১
মোবারক ডাক্তার সাহেবের দিকে তাকিয়ে একনাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছে।
তিনদিন ধরে জ্বর। কিছু খাইতে পারতেছি না ডাক্তার সাব। ঘুমাইতেও পারতেছি না।
ডাক্তার সাহেব মোবারকের কথাগুলো শুনলেন কিনা, বোঝা গেলো না। মোবারকেরও তা’ই মনে হলো। ডাক্তার গভীর মনযোগ দিয়ে টেবিলে রাখা খবরের কাগজটার দিকে তাকিয়ে আছেন। মোবারক এবার জোরে একটা গলা খাঁকারি দিতেই ডাক্তার সাহেব তার দিকে চোখ তুলে তাকালেন। মোবারক আবার বলল,
তিনদিন ধরে জ্বর। কিছু খাইতে পারতেছি না ডাক্তার সাব। ঘুমাইতেও পারতেছি না।
ডাক্তার সাহেব একটা কাগজ নিয়ে তাতে খসখস করে কি কি যেন লিখলেন। লেখা শেষ হতেই কাগজটা মোবারকের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
যা, এ ওষুধগুলো কিনে খাওয়া শুরু কর। সব লিখে দিয়েছি।
মোবারক হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিতেই ডাক্তার সাহেব আবার টেবিলে রাখা খবরের কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মোবারক কি করবে ভেবে না পেয়ে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে স্লামালেকুম বলে ডাক্তারের চেম্বার হতে বেরিয়ে এলো। এখন তাকে পাশের ফার্মেসিতে যেতে হবে ওষুধগুলো কেনার জন্য।
মোবারক বেরিয়ে যেতেই ডাক্তার পেপার হতে মুখ তুলে মোবারকের চলে যাবার পথের দিকে তাকালেন। প্রতি সপ্তাহে মোবারক জ্বর নিয়ে আসে। বহুবার তাকে বলেছে, সে যেন একবার গঞ্জে গিয়ে বড় ডাক্তারের কাছে যায়। তিনি ভালোই বুঝেন, মোবারকের টানাটানির সংসারে বড় ডাক্তারের কাছে যাওয়া তার জন্যে বিলাসিতা। শরীরের অসুস্থতা যা’ই থাকুক, সেটার চেয়ে পেটে খাবারের যোগানটা অনেক বেশি জরুরী। তার কাছে মোবারকের লক্ষণ ভালো ঠেকছে না। তাঁরও কিছুই করার নাই। তিনি সামান্য পল্লী চিকিৎসক। তার নিজের বিদ্যার দৌড় কতটুকু, সে তিনি ভালোই বোঝেন।
ডাক্তারখানার বাইরে এসে পাশের ফার্মেসির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা ছোটো দীর্ঘশ্বাস ফেললো মোবারক। তারপর ফার্মেসির দিকে না এগিয়ে উল্টোঘুরে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলো।
হাটের থেকে মোবারকের বাড়ি মাইল তিনেকের মতো হবে। এটুকু রাস্তা সে হেঁটেই যাবে। আগে সবাই হেঁটে হেঁটেই বাড়ি যেতো। আজকাল কিছু লোক রিকশায় চড়ে হাট হতে বাড়ি ফেরে। কিছু মানুষের পকেটে সবসময়েই টাকা থাকে।
টাকার কথাটা ভাবতেই মোবারকের মন আবার খারাপ হয়ে গেলো। সময়টা খুব খারাপ যাচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে দিন কাটানোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আজ সপ্তাহখানেক ধরে কোন কাজ নেই। পকেট খালি। ডাক্তার সাহেব ভিজিট নেননা বলে ডাক্তারখানায় যেতে পেরেছে। কিন্তু ওষুধটা ইচ্ছে করেই কিনলো না মোবারক। পকেটে যে যৎসামান্য টাকা আছে সেটা দিয়ে আরো দুই তিন দিন চলতে পারবে। ওষুধ কিনতে গেলে পরের দিন হতে না খেয়ে থাকতে হবে।
বাড়ির রাস্তায় অর্ধেকটুকু আসতেই শরীরে আর কুলালো না মোবারকের। সারা শরীর যেন ভেঙ্গে আসছে। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও পাচ্ছে না মোবারক। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে সামনের রাস্তার দিকে তাকাল একবার। মনে হলো, বাকী পথটুকু কোনোদিনই সে পেরোতে পারবে না। বাড়িতে জামালের মায়ের কথা মনে পড়লো। জামালের মা নিশ্চয়ই তার পথ চেয়ে বসে থাকবে। জামালের বয়স ছয় বছর। সেও কিছু না বুঝে মায়ের পাশে চুপ করেই হয়তো বসে থাকবে।মোবারক আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। রাস্তার পাশেই সে বসে পড়লো। কিছুক্ষণ পর মনে হলো, শুয়ে থাকলে হয়তো ভালো লাগবে। কিছু না ভেবেই রাস্তার ধারেই শুয়ে পড়লো মোবারক। মাটিতে শুয়েই আকাশের দিকে চোখ গেলো মোবারকের। আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘ। ভর দুপুরবেলা। এখনতো চৈত্র মাস। গরম লাগার কথা। কিন্তু মোবারকের শীত লাগছে। মোবারকের ঘুম পাচ্ছে।
২
জামালের মা অধীর আগ্রহে বসে আছেন। এতক্ষণে তো জামালের আব্বার চলে আসার কথা। বিকেল হয়ে গেছে। অপেক্ষা করতে করতে দুপুরের খাওয়া হয়নি। তেমন কিছু রান্না হয়নি। বাড়ির পেছনে খালের পাড়ে জংলা জায়গাটা হতে কিছু শাকপাতা তুলে এনে রেঁধেছে। জামাল ক্ষুধায় বারবার খেতে চাইছিল বলে তাকে ভাত খাইয়ে দিয়েছে জামালের মা। তারপর হতে একঠায় ঘরের দাওয়ায় একটা খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে আছে।
জামালের বাবা মোবারক কাঠমিস্ত্রির কাজ করে। আগে পসার ভালো ছিলো। দূরের গ্রামগুলো হতেও ডাক আসতো। কিন্তু কয়েকবছর হলো, কাজ তেমন পায় না। মানুষ গঞ্জে যায়, শহরে যায়। কাঠের জিনিসপত্র কিনে নিয়ে আসে। সেগুলো অনেক সুন্দর। এখন কাঠমিস্ত্রিকে দিয়ে মানুষ কিছু বানায় না। ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো জামালের মা। জামাল মায়ের গায়ে হেলান দিয়ে পাশে বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছে। ছেলের মাথাটা নিজের পায়ের উপর যত্ন করে রেখে দিলো। তারপর ছেলের মাথায় ধীরে ধীরে হাত বউলতে লাগলো। ঘুমন্ত ছেলের মুখের দিকে আনমনে চেয়ে রইলো জামালের মা। মাস দুয়েক আগে জামালের বাবাকে বলেছিল, ছেলের বয়স ছয় হয়ে গেছে। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলটাতে ভর্তি করিয়ে দিলে ভালো হতো। বিনে পয়সার স্কুল। খরচ নাই। জামালের বাপ বলেছিল,
স্কুলের শার্ট প্যান্ট কিনে দিতেতো পয়সা লাগবে।
এ কথা শোনার পর জামালের স্কুলে যাওয়া নিয়ে আর কখনো কিছু বলে নি জামালের মা। বাড়ির পাশে মসজিদে সকালে আরবি পড়ানো হয়। সেখানেই প্রতিদিন সকাল বেলা পড়তে যায় জামাল। সেখানে সমস্যা। যে হুজুর তাদের আরবি পড়ায়, প্রতিদিন একেকজন ছাত্রের বাড়ি হতে সে হুজুরের জন্য খাওয়া দেয়া হয়। জামালের বাড়ি হতে কখনোই কোন খাবার দেয়া হয় না। এজন্যে হুজুর তাকে মাঝে মাঝে এ নিয়ে বকাঝকা করে। জামাল বাড়িতে এসে কান্নাকাটি করে মাকে বলে, সে আর মক্তবে পড়তে যাবে না। হুজুর খালি ধমক দেয়।
জামালের মা চুপ করে শোনে শুধু। অভাবের পৃথিবীতে আত্মসম্মান থাকতে নেই। তাই পরদিন সকালে আবার জোর করে ছেলেকে মক্তবে পাঠিয়ে দেয় সে।
কাছেই কোথায় যেন একটা পাখির ডাকে জামালের মা’র ভাবনা ছুটে গেলো। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। জামালের বাবার কোন খোঁজ নেই। এখন তার দুশ্চিন্তা হচ্ছে। ছেলেকে সাথে নিয়েই রাস্তা ধরে হাটের দিকে এগিয়ে যাবে কিনা ভাবছে সে। ভাল্লাগছে না তার। মনের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তিভাব এসে হাজির হয়েছে। ছেলেটাও এমন বিভোর হয়ে ঘুমাচ্ছে, তাকে জাগাতে ইচ্ছা করছে না। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না জামালের মা। মনের ভেতর একটা কু ডাক দিচ্ছে তার।
৩
কয়েকজন লোক এসে মোবারককে ধরাধরি করে একটা ভ্যানগাড়িতে উঠালো। রাস্তার ধারে পড়ে থাকতে দেখে কয়েকজন পথচারীই প্রথমে এগিয়ে এসেছিলো। একজন পাশের বাড়ি হতে কিছু পানি এনে খাওয়ানোর চেষ্টা করলো। মোবারকের জ্ঞান ফেরানো গেলোনা। এ অবস্থায় একটা খালি ভ্যান দেখে সেটাতে তাকে উঠিয়ে বাজারে ডাক্তারখানায় নিয়ে যাবার জন্যে বললো একজন। উপস্থিত লোকদের কয়েকজন তাকে চিনতে পেরেছে। গ্রামাঞ্চলে মানুষের চেনাজানার পরিধি অনেক বড়ো হয়।
বাজারে ভ্যানগাড়িটা একই ডাক্তারের চেম্বারের সামনে এসে দাঁড়াতেই ডাক্তার সাহেব বেরিয়ে এলেন। নাড়ি দেখে মুখে দুশ্চিন্তার ভাব এনে ডাক্তার শুধু বললেন, তোরা মোবারককে গঞ্জে নিয়ে যেতে চাস তো, নিতে পারিস। আমার ভয় হচ্ছে মোবারকের হাতে সময় থাকবে কিনা।
গঞ্জে মোবারককে কে নিয়ে যাবে, এ নিয়ে দুতিনজন শলা করতে বসলো। একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে বলে যাচ্ছে, তুই যা। আমার কাজ আছে। তখন সে লোক বলছে, আমার তো জরুরী কাজ আছে। আমি কিভাবে যাই? এরমধ্যে গঞ্জে যাবার ভ্যান ভাড়া কে দেবে, ডাক্তারের খরচ কে দেবে- এসব নিয়েও কথা শুরু হলো।
ডাক্তার পাশে দাঁড়িয়ে উপস্থিত লোকজনের কথা শুনছেন। মোবারক ভ্যান গাড়িতে শুয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে না, তার কি হয়েছে! মাঝে মাঝে কিছু লোকজনের শোরগোল শুনতে পাচ্ছে সে। এরমধ্যে সে দেখতে পেলো, সে তার বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে। তার ছেলে জামাল তার পাশে এসে বলল, বাবা আমাকে একটা ফুটবল কিনা দিবা? তারপরেই তার মনে হলো, সে ঘরের দাওয়ায় খালি গায়ে বসে আছে, জামালের মা তার মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছে। মোবারক বোঝার চেষ্টা করছে, তার কি হয়েছে? তার এবার মনে হলো, চারদিকে এতো আলো আলো লাগছে কেন?
ডাক্তার সাহেব একমনে জামালের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কী মনে করে কাছে গিয়ে জামালের ডানহাতটা নিয়ে হাতে নিয়ে নাড়ি দেখার চেষ্টা করলেন। ঠিক সে সময় চারপাশের সবলোক কেন যেন নীরব হয়ে ডাক্তারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
মুখ অন্ধকার করে ডাক্তার সাহেব ধীরে ধীরে মোবারকের হাতটা ভ্যানের উপর রেখে দিয়ে বললেন, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
প্রায় সাথে সাথেই চারপাশে ঘিরে থাকা সব লোক সমস্বরে বলে উঠলো,
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাদের বলার ধরণে ডাক্তার সাহেবের মনে হলো, তিনি লোকগুলোর স্বরে হাঁপ ছেড়ে বাঁচার ব্যাপারটা স্পষ্ট শুনতে পেলেন।
লোকজন ভ্যান গাড়িটা ঠেলে হাটের মসজিদের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেলো। একজন লোক একটা রিকশা নিয়ে মোবারকের বাড়ির দিকে চলে গেলো, খবর দিতে হবে।
৪
মোবারককে গোসল করিয়ে লাশ রাখার খাটটাতে শোয়ানো হয়েছে। উপস্থিত একজন মুরুব্বী উঁচু গলায় বলে উঠলেন,
আহারে, কি কপাল। সবার ভাগ্যে এমন হয় না।
উপস্থিত বাকি সবাই সে লোকটির মুখের দিকে তাকাতেই লোকটা এবার বললো,
দুই বছর আগে মসজিদের এই লাশের খাটটা মোবারকই বানিয়ে দিয়েছিলো।