Posts

গল্প

MS রায়: শ্মশানের শেষ ছায়া

June 30, 2026

SANJIB ROY

44
View

বর্ষার রাত। আকাশে বিদ্যুতের ঝলকানি আর দূরে বজ্রের গর্জন। সাংবাদিক ও শখের গোয়েন্দা MS রায় একটি রহস্যময় চিঠি পেল।

চিঠিতে মাত্র কয়েকটি লাইন—

"যদি সত্য জানার সাহস থাকে, তবে আজ রাত বারোটায় কালীতলা শ্মশানে এসো। সেখানে মৃত মানুষ কথা বলে।"

চিঠির নিচে কোনো নাম নেই।

MS রায় অদ্ভুত ঘটনায় অভ্যস্ত। তাই ভয়কে গুরুত্ব না দিয়ে ক্যামেরা, টর্চ আর একটি নোটবুক নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

রাত ঠিক বারোটায় সে কালীতলা শ্মশানে পৌঁছাল।

শ্মশান প্রায় একশো বছরের পুরোনো। চারদিকে বিশাল বটগাছ, ভাঙা চিতা, ছাই আর অদ্ভুত নীরবতা।

হঠাৎ—

খট... খট... খট...

কেউ যেন কাঠের খড়ম পরে হাঁটছে।

MS রায় টর্চের আলো ফেলতেই কাউকে দেখা গেল না।

ঠিক তখনই বাতাসে ভেসে এল এক নারীর কান্না।

সে শব্দ অনুসরণ করতে করতে পৌঁছাল একটি ভাঙা মন্দিরের সামনে।

দেয়ালে রক্তের মতো লাল রঙে লেখা—

"ফিরে যাও... না হলে তুমিও মরবে।"

MS রায় দেয়াল ছুঁতেই লেখাটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

সে অবাক।

ঠিক তখনই পিছন থেকে একটি বৃদ্ধের কণ্ঠ—

"ওখানে দাঁড়িও না বাবা।"

ঘুরে দেখে এক বৃদ্ধ।

বৃদ্ধ বললেন, "পনেরো বছর আগে এখানে পাঁচজন যুবক নিখোঁজ হয়েছিল। সবাই বলত, তাদের ভূত এখনও ঘোরে।"

MS রায় জিজ্ঞেস করল,

"আপনি জানলেন কীভাবে?"

বৃদ্ধ শুধু হাসলেন।

"কারণ... আমি তাদের একজন।"

কথা শেষ হতেই বৃদ্ধ হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

MS রায় স্তব্ধ।

এটা কি সত্যিই ভূত?

নাকি কারও কৌশল?

সে চারদিকে খুঁজতে শুরু করল।

একটি পুরোনো সমাধির পাশে মাটিতে জুতোর ছাপ।

ভূতের তো জুতো লাগে না!

সে ছাপ অনুসরণ করতেই জঙ্গলের ভিতরে একটি লুকোনো ঘর দেখতে পেল।

ঘরের ভিতরে ঢুকে সে আরও বিস্মিত।

দেয়ালে অসংখ্য মানুষের ছবি।

সবাই নিখোঁজ।

এক কোণে কম্পিউটার, ক্যামেরা আর রেকর্ডিং যন্ত্র।

তাহলে কেউ ইচ্ছা করেই ভূতের নাটক করছে!

ঠিক তখনই দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

অন্ধকার।

হঠাৎ স্পিকারে ভেসে এল কণ্ঠ—

"MS রায়... তুমি অনেক দূর চলে এসেছ।"

তারপর একের পর এক ভয়ংকর ভূতের ছবি প্রজেক্টরে দেখা যেতে লাগল।

সাধারণ মানুষ হলে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যেত।

কিন্তু MS রায় বুঝে গেল—

সবই প্রজেকশন।

সে টর্চের আলো ফেলে প্রজেক্টর ভেঙে দিল।

ঘর আলোয় ভরে উঠল।

ঠিক তখন মুখোশ পরা তিনজন লোক ঢুকে পড়ল।

একজন বলল,

"এবার আর ফিরতে পারবে না।"

MS রায় চেয়ার ছুড়ে মেরে দরজা খুলে বাইরে দৌড় দিল।

বৃষ্টির মধ্যে শুরু হল ধাওয়া।

হঠাৎ সে একটি পুরোনো কুয়োর পাশে এসে পড়ল।

একজন মুখোশধারী পিছলে কুয়োর ভিতরে পড়ে গেল।

বাকি দুজন পালিয়ে গেল।

পুলিশ এসে কুয়ো থেকে লোকটিকে উদ্ধার করল।

জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এল চাঞ্চল্যকর সত্য।

বহু বছর ধরে এক অপরাধী চক্র শ্মশানকে ভূতের আস্তানা বলে গুজব ছড়িয়েছিল।

মানুষ ভয়ে সেখানে যেত না।

সেই সুযোগে তারা অপহরণ, চোরাচালান এবং মূল্যবান পুরোনো মূর্তি পাচার করত।

ভূতের কান্না?

লুকোনো স্পিকার।

আলো?

রিমোট-নিয়ন্ত্রিত প্রজেক্টর।

মিলিয়ে যাওয়া মানুষ?

গোপন সুড়ঙ্গ।

সব রহস্যের সমাধান হয়ে গেল।

কিন্তু...

ঘটনা এখানেই শেষ নয়।

পরদিন সকালে পুলিশ পুরো এলাকা তল্লাশি করছিল।

একজন কনস্টেবল হঠাৎ দৌড়ে এসে বলল—

"স্যার... কুয়োর ভিতরে একটা কঙ্কাল পাওয়া গেছে।"

কঙ্কালের হাতে একটি মরচে ধরা ঘড়ি।

ঘড়ির পিছনে খোদাই করা—

"১৯৯১ – অমিত।"

পুলিশের নথি খুলে দেখা গেল—

১৯৯১ সালে সত্যিই অমিত নামে এক যুবক নিখোঁজ হয়েছিল।

অপরাধী চক্রের জন্মও তার বহু বছর পরে।

তাহলে অমিতের মৃত্যু কীভাবে?

আর সেই বৃদ্ধ?

যিনি নিজেকে নিখোঁজ যুবকদের একজন বলেছিলেন?

MS রায় আবার রাতের শ্মশানে ফিরল।

একই বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে সে ডাকল—

"আপনি যদি সত্যিই থাকেন... সামনে আসুন।"

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর ঠান্ডা বাতাস।

একটি অস্পষ্ট ছায়া ধীরে ধীরে ফুটে উঠল।

সেই বৃদ্ধ।

তিনি বললেন,

"আমরা কাউকে ভয় দেখাতে চাইনি। আমরা শুধু চাইছিলাম সত্য প্রকাশ পাক।"

MS রায় শান্ত গলায় বলল,

"আপনি... সত্যিই ভূত?"

বৃদ্ধ হেসে বললেন,

"সব রহস্যের উত্তর মানুষের যুক্তিতে মেলে না।"

পরমুহূর্তেই ছায়াটি মিলিয়ে গেল।

শুধু বাতাসে ভেসে এল একটি ফিসফিসানি—

"ধন্যবাদ..."

এরপর আর কখনও কালীতলা শ্মশানে অদ্ভুত ঘটনা ঘটেনি।

কিন্তু আজও গ্রামের মানুষ বলে—

বর্ষার গভীর রাতে যদি কেউ সেই শ্মশানের পাশ দিয়ে যায়, তবে দূরে একটি লণ্ঠন হাতে সাদা পোশাকের বৃদ্ধকে দেখা যায়।

তিনি কারও ক্ষতি করেন না।

শুধু নীরবে পাহারা দেন—

যেন আর কোনো অপরাধী অন্ধবিশ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে না পারে।

আর MS রায়?

তিনি তাঁর ডায়েরির শেষ পাতায় লিখেছিলেন—

"বেশিরভাগ ভূতের রহস্যের পেছনে থাকে মানুষের লোভ। কিন্তু কখনও কখনও এমন কিছু ঘটে, যার ব্যাখ্যা আজও আমার কাছে নেই।"

— সমাপ্ত —

Comments

    Please login to post comment. Login