আবুল হোসেন উঠানে বসে আছেন। রাত দশটার মতো বাজে। গ্রামাঞ্চলে রাত দশটা মানে অনেক রাত। ঘুম আসছে না, তাই উঠানে বসে থাকা। ঘরের ভেতর খুব গরম। উঠানে তবুও একটু বাতাস আছে। উঠানে বসে বসত ঘরের দিকে তাকালেন তিনি। ঘরের পেছনে বড় আম গাছটার ঠিক উপরে বিরাট একটা চাঁদ উঠেছে। চাঁদের দিকে তাকিয়ে কেন যেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আবুল হোসেন। আজ মানুষটা আসবে। হয়তো এখনই আসবে। না আসারতো প্রশ্নই আসে না।
আবুল হোসেন একা মানুষ। তিন কুলে তার কেউ নেই। বিয়ে থা করেননি। একটা একতারাকে সঙ্গী করেই জীবন কাটিয়ে দিলেন। উঠানে যেখানটায় বসেছেন, সেখানে তার সম্মানেই একটা জলচৌকি রাখা আছে। তার ডান পাশেই একতারাটা রাখা।
আবুল বয়াতি বাড়ি আছো নাকি?
আচমকা মানুষের কণ্ঠে চমকে উঠলে সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিলেন আবুল বয়াতি।
আছি, চৌধুরী সাহেব। বলেই নড়েচড়ে বসলেন আবুল বয়াতি। অন্ধকারের মধ্য থেকে সামনে এসে দাঁড়ালেন সোলায়মান চৌধুরী।
আসসালামু আলাইকুম চৌধুরী সাব।
খবর কীরে আবুল?
ভালা আছি সাব।
ততক্ষণে সামনে রাখা জলচৌকিতে বসে পড়েছেন সোলায়মান চৌধুরী। বসেই ঘাড় বাঁকিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন তিনি। কিছুক্ষণ চুপচাপ চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। চারদিক চাঁদের রূপালী আলোয় সয়লাব হয়ে আছে। যেখানে যেখানে ছায়া পড়েছে, সে জায়গাগুলোর অন্ধকার রাতের সাক্ষ্য দিচ্ছে। বাতাসটা এখন একটু জোরে বইছে। গুমোট ভাবটা কেটে গেছে। রাত মানেই রহস্য, সেই রহস্যের ভেতর দুজন মানুষ একটা উঠানে মুখোমুখি বসে পূর্ণিমার আলোতে যেন গোসল করছেন।
গলা খাঁকারি দিয়ে সোলায়মান চৌধুরী বললেন,
আবুল, চাঁদনি পসর নিয়া একটা গান আছে না?
জী সাব, আছে।
সেই গানে চান্দের দাওয়াতের একটা কথা আছে না?
আছে, চৌধুরী সাব।
সেইটা একবার গাইবি?
আবুল বয়াতি একতারাটা হাতে নিয়ে গানটার ওই অংশটা গাইতে শুরু করলেন।
সে আমারে থারে থারে ঈশারায় কয়
এই চাঁন্দের রাইতে তোমার হইছে গো সময়
ঘর ছাড়িয়া বাহির হও ধরো আমার হাত
তোমার জন্য আনছিগো আজ চান্দেরও দাওয়াত।
গাইতে গাইতে সোলায়মান চৌধুরীর দিকে একবার তাকালো, আবুল বয়াতি। চাঁদের আলোতে তার দুচোখ বেয়ে নেমে আসা অশ্রু যেন বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের মতো ঝরছে। আবুল বয়াতি না থেমে আবার ওই অংশটাই গাইতে লাগলো। গাইতে গাইতে নিজের দুই চোখ বন্ধ করে রেখেছেন আবুল বয়াতি। চোখ বন্ধ করে গানটির বাকি অংশ গাইল।
গানটি শেষ হলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন আবুল বয়াতি। ধীরে ধীরে চোখ মেললেন এবার। সামনের জলচৌকিটা খালি। আবুল বয়াতি অবাক হলেন না। খুব স্বাভাবিকভাবেই একতারাটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। একটু ঝুঁকে জলচৌকিটা তুলে নিয়ে ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
আবার পরের পূর্ণিমায় সোলায়মান চৌধুরী আসবেন। সেদিন হয়ত আরেকটা গানের আবদার করবেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের দাওয়ায় উঠে একটু থেমে উঠানের দিকে তাকালেন। প্রায় পঁচিশ বছর হয়ে গেছে। পৃথিবী থেকে সোলায়মান চৌধুরী বিদায় নিয়েছেন। পাশের গ্রামের এক হিন্দু মেয়ের গভীর প্রেমে পড়েছিলেন।জমিদার বংশে এ ধরণের ঘটনার কোন সুযোগই ছিলো না। একরাতে দুজনে একসাথে বিষ খেয়েছিলেন। সেটিও ছিলো একটা পূর্ণিমার রাত। আবুল হোসেনের মনে হলো, দুনিয়াতে মানুষ মরে যাওয়া মানে দুনিয়া থেকে বিদায় নয়। সোলায়মান চৌধুরীতো বিদায় নেননি। যারা যারা দুনিয়ায় মারা গিয়েছেন, তারাও সবাই কি এখনো এখানেই আছেন তাহলে? লাখ লাখ বছর ধরে যতো মানুষ মারা গেছে, তারা সবাই তাহলে এখনো এই দুনিয়াতেই আছেন?
ভাবতে ভাবতে ঘরের দাওয়ায় বসে পড়লেন আবুল বয়াতি। একতারায় টুং টাং শব্দ করতে করতে আপন মনে সুর করে গাইতে লাগলেন,
কি চক্ষু দিলা খোদা, কিচ্ছু দেখি না,
মানুষ দেখি না, খোদা তোমায় দেখি না।
নকল চক্ষু চাই না আমি, আসল চক্ষু দাও,
খোদা তোমায় দেখার একটা সুযোগ দাও।
এটুকু বলেই থামলেন তিনি। কি মনে করে সুরটা খানিক পাল্টে আবার কথাগুলো বললেন তিনি। তার মনের মধ্যে কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। সৃষ্টির আনন্দ হয়ত সেটাই। আবুল বয়াতি আবার গাইলেন এটুকুই। তিনি বুঝে ফেলেছেন, আজ রাতে আর ঘুম হবে না, এই গান পুরোটা বানানো অব্দি ঘরের দাওয়া থেকেও উঠবেন না তিনি। এবার জোর গলায় ওই চার লাইন আবার গাইলেন। গাইতে গাইতে কেন যেন এক মূহুর্তের জন্য সোলায়মান চৌধুরীর কথা মনে পড়লো তার।
সোলায়মান চৌধুরী একটা কাগজে কিছু লিখে তাকেই দিয়ে বলেছিলেন, গঞ্জে এক লোকের সাথে দেখা করে ওই কাগজটা দেয়ার জন্য। আবুল বয়াতি এখনো ওই কষ্টেই পড়ে রয়েছেন। তাকে দিয়েই ওই বিষ আনিয়েছিলেন সোলায়মান চৌধুরী। তিনি জানতেনও না, তিনি কি নিয়ে এসেছিলেন! তীব্র অপরাধবোধে তিনি কাঁদতে কাঁদতে গাইতে লাগলেন,
তোমায় দেখব খোদা, সেই চোখ নাই।
কেমন করে বলব আমি, আমার দোষ নাই।
তোমার দুনিয়া, তোমার খেলা,
আমায় তুমি খেলাও,
কি আজব ছলাকলায়
বিষ আমারে গেলাও।
কান্না এবং গান একসাথে মিশে এক আশ্চর্য অশরীরী সুর যেন ঘরের দাওয়া থেকে উঠোনে ঢলে পড়তে লাগলো। সেখানে জ্যোৎস্নার আলো তখন যেন থৈ থৈ করছে। আবুল বয়াতি চোখ বড় করে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। তার মনে হলো, এই জ্যোৎস্না, এই সুর- কিছুই তিনি ছুঁতে পারেন না, শুধু তিনিই নয়, পৃথিবীর কেউই পারে না। আল্লাহ্ মানুষকে সব ক্ষমতা দেয় না, অল্প কিছু কাজের ক্ষমতা দিয়েছেন। তাতেই মানুষের কোটি কোটি ভুল আর পাপ। গান থামিয়ে আবুল হোসেন উঠানের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
Comments
Be this story’s first reader
+25 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.