সূর্যের আলো তখনও পৃথিবীর মুখ স্পর্শ করেনি, কিন্তু রক্তিম নদীর জলে কালচে রঙের ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এক সময় নদীর জল ছিল কাঁচের মতো স্বচ্ছ, মানুষ সেই জলে মুখ দেখে হাসি ফুটাত। আজ সেই জলের ধার ঘেঁষে কেবল নীরবতার গন্ধ, যেন কোনো দীর্ঘশ্বাসের শব্দ আটকে আছে জলের তলদেশে।
দেশটির নাম ছিল শান্তিগঞ্জ, কিন্তু এর ভেতরের প্রতিটি গলি রূপ নিয়েছিল আতঙ্কের সাম্রাজ্যে। এই সাম্রাজ্যের একছত্র অধিপতি ছিলেন "পিচ্চি রাসেল"। তাকে সবাই বলতো 'মহামান্য নেতা', যদিও তার ক্ষমতার পেছনে কোনো শ্রদ্ধার প্রলেপ ছিল না—ছিল স্রেফ রক্ত হিম করা ভয়। রাসেল রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন বহুবছর আগে। প্রথমে মুখের মিষ্টি কথার ছলনা, তারপর আস্তে আস্তে সমগ্র দেশটাকে রূপ দিয়েছিলেন নিজ পরিবারের তালুকে।
এমন কোনো অপরাধ ছিল না, যা রাসেল বা তার অন্ধ অনুগামীদের হাত ধরে এই দেশে ঘটেনি। ভরদুপুরে ব্যবসায়ী হাসান সাহেবকে তার দোকানের সামনে থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো। তার অপরাধ ছিল, তিনি বাৎসরিক "কর"—যা প্রকৃতপক্ষে ছিল রাসেলের বাহিনী কর্তৃক নির্ধারিত চরম চাঁদাবাজি—তা মেটাতে এক সপ্তাহ দেরি করেছিলেন। তিন দিন পর রূপগঞ্জ শহরের বাইরে ড্রেনের ধারে হাসান সাহেবের লাশ মিলল, যেন তিনি কোনো মানুষ ছিলেন না, ছিলেন ছুড়ে ফেলা আবর্জনা।
ছিনতাই, ডাকাতি, গুম আর রাজনৈতিক হত্যা নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়াল। রাজপথের প্রতি কোণে ওত পেতে থাকত রাসেলের পোষা পেটুয়া বাহিনী। সাধারণ মানুষ সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরবে কি না, তা নিয়ে পরিবারগুলো প্রহর গুনত। কিন্তু এসবের চেয়েও মারাত্মক এক অদৃশ্য ক্ষতের সৃষ্টি হচ্ছিল দেশের অর্থনীতিতে। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ খালি হয়ে যাচ্ছিল। কোটি কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হয়ে যাচ্ছিল বিদেশের অভিজাত শহরের বাড়ি আর অবৈধ ব্যাংকে। সাধারণ মানুষের ঘামে অর্জিত রক্ত জল করা অর্থ দিয়ে রাসেল বিদেশের মাটিতে নিজের ও তার চাটুকারদের জন্য তৈরি করছিলেন বিলাসিতার স্বর্গরাজ্য। দেশের যুবসমাজ যখন এক মুঠো অন্নের জন্য দিশেহারা, তখন দেশের অর্থ বয়ে যাচ্ছিল বিদেশের সমুদ্রে।
প্রবীণ শিক্ষক আলিমুদ্দিন সাহেব একদিন তার ক্লাসে ছাত্রদের বলেছিলেন, "অত্যাচারীর দাপট দেখে কেঁপো না, মনে রাখবে, প্রতিটা ঢেউ যেমন তীরে এসে ভেঙে পড়ে, জল্লাদের ক্ষমতাও একদিন নিজের তৈরি রক্তের সাগরেই ডুবে যায়।" সেই কথাটি যেকোনোভাবে রাসেলের গুণ্ডা বাহিনী জেনে ফেলে। পরদিনই আলিমুদ্দিন সাহেবকে তার কক্ষ থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর তিনি আর কোনোদিন ফিরে আসেননি।
প্রতিবাদের প্রতিটি সুর স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সংবাদপত্রগুলোর প্রধান পাতায় থাকত কেবল রাসেলের প্রশংসাগীতি, আর পেছনের পাতায় লেখা হতো একের পর এক লাশ উদ্ধারের খবর, যা দুর্ঘটনায় মৃত্যু বলে চালানো হতো। ভয় এমন এক স্তরে পৌঁছেছিল যে, ঘরে নিজেদের সন্তানের সামনেও মানুষ সরকারের সমালোচনা করতে ভয় পেত।
কিন্তু ভয়েরও একটি সীমা থাকে। অত্যাচার যখন চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন তা মানুষের হৃদয় থেকে ভয়ের শেষবিন্দুটিকেও পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।
ঘটনার সূচনা হয়েছিল খুব সামান্য এক প্রতিবাদ থেকে। ফুলমারী শহরের গোলচত্বরে এক মা তার গুম হয়ে যাওয়া সন্তানের ছবি হাতে নিয়ে একা দাঁড়িয়েছিলেন। ছবির নিচে লেখা ছিল, "আমার সন্তান কোথায়?" কোনো স্লোগান নয়, কোনো গালমন্দ নয়—কেবল চোখের জল আর ছবি। রাসেলের পেটুয়া বাহিনীর এক সদস্য এসে সেই বৃদ্ধা মায়ের চুল ধরে রাস্তায় ফেলে দিয়ে ছবিটা বুটজুতো দিয়ে পিষে দিল।
সেই দৃশ্য দূর থেকে দেখেছিল রিফাত নামের এক তরুণ। রিফাত কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী ছিল না; সে ছিল আলিমুদ্দিন সাহেবেরই এক প্রাক্তন ছাত্র। মা ও মাটিকে অপমানিত হতে দেখে রিফাতের রক্তে যে আগুন জ্বলে উঠল, তা মুহূর্তে চারপাশের মানুষের হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়ল। রিফাত এগিয়ে গিয়ে পেটুয়া সদস্যের হাত ধরে স্বজোরে টান দিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে দিলো এবং বলল, "আর এক পা-ও না।" "অনেক সহ্য করেছি আমরা"।
কথাটি ছিল ছোট, কিন্তু বাতাসে তা যেন চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল। পেটুয়া সদস্যটি থমকে গেল। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে এই দেশে রাষ্ট্রনেতার লোকদের গায়ে হাত দেওয়ার সাহস কারো হতে পারে।
পরেরদিন রাসেলের গুণ্ডা বাহিনী রিফাতকে ধরে নিয়ে তাদের গোপন আস্তানায় নিয়ে গেল এবং তাকে মেরে গুরুতর জখম করা হলো। রিফাতের নামে রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলাসহ ডজন খানেক মামলা দায়ের করা হলো। সেই খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল পুরো দেশে। কিন্তু রিফাতের সেই প্রতিবাদের পেছনে তখন আরও একশ জোড়া চোখ জ্বলে উঠেছে। পরদিন সকালে রাস্তায় নামল কয়েক হাজার মানুষ। তার পরদিন সংখ্যাটা দাঁড়াল লাখে। সাধারণ মজুর, শিক্ষক, ছাত্র, গৃহিণী, রিকশাচালক—সবাই কাজ ফেলে নেমে এল রাজপথে। আর ভয় নয়, আর মেনে নেওয়া নয়। এবার মুক্তির পালা, এবার ঘাতক মুক্ত দেশের প্রত্যাশা। মানুষের এক মাত্র দাবি হয়ে দাঁড়াল—অত্যাচারী রাসেলের পতন।
রাসেল প্রথমে তা উপহাস করে উড়িয়ে দিয়েছিল। সে ভেবেছিল তার মসনদ চিরস্থায়ী, কেউ তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে না। তার দীর্ঘদিনের ক্ষমতার অহংকার তাকে অন্ধ করে রেখেছিল। সে বাহিনী পাঠালো গুলি চালানোর জন্য। রাজপথ লাল হয়ে উঠল তাজা রক্তে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, রক্ত দেখে মানুষ এবার পিছু হটল না। একজন গুলি খেয়ে পড়লে দশজন তার জায়গা দখল করতে লাগল। মানুষের বুক থেকে ভয়ের শিকড় উপড়ে গিয়ে জমা হয়েছে অদম্য ক্ষোভ।
বিপ্লব ততদিনে পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রাম থেকে শহর—সব জায়গায় মানুষ লাঠি, ব্যানার আর বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা বছরের পর বছর যন্ত্রণা নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। সমস্ত পথ গিয়ে মিশেছে রাসেলের প্রাসাদের অভিমুখে। চাপের মুখে স্বৈরাচার রাসেল রিফাতকে মুক্ত করে দিতে বাধ্য হলো।
সেনাবাহিনী ও প্রশাসন একে একে জনগণ থেকে নিজেদের আলাদা করতে শুরু করল। যে পুলিশ এতদিন রাসেলের হুকুম বাস্তবায়নে অভ্যস্থ ছিল, তারাও বুঝতে পারল সাধারণ জনতার মহাসমুদ্রকে আর আটকে রাখা সম্ভব নয়। রাসেলের পেটুয়া বাহিনীর সদস্যরা যে যার মতো পালানোর পথ খুঁজতে শুরু করল। যে চাটুকাররা এতদিন বলত, "আপনার জন্য জীবন দেব," তারা নিজেদের জমা করা লুটের টাকা নিয়ে গোপনে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করতে লাগল।
পরদিন দুপুর। সুর্যের আলো তখন মধ্যগগনে। লাখ লাখ মানুষের মিছিল রাসেলের প্রাসাদের সীমানা প্রাচীর ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করল। লোহার বিশাল ফটক জনতার গর্জনের সামনে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। প্রাসাদ রক্ষীরা অস্ত্র ফেলে দিয়ে হাত তুলে দাঁড়িয়ে গেল।
রাসেল তখন তার ভূগর্ভস্থ গোপন কক্ষে আত্মগোপন করে ছিলেন। যে মানুষটি একদিন পুরো দেশকে নিজের আঙুলের ইশারায় নাচাতেন, তিনি এখন মাটির নিচে ইঁদুরের মতো কাঁপছিলেন। তার হাতে ছিল বিদেশের পাসপোর্ট আর কয়েক মুঠো ডায়মন্ড, কিন্তু সেই মুহূর্তে ওই সবকিছুর মূল্য ছিল এক টুকরো ছেঁড়া কাগজের চেয়েও কম।
জনতা তাকে খুঁজে বের করল। কোনো রাজকীয় পোশাক তাকে আর আড়াল করতে পারল না। তাকে টেনেহিঁচড়ে মাটির ওপর বের করে আনা হলো। রাসেল জনতার পায়ে ধরে কান্নাকাটি করতে লাগলেন, দয়া ভিক্ষা চাইলেন, লুটের সব অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। কিন্তু জনতার চোখে তখন দয়ার কোনো জায়গা ছিল না; সেখানে জ্বলছিল হাজার হাজার নিখোঁজ মানুষের স্বজনদের হাহাকার, নিহত ভাইদের রক্ত আর নিষ্পেষিত এক জাতির পুঞ্জীভূত বিচার।
আইন যেখানে অত্যাচারীর দাস হয়ে যায়, সেখানে জনতাই হয়ে ওঠে সর্বোচ্চ আদালত, সেখানে কোন সাংবিধানিক আইন কাজ করে না।
ফুলমারী শহরের সেই গোলচত্বরে—যেখানে মায়ের হাতের ছবি বুটজুতো দিয়ে পিষে ফেলা হয়েছিল—সেখানেই তৈরি করা হলো এক বিশেষ মঞ্চ। কাঠ আর দড়ির তৈরি এক সাধারণ ফাঁসির কাষ্ঠ। কোনো বিচারকের রাজকীয় পোশাক ছিল না, কোনো দীর্ঘ নথিপত্রের দিন গণনা ছিল না। পুরো দেশ সেখানে উপস্থিত হয়েছিল বিচারক হিসেবে।
রাসেলকে মঞ্চের ওপর দাঁড় করানো হলো, বিকাল তিনটায় তার ফাঁসি কার্যকর করা হবে। হাজার হাজার মানুষের কোলাহল হঠাৎ এক অদ্ভুত নীরবতায় রূপ নিল। যে নীরবতায় ছিল এক গভীর গম্ভীরতা।
রিফাত ফাঁসির কাষ্ঠের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। সে রাসেলের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে এখন রাজকীয় অহংকার নেই, আছে শুধু মৃত্যুটানের চরম আতঙ্ক।
রিফাত ধীর অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "আপনি ভেবেছিলেন ক্ষমতা চিরস্থায়ী," "ভেবেছিলেন রক্তের কোনো হিসাব দিতে হয় না। আজ আপনার সেই হিসাব মেটানোর দিন।"
রাসেলের গলায় ফাঁসির দড়ি পরানো হলো। উপস্থিত লাখ লাখ মানুষ একযোগে চিৎকার করে উঠল, "জনতার বিচার সফল হোক!"
ঘড়ির কাঁটা যখন ঠিক তিনটার ঘর ছুঁলো, লিভার টেনে দেওয়া হলো। রাসেলের শরীর ঝুলতে লাগল বাতাসে। কয়েক মুহূর্তের ছটফটানি, তারপর সব শান্ত।
পতনের সাথে সাথেই পুরো স্কয়ারজুড়ে এক অভূতপূর্ব নীরবতা নেমে এল, যা ভেঙে আছড়ে পড়ল বিশাল উল্লাসের তরঙ্গে। মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। এ কান্না দুঃখের নয়, এ কান্না বহুবছরের রুদ্ধশ্বাস থেকে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার আনন্দাশ্রু।
পরদিন সকালে আবার সূর্য উঠল। সেই নদীর কালচে জল আবার ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। বাতাসে এখন আর ভয়ের গন্ধ নেই, আছে নতুন ভোরের গন্ধ। স্বৈরাচারের পতন নিশ্চিত করে জনতা প্রমাণ করে দিল—শক্তির মূল উৎস কোনো স্বৈরাচারী শাসক নয়, শক্তির প্রকৃত মালিক এই দেশের সাধারণ মানুষ। নির্যাতনের সমাপ্তি ঘটল, আর এক মুক্ত দেশের আকাশজুড়ে উড়তে লাগল স্বাধীনতার নতুন পতাকা।
48
View