বুক রিভিউ: চতুষ্কোণ গ্যাং — বন্ধুত্বের চিরন্তন চাদর ও জীবনের অন্যরকম উপাখ্যান
বইয়ের নাম: চতুষ্কোণ গ্যাং
লেখক: সালাম খোকন
প্রকাশনী: শিল্পৈষী
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৭৬
মূল্য: ৪৫০ টাকা
প্রাপ্তিস্থান: রকমারি ডট কম
তারুণ্যের দিনগুলো ফুরিয়ে যখন বাস্তবতার কঠিন পিচঢালা পথে মানুষ পা বাড়ায়, তখন পেছনে ফেলে আসা দিনগুলোর জন্য একধরনের দীর্ঘশ্বাস জমা হয় মনের কোণে। সেই ফেলে আসা সোনালী সময়, তারুণ্যের অপ্রতিরোধ্য উচ্ছ্বাস এবং সময়ের স্রোতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়া চার বন্ধুকে নিয়ে রচিত হয়েছে সালাম খোকনের উপন্যাস ‘চতুষ্কোণ গ্যাং’। এটি কেবল কতগুলো পাতার সমষ্টি নয়, বরং প্রতিটি পাঠককে তার নিজের তারুণ্য ও বন্ধুত্বের ঠিকানায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার এক জাদুকরী দলিল।
উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রিদওয়ান, সানিদ, তানভীর এবং সুনিয়া—এই চার তরুণ-তরুণী, যাদের নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘চতুষ্কোণ গ্যাং’। লেখকের ভাষায়, উপন্যাসের কেউ হিরো নয়, আবার কেউ খলনায়কও নয়; তারা সবাই রক্ত-মাংসের সাধারণ মানুষ। তাদের জীবনে ভুল আছে, দ্বিধা আছে, সংগ্রাম আছে, আবার আত্মোপলব্ধির আলোও আছে।
সানিদের সরকারি চাকরির কঠোর লড়াই, তানভীরের কর্পোরেট জীবনের নিঃসঙ্গ ইঁদুর দৌড়, সুনিয়ার পারিবারিক জীবনের রুটিনমাফিক অস্তিত্বের ভেতরে লুকানো শূন্যতা, আর রিদওয়ানের একাকী কিন্তু আপসহীন শৈল্পিক পথচলা—সব মিলিয়ে চরিত্রগুলো এত বেশি জীবন্ত যে, পাঠক সহজেই তাদের মধ্যে নিজের বা চেনা কোনো মানুষের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাবেন।
লেখক অত্যন্ত মুন্সিয়ানার ফুটিয়ে তুলেছেন যে, বন্ধুত্ব কোনো নিছক সম্পর্ক নয়, এটি এক পরম আশ্রয়। বর্তমান যান্ত্রিক সময়ে যখন চারপাশ অচেনা ঠেকে, তখন বন্ধুরা হয়ে ওঠে সত্যিকারের ঠিকানা। উপন্যাসের মূল আকর্ষণ এর আবেগঘন আবহ—যেখানে জীবনের নানা টানাপোড়েন, ভুল বোঝাবুঝি পেরিয়েও আত্মিক সম্পর্কগুলো বেঁচে থাকে। বিশেষ করে দীর্ঘ দূরত্বের পর তাদের আবার একত্রিত হওয়ার প্রচেষ্টা এবং চায়ের কাপে পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করার দৃশ্যগুলো পাঠকের মনে তীব্র নস্টালজিয়ার জন্ম দেয়।
সালাম খোকনের গদ্যশৈলী অত্যন্ত সহজ, সাবলীল এবং মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা সম্পন্ন। তিনি রূপক বা জটিল অলংকরণের চেয়ে চরিত্রের ভেতরের অনুভূতি ও মানসিক দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তোলার ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। উপন্যাসের প্রতিটি সংলাপ পাঠকের হৃদয়ে নাড়া দেয়। বিশেষ করে লেখকের নিজের মুখবন্ধ বা কথা অংশে যে আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে, তা পুরো উপন্যাসটিকে একটি অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
যারা জীবনের ব্যস্ততায় নিজেদের পুরোনো বন্ধুদের হারিয়ে ফেলেছেন, তাদের জন্য এই বই এক মৃদু ও মায়াবী আহ্বান।
যারা এখনও বন্ধুত্বের পবিত্র বাঁধন বুকভরে আগলে রেখেছেন, তাদের জন্য এটি উদযাপনের খোরাক।
যারা শহুরে যান্ত্রিকতা থেকে দূরে গিয়ে একটু বিশুদ্ধ আবেগ ও শেকড়ের টান অনুভব করতে চান।
১৭৬ পৃষ্ঠার এই ছোট অথচ গভীর উপন্যাসটি শেষ করার পর পাঠক মাত্রই নিজের জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাববেন। কলেজ ক্যাম্পাস, মেস রুম কিংবা আড্ডার চেনা মুখগুলো ভেসে উঠবে স্মৃতির পাতায়। লেখকের এই সৃষ্টি কেবল একটি বই নয় বরং বন্ধুত্বের নামে এক চিরন্তন স্মারক।
"আমরা একসাথে থেকে একে অপরকে আরও সমৃদ্ধ করব।" — এই প্রতিজ্ঞাকে বুকে ধারণ করে একবার হলেও সংগ্রহ করতে পারেন ‘চতুষ্কোণ গ্যাং’।