Posts

গল্প

মেধার মৃত্যু

August 8, 2026

অ্যাডঃ মোঃ রেজওয়ানুল ইসলাম

19
View


প্রথম পর্ব:
মেঘনা নদীর তীরের ছোট্ট শহর শান্তিপুর। নামে শান্তিপুর হলেও সেখানে শান্তির লেশমাত্র ছিল না। পুরো শহর পরিচালনা করত একজন মানুষ, যার নাম মোজাফফর শিকদার। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মুখ কোনোদিন না দেখলেও চাতুর্য, ছলনা আর ক্ষমতার জোরে তিনি আজ শহরের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি। অর্থ উপার্জনের জন্য এমন কোনো অপকর্ম নেই যা তিনি করেননি—নকল ওষুধের ব্যবসা, নদী দখল, ভুয়ো সনদ বিক্রি থেকে শুরু করে সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ। তার কাছে নীতি কথাটি ছিল একপ্রকার বিলাসিতা, আর শিক্ষাসম্পন্ন মানুষগুলো ছিল নিছকই ‘বুদ্ধিহীন বোকা মানুষ’।

অন্যদিকে, এই শহরেরই সন্তান “সূর্য”। মেধা ছিল যার প্রধান অস্ত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে পাস করার পর ইউরোপের নামজাদা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপের চিঠি এসেছিল তার কাছে। কিন্তু সূর্যের ভাবনা ছিল ভিন্ন। সে ভেবেছিল, “আমার মেধা যদি নিজ দেশের, নিজ এলাকার মানুষের কোনো কাজে না আসে, তবে এই শিক্ষার মূল্য কোথায়?”
গবেষণা শেষে সূর্য শান্তিপুরে ফিরে আসে। নদীর দূষণ মুক্ত করা এবং স্থানীয় কৃষকদের জন্য কম খরচে পরিবেশবান্ধব জৈব সার তৈরির একটি প্রকল্প হাতে নেয় সে। সূর্য স্বপ্ন দেখত, মেধা ও বিজ্ঞানের শক্তিতে শান্তিপুরের চেহারা বদলে দেবে।
কিন্তু সে জানত না, অশিক্ষিত আর অন্ধকারের রাজাদের শহরে আলোর শিখা জ্বালানো কতটা বিপজ্জনক।

দ্বিতীয় পর্ব:
সূর্যের গবেষণাগারটি ছিল শহরের শেষ মাথায় নদীর কাছে। দিনরাত এক করে সে কাজ করে যাচ্ছিল। কিন্ত কাজ করতে গিয়েই একটি ভয়ংকর সত্য তার সামনে উন্মোচিত হয়।
শান্তিপুরের বাতাসে বিষ ছড়িয়ে পড়ছিল মোজাফফর শিকদারের অবৈধ কেমিক্যাল কারখানা থেকে। শুধু তাই নয়, শিকদার বাজারের যে কীটনাশক ও ওষুধ সরবরাহ করছিলেন, তা অত্যন্ত নিম্নমানের এবং বিষাক্ত, যার কারণে এলাকার শত শত কৃষক জমি হারাচ্ছিল, জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছিল শিশু ও বৃদ্ধরা।
সূর্য বসে থাকেনি। সে বৈজ্ঞানিক তথ্যাদি, ল্যাব টেস্টের রিপোর্ট এবং ছবি সংগ্রহ করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করতে শুরু করে। তার উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসন ও গণমাধ্যমের কাছে এই ভয়াবহ জালিয়াতি উন্মোচন করা।
খবরটি পৌঁছাতে মোজাফফর শিকদারের সময় লাগেনি।
একদিন বিকেলে মোজাফফর শিকদার তার চার-পাঁচজন সশস্ত্র ক্যাডার নিয়ে হাজির হন সূর্যের সাধারণ ল্যাবরেটরিতে। দামি সুগন্ধি মেখে, সোনার চেইন ঝুলিয়ে শিকদার চেয়ারে বসে একগাল হেসে বললেন, “শোনো সূর্য মিঞা, শুনলাম তোমার মাথায় নাকি অনেক বুদ্ধি! অনেক পড়ালেখা করেছ। তা এই কাগজের টুকরো আর কেমিক্যালের বোতল দিয়ে কয় টাকা কামাও? আমার সাথে হাত মেলাও। আমার কোম্পানির হেড বানিয়ে দেব, মাসে দুই লাখ টাকা বেতন পাবে। শুধু নদী আর কেমিক্যাল নিয়ে তোমার ওই ফালতু রিপোর্ট তৈরি বন্ধ করো।”
সূর্য শান্ত চোখে মোজাফফর শিকদারের দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো ভয় ছিল না, ছিল একরাশ অবজ্ঞা। সে ধীরকণ্ঠে বলল, “শিক্ষা আমাকে টাকা উপার্জনের দাস হতে শেখায়নি, শিকদার সাহেব। আপনার মতো মূর্খদের প্রতারণা আর জালিয়াতির কারণে হাজার হাজার নিরীহ মানুষের জীবন ধ্বংস হচ্ছে। আমি আমার মেধা বিক্রি করতে আসিনি, আর আপনার এই রক্তচোষা ব্যবসাকে আমি পুরো দেশের সামনে উন্মুক্ত করব।”
‘মূর্খ’ শব্দটি শুনে মোজাফফর শিকদারের মুখ রক্তবর্ণ ধারণ করল। একজন সামান্য মাস্টার্স পাস ছোকরা, যার ব্যাংকে কোনো টাকা নেই, যার পেছনে কোনো গুন্ডাবাহিনী নেই—সে তাকে ‘মূর্খ’ বলছে! ক্ষমতার অহংকারে আঘাত লাগল মোজাফফরের।
তিনি উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের ওপর রাখা সূর্যর ল্যাবরেটরির টেস্টটিউবগুলো এক আঘাতে নিচে ফেলে ভেঙে চুরমার করে দিলেন। এরপর ফিসফিস করে বললেন, “পড়াশোনা করে মাথাটা বেশি গরম হয়ে গেছে তো! মেধা দেখানোর জায়গা এটা না, সূর্য মিঞা। এই দেশ চালায় টাকা আর ক্ষমতা। তোমার বই-খাতা আর সার্টিফিকেট দিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচাতে পারবে তো?”

তৃতীয় পর্ব:
ঘটনার তিন দিন পরের কথা। রাত তখন প্রায় আড়াইটা।
ঝুম বৃষ্টি নামছিল শান্তিপুরে। নিজের ছোট টেবিলে বসে ল্যাম্পের আলোয় সূর্য তার রিপোর্টের শেষ পাতাটি তৈরি করছিল। কাল সকালে সে জেলা প্রশাসকের কাছে যাবে এবং স্থানীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করবে। সমস্ত প্রমাণ সযত্নে একটি ফাইলে গুছিয়ে রাখছিল সে।
হঠাৎ বিকট শব্দে ল্যাবের দরজার লোহা ভেঙে পড়ে।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভেতরে ঢোকে মোজাফফর শিকদারের ডানহাত হিসেবে পরিচিত কুখ্যাত খুনি ‘কালা রতন’ এবং তার চারজন সশস্ত্র সঙ্গী। তাদের হাতে ভারী লোহার রড, দেশীয় অস্ত্র আর পেট্রোলের বোতল।
সূর্য উঠে দাঁড়াতেই রতন তার মাথায় রড দিয়ে সজোরে আঘাত করে। রক্তে ভেসে যায় সূর্যের মুখ। মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে সে।
রতন সূর্যের চুল ধরে মাথাটা তুলে ধরে পিশাচের মতো হেসে বলল, “অনেক মেধা না তোর? অনেক পড়াশোনা করেছিস? বড় বড় লেকচার দিস? আমাদের বস মোজাফফর ভাইয়ের সামনে তুই নাকি খুব পণ্ডিতি দেখাচ্ছিলি?”
সূর্য ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলেও তার চোখ দুটো তখনও তীব্র আলোয় জ্বলছিল। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “তোরা... তোরা সত্যকে হত্যা করতে পারবি না... আমার এই গবেষণা, এই প্রমাণ মিথ্যে হয়ে যাবে না...”
রতন ঠাট্টা করে বলল, “তোর প্রমাণ? দেখাচ্ছি তোর প্রমাণ!”
সে টেবিল থেকে সূর্যের কষ্টার্জিত বছরের পর বছর ধরে করা গবেষণার ফাইল, বই, ডিগ্রির সনদপত্রগুলো টেনে নিয়ে মাঝখানে ফেলে দিল। তারপর পেট্রোল ঢেলে দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে দিল।
চোখের সামনে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল সূর্যের সমস্ত শিক্ষা, মেধা আর স্বপ্নের দলিল। আগুনের শিখায় ছাই হয়ে যেতে লাগল তার মেধার সাক্ষ্যগুলো।
সূর্য চিৎকার করে ওঠার চেষ্টা করল, কিন্ত রতনের সঙ্গীরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। একের পর এক লোহার রডের আঘাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো সূর্যের মাথা—যে মাথায় লুকিয়ে ছিল এক উন্নত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
যে হাত দুটো দিয়ে সে সমাজকে বাঁচাতে চেয়েছিল, সেই হাতগুলোকে বুটের তলায় পিষে দেওয়া হলো। সূর্য যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছিল, তখন ল্যাবের মেঝেময় ছড়িয়ে ছিল তার ভাঙা চশমা, জ্বলন্ত বইয়ের ছাই আর একজন মেধাবী যুবকের তাজা রক্ত।

চতুর্থ পর্ব:
পরদিন সকালে সূর্যের ল্যাবরেটরি থেকে উদ্ধার করা হয় তার ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ। পুরো শহরজুড়ে খবর ছড়িয়ে পড়ে। কিন্ত বিকালের মধ্যে শহরের বাতাস অন্য সুর গাইতে শুরু করে।
মোজাফফর শিকদারের কেনা সংবাদপত্রে শিরোনাম হলো: “পূর্ব শত্রুতার জেরে ডাকাত দলের হামলায় এক যুবকের মৃত্যু।”
প্রশাসন নিশ্চুপ। পুলিশ সাধারণ একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করে তদন্ত ফাইল বন্ধ করে দিল। সূর্যের গবেষণার কোনো ফাইল আর অবশিষ্ট ছিল না, প্রমাণ দেওয়ার মতো কেউ বেঁচে ছিল না।
তিন দিন পর। শান্তিপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক বিশাল নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়।
সংবর্ধনার নায়ক অন্য কেউ নন—মোজাফফর শিকদার। তিনি সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য ভুয়া এক আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে ‘শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব’ পদক পেয়েছেন!
মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাইকের সামনে মোজাফফর শিকদার বড় গলায় ভাষণ দিচ্ছেন। দামি পোশাকে আবৃত তার শরীর, মুখে চওড়া হাসি। তিনি বলছেন, “আজকের তরুণ সমাজ বই পড়ে মাথা নষ্ট করছে। তারা বলে মেধা নাকি সব! কিন্ত আমি বলি—শিক্ষা দিয়ে কী হবে, যদি বুদ্ধি না থাকে? সততা আর মেধার দম্ভ যারা করে, তারা সমাজের শত্রু। আজ দেখুন, সত্যের জয় হয়েছে। আমি আপনাদের সেবা করে যেতে চাই।”
পুরো মাঠ করতালি আর জয়ধ্বনিতে ফেটে পড়ল। প্রতারক, মিথ্যাবাদী আর খুনির গলায় পরিয়ে দেওয়া হলো ফুলের মালা। যে সমাজ এক মেধাবীকে রক্ষা করতে পারেনি, সেই সমাজই আজ একজন জল্লাদকে বরণ করে নিচ্ছে উল্লাসে।

শেষ পর্ব:
কবরস্থানে সূর্যের নতুন কবরে তখনও মাটি কাঁচা। সেখানে কোনো স্মৃতিফলক নেই, কোনো বড় ফুলের তোড়া নেই। কেবল বাতাসের সাঁসে যেন এক করুণ সুর ভেসে বেড়ায়।
যে মেধাকে সম্মান দেওয়ার কথা ছিল, তাকে আজ মাটির নিচে চাপা দেওয়া হয়েছে। আর যে মিথ্যা, প্রতারণা আর অজ্ঞতাকে দূর করার কথা ছিল, তা আজ রাজসিংহাসনে বসে হাসছে।
সূর্যের নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একজন মানুষের মৃত্যু ছিল না—তা ছিল একটি জাতির মেধার মৃত্যু, বিবেকের মৃত্যু, এবং সত্যের চূড়ান্ত পরাজয়।

এরকম আরো ছোটগল্প চাইলে, কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না!!!

Comments

    Please login to post comment. Login