মায়ের অসুস্থতা শুনে বরিশাল হয়ে বাড়ি যাচ্ছি।
ছোট লঞ্চ, মৌসুমী। তিনটায় বরিশাল ছেড়েছে।
বরাবরের মতো নিচতলায় কাঠের বেঞ্চিতে আসন নিয়েছি।উপরে জায়গা পেলে ও বসি না।
নিচে বসার আলাদা একটা আকর্ষণ আছে।নাদীর ঢেউ।এর বিপরীতে ছোট লঞ্চের এগিয়ে চলা।নদীর চার্ পাশ দেখে ও প্রান্তিক মানুষের কথা শুনে সময় কেটে যায়।
প্রথম বরিশাল আসি মেজো খালুর সাথে।ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন।মামীর দেয়া পাঞ্জবি পড়ে আছি।একজন লঞ্চের সিঁড়িতে আমাকে বলল,হুজুর একটু সরেন।বাংলাদেশের মানুষের এই এক অভ্যাস।পাঞ্জবি পড়া দেখলে হুজুর ভেবে বসে। যাই হোক মায়ের বানানো পিঠা পুলি,নাড়ু,মুড়ি মোয়া নিয়ে বড় বোনের হোস্টেলে উঠি।বড় বোন বরিশাল মহিলা কলেজে ইন্টার পড়ছে তখন।আমাকে দেখে তো মহা খুশি।বোনের ম্যাচমেট আপুরা খুশি মায়ের হাতে বানানো পিঠা পুলি খেয়ে।
লঞ্চের কেরানির ডাকে আমার সম্বিত ফিরে,দাদা টিকেট টা। একশো টাকার একটা নোট ধারিয়ে দেই।এর কিছুক্ষণ পরে আমার কানে আসে,ভাইয়া আমার কাছে তো খুচরো নেই।পাশে তাকিয়ে দেখি এক ভদ্র মহিলা ,সাথে বারো তেরো বছর বয়সী ছেলে।আমি কেরানি কে বলি,কয় টাকার নোট আমি খুচরো করে দিচ্ছি।কেরানি বলল, দেখুন তো দাদা এক হাজার টাকার নোট কয়টা ভাঙ্গতি করা যায়।
টাকাটা দিতে গিয়ে মহিলার চোখের দিকে ইচ্ছে না হলে ও তাকাই। আরে একে তো খুব চেনা লাগছে!ভদ্র মাহিলা বলে, ধন্যবাদ ভাইয়া। এবার আমাদের চোখাচোখি হয়।আমি চিনে ফেলি।বলি,আপনি দীপা।
হুম। আপনি নাম জানলেন কি করে।
আমি আবার বলি,আপনি সুবীর সারের বড় মেয়ে।আপনার ছোট সিপা। আর একমাত্র ভাই সাগর। কী ঠিক বলছি তো।
দীপা বলে,আপনি কি বাবার ছাত্র।
না সরাসরি ছাত্র নই।আপনাদের ও আমাদের বাড়ি,খালের এপার ওপার। আপনাদের এপার দিয়ে যেতে হয়।এইভাবে চেনা।
দীপা বলে, হুম।
আচ্ছা স্যার কে দেখি না অনেক বছর।
বাবা মা ইন্ডিয়া চলে গেছেন, তা পনের বছর।
বাড়িতে কেও থাকে না?
না।জমি জমা বিক্রি করে গেছে।লাস্ট ইয়ার ছোটো ভাইটি গেছে।
মানে চব্বিশ আগস্ট পরবর্তীতে।
হুম।
আমরা কিছুক্ষণ চুপ থাকি।ওর কিশোর বয়শি ছেলেটা মোবাইল চেয়ে নেয়।আমি বলি,ছেলে?
দীপা মাথা নাড়ায়।
আমি সাহস করে বলি,দীপা চা খাবেন।
দীপা আবার মাথা নাড়ে।
চা খেতে খেতে দীপা বলে,আপনাকে লঞ্চের কেরানি দু বার দাদা বলল, আপনি কি হিন্দু?
আমি হেসে বলি,হিন্দু হলে পঁচিশ বছর আগে একটা প্রেম হয়ে যেতে পারত আপনার সাথে ।
দীপা দাঁত বের করে উচ্চ স্বরে হাসে।
বলে,কিভাবে।
আমি বলি,সালটা নিরানববই হবে, আপনি বেনি দুলিয়ে স্কুল ড্রেস পড়ে,সাকো পাড় হয়ে, আমাদের এপার দিয়ে প্রতিদিন যেতেন।আমার ইন্টার পরিক্ষা শেষ। দোকানে বোসে আপনার আসা যাওয়া দেখতাম।
শুধুই দেখতেন। পিছু নিতেন না।দীপার কৌতুহলী প্রশ্ন।
পিছু না বলে বলেন সামনে নিতাম।
সেটা কেমন?
ধরেন স্কুল ছুটি হয়েছে। ওই সময় টা ধরে রাস্তায় হেঁটে যেতাম,আপনাকে একনজর দেখার জন্য।কখনও মনে হতো বিষয় টা আপনি বুজতেন। কখনো মনে হতো,না।
দীপা বলল, ইন্টারেস্টিং তো।
হুম,এখন ভাবলে নিজেকে বোকা মনে হয়। প্রেম কি এভাবে হয় ।
দীপা মজা করে হেসে বলে,প্রস্তাব দিয়ে দেখতেন।
ওরে বাবা। সেই সময় আপনি সহজেই বিষয় টা নিতেন? রাষ্ট্র হয়ে যেত।আমার দারোগা মা পিটিয়ে আমাকে বাড়ী ছাড়া করত।
এ কথায় দুজনেই হাঁসি।আমাদের হাসিতে ছেদ পড়ে। দীপার ছেলে লঞ্চের পাশ থেকে এসে মায়ের কাছে বোসে জিজ্ঞেস করে আমি পরিচিত কিনা। দীপা আমার দিকে চেয়ে বলে,হুম খুব পরিচিত ।
(পরবর্তী পর্বে সমাপ্ত)