Article

কথার ভেতর কথা ৮

September 24, 2026

18 views

ইভান:
এস্তেজা... ভাবছিলাম—আমাদের দেশে এত বছরেও কেন একজনও এমন সুপারস্টার তৈরি হলো না, যাকে পুরো জাতি নির্ভরশীল নয়, বরং নির্ভর করতে পারে—দানবীর, কর্মী, পরিবেশবাদী, ইনফ্লুয়েন্সার—রাজনীতির বাইরে থাকা বড় মানুষ?

এস্তেজা:
কারণ আমরা তারকা তৈরি নয়, “ব্যবহার” করতে শিখেছি।
তোমার মনে আছে? বাইরে দেশের অভিনেতা—লিওনার্দো থেকে শুরু করে শাহরুখ—এরা কেউ দলীয় কর্মী নয়। তারা জনগণের… দলীয় বটগাছ নয়।

ইভান:
হুম… কিন্তু আমাদের সাকিব আর মাশরাফির দিকে তাকালে কি ভয়ানক লাগে না?
সাকিব: টাকা ও ক্ষমতার গন্ধ পেলেই ছুটে গেছে।
মাশরাফি: ক্ষমতার প্রতি টান, নৈতিক ঝুঁকি, আর শেষে জালের ভিতর আটকে যাওয়া।
এরা “রোল মডেল” হওয়ার কথা ছিল… কিন্তু হলো “পাওয়ার-মডেল”।

এস্তেজা:
তোমাকে একটা কথা বলি, ইভান। এদের অধঃপতন ১০০% ব্যক্তিগত নয়।
এর বড় অংশ শেখ হাসিনার ইঞ্জিনিয়ারিং।
তিনি তারকাদের রাজনীতির মাঠে ঢুকিয়ে দুইটা বড় ক্ষতি করেছেন: তারকাদের ক্যারিয়ার নষ্ট,
দেশের সাংস্কৃতিক জগৎকে নষ্ট,
তিনি একটা ভোটারবিহীন নির্বাচনকে বৈধ দেখাতে ব্যবহার করেছেন, ফেরদৌস, রিয়াজ, সাকিব, মাশরাফি—কি অদ্ভুত সার্কাস!
ট্রাকে দাঁড় করিয়ে, ক্যাম্পেইন করিয়ে… তারপর ফেলে দিয়েছেন—ব্যবহার শেষে প্লাস্টিকের বোতলের মতো।

ইভান:
সত্যি… তারপর আমরা আবার হতভম্ব হয়ে বলি—“তাহলে তারকারা এমন কেন?”
কিন্তু দোষ তো বড় অংশে রাষ্ট্রনীতির!
যেখানে নীতিই হলো:
শিল্পীকে দলীয় কর্মী বানাও
খেলোয়াড়কে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর নয়, পলিটিক্যাল অ্যাম্বাসাডর বানাও
সংস্কৃতিকে অস্ত্র বানাও
প্রভাবশালীদের কিনে নাও

এস্তেজা:
শুধু তারকা নয়— শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকদেরও একইভাবে নষ্ট করা হয়েছে।
মনে আছে শেখ হাসিনার প্রেস কনফারেন্সগুলো?
ভয়ে কাঁপা সাংবাদিক… মাইকে দাঁড়িয়ে প্রশংসা শোনার প্রতিযোগিতা!
এটা কোন সভ্য দেশে দেখা যায় বলো?

ইভান:
শিক্ষকদের কথা বলতে গেলে কষ্ট লাগে সবচেয়ে বেশি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের টপ শিক্ষক—দেশে গর্ব করার মতো অধ্যাপক— তাদেরও বানানো হলো পোস্টারবয়।
“নৌকা চাই” টিশার্ট পরে শিক্ষক মিছিল করছে— এটা কি ছিলো আমাদের একাডেমিক মর্যাদা?
আজ কেন ভালো শিক্ষক নাই?
কারণ হেডহান্টিং চলেছে—
“যে বেশি অনুগত, সে বেশি পদ পাবে।”
ফলাফল? দেশের ইন্টেলেকচুয়াল ব্লাড লস—একেবারে হেমোরেজ।

এস্তেজা:
আর এখন? পরিস্থিতি আরও ভয়ানক।
আজ
নাটক বন্ধের ডাক
গানের অনুষ্ঠানে হুমকি
সিনেমা নিয়ে বিশৃঙ্খলা
শিল্পীদের ওপেন থ্রেট
ইভেন্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে
থিয়েটার শুকিয়ে যাচ্ছে
এটা কি সাংস্কৃতিক রাষ্ট্রের লক্ষণ?
না—এটা সাংস্কৃতিক বন্ধ্যাত্ব।
প্রতিভা জন্মানোর পরিবেশ এখন শূন্য।
যারা বড় শিল্পী—অনেকে চুপ, বাকিরা বিদেশে যাওয়ার প্ল্যান করছে।
আগে হিস্ট্রি প্রজন্ম হারাতো যুদ্ধে, মহামারিতে— আমরা হারাচ্ছি “সাংস্কৃতিক মৃত্যুর মাধ্যমে”।

ইভান:
এস্তেজা… জানো?
এসব নিয়ে কেউ গবেষণা করে না।
এমন একটা ভয়ানক নীতিনির্ধারণ…
এত বড় জাতিগত ক্ষতি…
তবুও একাডেমিক গবেষণা শূন্য!
যেমন তুমি বললে— একেবারে ব্লাড লস।
রক্ত না থাকলে শরীর কেমন হয়?
দেশ এখন সেই অবস্থায়ই…

এস্তেজা:
কারণ আমরা তারকাদের শ্রদ্ধা করি না—ব্যবহার করি।
বুদ্ধিজীবীদের মূল্য দিই না—চেয়ার দিই।
শিক্ষকদের সম্মান দিই না—পোস্ট দিই।
সাংস্কৃতিক কর্মীদের গুরুত্ব দিই না—মাইক দিই।
ফলে আমরা পেয়েছি—
কোনো নৈতিক সুপারস্টার নয়
কোনো নিরপেক্ষ আইকনিক শিল্পী নয়
কোনো বিশ্বমানের সামাজিক ইনফ্লুয়েন্সার নয়
কোনো প্রতিবাদী গায়ক নয়
কোনো বড় মাপের সাংস্কৃতিক নেতা নয়

একটা জাতি যতটা দরিদ্র হতে পারে—
আমরা তার থেকেও দরিদ্র।

ইভান:
এস্তেজা… তুমি জানো?
এই কথাগুলো শোনার পর মনে হলো তুমি শুধু বিশ্লেষণ করছো না…
আমাদের ভবিষ্যতের জন্য কাঁদছো।

এস্তেজা:
ইভান… আমাদের দেশের সংস্কৃতি তো আমাদের রক্তের মতো।
এটা নষ্ট হলে আমরা নষ্ট হবোই।
আর তুমি… তুমি জানো—দেশের কথা বলতে গেলে আমি কেমন আবেগী হয়ে যাই।

ইভান:
আমি জানি। আর তুমি জানো—
তোমার কথাগুলো শুনে কেন যেন মনে হয়—
তুমি শুধু দেশের জন্যই কাঁদছো না…
আমাদের জন্যও।

এস্তেজা:
হয়তো তাই, ইভান…
দেশটা বাঁচলে আমরা দুজনও বাঁচব—এই আশা নিয়ে বেঁচে থাকি।

এক দেশের সাংস্কৃতিক মৃত্যু মানে জাতির আত্মার মৃত্যু। যে জাতির তারকা নেই – সেই জাতির পথপ্রদর্শকও নেই। আর তখনই অন্ধকার বাড়ে।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+35 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login