর কোনোদিন কিছু কেনে না — এটা দেখতে কোনো বিশেষ চোখ লাগে না।

একদিন তিনি একটা টুল সরিয়ে দেয়ালের কাছে রাখলেন। আমার দিকে তাকিয়ে না। তিনি টুলটা সরালেন, তারপর কাউন্টারে ফিরে গিয়ে খাতায় লিখতে লাগলেন।

আমি সেদিন টুলে বসলাম না। পরদিন বসলাম।

○

তাকের একদম নিচের থাকে জিনিসগুলো ছিল।

বই না। মলাট নরম, কাগজ খসখসে, ছাপা কোথাও গাঢ় কোথাও হালকা। পাতলা — বিশ পাতা, তিরিশ পাতা। কোনোটার মলাটে কেবল একটা নাম আর একটা সংখ্যা, আর নিচে ছোট করে দাম, পাঁচ টাকা, সাত টাকা।

আমি প্রথমবার ওগুলো তুলে দেখে ভেবেছিলাম নষ্ট মাল।

সত্যিই তাই ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম ছাপাখানায় কিছু গোলমাল হয়েছে, বা বিক্রি হয়নি, তাই নিচের তাকে ফেলে রাখা হয়েছে সস্তায় ছেড়ে দেওয়ার জন্য। মাগুরার লাইব্রেরিতে এরকম একটা তাক ছিল, ছেঁড়া বইয়ের।

একটা তুলে খুললাম।

ভেতরে কবিতা। তারপর একটা লেখা, যেটা গল্প না প্রবন্ধ বোঝা যাচ্ছে না। তারপর আরেকটা কবিতা, যেটার লাইনগুলো পাতার মাঝখান থেকে শুরু হয়েছে, আর একটা লাইনে শুধু একটা শব্দ।

শেষ পাতায় ছোট করে লেখা: সম্পাদক, তারপর একটা নাম, তারপর একটা ঠিকানা — এবং ঠিকানাটা এই মার্কেটেরই।

দোকানের লোকটা তখন কাউন্টারে।

আমি জিজ্ঞেস করতে গিয়ে করলাম না। প্রশ্নটা কী হবে সেটাই আমি সাজাতে পারছিলাম না। “এইগুলা কী?” — প্রশ্নটা এমন যে জিজ্ঞেস করলেই বোঝা যায় লোকটা কিছু জানে না।

আমি জিনিসটা আধা ঘণ্টা ধরে উল্টেপাল্টে দেখলাম, প্রতিটা পাতা, বিজ্ঞাপন পর্যন্ত — বিজ্ঞাপন ছিল না, একটাও না, আর সেটা আমার চোখে পড়ল কিন্তু কেন সেটা অস্বাভাবিক তা তখন বুঝিনি।

তারপর যেখান থেকে নিয়েছিলাম সেখানে রেখে দিলাম।

পাঁচ টাকা আমার পকেটে ছিল।

○

চায়ের ব্যবস্থাটা ছিল সিঁড়ির গোড়ায়।

দোতলায় ওঠার সিঁড়ির নিচের ফাঁকা জায়গাটায় একটা টেবিল, তার উপর ফ্লাস্ক, কাচের গ্লাস উপুড় করে সাজানো, বিস্কুটের বয়াম, আর একটা প্লাস্টিকের বালতিতে ধোয়ার পানি।

চা বানাত মজনু।

বয়স সতেরো, আমার চেয়ে তিন বছরের ছোট। রোগা, লম্বা, হাতা গোটানো শার্ট। সে সারাদিন ওখানে থাকত, সকাল নয়টা থেকে রাত নয়টা, আর দোতলা-তিনতলায় চা দিয়ে আসত ট্রেতে করে, ছয়-সাত গ্লাস একসঙ্গে, সিঁড়ি বেয়ে উঠত দৌড়ে।

চা দুই টাকা।

প্রথম দিন আমি চা খাইনি। দ্বিতীয় সপ্তাহে খেয়েছিলাম, দাম দিয়েছিলাম।

তারপর একদিন আমার পকেটে ভাঙতি ছিল না। পাঁচ টাকার একটা নোট ছিল, আর সেটা ভাঙালে সন্ধ্যার বাসভাড়া নিয়ে টানাটানি হত।

আমি বললাম, “মজনু, আজকে থাক।”

সে বলল, “খান। কাল দিয়েন।”

“না, থাক।”

সে গ্লাসটা এগিয়ে দিল। “খাতায় লেইখা রাখি। সবাই তো খাতায় খায়।”

খাতাটা ছিল একটা স্কুলের খাতা, দুই টাকার, আর তার ভেতরের পাতায় নামের পাশে দাগ কাটা। আমি ঝুঁকে দেখলাম। কিছু নামের পাশে অনেক দাগ। একটা নামের পাশে এত দাগ যে সেটা আর গোনা যায় না।

“ওইটা কার?”

“কামরুল ভাইয়ের।”

“উনি দেন না?”

“দেয়। মাসে-দুই মাসে একবার। যেদিন পায় সেদিন সবার টা দিয়া দেয়।”

মজনু আমার নামটা লিখল খাতায়, বানান জিজ্ঞেস করে, আর তার হাতের লেখা ছিল ছোট ছোট আর গোল গোল, ক্লাস ফাইভের হাতের লেখার মতো, আর পরে জেনেছিলাম সে ক্লাস ফাইভ পর্যন্তই পড়েছে।

সেই মাসে আমার খাতায় দাগ পড়ল এগারোটা।

○

মজনু কোথায় থাকে সেটা আমি জেনেছিলাম দুর্ঘটনাক্রমে।

একদিন আমি বেরোতে দেরি করে ফেলেছিলাম। দোকান বন্ধ, করিডরের বাতি অর্ধেক নেভানো, আর সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে দেখি মজনু টেবিলটা দেয়ালের সঙ্গে ঠেসে দাঁড় করাচ্ছে, আর সিঁড়ির নিচের ফাঁকা জায়গাটায় একটা পাটি বিছাচ্ছে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি এইখানে থাকো?”

সে বলল, “হ।”

“রোজ?”

“রোজ। রাইতে দারোয়ান তালা দেয়, আমি ভিতরে।”

মার্কেটে দুইজন থাকে, সে বলল — সে আর তিনতলার এক দোকানের কর্মচারী। রাত নয়টায় শাটার নামে, তারপর পুরা বিল্ডিং তাদের।

“ভয় করে না?”

“কিসের ভয়?” সে পাটির উপর একটা কাঁথা রাখল। “গেরামে থাকলে ভয় করত। এইখানে তো তালা।”

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।

মজনুর বাড়ি নেত্রকোনায়। তেরো বছর বয়সে এসেছে, চাচার সঙ্গে, চাচা মিরপুরে রিকশা চালায়। প্রথমে সে-ও গ্যারেজে থাকত, তারপর এই কাজটা পেয়ে মার্কেটে চলে এসেছে, কারণ এইখানে থাকা-খাওয়া নাই, শুধু বেতন — কিন্তু থাকার জায়গাটা ফ্রি, আর বেতনের পুরাটা বাড়িতে যায়।

সে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছে।

আমি বললাম, “তোমার তো এইখানে এত বই।”

সে হাসল। প্রথমবার আমি তাকে হাসতে দেখলাম।

“বই দিয়া কী করুম?”

প্রশ্নটার উত্তর আমার কাছে ছিল না। আর আমার হাতে তখন কোনো বই ছিল না, কারণ যেটা পড়ছিলাম সেটা তাকে রেখে এসেছি, আর সেটা আমার না, আর কোনোদিন হবেও না।

আমি নেমে গেলাম। পিছনে সিঁড়ির নিচের বাতিটা নিভে গেল।

○

তর্কটা আমি শুনেছিলাম আগস্টে, সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে।

দোতলা আর তিনতলার মাঝখানে একটা চওড়া ল্যান্ডিং আছে, আর সেখানে একটা জানালা, আর জানালার কাছে বিকালের দিকে লোক জমত। আমি সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলাম, আর ল্যান্ডিংয়ে চারজন দাঁড়িয়ে ছিল, আর তাদের পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়ে আমি থেমে গেলাম।

থেমে গেলাম কারণ একজন খুব জোরে কথা বলছিল।

“—তুই যদি এইটা দেশে ছাপাস, তাইলে তোর লেখাটা আর তোর থাকল না। তখন ওইটা ওদের।”

“লেখা তো লেখাই। কোথায় ছাপল তাতে কী?”

“তাতে কী মানে? তাতে সব। তুই কার টেবিলে বইসা খাইতেছস সেইটাই তো কথা।”

“তাইলে না ছাপায়া রাইখা দিলে কী হয়? পড়ব কে?”

“পড়ব যারা পড়ে। বিশজন। বিশজন যথেষ্ট। বিশজন না হইলে দশজন।”

আরেকজন হাসল। “দশজন! ভাই, দশজনের জন্য লিখলে ঘরে বইসা লিখেন, ছাপান ক্যান?”

আমি রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আর একটা কথাও নড়তে পারছিলাম না।

শব্দগুলো বাংলা। আলাদা করে প্রতিটা শব্দ আমি চিনি। “প্রতিষ্ঠান” শব্দটা আমি জানি — স্কুল একটা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক একটা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ওরা যেভাবে বলছিল, তাতে শব্দটার অর্থ অন্য কিছু, আর সেই অর্থটা ওরা চারজনই জানে, আর সেটা কেউ কাউকে বুঝিয়ে বলছে না, কারণ বুঝিয়ে বলার দরকার নেই।

একজন বলল, “ফর্মের প্রশ্নটা তুই আবার ঘুরায়া আনতেছস।”

আরেকজন বলল, “ফর্ম ছাড়া রাজনীতি হয় না। ফর্মই রাজনীতি।”

তৃতীয়জন বলল, “এইটা তুই সুবিমল থেকে বলতেছস, কিন্তু সুবিমল যেইটা করে সেইটা তুই করতে পারবি না, কারণ তোর ভয় আছে।”

চতুর্থজন বলল কিছু, নিচু গলায়, আর তাতে বাকিরা চুপ হয়ে গেল।

তারপর একজন হেসে বলল, “মজনু, চা!”

আর তখনই তারা সরে দাঁড়াল, আমার জন্য না, চায়ের জন্য, আর আমি উপরে উঠে গেলাম।

○

সেদিন রাতে মেসে ফিরে আমি খাতার পিছনের পাতায় লিখলাম:

প্রতিষ্ঠান ফর্ম সুবিমল

তিনটা শব্দ। তারপর তাকিয়ে রইলাম।

প্রথম দুইটা শব্দ আমি জানি এবং জানি না। তৃতীয়টা একটা মানুষের নাম, কিন্তু কোন মানুষ, তা আমি জানি না, আর কাকে জিজ্ঞেস করব তাও জানি না, কারণ জিজ্ঞেস করতে হলে আগে বলতে হয় আমি এইটা কোথায় শুনেছি, আর আমি শুনেছি সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে, লুকিয়ে।

বাদল চৌকিতে শুয়ে বই পড়ছিল, তার নিজের সিলেবাসের বই।

সে বলল, “কী লিখস?”

“কিছু না।”

সে আর জিজ্ঞেস করল না।

আমি খাতাটা বন্ধ করে ট্রাংকে রাখলাম, আর শুয়ে পড়লাম, আর অন্ধকারে শব্দ তিনটা আমার মাথায় ঘুরতে থাকল, আর আমি বুঝলাম যে আমি এগুলো ভুলব না।

○

দোতলার যে দরজাটার উপর কাঠের ফলকে পত্রিকার নাম লেখা, সেই দরজাটা আমি প্রায়ই খোলা দেখতাম।

ভেতরে একটা ঘর। বড় না। একটা টেবিল, কয়েকটা চেয়ার, দেয়ালে তাক, তাকে বাঁধাই করা পুরনো সংখ্যা। মেঝেতে কাগজের বান্ডিল, দড়ি দিয়ে বাঁধা। সিলিং ফ্যান, আর ফ্যানের বাতাসে টেবিলের কাগজ উড়ত বলে কাগজের উপর একটা পাথর চাপা দেওয়া থাকত।

বিকালের দিকে ওখানে লোক বসত। তিনজন, চারজন, কখনো সাতজন — তখন চেয়ার কম পড়ে যেত আর কেউ কেউ টেবিলের কোণে বসত।

আমি দরজার সামনে দিয়ে হেঁটে যেতাম, দিনে চার-পাঁচবার।

সেপ্টেম্বরের এক বিকালে ঘরটা প্রায় খালি ছিল। একজন লোক টেবিলে বসে প্রুফ দেখছিলেন, লাল কলম দিয়ে।

আমি দরজার সামনে দাঁড়ালাম।

কী বলব, সেটা আমি হাঁটতে হাঁটতে ঠিক করে ফেলেছিলাম। বলব — আমি লেখালেখি করি। এইটা মিথ্যা না, আমি খাতায় লিখি, কিন্তু কেউ পড়েনি। অথবা বলব — আপনাদের পত্রিকাটা কোথায় পাওয়া যায়। এইটাও চলে, আর এইটায় ঝুঁকি কম।

লোকটা মাথা তুললেন না। তিনি প্রুফ দেখছিলেন আর মাঝে মাঝে ঠোঁট নেড়ে পড়ছিলেন।

আমি দরজার চৌকাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভেতরে ঢুকতে হলে এক পা।

তারপর সিঁড়ির দিক থেকে দুইজনের গলা শোনা গেল, তারা উঠে আসছে, আর আমি সরে গিয়ে করিডর ধরে হাঁটতে লাগলাম, যেন আমি কোথাও যাচ্ছি।

করিডরের শেষ মাথায় গিয়ে আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। ওরা দুইজন ঘরটায় ঢুকে গেছে। দরজা খোলাই।

আমি বইয়ের দোকানে চলে গেলাম।

সেদিন আমি ছেষট্টি পাতা পড়েছিলাম, যেটা আমার রেকর্ড, আর একটা লাইনও মনে ছিল না।

○

সেপ্টেম্বরে একদিন দোকান বন্ধ হওয়ার সময় হয়ে গেছে আর আমি তখনো দাঁড়িয়ে।

সেদিন যে বইটা পড়ছিলাম সেটা উপন্যাস না। পাতলা বই, সাদাটে মলাট, ছিয়াত্তর সালের ছাপা। নামটা আমি তাকে দেখে তুলেছিলাম, কারণ নামটা বাক্যের মতো, আর বাক্যটা এমন যে পড়ার পর মাথা থেকে যায় না।

আমি সাঁইত্রিশ পাতায় ছিলাম, আর সাঁইত্রিশ পাতার ভেতর আমি তিনবার থেমে গিয়ে আবার প্রথম থেকে পড়েছিলাম, কারণ লোকটা এমন সব কথা লিখেছেন যা আমাদের বাড়িতে, আমাদের বাজারে, আমাদের ইশকুলে কেউ বলে না — বলে না বলে না, বলা যায় না।

কাউন্টারের লোকটা শাটার নামানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

তখন দরজা দিয়ে একজন ঢুকলেন।

লম্বা না, বেঁটেও না। পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি বয়স। কাঁধে একটা কাপড়ের ঝোলা, ঝোলাটা ভারী, আর মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। তিনি কাউন্টারের লোকটাকে কিছু একটা বললেন, লোকটা হেসে মাথা নাড়লেন, তারপর তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন।

আর ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখলেন।

আমি বই হাতে দাঁড়িয়ে। তিনি এক সেকেন্ড আমার দিকে তাকালেন, তারপর তাকালেন আমার হাতের বইয়ের দিকে, তারপর আবার আমার দিকে।

তিনি বললেন, “এইটা যে লিখছে, সে এই মার্কেটেই বসে।”

তারপর বেরিয়ে গেলেন।

আমি কিছু বলিনি। বলার মতো কিছু ছিল না — আমি জানতাম না বইটা কে লিখেছে, মানে নামটা মলাটে ছিল, আমি পড়েছি, কিন্তু নামটা আমার কাছে শুধু একটা নাম ছিল, আর “সে এই মার্কেটেই বসে” কথাটার মানে আমি বুঝতে পারিনি — কোথায় বসে, কোন দোকানে, কেন বসে।

আর যতক্ষণে আমার মাথায় এল যে আমি কিছু জিজ্ঞেস করতে পারতাম, ততক্ষণে তিনি সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেছেন।

কাউন্টারের লোকটা শাটার টানতে টানতে বললেন, “বন্ধ করব ভাই।”

আমি বইটা তাকে রেখে বেরিয়ে এলাম।

সিঁড়ির গোড়ায় মজনু গ্লাস ধুচ্ছিল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “যে বাইর হইয়া গেল, উনি কে?”

“কোন জন?”

“ঝোলা কাঁধে। দাড়ি।”

মজনু গ্লাস ধোয়া থামাল না। “কামরুল ভাই।”

○

মেসে ফিরতে সেদিন রাত হয়ে গেল।

গেটে তালা পড়ে গিয়েছিল, মোসলেম মিয়াকে ডেকে তুলতে হলো, তিনি বিরক্ত হয়ে কিছু বললেন না, শুধু তালা খুলে ফিরে গেলেন।

বাদল জেগে ছিল।

“এত রাইত?”

“বই পড়তেছিলাম।”

“কই?”

“একটা দোকানে।”

সে উঠে বসল। “দোকানে বই পড়া যায়?”

আমি কী বলব বুঝতে পারলাম না। বললাম, “কেউ কিছু বলে না।”

বাদল খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “কিনস না ক্যান?”

“পয়সা নাই।”

“পয়সা নাই তো পড়তেছস ক্যান?”

প্রশ্নটা সে খোঁচা দিয়ে করেনি। সে সত্যিই জানতে চেয়েছিল। বাদলের কাছে জিনিসটার একটা হিসাব থাকতে হবে — পড়লে কী হয়, পড়ে কী হবে, কোন পরীক্ষায় আসবে।

আমি বললাম, “এমনি।”

সে শুয়ে পড়ল। যাওয়ার আগে বলল, “খাওয়া রাখছিলাম। ঢাকা দেওয়া আছে।”

সে আমার মিলের ভাত ঢেকে রেখেছিল। নিজের মিল থেকে না, আমার নাম খাতায় ছিল, ভাত আমার প্রাপ্য — কিন্তু ঢেকে রাখাটা তার কাজ ছিল না।

আমি ভাত খেলাম, ঠান্ডা, ডাল জমে গেছে।

তারপর ট্রাংক খুলে খাতাটা বের করলাম আর পিছনের পাতায় শব্দ তিনটার নিচে আরেকটা নাম লিখলাম:

কামরুল

○

সেই মাসে আমি হিসাব করে দেখলাম।

সেপ্টেম্বরে আজিজে গেছি সতেরো দিন। দাঁড়িয়ে পড়েছি — মোটামুটি হিসাবে — দুইশো বারো পাতা। চারটা বই, তার একটাও শেষ হয়নি।

মজনুর খাতায় আমার দাগ ছিল এগারোটা। বাইশ টাকা।

আমি টাকাটা শোধ দিয়েছিলাম মাসের শেষে, টিউশনির টাকা পাওয়ার দিন, একবারে।

মজনু কলম দিয়ে দাগগুলোর উপর একটা লম্বা টান দিল, তারপর বলল, “আবার লিখা শুরু করি?”

আমি বললাম, “করো।”

Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.