-আচ্ছা বাবা, সামনের মাসে একটা লাল প্যান্ট কিনে দেবো। শফিক ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল।
শফিকের কথা শুনে চার বছরের ছেলে সুমন খুশীতে দৌড়ে পাশের রুমে চলে গেল। শফিক এ ঘর হতেই শুনতে পাচ্ছে, সুমন তার মা'কে বলে যাচ্ছে এইমাত্র বাবা তাকে যা বলল।
শফিক বসে বসে টেলিভিশনের চ্যানেল পাল্টে যাচ্ছে। কোন চ্যানেলেই বেশীক্ষন থাকছে না। আরো কিছুক্ষন একটার পর একটা চ্যানেল পাল্টাতে পাল্টাতে একসময় মেজাজ খারাপ করে একা একা বিড় বিড় করে বলল, ধুর, কে বানাতে বলেছে এতগুলো চ্যানেল? কোথাও তো কিছু নাই।
-তুমি অস্থির কেন এতো? এক জায়গায় তো এক মিনিটও থাকোনা। মিতার কণ্ঠ শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখল কখন পেছনে এসে মিতা তার এই চ্যানেল পরিবর্তন করা দেখছিল।
-না, আসলেই তো কোথাও কিছু নাই। শফিক বলল।
-এত অস্থির থাকলে কিছুই দেখতে পাবে না এবং কোন চ্যানেলই তোমার ভাল লাগবে না। মিতা বলল।
-বিকেলে একটু বের হবো। সুমন একটা লাল রঙের প্যান্ট কিনতে চেয়েছে। ওকে বলেছি যে, আগামী মাসে বেতন পেলে কিনে দেব। ভাবছি আজই কিনে এনে দেব। ছেলেটা খুশী হবে।
-সে তোমাদের বাবা ছেলের ব্যাপার। হুম, আমাকেও বলেছে। তুমি কিনে দেবে বলাতে ছেলেতো মারাত্মক খুশী। আর যদি আজই নিয়ে আসো, সে তো খুশীতে আত্মহারা হয়ে যাবে। মিতা বলল।
-সুমন কই এখন? শফিক বলল।
-এইমাত্র নীচে খেলতে গেল।
-আচ্ছা। শফিক আবার রিমোট হাতে নিয়ে বসলো।
তিনতলা বাসাটার একেবারে উপর তলায় থাকে শফিক। একটা ছোটখাট চাকুরি নিয়ে এক ছেলেসহ সংসার চলে যায়। মাসের শেষ সপ্তাহে একটু টানাটানি থাকে। আগে এসব নিয়ে খুব ভাবতো। এখন মেনে নিয়েছে। মিতা নিজে খুব সংসারী। বাস্তবতা বোঝে। ছেলেটাই মাঝে মাঝে এক আধটুক আবদার করে। অনেক সময়েই সাধ্যে কুলোয় না। তারপরেও শফিকের পক্ষে যতটুকু সম্ভব, শফিক ছেলের আবদার রাখার চেস্টা করে।
টিভি দেখতে দেখতে চোখ দুটো লেগে গিয়েছিল। হঠাৎ খুব শোরগোল শুনে ঘুম ভেংগে গেল শফিকের। চোখ মেলতেই শুনলো মিতা চিৎকার করে তাকে ডাকছে, বলছে নীচে যেতে। মিতাও দৌড়ে দরজা খুলে সিঁড়ির দিকে ছুটলো। শফিকের তক্ষুনি মনে হলো, সুমন তো নিচে খেলতে গেছে। সুমিনের কিছু হলো কিনা! আর কিছু ভাবতে পারল না শফিক। সেও সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল। মিতা ততক্ষণে একতলা অব্দি নেমে গেছে। মিতার কন্ঠে সুমন, সুমন চিৎকার শুনতে পেল।
নিচে নেমে আসতেই বাসার দরজার বাইরে ভীড় দেখেই শফিকের পায়ের তলার মাটি দুলতে শুরু করল। লোক জমে আছে। তাদের মধ্যে সে শুধু দেখতে পেল, মাটিতে শুয়ে থাকা সুমনের মাথাটা কোলে নিয়ে চিৎকার করে কাঁদছে। সুমনের চারপাশে রক্তে ভিজে আছে রাস্তাটা। শফিক আস্তে আস্তে এগিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা সুমনের পাশে হাঁটু গেঁড়ে বসল। সুমনের অসাড় শরীরেটা মাটিতে কি রকম অবহেলায় পড়ে আছে। শফিকের মুখ দিয়ে কোন কথা বেরোচ্ছে না। মিতা চিৎকার করে শফিককে বলল, শফিক, শফিক আমার ছেলেটার কি হলো!
পাশে কারা কারা যেন বলাবলি করছে, সুমন হঠাৎ দৌড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিল, তখনি একটা প্রাইভেট কার ...
শফিক ছেলেকে পাঁজাকোলা করে তোলার চেস্টা করছে, এত ভারী লাগছে কেন? ছেলেকে তো সকালেই সে কোলে নিয়েছিল। মিতা বিলাপ করে যাচ্ছে, দেখো শফিক, দেখো দেখো, আমার ছেলে তোমার কাছে লাল প্যান্ট চেয়েছিল। আমার ছেলের আর লাল প্যান্ট দরকার নাই। আমার ছেলের প্যান্ট এখন লাল হয়ে গেছে।
শফিক কথা হারিয়ে ফেলেছে, যেন শব্দ করার ক্ষমতাও তার নেই। তার চোখ দুটো পাথর হয়ে গেছে। মিতা তাকে ডাকছে, শফিক, শফিক।
শফিক কোন জবাব দিচ্ছে না। চোখ বড় বড় করে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে। মিতা তার গায়ে ধাক্কা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, শফিক এই শফিক...
-শফিক, শফিক। মিতার ডাক তার কানে পৌছাচ্ছে শুধু। মিতা আবার তাকে ধাক্কা দিতেই সে চোখ মেলে তাকালো। একমূহুর্ত হতবিহবল তাকিয়ে থেকে বলল, সুমন কোথায়?
তার কথার জবাবে মিতা বলল, সুমন পাশের রুমে খেলছে এখন। তুমি চেয়ারে বসে বসে ঘুমাচ্ছ কেন? ঘুম পেলে বিছানায় গিয়ে শোও।
Comments
-
-
probash khobor 3 hours ago
দারুণ লিখেছেন।
-
তারিক হোসেন
4 hours ago
Excellent story.