বর্ষার শেষ দিকের একটি বিকেল। আকাশে মেঘ ডাকছে। শহরের একশ বছরের পুরোনো ডাকঘরটিতে সংস্কারের কাজ চলছে। দেয়ালের বিভিন্ন পলেস্তারা খসে পড়েছে, সেগুলো ঠিক করার কাজ চলছে। ভেতরের বাতাসে পুরোনো কাগজ আর স্যাঁতসেঁতে কাঠের গন্ধ। আচমকা বৃষ্টি এলে যদি সমস্যা হয়, সেজন্য কর্মচারীরা এবং শ্রমিকরা মিলে পুরোনো আলমারি আর নথিপত্র সরিয়ে ঘরের মাঝামাঝি জায়গায় জড়ো করছে।
সোহেল এ ডাকঘরের সহকারী পোস্টমাস্টার। কাজের ফাঁকে হঠাৎ শ্রমিকদের একজন তাকে ডাকল।
স্যার, এইটা দেখেন তো। আলমারির পেছনে মাটিতে পড়ে ছিল।
শ্রমিকটির হাতে ধুলোমাখা একটি খাম। খামের কোণগুলো হলদেটে হয়ে গেছে। ওপরে সুন্দর হাতের লেখায় লেখা, মোছাম্মৎ রহিমা বেগম।
ডাকের সিল দেখে সোহেলের চোখ কপালে উঠল। তারিখ ত্রিশ বছর আগের।
কৌতূহলবশত সে পুরোনো রেজিস্টার ঘাঁটল। নাহ, অতো পুরাতন রেকর্ড নেই। চিঠিটা কোন কারণে বা হয়ত ভুলবশত বিলি করা হয়নি। কিংবা কোনোভাবে আলমারির পেছনে পড়ে যাওয়ায় সেটি কেউ আর লক্ষ্য করেনি।
দুই দিন পর সোহেল ঠিকানাটি খুঁজে বের করল। শহরের দক্ষিণ প্রান্তে নদীর ধারের একটি পুরোনো বাড়ি। টিনের চাল, শ্যাওলা ধরা দেয়াল, উঠানে একটি আমগাছ। দরজায় কড়া নাড়তেই সাদা শাড়ি পরা এক বৃদ্ধা বেরিয়ে এলেন।
আপনি কি রহিমা বেগম?
হ্যাঁ বাবা, বলো।
সোহেল খামটি বাড়িয়ে দিল।
বৃদ্ধা খামের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন বহুদিনের হারানো কাউকে হঠাৎ সামনে দেখতে পেয়েছেন।
এটা... কোথায় পেলে?
ডাকঘরের আলমারির পেছনে পড়ে ছিল। অনেকটা ক্ষমা প্রার্থনার ভংগিতে সোহেল বলল।
কাঁপা হাতে খাম খুললেন তিনি। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর চোখ ভিজে উঠল। চিঠিটি লিখেছিলেন তাঁর স্বামী আজিজুল হক। ত্রিশ বছর আগে এক নৌকাডুবির ঘটনায় যিনি নিখোঁজ হন। সবাই ধরে নিয়েছিল তিনি মারা গেছেন।
চিঠিতে লেখা আছে,
আমি কাজের জন্য খুলনায় যাচ্ছি। কয়েক মাসের মধ্যে ফিরে আসব। জরুরি প্রয়োজনে আমার বন্ধু মতিয়ারের কাছে যেও। কিছু টাকা তার কাছে রেখে গেলাম।
রহিমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
যদি এই চিঠিটা তখন পেতাম! স্বামীর খোঁজে কত জায়গায় গেছি। জমিজমা বিক্রি করেছি। মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি।
সোহেল চুপ করে রইল। বৃদ্ধা জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
মৃত্যুর চেয়েও কষ্টের জিনিস আছে বাবা।
কী?
অপেক্ষা। যখন জানো না মানুষটা বেঁচে আছে না মরে গেছে।
বৃদ্ধার হাত থেকে চিঠিটি নিয়ে সেও একবার চোখ বুলালো। তারপর বলল,
এই মতিয়ার লোকটা কে? চেনেন আপনি?
হ্যাঁ, বাবা। আমার স্বামীর বন্ধু। এইতো কাছেই থাকতো, শুনেছি মারা গেছেন। বলে তিনি মতিয়ারের বাড়ির ঠিকানাটিও বললেন।
সেদিন রাতে সোহেলের ঘুম এল না। তার নিজের অফিসের একটা ভুলের জন্য একটা পরিবারকে এত দীর্ঘমেয়াদি কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হলো, ভাবতেই তার খারাপ লাগছিল।
পরদিন থেকে চিঠিতে উল্লেখ করা মতিয়ার নামের মানুষটির খোঁজ করতে শুরু করল সে। রহিমা বেগমের দেয়া ঠিকানায় খুঁজল। স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে অবশেষে মতিয়ারের ছেলেকে খুঁজে পেল।
তাকে সব বলতেই লোকটি বিস্মিত হয়ে বলল,
বাবার একটা লোহার ট্রাঙ্ক আছে। উনার মৃত্যুর পর থেকে সেটি খোলা হয়নি। আর উনি মারা গেছেন, সেও তের বছর আগে।
মতিয়ারের ছেলেটা ভদ্রগোছের। সে সোহেলকে বলল, আসুন দুজনে একসাথেই ট্রাঙ্কটা খুলল।
ধুলোমাখা ট্রাঙ্কটা খুলতেই সেখানে কিছু পুরোনো দলিল, ছবি, রসিদ আর চিঠির স্তূপের মধ্যে একটি ছোট খাতা পাওয়া গেল। সে খাতার একটি পাতায় লেখা,
আজিজুল হক — জমা ১২,০০০ টাকা। প্রয়োজনে স্ত্রীকে প্রদান করিব।
নিচে মতিয়ারের স্বাক্ষর।
দুজনের মুখে নীরবতা নেমে এল। অঙ্কটা আজকের হিসাবে খুব বড় নয়। কিন্তু ত্রিশ বছর আগে এটি ছিল একটি পরিবারের জীবন বদলে দেওয়ার মতো অর্থ। সোহেল আর কিছুই বলল না সে টাকার ব্যপারে।
ফেরার পথে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষন, সোহেল। সন্ধ্যার আলো পানির ওপর ভেঙে পড়ছে। তার মনে হলো, রহস্যের সমাধান সবসময় চমকপ্রদ হয় না। কখনো কখনো রহস্য মানে কয়েক দশকের ভুলে যাওয়া একটি খাম, একটি অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি, আর এমন কিছু প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর এসে পৌঁছায় অনেক দেরিতে।
কিন্তু দেরিতে আসা উত্তরও মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘ অপেক্ষাকে শেষ করে দিতে পারে। আর কখনো কখনো, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সোহেলের একবার মনে হলো, রহিমা বেগমকে গিয়ে বলে, যে সত্যিই তার স্বামী টাকা রেখে গিয়েছিলেন মতিয়ারের কাছে; পরক্ষণেই মনে হলো, থাক, এভাবেই থাকুক পুরো ব্যপারটা। একটা অপেক্ষা কখনো শেষ হতেই পারে, কিন্তু সকল অপেক্ষার শেষে সমাধান আসে না বা আশা মেটে না। আজ এ সংবাদটি রহিমা বেগম পেলে কোন ভালো কিছুই ঘটবে না, বরং আক্ষেপের দীর্ঘশ্বাস আরো দীর্ঘ হবে।
ভাবতে ভাবতে সোহেল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর তার নিজের বাসার দিকে রওনা হলো। পুরাতন খাম মানেই বিষাদ!
Comments
-
-
probash khobor 4 hours ago
বাহ! একটা খাম নিয়ে দারুণ লিখলেনতো। সুন্দর গল্পটা।