কোথাও যেনো একটা শব্দ হলো। শব্দটা কানে যেতেই সোমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। চোখ মেলে বিছানাতেই চুপ করে রইলো সে। বোঝার চেষ্টা করছে, কীসের শব্দ হলো। ডান দিকে কাত হয়ে শুয়েছিলো। ধীরে ধীরে চিত হয়ে শুয়ে মশারির ভেতর দিয়ে ছাদের দিকে তাকালো। ফ্যানের দিকে চোখ পড়তেই দ্বিধায় পড়ে গেলো সোমা। ফ্যানটা তো চালু করেই ঘুমিয়েছিল সে। ফ্যান না চালিয়ে কখনো ঘুমায় না সে। ঘুমানোর সময়ে কী করছিলো সে? ওহ, মনে পড়েছে। ফেসবুক ঘাঁটছিল। হয়তো মোবাইল দেখতে দেখতেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলো, তাই ফ্যান চালানো হয়নি। নিজেকে এটা বলে আবার ঘুমিয়ে পড়ার উদ্যেশ্যে চোখ বন্ধ করলো সোমা।
কিছুক্ষণ পরেই আবার সেই একইরকম শব্দ শুনতে পেয়েই চোখে মেলে তাকালো সোমা। আগেরবার শব্দটা সে ঘুমের ভেতর শুনেছিলো। তখন ঠিকমতো বোঝা যায়নি, কীসের শব্দ। এখন বুঝতে পেরেছে সে। কিছু একটা তার ঘরের দরজায় শব্দ করছে। শব্দটা কেমন যেন অনেকটা দরজার কাঠে আঁচড় কাটার মতো। এরকম শব্দ কীভাবে হচ্ছে দরজায়? এভাবে তো কেউ নক করে না। তাহলে কীসের শব্দ? ভাবতেই খানিকটা ভয়ও পেলো সোমা। চুপ করে শুয়ে রইলো সে। খানিকক্ষণ পর দরজায় আঁচড় কাটার শব্দটা আবার হলো। কীসের শব্দ হতে পারে সেটি? না থাক, এ নিয়ে আর কিছু ভাববে না। দরজায় শব্দটা আবার হলো। সোমার এখন ভয় লাগছে। দরজায় কিছু একটা যেন নখ দিয়ে আঁচড় কাটছে।
সোমা বিছানায় বসে আছে। ঘুম একেবারেই উধাও হয়ে গেছে। মনে হলো, বিছানা থেকে নেমে রুমের লাইট জ্বালিয়ে দিলে হয়তো শব্দটা আর শোনা যাবে না। কিন্তু এখন কেনো যেনো বিছানা থেকে নামতেই তার ভয় করছে। কিছুক্ষণ পর পর দরজায় কিছু একটা বা কেউ একজন আঁচড় কাটছে। কেমন একটা ঘরর ঘরর করা শব্দ। শব্দটা এখনো হচ্ছে। মোবাইলটা বালিশের পাশেই। সময়টা দেখা যেতো। কিন্তু নড়তেও সাহস হচ্ছে না। রাত কটা বাজে, সেটিও বোঝার উপায় নেই এখন। সোমার ভালো লাগছে না, ভালো লাগার ব্যাপার নয় এটি মোটেই। একটু ভয় ভয় লাগছে বরং।
এবার যেন শব্দটা একটু অন্যরকম লাগলো। একটু পর পর একটা খট খট শব্দ। মনে হচ্ছে, শব্দটা ঘরের মধ্যেই হচ্ছে। মশারীর মধ্যে বসে ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে অন্ধকারেই ঘরের ভেতর দেখার চেষ্টা করলো সোমা। অন্ধকারেই তার মনে হলো, রুমের মেঝেতে কিছু একটা হাঁটছে। সেটি থেকেই খট খট শব্দ হচ্ছে। সেদিকে তাকাতেই সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো সোমার। ভীষণ আতংকে ঠিকভাবে চিন্তা করার ক্ষমতাও লোপ পেয়েছে তার। মেঝেতে যে জিনিসটা এদিক ওদিক হাঁটাহাঁটি করছে, সেদিক থেকে চোখ সরাতে চাইলেও কেনো যেন পারলো না। অন্ধকারে সে অবয়বটি যেদিকেই যাচ্ছে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে সে।
মনের ভেতর কেউ একজন তাকে বলে উঠলো,
সোমা, ওদিকে কী দেখছ? তুমি শুয়ে পড়ো।
সোমাও যেনো মনের ভেতরের সেই কণ্ঠকে মনে মনে জবাব দিলো, আমার রুমে এটি কী?
অতোসব বুঝে তোমার কি কাজ? ঘুমাও।
না, আমি দেখবো।
শুধু শুধু জিদ করছো তুমি। জিদ করা ভালো না।
তুমি চুপ করো। মনে মনেই অজ্ঞাত সেই বক্তাকে ধমক দিলো।
ধমক দেয়ার পরই সব কিছু যেনো আরও নিশ্চুপ হয়ে গেলো। সোমা মেঝের দিকে তাকিয়ে অন্ধকারেই সেই অবয়টাকে খুঁজছে। কোথাও কিছু নেই। কি মনে করে বিছানার পাশে তার পড়ার টেবিল সংলগ্ন চেয়ারটার দিকে তাকাতেই ভয়ে হিম হয়ে গেলো। একটা মানুষের মতো অবয়ব সেখানে বসে আছে। সোমা সেদিকে তাকাতেই তার মনে হলো, সে অবয়বটা তার দিকেই তাকিয়ে আছে। অন্ধকার ফুঁড়ে সে অবয়বের দিক হতে একটা খনখনে গলা কথা বলে উঠলো,
সোমা, রুমে লাইট জ্বালাও।
কণ্ঠটা শুনে সোমার হয়তো ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া উচিত ছিলো, কিন্তু সেসবের কিছুই হলো না। সোমার ঐ খনখনে কণ্ঠটাই কেনো যেন খুব ভালো লাগলো। সে বিছানা থেকে নেমে দরজার পাশে গিয়ে রুমের লাইটটি জ্বালালো। চেয়ারে বসা অবয়বটা মানুষের মতোই, বীভৎস ধরণের ক্ষত তার মুখে, একটা চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে এসে নাকের পাশে ঝুলছে। ডান পায়ের হাঁটুর পরের অংশটুকু নেই। অঝোরে রক্ত ঝরছে। লোকটার উরুতে একটা কাঠের টুকরো বাঁধা, সেটিতে ভর করেই হাঁটছিল হয়তো। সেজন্যেই খট খট করে মেঝেতে শব্দ হচ্ছিলো। মানুষটার হাতে কোন আঙ্গুল নেই, কেমন যেনো কুকুরের থাবার মতো, তার মধ্য দিয়ে নোংরা কিছু বাঁকা বাঁকা নখ বেরিয়ে এসেছে। সোমা কেনো যেনো মোটেই ভয় পেলো না। বরং তার কেনো যেন খুব ভালো লাগার একটা অনুভূতি হলো।
মানুষটা তার দিকে তাকিয়ে বললো,
তুমি দুই চোখ দিয়ে কি করছ? একটা চোখ হলেইতো চলে। কাছে এসো। তোমার একটা চোখ বের করে ফেলে দিই।
সোমা ঘোর লাগা কণ্ঠে বলল, আমারও তাই মনে হয়েছে কয়েকদিন ধরে। কিন্তু আমার কাছেতো কিছুই নেই। চোখ বের করবো কীভাবে?
সে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। কাছে এসো। আমার হাতের নখগুলোই যথেষ্ট।
সোমা কিছু না বলে মুচকি হেসে মানুষটার দিকে খানিকটা এগিয়ে এলো।
মানুষটা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। ভালো পা দিয়ে মাটিতে ভর দিয়ে কাঠের টুকরো বাঁধা পা মাটিতে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
এখন দুজনেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
সোমা নাক কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো, তোমার গায়ে কীসের গন্ধ?
তোমাদের বাড়ির কাছে ডাস্টবিনে একটা বিড়াল মরে পঁচে পড়েছিলো। ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছিলো। তাই সেটা থেকে খানিকটা খেয়ে এসেছি। বলেই মানুষটা সোমার চিবুক বাঁ হাত বা থাবা দিয়ে ধরলো। তারপর ডান থাবাটা ধীরে ধীরে উপরে তুলে ধরতেই সোমা দেখতে পেলো, নোংরা নখগুলো কেমন যেন বাঁকা বাঁকা। ঠিক মধ্যিখানের নখটা বেশ লম্বা। সে নখটা ধীয়ে ধীরে তার বাঁ চোখের সামনে এলো। তারপর চোখের পলকে অসম্ভব দ্রুততায় সে নখটা তার বাঁ চোখের এক পাশ দিয়ে চোখের কোটরে ঢুকে গিয়ে পরমূহুর্তে বের করে আনতেই সোমার চোখটা বেরিয়ে এসে সামনে মেঝেতে পড়লো। সোমা অবাক হয়ে ভাবতে লাগলো, কোন ব্যাথা পেলো না কেনো? মানুষটা এবার তাকে বলল,
এখন দেখো, সবই আগের মতোই দেখতে পারছো। শুধু শুধু দুটো চোখের ভার বয়ে বেড়ানোর কোন মানেই হয় না, তাই না?
সোমা বলল, হ্যাঁ, সবই দেখতে পাচ্ছি।
মেঝেতে পড়ে থাকা চোখটার দিকে তাকিয়ে লোকটা বলল, এটা এখন ফেলে দাও বাইরে।
না, আমি এটা ফ্রিজে রেখে দেবো।
হা হা হা করে মানুষটা হাসতে লাগলো। যেনো খুব মজা পেয়েছে। হাসি থামিয়ে বলল,
ঠিক আছে রেখে দিয়ো। এখন তুমি শুয়ে পড়ো।
হ্যাঁ, আমি শুয়ে পড়বো এখনি।
আর শোনো, কাউকে বলার দরকার নেই, তোমার একটা চোখ নেই। বাইরে কেউ বুঝতেও পারবে না। সকালে ঘুম হতে উঠতে উঠতে তোমার চোখের গর্তে চোখের মতো একটা জিনিস হবে। সেটা দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না, যে ওটা চোখ নয়। সবাই ভাববে সেটা আসল চোখ।
সোমার কেন যেন খুব ভালো লাগছে। মনের মধ্যে একটা সুখ সুখ ভাব। নিজেকে হালকা হালকা লাগছে।
সোমা বিছানায় উঠে শুয়ে পড়লো। মানুষটা বলল,
তুমি এখন ঘুমাও। আমি রুমের লাইট নিভিয়ে দিচ্ছি।
ঠিক আছে। একটা কথা জিজ্ঞেস করি? সোমা বালিশে মাথা রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করলো।
হ্যাঁ, বলো।
কেন এ চোখটা তুলে ফেললে, সেটা কিন্তু বলোনি।
ও হ্যাঁ। আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো ব্যপারটা বুঝবে। শোনো, তোমাদের দুটো চোখ দেয়া হয়েছিলো দুইভাবে দেখার জন্য। চাক্ষুষ দেখা এবং অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখা। মানুষেরা কেউই অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখছে না। তাই পৃথিবীর সব মানুষের একটা করে চোখ তুলে ফেলা হচ্ছে। মানুষ এ পৃথিবী তাদের সাধারণ চাক্ষুষ দৃষ্টি দিয়েই দেখুক।
এখন বুঝেছি। সোমা বলল।
মানুষটা রুমের লাইট নিভিয়ে দিতেই এক রাশ অন্ধকার নেমে এলো রুমটাতে। সোমা চুপ করে শুয়ে আছে। এখন ঘুমানো দরকার। ক্লান্তি লাগছে খানিকটা। মানুষের জন্য তার এখন কেনো যেনো করুণাবোধ হচ্ছে। মানুষ কখনো হয়তো জানেইনি, দুটো চোখ তাকে কেন দেয়া হয়েছিলো!
Comments
-
-
probash khobor 3 hours ago
কিছুটা ভীতিকর বটে। তবে গল্পের শেষে বার্তাটি দারুণ ছিল।