মা..মা..ডাকছে ছেলেটা।
নুরুন নেছা শুনতে পাচ্ছেন কিন্তু সাড়া দিতে পারছেন না।কে যেন তার কণ্ঠ রোধ করছে।ছেলে হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে আম সাধছে।তিনি নিতে চাচ্ছেন। কিন্তু পাশ থেকে কে যেন বারণ করছে নিতে। ছেলে মন খারাপ করে চলে যাচ্ছে।নুরুন নেছা আস্তে আস্তে একটা সুড়ঙ্গের শেষে চিকন আলোর রেখা দেখছেন।তার মস্তিস্ক হালকা লাগছে, অনুভূতিগুলো অচেনা মনে হচ্ছে।যেনো এক স্থর থেকে মুক্তি পেয়ে অন্য স্থরে প্রবেশ করছেন। তিনি এবার মেঝ মেয়ে লাজুকে দেখতে পাচ্ছেন।মেয়েটার মন খারাপ।বলছে, মা অপারেশন রুমে ওরা বেশি এনেস্থেসিয়া দিয়ে আমাকে মেরে ফেলল।আজকাল কেউ ওভারি টিউমার অপাারেশনে মারা যায়! নুরুন নেছা শুনছেন।কিছু বলতে পারছেন না।তার দু চোখে অশ্রুজল। প্রবল পানির তৃষ্ণা লাগছে।মেয়ে পানির গ্লাস নিয়ে শিয়রে দাঁড়িয়ে।
ছোট মেয়ে নাজু তখনও পাশের চৌকিতে ঘুমাচ্ছে।ঘুমের মধ্যে নাজুর মনে হলো মা একবার ডেকেছিলেন। ধর ফরিয়ে উঠে মায়ের খাটের সামনে এসে দাঁড়ালেন। জোরে জোরে ডাকলেন মা..মা।মায়ের কোনো সাড়া নেই।সকালে ঘরের হালকা আলোতে মায়ের আবছা মুখটা দেখে কলিজা কেঁপে ওঠে। ধাক্কা দিয়ে আবার ডাকলেন, মা..মা।অন্য সময় হলে মা বিরক্ত হয়ে বলত, "ডাকোচ কা।তোর জন্য একটু শান্তিমতো ঘুমাইতেও পারি না।"আজ মায়ের কোনো সাড়া নেই দেখে অজানা আশঙ্কায় নাজু জোরে চিৎকার দেয়।বাড়ির সব ঘরের মহিলারা নাজুর চিৎকারে ছুটে আসেন।
উত্তর ঘরে আশা,যে নাকি সম্পর্কে নুরুন নেছার ভাগ্নি, ছয় মাসের কোলের মেয়েকে দুধ খাওয়াচ্ছিল। বাচ্চা রেখে দৌড়ে ছুটে আসে।পাশে নুতুন ঘরের তনুর মা বটি দিয়ে তরকারি কুটছিলেন। বটি ছুঁড়ে চলে আসেন। আশা এসে নুরুন নেছার পায়ে হাত দিয়ে দেখে। পা ঠান্ডা।কপালে হাত বুলায়। ঠান্ডা। এরপর এক চিৎকারে বলে,খালাম্মা নেই।
সারা ঘরময় মহিলাদের হইচই, চিৎকার, হাহাকার কান্নার রোল। বাড়ির সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলাকে তারা হারিয়ে ফেলেছেন।মেয়ে নাজু কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। কেউ একজন বলে ডাক্তার ডেকে আন।আরেকজন বলল,হার্ট অ্যাটাক করছে।বাড়ির মেয়ে মানুষেরা ভেবে পাচ্ছন না কি করবেন।
নতুন ঘরের তনুর মা ছেলে রূুমিকে ডাকেন। গ্রামের নুরু ডাক্তার কে খবর দেয়া হয়। নুরু ডাক্তার আসে।পার্লস দেখে বিমর্ষ মুখে উঠে চলে যায়। পশ্চিম ঘরের ফাহিমের মা বলেন,ঢাকাতে বড় মেয়ে ও ছোটো ছেলেকে খবর দেওয়া দরকার। আশা,তুই শিফার কাছে ফোন দে। আশা রাজি হয়না। বলে,আমি একটু আগে খালাম্মারে ইসবগুলের শরবত খাওয়াইছি। মানুষটা হাসিমুখেআমার সাথে কথা কইছে।আইজ কি রান্না করবো তাও কইছে।তার মৃত্যু সংবাদ আমি দিতে পারুম না।(চলবে)