Story

এক কাপ কফির প্রতিশ্রুতি

September 22, 2026

7
View

ঢাকার এক ব্যস্ত সকালে, নীলা কলেজে যাওয়ার পথে হঠাৎ বৃষ্টিতে আটকে গেল। মাথার উপর ছাতা নেই, রিকশাও মিলছে না। এক কোণে ছোট্ট এক ক্যাফে দেখে ঢুকে পড়ল—"ব্রিউ বুথ"।
ক্যাফেটা ফাঁকা, শুধু একটা টেবিলে বসে বই পড়ছিল একটা ছেলে—অরণ্য। কফির কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে, আর ওর চোখ বইয়ের পাতায়।
নীলা কাঁপতে কাঁপতে ঢুকে চেয়ার খুঁজছিল। অরণ্য তাকিয়ে বলল,
– "আপনি চাইলে এখানে বসতে পারেন। ক্যাফেটা বড্ড ছোট আর চেয়ারগুলো বেশিরভাগই ভেজা।"
নীলা একটু দ্বিধা নিয়ে বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর অরণ্য বলল,
– "এক কাপ কফি খাবেন? এখানে দারুণ বানায়। আমি ট্রীট দিচ্ছি।"
নীলা হেসে বলল,
– "অচেনা কাউকে কি এত সহজে কফি অফার করেন?"
অরণ্য একটু লাজুক হাসিতে বলল,
– "না, সাধারণত না। কিন্তু আজ সকালটা একটু অন্যরকম। আপনার চোখে দেখলাম বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। তাই ভাবলাম, কফিটা সঙ্গ দিতে পারে।"
সেই কফির কাপের পাশে শুরু হয় গল্প। প্রথমে বই নিয়ে, তারপর সিনেমা, সঙ্গীত, জীবন আর ছোট ছোট আফসোস নিয়ে। বৃষ্টি থেমে যায়, তবু ওরা উঠে দাঁড়ায় না।
নীলা বলে,
– “তুমি অরণ্য, তাই তো? আমি নীলা। আশ্চর্য না? অরণ্য আর নীলা—একটা গল্পের মতো লাগে।”
সেদিন ছিল তাদের প্রথম দেখা, প্রথম কফি, আর প্রথম বন্ধুত্বের শুরু।
তারপর থেকে প্রতি সপ্তাহে একবার, তারা দেখা করত সেই ক্যাফেতে। একই টেবিল, এক কাপ কফি, আর গলায় জমে থাকা না বলা কথাগুলো ভাগ করে নেওয়া।
দিন গেল, মাস গেল। একদিন অরণ্য একটু থেমে বলল,
– “নীলা, জানো? বন্ধুত্ব শুরু হয়েছিল কফির কাপ দিয়ে। কিন্তু এখন কফির চাইতেও বেশি দরকারি হয়ে উঠেছ তুমি।”
নীলা এক চুমুক দিয়ে বলল,
– “তোমার বন্ধুত্বেও কফির মতো একটা তীব্রতা আছে… তেতো কিন্তু ছাড়া যায় না।”
তাদের চোখে ছিল এক ধরনের নীরব সম্মতি—ভালোবাসা হয়তো এখনো বলা হয়নি, কিন্তু বন্ধুত্বটা ছিল তার চেয়েও গভীর।


বছর খানেক পেরিয়ে গেছে।
ক্যাম্পাস জীবনের সেই শেষ সন্ধ্যায়, যখন সব বন্ধুরা উৎসবে, বিদায় অনুষ্ঠানে ব্যস্ত— নীলা আর অরণ্য ক্যান্টিনে বসে চুপচাপ কফি খাচ্ছিল।
কেউ কিছু বলছিল না।
শুধু জানালার বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল হালকা করে, আর তাদের সামনে দুটো কাপে ধোঁয়া উঠছিল ঠিক আগের মতো।
সেই সময়টুকুতে কেউই ভালোবাসা বলেনি।
বলবার দরকার ছিল না।
কিন্তু বললে হয়তো আরও কিছু বদলাত…
স্নাতক শেষ করে নীলা ঢাকাতেই একটা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়ে যায়।
অরণ্য ঢাকার বাইরে, এক কলেজে শিক্ষকতা শুরু করে।
তাদের মাঝে দূরত্ব আসে, কিন্তু সম্পর্কটা মুছে যায় না।
সপ্তাহে একদিন, শুক্রবার বিকেলবেলা, তারা দেখা করে সেই পুরোনো ক্যাফেতে।
একই টেবিল, দুই কাপ কফি।
নীলা মাঝে মাঝে বলে, "আমরা কি আজও কেবল বন্ধু?"
অরণ্য হেসে ফেলে। উত্তর দেয় না।
সে চুপ থাকলে, নীলার বুকের ভেতরে হালকা কষ্ট ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু মুখে বলে না কিছুই।
কিছু অনুভূতির হয়তো ভাষা হয় না, সময়ও খুঁজে পায় না।
একদিন, নীলার পরিবার থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসে।
ছেলেটা কানাডা থেকে এসেছে, প্রতিষ্ঠিত, ভদ্র, যোগ্য।
নীলা দ্বিধায় পড়ে যায়।
কিন্তু যেদিন পরিবার থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়, সেইদিন সন্ধ্যায় নীলা একা আসে ক্যাফেতে।
অরণ্য তখন জানালার পাশে বসে, সামনের কাপে ধোঁয়া তুলছে।
নীলা ধীরে বলে, "অরণ্য, যদি আমি এই শহর ছেড়ে চলে যাই… তুমি কি কিছু বলবে না?"
অরণ্য তাকিয়ে থাকে।
তার ঠোঁটে একটুও কাঁপুনি নেই, কিন্তু চোখের কোণে একটা ছোট রেখা জমে উঠেছে— জলের কিনারা।
সে বলে, "নীলা, ভালোবাসা আমি চিৎকার করে বলিনি, কারণ জানতাম— তুমি বুঝে গেছ।
কফির স্বাদ বদলায়নি, তোমার তাকানোর ভঙ্গিও না।
তুমি আজও আমার কফির মতো— প্রতিদিন চাই, কিন্তু আসক্তির মতো নয়… অভ্যাসের মতো, শান্তির মতো।
তুমি যদি যাও, আমি কিছু বলব না…
কিন্তু যদি থেকো, তবে প্রতি শুক্রবার, এই টেবিলে এক কাপ কফি থাকবে তোমার জন্য।"
নীলা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
"তাহলে এবার আমিই বলি, অরণ্য— এই কফির প্রতিশ্রুতি আমি রাখতে চাই। শুধু বন্ধু হয়ে নয়, জীবনসঙ্গী হয়ে।"
সেই সন্ধ্যায় তারা প্রথমবার, সত্যিকার অর্থে হাত ধরেছিল।
ক্যাফের ভেতরে নিঃশব্দ, কিন্তু বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল— হালকা, উষ্ণ, আশীর্বাদের মতো।
কফির কাপ আর ছুঁয়ে দেখে না কেউ।
কফির গন্ধ, সেই পুরোনো, কিন্তু এবার তার সঙ্গে ছিল প্রতিশ্রুতি—
ধীরে গড়ে ওঠা, কিন্তু চিরকাল রয়ে যাওয়ার এক সম্পর্কের।

শেষ নয়... কারণ ভালোবাসার গল্প কখনো শেষ হয় না।

Comments

    Please login to post comment. Login