নুরুন নেছা মাঝের ঘরে আসেন।অসুস্থ ছোট মেয়েটা কান্নার শক্তিও হারিয়েছে।চার জন মহিলা নুরুন্ নেছা কে খাট থেকে নামাতে চেষ্টা করছে,শেষ গোসল করাবে।নাজু দৌড়ে গিয়ে শরীরের সব শক্তি দিয়ে মাকে আগলে রাখেন।বলেন,
আমার মাকে নামাইতে দিমু না।আপনেরা আমার মাকে নিতে পারবেন না।খালা সম্পর্কে,
একজন নাজুকে বুঝায়।বলে,সবাইকে একদিন মরতে হবে। দুনিয়াডা চিরোস্থায়ী না।
নাজু বুঝ মানেনা।শেষে একজন বলে,তুই কি চাস তর মা নাপাক অবস্থায় পড়ে থাকে।
নাজুর হাতের বাঁধন ডিলে হয়ে আসে।
নুরুন নেছা দেখছেন তার পঁঞ্চাশ বছরের চেনা ঘর থেকে অচেনা মূখী হচ্ছেন।যেখানে তার ইচ্ছা অনিচ্ছা বলতে কিছু নেই। আছে নিয়তি।
ঘরের পেছনের দরজা দিয়ে কোলে করে সাবধানে নামানো হোচ্ছিলো।তিনি শেষ বারের মতো প্রিয় ঘর খানি দেখেন। বিবর্ণ রসুই ঘর দেখেন।কতদিন হয় মাটির চুলায় রান্না করেন নি।ছেলে রিন্টু শেষ যখন বাড়ি আসলো, মাটির চুলায় মায়ের হাতে খিচুড়ি খেতে চেয়েছিল।সে কথা ভেবে তার কান্না আসছে। জাগতিক জগতে থাকলে কাদতেন।কিনতু তিনি তো সেই জাগৎ ছেড়ে এসেছেন। কান্না আসবে কোথা থেকে।তবু কোথায় যেন আপন ঘর,ছেলে, মেয়ের জন্য মায়া, তাদের ছেড়ে চিরতরে চলে যাওয়ার বেধনা,তার আত্মায় এখন ও জাগরুক।চেতনার এই জগতে কেও জানে কি নুরুন নেছর ভাবনা?
মোল্লা বাড়িতে তখন বিকেল নেমেছে।শনিবারের বিকেল।শুন শান নিরব।একটা পাখির ডাক নেই। বিকেলের নরম,মনমরা রোদ গাছ গাছলীর ফাঁক ফোকর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে।আসরের আযান তখনও দেয় নি।
দুর থেকে দেখা যাচ্ছে নুরুন নেছার ছোটো ছেলে ও বড় মেয়ে আসছে।বিষন্ন ক্লান্ত তাদের শরীর, চোখ,মুখ।ঘরে এসেই বোন নাজুকে জড়িয়ে ধরে। জিজ্ঞেস করে মা কই।উপস্থিত লোকজন যেনো ভাষা হারিয়ে ফেলে। হাতের ইশারায় ঘরের পিছনটায় রাখা খাটিয়া দেখিয়ে দেয়।
মা এর লাশ দেখে বড় মেয়ে শেফা ও ছোট ছেলে রিন্টু যেনো কাদতে ভুলে গেছে।মায়ের মুখ খানি দেখে তাদের মনে হচ্ছিল, মা ঘুমিয়ে আছে। জেগে উঠবে।ইশ মা তো সাকালে ও জীবিত ছিল,কথা বলছে।সেফা কাঁদতে কাঁদতে বলল, কত বার বলছি, মা বুকে ব্যথা নিয়ে বাড়ি বইসা থাইকেন না। হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার দেখান। আশা আপনারে নিয়া যাইবে।ডাক্তার দেখালে মনেরে একটু সান্তনা তো দিতে পারতাম।
ছেলে রিন্টু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বোনের কথা শুনছিল।কে একজন তাকে ডেকে নিয়ে গেলো। বাড়ির দরোজার মসজিদে আসর আযান দিচ্ছে। আসর পড়ে মায়ের জানাজার নামাজ কখন হবে মুসল্লিদের বলতে হবে।
দোকানে মায়ের সামান্য বকেয়া আছে। নামাজ শেষে সেটি মিটিয়ে রিন্টু দ্রুত বাড়ী আসে।তার মনে হলো,আর কিছুক্ষণ,,।তার পর এই জগতে আর কখনো মায়ের মুখখানি আর দেখা হবে না। ঢাকা থেকে আসলে খুব সকালে দরজা খুলে হাসি দিয়ে বলবে না, “বাবা তুই আইছস। ফজর পড়ে তোর জন্য অপেক্ষা করছি। কখন আসবি।”
মায়ের মাথার পাশে মোড়া পেতে বসে অঝোর ধারায় কাদতে লাগল রিন্টু। মৃত মায়ের গালে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিলেন। চোখের পানি গড়িয়ে মায়ের কপলে পড়ে। মা ছেলের কথা হয়।
মা কত অন্যায় করেছি। কষ্ট দিয়েছি মা।মাফ করে দিয়েন। ছেলে মোড়া ছেড়ে উঠে মায়ের পা ধরে মাফ চায়। মা নুরুন নেছা কি দেখতে পান। বা শুন্তে ?
মা বড় মেয়ের কথা হয়।মেয়ে মা এর কপোলে সাহসী চুমু এঁকে দেন। বিদায় মা।🌿