Story

সময়ের চেয়ে দামি

September 22, 2026

8
View

অফিস থেকে ফেরার পথে আনিসের হঠাৎ মনে হলো, রেবাকে আজ কিছু একটা দেওয়া দরকার। কোনো বিশেষ দিন নয়, কোনো অ্যানিভার্সারি বা জন্মদিনও না। নিউ মার্কেটের মোড়টায় জ্যামে আটকে থাকার সময় ফুটপাথের এক ঝলমলে দোকানের দিকে তাকাতেই চোখ আটকে গেল। সোনালী চেইনের একটা চমৎকার ঘড়ি। খুব আহামরি দামী কিছু না, কিন্তু রুচিশীল।
আনিস ভাবল, রেবার হাতে ঘড়িটা বেশ মানাবে। বারো বছরের সংসারে রেবা নিজের জন্য কবে শেষবার কিছু চেয়েছে, আনিসের মনে নেই। সংসার, বাচ্চা, আর আনিসের ভালো-মন্দ দেখতে দেখতে মেয়েটা নিজের শখগুলো হয়তো আলমারির তাকে তুলে রেখেছে।
বাসায় ফিরে আনিস জামা-কাপড় না ছাড়তেই পকেট থেকে প্যাকেটটা বের করল। রেবা তখন ড্রয়িংরুমে বসে বাচ্চার স্কুলের খাতা দেখছিল।
"রেবা, একটু এদিকে এসো তো," আনিসের গলায় ধামাচাপা উত্তেজনা।
রেবা মুখ না তুলে বলল, "কিছু বলবে? ওখানেই রাখো, আমি আসছি।"
"আরে এসো না, তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি।"
রেবা এবার চশমাটা খুলে এগিয়ে এল। আনিস প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিল। রেবা ভ্রু কুঁচকে প্যাকেটটা খুলল। ভেতরে সোনালী চেইনের ঘড়িটা চকচক করছে।
আনিস আশা করেছিল রেবার মুখে এক চিলতে হাসি দেখবে। হয়তো বলবে, "খুব সুন্দর হয়েছে।" কিন্তু রেবা ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল প্রায় মিনিটখানেক। তারপর শান্ত, কিন্তু অভিমানী গলায় বলল, "ঘড়ি?"
আনিস বলল, "হ্যাঁ, পছন্দ হয়নি? দোকানদার বলল এটা নাকি লেটেস্ট ডিজাইন।"
রেবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঘড়িটা টেবিলের ওপর রেখে বলল, "বিয়ের বারো বছর পর তোমার মনে হলো আমার একটা ঘড়ি দরকার? যখন ইউনিভার্সিটি পড়তাম, তখন কতবার বলেছি একটা ঘড়ি কিনে দিতে। তখন তো কই, কানেই তোলোনি। আর এখন? যখন সময় দেখারই সময় নেই আমার, তখন ঘড়ি এনে কী হবে?"
আনিসের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে ভেবেছিল এটা ভালোবাসা, কিন্তু রেবা দেখছে অবহেলা। আনিসের মেজাজটাও চড়ে গেল। সারাদিন অফিসের খাটুনির পর এই খোঁচাটা সহ্য হলো না।
সে বলল, "তোমাদের নিয়ে এটাই সমস্যা। না দিলেও দোষ, দিলেও দোষ। দিলাম তো ভালোবেসে, এখন পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটার মানে হয়?"
"ভালোবাসা!" রেবা গলার স্বর উঁচুতে তুলল, "ভালোবাসা মানে শুধু জিনিস কিনে আনা না আনিস। ভালোবাসা মানে বোঝা। তুমি যদি আমাকে একটুও বুঝতে, তবে জানতে এখন আমার ঘড়ির চেয়ে তোমার একটু সময়ের প্রয়োজন বেশি। অফিস থেকে ফিরে সেই যে ল্যাপটপ নিয়ে বসো, আমার দিকে তাকানোর সময় পাও?"
ব্যাস, শুরু হয়ে গেল। এক কথা থেকে দুই কথা। পুরনো সব ঝগড়া, না পাওয়া, আর অভিযোগের ধুলো ঝেড়ে বের করা হলো। আনিস রাগে গটগট করে বেডরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। রেবা রান্নাঘরে গিয়ে বাসন-কোসন খুব জোরে শব্দ করে ধুতে লাগল।
রাতটা কাটল নিঃশব্দে। দুজন দুই দিকে মুখ করে শুয়ে রইল। মাঝখানে মাত্র এক হাত দূরত্ব, কিন্তু মনে হচ্ছে যোজন যোজন মাইলের ব্যবধান।
পরের দুই দিন বাসায় অদ্ভুত এক নীরবতা। আনিস সকালে নাস্তা করে চুপচাপ অফিসে চলে যায়। রেবাও কথা বলে না, শুধু টিফিন বক্সটা টেবিলে রেখে দেয়। কেউ কারো দিকে তাকায় না, কিন্তু দুজনই আড়চোখে লক্ষ্য করে অপরজনকে। আনিস খেয়াল করে, রেবা তার ইস্ত্রি করা শার্টটা ঠিক জায়গাতেই রেখেছে। রেবা খেয়াল করে, আনিস বাজার থেকে তার পছন্দের মাছটাই এনেছে, কোনো কথা না বলে।
তৃতীয় দিন বিকেলবেলা। আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামল। আনিস বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে। হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। চা-টা রেবা বানিয়ে দিয়ে গেছে একটু আগে, কিন্তু কিছু বলেনি।
হঠাৎ আনিসের মনে হলো, রেবা তো ভুল কিছু বলেনি। এই বারো বছরে সে রেবাকে অনেক কিছুই দিয়েছে—শাড়ি, গয়না, সংসারের স্বাচ্ছন্দ্য। কিন্তু সেই প্রথম দিকের মতো মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা, বা অকারণে গল্প করা—সেটা কমে গেছে অনেক।
আনিস ধীর পায়ে ঘরে ঢুকল। রেবা ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধছে। আনিস দেখল, টেবিলের এক কোণে সেই ঘড়িটা পড়ে আছে।
আনিস ঘড়িটা হাতে নিল। রেবার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। রেবা আয়নায় আনিসকে দেখছে, কিন্তু নড়ছে না। আনিস খুব সাবধানে রেবার বাঁ হাতে ঘড়িটা পরিয়ে দিল।
রেবা হাতটা সরাল না। শুধু নিচু গলায় বলল, "এখনো রাগ করে আছো?"
আনিস রেবার কাঁধে হাত রেখে বলল, "দেরি করে ফেলেছি, তাই না? বারো বছর লেগে গেল ঘড়িটা দিতে। তবে কথা দিচ্ছি, এখন থেকে শুধু ঘড়ি না, সময়টাও দেব।"
রেবার চোখের কোণটা ভিজে উঠল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে আনিসের বুকে মাথা রাখল। বাইরে ঝুম বৃষ্টির শব্দ। ঘরের ভেতর বারো বছরের পুরনো এক সংসারের অভিমান গলে পানি হয়ে যাচ্ছে।
ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে চলছে। সময় চলে যায়, কিন্তু ভালোবাসাটা ঠিকই থেকে যায়—কখনো রাগে, কখনো অনুরাগে আর কখনো এক কাপ চায়ের নীরবতায়।

Comments

    Please login to post comment. Login