নুরুন নেছা জেগে উঠলেন।জাগতিক হলেন না।তিনি নিজেকে হালকা বোধ করছেন।তার মনে হলো নিজের দেহ থেকে আত্না আলাদা হয়ে গেছে।বা দেহ নামক কিছু ছিলো তিনি ভাবতে পারছেন না। কত সময় পড়ে তিনি জাগলেন মনে করতে পারছেন না।বা সময় নামক কিছু আছে,সেকেন্ড মিনিট দিয়ে পরিমাপ করা হয়।বুঝতে পারছেন না।তিনি দেখছেন একটা ঘর। ঘরের ভিতরে অনেক লোকজন জড়ো হয়ে আছে। পুরুষ, মহিলা, শিশু,তাদের মুখ নড়ছে। হাত,পা নড়ছে। কেহ চোখের পানি মুছছে।তিনি তাদের মুখ চিনতে পারছেন না।কোনো শব্দ শুনতে পাচ্ছেন না। তার শুধু একটা মুখ মনে পড়ছে। পানি চেয়েছিলেন। মেজো মেয়ে গ্লাসে পানি নিয়ে মাথার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
ততক্ষণে আশপাশের দু চার বাড়ি জেনে গেছে, নুরুন নেছা এই পৃথিবীতে আর নেই। পাশের ঘরের খালিদ মোল্লা তখন বাজারে। সবে রিক্শা থেকে নেমে ভাড়া মেটাচ্ছেন।তনুর মা ফোনে বলল, চাচী আম্মা আর নেই।
‘হ্যা কি কও?আমি আসার সময় ঘরে কথা শুনে আসলাম।’
নুূতন বাড়ির বড় নাতিন এসে বলল,গতকাল মাদ্রাসা ছুটি শেষে বাড়ী এসে বড় আম্মার সাথে আগে দেখা করছি।বালছি আমার ক্লাসের এক ছাত্রীর মা অসুস্থ। গরিব,চিকিৎসা করাতে কষ্ট।বড় আম্মা বলছে ছুটি শেষ হইলে আবার মাদ্রাসায় যখন যাইবি।আমারতন পাচশ টাকা নিয়া জাইচ। মেয়েটা এই বলে কান্না শুরু করে দিলো।
তনুর মা ছোটো ছেলে রূুমিকে কাছে ডাকলেন।জিজ্ঞেস করলেন ঢাকায় ছেলে মেয়েকে খবর দিছে কিনা।কবর খোঁড়ার মানুষ কখন আসবে।রুমী মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বলে।কিন্তু সমস্যা একটা।দাদুর ইচ্ছা ছিল দাদার পাশে তার কবর হবে। দাদার কবরের পাশে খালি জায়গা নাই।
চারজন অল্প বয়শি কওমি মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্র নিয়ে এসেছে তনুর বাবা। এরা এই ঘরে আগেও এসেছে মাদ্রাসার মুস্টি চাল নিতে। সামনের ঘরে চৌকিত গোল হয়ে বসে কোরআন শরীফ তেলোওয়াত শুরু করলেন।মাহিলরা এতক্ষণ অনেক কথা বলছিলেন।তেলোওয়াত শুনে তাদের আওয়াজ কমে আসলো।
নুরুন নেছা যেনো কিছুটা সম্বিত ফিরে পেলেন।তিনি এখন অনায়াসে ঘরের এক কোণ থেকে অন্য কোণে যেতে পাারছেন।কিছুটা শুন তে পারছেন।তিনি সামনের রুমে গেলেন।সুর করে চারজন পড়ছে।তার কানে তিব্রভাবে পবিত্র তেলোওয়াত প্রবেশ করছে।তিনি স্মরণ করার চেষ্টা করলেন।পারলেন। তিনি দেখলেন ঘর আলোয় আলোয় উদ্ভাসিত হোচ্ছে। একজন উঠে গিয়ে দেয়ালে টানানো মোলিন মুখের একটা ছবি কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলো।নুরুন নেছা চিনলেন- বড় ছেলের ছবি।
নুরুন নেছা ঘরের সামনে দরোজায় পাশের ঘরের নাতি রূুমিকে দেখেন।গতকাল ও এখনটায় বসে ছোটো ছেলের সাথে মোবাইল এ কথা বলেছেন।আজ সেখানে বসে রুমী তার নিজের অন্তিম শায়ান নিয়ে ছেলে রিন্টুর সাথে কথা বলছে।
তিনি শুনতে পাচ্ছেন ছোটো ছেলে মোবাইলে বলছে, আমরা না আসা পর্যন্ত মাকে খাট থেকে নামাইবানা। মা যেমন শুয়ে ছিলেন।আমরা মাকে শুয়ে থাকা অবস্থায় দেখব।
নুরুন নেছার কান্না আসে। কাঁদতে পারছেন না।
(চলবে)