এস্তেজা: আজ তোমার সঙ্গে একটা বিষয় নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে চাই…
ইভান: হ্যাঁ, বলো। শব্দটা তোমার গলায় কতটা ভারী—ইচ্ছে করছে শুনি।
এস্তেজা: সম্প্রতি আমি ভাবছি—বাংলাদেশে এখন কি সত্যিকারের বিশ্বমানের কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, শিক্ষক, কিংবা ইনটেলেকচুয়াল আছে? আমরা স্কুলে যখন পড়তাম, তখন আক্তারুজ্জামান ইলিয়াস, হেলাল হাফিজ, হাসান আজিজুল হক… এমন কত নাম ছিল, যাদের লেখা আমরা বুকের কাছে রেখে শিক্ষিত হই। এখন?
ইভান: তুমি ঠিকই ধরেছ—এটা শুধু নস্টালজিয়া নয়। বাস্তবেই তখন কেবল সংখ্যা ছিল না, গুরুত্ব ছিল। আর সেটা সমাজ–মননে গভীর ছাপ ফেলে।
এস্তেজা: ঠিক। তখন সাহিত্য মানে সমাজ দেখানো, সমাজকে প্রশ্ন করা, সমাজকে ব্যথা দেখানো। এখন? আমরা কি সেই সাহিত্যের ধারায় দাঁড়িয়ে আছি?
ইভান: আমি মনে করি—আমাদের পরিবেশ বদলেছে। কী বদলেছে সবচেয়ে বেশি? লোকেরা এখন চাইতে বেশি পছন্দ করে—শব্দে প্রচার, বাক্যে বিশালতা, বাস্তবে খালি বানী।
এস্তেজা: সম্পূর্ণ সঠিক। পর্দায় অভিনেতা, সোশ্যাল মিডিয়ায় ইনফ্লুয়েন্সার—সাহিত্যের যে শক্তি ছিল, সেটা কোথায়?
ইভান: সাহিত্য কখনও শুধু শব্দের সমষ্টি নয়। এটা মানবিক অন্তর্দৃষ্টি, সামাজিক বেদনা, প্রশ্ন এবং বিক্ষোভের প্রতিবিম্ব। এগুলোই পৃথিবীর সাহিত্যকে বিশ্বমানের করে— শুধু আত্মপ্রকাশ বা আত্মস্তূতি না।
এস্তেজা: আর গবেষণা? আমি পড়েছি—কোলকাতার মতো পরিবেশেই প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণা বেরোয়। এদিকে স্বাধীনতার ৫০+ বছরেও আমরা Fiz. Rev. Letters, APS, IOP স্তরের লেখক সৃষ্টি করতে পারিনি।
ইভান: হ্যাঁ। এটা শুধু সংখ্যা নয়—মানুষের গভীর চিন্তা করার ক্ষমতা। ইউরোপ–আমেরিক বা ভারত–চীন, তারা শুধু গবেষণা করে না… তারা প্রশ্ন করে, টানাপোড়েন করে, চ্যালেঞ্জ করে। এ দেশে কি কেউ নিজের বর্তমানকে প্রশ্ন করে?
এস্তেজা: প্রশ্ন না থাকলে গবেষণা কীভাবে জন্মাবে? আর শিক্ষক? বিশ্বমানের শিক্ষক মানে কি শুধু ডিগ্রি থাকা? না—মানুষকে আলোকিত করার ক্ষমতা থাকা।
ইভান: এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কিছু শিক্ষক ছিল যারা চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করাতেন—“তুমি কী ভাবছো? তুমি কি সত্যিই বুঝেছো?” আর তাদের উত্তর কখনো আদেশ নয় বরং চিন্তার দিকনির্দেশ।
এস্তেজা: এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও—গভীর চিন্তা–চেতনা কোথায়?
ইভান: গভীরতা তৈরি হয় সংঘর্ষে—আলাপ– আলোচনায়, সমালোচনায়, অসন্তোষে, বিক্ষোভে। এখানে রাজনীতির ভাষা শুনলে টের পাও—কত হাঙ্গামা আর কত ভাবনা! রাস্তায় হাঁটলে—ট্রাফিক জ্যাম, চা দোকানে উচ্ছ্বাস; নদীর ধারে গেলে—ধুলো, আবর্জনা; অফিস–আদালতে গেলে—টাইম, টাকা, চেহারা পরিবর্তন ছাড়া কোনো বাস্তব পরিবর্তন নেই।
এস্তেজা: এটাই বাস্তব। আমরা ব্যস্ত-ব্যস্ত-ব্যস্ত, কিন্তু ভুলে গেছি—চিন্তা, বিশ্লেষণ, অন্তর্দৃষ্টি, নৈতিক সাহস—এসবই একটা জাতিকে শক্ত করে।
ইভান: ঠিক। আমরা গুগলে অনুসন্ধান করি—কেউ আমাদের বলে না কী অনুসন্ধান করতে হবে। শিক্ষা মানে এখন পাসিং মার্ক— গভীরতা না। আর শিক্ষক মানে লেকচার করা— জাগানো না।
এস্তেজা: আর গবেষক? আমার মনে হয়, বাণিজ্যিক প্রকাশনা বেশি, গবেষণার প্রকৃত প্রশ্ন–চিন্তা অনেক কম।
ইভান: তুমি ঠিক বললে। Elsevier-এর আর APS/AIP/IOP-এর পার্থক্য শুধু কম্পোজিশন নয়—এটা সোসাইটাল মানসিকতা সম্পর্কে। APS/AIP/IOP ব্যবস্থা সবসময় পিয়ার রিভিউ + সমালোচনা + ভুল প্রমাণ + পুনর্গঠন চায়। এদেশে আমরা সংখ্যা অর্জন করি, ব্যাজ সংগ্রহ করি। এটা গবেষণা নয়— গল্প সাজানো।
এস্তেজা: আর সাহিত্য? সাহিত্য হবার জন্য কি শব্দের রসধারার বাইরে কিছু লাগে?
ইভান: হ্যাঁ—ইমানদারি, দর্শন, জীবন–ব্যথা বোঝা, সমাজের আঘাত বোঝা, স্মৃতি ইন্টারগ্রেট করা। এখনকার সাহিত্যিকদের কয়েকজন আছে যারা ভালো লিখে— কিন্তু “বিশ্বমানের” বলা ঠিক হবে কি?
এস্তেজা: বিশ্বমানে পৌঁছাতে লেখককে বিশ্বব্যাপী মানুষিক অভিজ্ঞতা দিতে হয়— নিজের স্থানীয়কে বিশ্বের অন্তর্দৃষ্টিতে রূপান্তর করতে হয়।
ইভান: শর্ত খুব কঠিন নয়—কিন্তু সেটা সমালোচনা সহ্য করার সাহস, সত্য বলার নীতি, দৃষ্টির গভীরতা—এই তিনটা লাগে।
এস্তেজা: আর শিক্ষক মানে শুধু নাম। এইকালে অনেক PhD আছে—কিন্তু দেশ সমাজ বদলানোর শক্তি কোথায়?
ইভান: সে শক্তি তৈরি হয় পরীক্ষণ/বৈপরীত্য/সমালোচনা/ অসন্তোষের সাথে।
এস্তেজা: আর সেটা ট্রেন্ডি পোস্ট বা ইনস্টাগ্রাম ক্যাপশন দিয়ে হয় না।
ইভান: তাই তো—আমাদের দেশে সাহিত্য, গবেষণা, বিজ্ঞান—এসব একদিকে আছে, কিন্তু জাগরণের সূচনা সেখানে নেই।
এস্তেজা: আর মনে হয়—আমাদের নীতিনির্ধারকরা এই ধারার গুরুত্ব এতটুকুও বুঝতে পারেন না। তারা শুধু GDP, ব্যাংকিং, ডলারের হিসাব দেখে—কিন্তু মানের ভিত্তি, চরিত্র, মানসিক গভীরতা—এসব কোথায়?
ইভান: কারণ তারা দর্শন/চিন্তাকে রাষ্ট্রের কেন্দ্র বানানোর পরিবর্তে পরিকল্পনা/সংখ্যা বানিয়েছে। পার্থক্যটা শুধুই মান— একটা শিখায় জীবন, আরেকটা শিখায় জীবনের ভয়াবহতা এড়ানোর কৌশল।
এস্তেজা: আর সেই ভয়াবহতা হলো—মানুষ আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। মানুষ ভাবছে—আমি যদি পরীক্ষায় ভালো করি, তবেই আমি ভালো হব। কিন্তু জীবনে ভালো হওয়া মানে তো চিন্তার মান উন্নয়ন।
ইভান: ঠিক। আমরা ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা—সবাই দেখি—নিজেকে প্রশ্ন করতে ভয় পায়। প্রশ্ন করা মানে প্রতিবাদ করা নয়, প্রশ্ন করা মানে চিন্তা করা।
এস্তেজা: আর আমাদের দেশে তো চিন্তা করা সৌন্দর্য্য — এটাও একটা সঙ্কট।
ইভান: হয়তো তাই আজ বাহিরের অনেক দেশে সৃজনশীল মানুষ বাংলাদেশি সাহিত্য / সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বুঝতে চায়— কেন আমরা নিজেরাই তা বুঝি না?
এস্তেজা: কারণ আমরা ডেটা দেখে আছি— দর্শন দেখে না। ভাবো—কেউ শব্দের মহিমা বোঝে না, সে সাউন্ডটা পছন্দ করলে কি সেটা সাহিত্য?
ইভান: না… শব্দের অর্থ, অনুভূতি, আত্মার স্পন্দন—এসব মিলে সাহিত্য সৃষ্টি হয়।
এস্তেজা: আর শিক্ষক? শিক্ষক শুধু পাঠ্য পড়ায় না, জীবন শেখায়।
ইভান: একটা শিক্ষক জীবনের প্রশ্ন করলে—শিক্ষার্থীর জীবন বদলে যেতে পারে। কিন্তু নিয়মের প্রশ্ন করলে— শিক্ষা হয় রুটিন।
এস্তেজা: আর গবেষক? গবেষক শুধু তথ্য দেয় না—তথ্যকে অর্থ দেবার ক্ষমতা তৈরি করে।
ইভান: তাই তো—বিশ্বমানের গবেষক তখনই হবে যখন সে বাচ্চাদের বলে—“এটা শুধু পরিক্ষার জিনিস না, এটা জীবনের প্রশ্ন।”
এস্তেজা: তুমি আজ খুব গভীরভাবে বলছো।
ইভান: কারণ এটা কেবল একটা আলোচনা নয়—এটা আমাদের দেশের মনোবিজ্ঞান এবং মানসিক শূন্যতার প্রতিবেদন।
এস্তেজা: আমি মনে করি—যতক্ষণ না আমরা চিন্তার মান বাড়াবো, ততক্ষণ সাহিত্য, গবেষণা, বিজ্ঞান—সবই কেবল আবেগের ছায়া থেকে যাবে।
ইভান: সত্যি কথা। এটা হয় সংঘর্ষের আলো, না হলে ট্রেন্ডের আলো।
এস্তেজা: আর সংঘর্ষ ছাড়া কোনও উন্নয়ন স্থায়ী হয় না।
ইভান: তাই তো— আমরা এখনও সংগ্রামে আছি। প্রতিটি প্রশ্নই একটা বিপ্লব।
এস্তেজা: তুমি কি মনে করো—এটা কখনও বদলবে?
ইভান: পরিবর্তন আসবে—যখন মানুষ জানতে চাওয়া শুরু করবে… কি পড়ব না বলে বলবে কেন পড়ব।
এস্তেজা: তাহলে এখনও আশা আছে।
ইভান: হয়তো… আশা সবসময় জাগ্রত থাকে—শুধু কিছু মানুষ প্রশ্ন করা শুরু করলে।
এস্তেজা: তাই তো— প্রশ্ন করাই শিক্ষা।
ইভান: আর উত্তর খুঁজে পাওয়া—এটাই গবেষণা।
এস্তেজা: শুধু শব্দ নয়— অনুভুতি, চরিত্র এবং দৃষ্টি।
ইভান: শেষ পর্যন্ত—মানুষই তো মানুষের হাত ধরবে।
এস্তেজা: তাই… আমরা এখনও বাঁচি—ঐক্য করি।
ইভান: ঠিক আছে… শুভরাত্রি।
এস্তেজা: শুভরাত্রি।