ঢাকা থেকে বাসে করে রাজশাহী যাইতে ৫-৬ ঘণ্টা লাগে।আসলেই কি তাই?
ঢাকা থেকে রাজশাহী বাসে যাওয়া খুবই স্মুথ একটা ব্যাপার। ঈদ ছাড়া আগের থেকে টিকিট ও করে রাখার লাগে না। সবসময় বাস এভেইলেবল। কিন্তু এক্সসেপশন তো আছেই। চলুন একটু ঘুরে আসি সেটায়।
বুয়েট থেকে আমি আর অর্ণব সোজা চলে গেলাম কল্যাণপুর। আমি যতগুলা বাস চিনি দেখি একটাতেও কোনো টিকিট নাই।জিজ্ঞেস করলাম এই অবস্থা কেন? এরকম তো কখনো হয়না। কাউন্টার থেকে বললো কালকে রাজশাহীতে কি জানি বড় পলিটিকাল প্রোগ্রাম আছে, সব বাসের টিকিট শেষ।
রাত বাজে তখন প্রায় ১১:৩০। আমাদের পকেটের অবস্থা যা, এখন আবার বুয়েটে ব্যাক করাও সম্ভব না। সামহাও যাওয়া তো লাগবেই। ঠিক সেই মুহুর্তে দেখি কয়েকটা লোক ডাকাডাকি করতেসে, রাজশাহী, রাজশাহী, রাজশাহী। রাত ১২ টার গাড়ি।
আমি আর অর্ণব গেলাম ওখানে। গাড়ির নাম শিশির ইন্টারপ্রাইজ। এই প্রথম নাম শুনলাম। জিজ্ঞেস করলাম, দুইটা সিট লাগবে। তখন ঢাকা-রাজশাহী ভাড়া ছিল ৪৮০ করে। তাহলে দুই টিকিট মিলে আসে ৯৬০ টাকা। ওরা ৯৬০ ই চাইলো। আমি কি মনে করে জানি বললাম ৭০০ দেই?
এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলো। আমি সঙ্গে সঙ্গে অর্ণবকে বললাম, বাল ৫০০ বললেও মেইবি রাজি হয়ে যাইতো।
কাউন্টারের লোক আমাদেরকে বাসের কাছে নিয়ে গেলো। ঢাকার রাস্তায় চলাচল করা সবচেয়ে পুরোনো, কনজাস্টেড
এরকম একটা বাসে উঠায় দিয়ে বললো, এইটা টেকনিকাল পর্যন্ত নিয়ে যাবে। ওখানে মেইন বাস দাঁড়ায় আসে।
দেখলাম বাস টেকনিকাল পার হয়ে গেলো কিন্তু থামলো না। আমরা বুঝলাম কোনো মেইন বাস নাই। এইটাই মেইন বাস।
কি আর করার এখন। নেমে যাওয়ার সুযোগ ও তে নাই। এইটাইতে যাওয়া লাগবে। আমাদের পোড়া কপালকে দোষ দেয়া ছাড়া আর কিছুই করার নাই।
গাড়ির বাকি প্যাসেঞ্জারদের দেখে বুঝে গেছি এইটা কোন বাস। পা দুইটার অবস্থা ব্যাপক খারাপ। রাখারই জায়গা নাই।
ঠিক জানিও না যে কোন লোকেশনে আছি। এর মাঝে যেটা হওয়ার সেটা হইলো। গাড়ি নষ্ট। এই গাড়ির কোনো সুপারভাইজার ছিল না। শুধু দেখতেসি হেল্পার সামনে দাঁড়ায় আসে। আর ড্রাইভার কাকে জানি ফোন দিয়ে বলতেসে আরেকটা গাড়ি পাঠায় দিতে। বলার সময় খুব জোর গলায় বলতেসে, ভাই শিশির গাড়ির ড্রাইভার বলতেসি, আরেকটা গাড়ি পাঠায় দেন তো। ভাবখানা এমন যে সে গ্রিন লাইনের ড্রাইভার।
এর মাঝে কেমনে জানি আমি ঘুমায় গেসি। উঠে দেখি ড্রাইভার নাই। ড্রাইভার কোথায়? ড্রাইভার বাসের নিচে।
এই ড্রাইভার একই সাথে মেকানিক ও। সেই নেমে পড়েছে গাড়ি ঠিক করতে। কিন্তু গাড়ি আর ঠিক হয়না।
এর মাঝে আমরা শুনলাম নতুন একটা টার্ম। ১৯ নাম্বার ডাইল। হেল্পার ক্রমাগত বলেই যাচ্ছে ১৯ নাম্বার ডাইলে সমস্যা। আমরা তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
এরই মাঝে ত্রাণকর্তা হাজির। একদম পেছনের থেকে এক লোক বলে উঠলো, কি ভাই ১৯ নাম্বার ডাইল ঠিক করতে পারতেসেন না। কিছুই তো পারেন না দেখি।
এই লোক হলো আসল মেকানিক। কিছুক্ষণ পর এই লোক যে গাড়ির যাত্রী সে গাড়ির নিচে চলে গেলো ১৯ নাম্বার ডাইল ঠিক করার জন্য। আমরা ভাবলাম, কি অদ্ভুত ব্যাপার। প্যাসেঞ্জার গাড়ি ঠিক করতেসে। এবং গাড়ি আসলেই ঠিক হয়ে গেলো।
এই মেকানিক ভাইয়ের আর কিছু থাকুক না থাকুক। এটিটিউড ছিল। Swag তার সালমান খানের চেয়েও বেশি। আর ভাবখানা এমন যে সে ডোনাল্ড ট্রাপ। দুই পয়সা দিয়ে সে কাউকেই গুনে না।
সকাল ৭ টা বাজে। আমরা আবার ঘুমায় গেসলাম। টের পেয়ে দেখি গাড়ি আবার থেমে আসে। টাইম দেখে ভাবলাম পৌছায় গেসি হয়তো। গাড়ি থেকে নেমে দেখি, ৭ ঘন্টায় মাত্র সিরাজগঞ্জ আসছি। খাওয়ার জন্য ব্রেক দিসে।
কেরকম একটা হোটেলে থামসে। হোটেল ও বলা যায় না। বড়জোর একটা টং। আমি আর অর্ণব তেমন কিছু খাইলাম না। হালকা চা পারুটি খেয়ে সাইডে বিড়ি খাইতে গেসি।
আমরাই সবার শেষে গাড়িতে উঠলাম। গাড়ির লোকজন আমাদের জন্যই ওয়েট করছিল। এক লোক বললো আরে ভাই বাইরে কেনো? এখানেই ধরায় দেন। এই বলে সে প্যাকেটে থেকে ডার্বি বের করে চলন্ত গাড়িতেই ধরায় দিল। আশেপাশে দেখলাম সবাই ই ধরায় দিসে। আমরা ভাবলাম, ভাই রে ভাই সেই প্রিমিয়াম গাড়িতো।
সকাল সাড়ে ১০ টার মতো বাজে। এইবার বুঝি চলেই আসলাম। কিন্তু না। কোনোরকমে নাটোর আসছি। হেল্পার বলতেসে, ভাই সবাই নামেন। আমরা বললাম গাড়ি না রাজশাহী যাবে? হেল্পার বললো কথা তো সেটাই ছিল। কিন্তু গাড়ির অবস্থা ভালো না। গাড়ি আর চলবে না।
কি আর করার, নেমে গেলাম। নাটোর থেকে রাজশাহীর বাস অহরহ পাওয়া যায়। একটা বাসে উঠে পড়লাম। আর জানালার সাইড দিয়ে দেখলাম শিশির গাড়ির ড্রাইভার অন্য আরেক বাসের হেল্পারি করতেসে।
মাল্টিডাইমেনশনাল বুঝি এরেই বলে। সে একাধারে ড্রাইভার,মেকানিক ও হেল্পার।
এতকিছুর পরে ৫-৬ ঘন্টার পথ আমরা ১২ ঘন্টার ও বেশি সময় নিয়ে পার করলাম। ঠিক দুপুর ১২ টায় পৌছালাম মামুর বুটার শহর রাশ্শাইতে।