শফিক সাহেব ঠিক ভেবে পাচ্ছেন না, কি করবেন। তার রীতিমতো অপমানিত লাগছে। উনি কখনো ভাবেন নি যে কেউ তাকে মুখের উপর এত বড় কথা বলতে পারে। দু কান ঝাঁ ঝাঁ করছে তার।
যে এলাকায় থাকেন তা মোটামুটি ধনী লোকদের আবাসিক এলাকা। আশেপাশের সব বিল্ডিংগুলোতেই সব এপার্টমেন্ট। তিনি যে বিল্ডিং এ থাকেন সেটিতেই সব মিলিয়ে বিশটা ফ্ল্যাট। আশেপাশের সব বাড়িগুলোও এরকমই। কদিন ধরেই অফিসে যাওয়া আসার পথে তার বাসা হতে কিছু দূরে দেখেছেন, শীতার্তদের জন্য গরম কাপড় এবং নগদ অর্থ সংগ্রহ চলছে, মর্মে একটা ব্যানার লাগানো রয়েছে। সেখানে বিকেল বেলা এলাকার কিছু তরুণ ছেলেমেয়ে একসাথে থাকে।
আশেপাশের প্রতিবেশীরা এসে এসে সেখানে শীতের কাপড় চোপড় দিয়ে যাচ্ছে। আয়োজনটা দেখে তিনি খুশীই হলেন। এখনকার তরুণেরা তো মূল ধারার সমাজ এবং জীবনযাত্রা হতে একরকম বিচ্ছিন্নই। এর মধ্যেও তারা যে এ কাজটা করছে, দেখে তার মন ভরে গেল। তার নিজের মনে পড়ে গেল, সেই সত্তরের দশকে কলেজে পড়াকালীন সময়ে তারাও বন্ধুদের নিয়ে এসব কাজ করেছিলেন, লংগরখানায় ভলান্টিয়ারের কাজ করেছেন। কাল রাতে বাসায় বসে বসে সেদিনগুলোর কথা মনে করার চেষ্টা করেছেন। পরে রাতেই ঠিক করলেন যে, তিনি ওখানে কিছু সাহায্য দেবেন। এসব উদ্যমী ছেলেমেয়েদের পাশে তিনিও দাঁড়াবেন।
আজ অফিসে গিয়েই লোক পাঠিয়ে দশটা কম্বল আনালেন। ঠিক করলেন, কম্বলের সাথে তিনি হাজার বিশেক টাকা দেবেন। কমও তো দেয়া যায়না। এলাকায় তিনি মোটামুটি পরিচিত। তার নিজেরও একটা মান ইজ্জত আছে।
অফিস হতে আসার পথে গাড়ি নিয়েই সেখানে চলে গেলেন। ব্যানার লাগানো স্ট্যান্ড এর পাশেই একটা সামিয়ানা লাগানো দশ ফুট বা দশ ফুট একটা ঘরের মত বানানো, তার সামনে টেবিল রাখা, ভেতরে চারটে চেয়ার। চারজন বসে আছে, সাথে আরো দুজন সেখানে কম্বল এবং শীতের কাপড় গুছাচ্ছে। ওদের এভাবে কাজ করতে দেখেই তার মন ভরে গেল। গাড়ি হতে নেমে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ড্রাইভারকে বললেন, কম্বলগুলো বের করে আনার জন্য। উনি পকেটে হাত দিলেন টাকা বের করার জন্য। এর মধ্যে ড্রাইভার ঐ টেবিলের উপর কম্বলগুলো রাখল। একটা ছেলে লিখছিল, সে দাঁড়িয়ে বলল,
আসসালামু আলাইকুম, চাচা। আপনি কি শীতার্তদের জন্য সাহায্য দিতে এসেছেন?
হ্যাঁ, বাবা। এই দশটা কম্বল এবং এর সাথে আমি কিছু ক্যাশ দিচ্ছি।
ছেলেটা নির্বিকার চেহারা করে বলল,
চাচা, আমরা আপনার সাহায্য নেব না।
শফিক সাহেব অবাক হয়ে গেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
কেন?
বসে থাকা আরেক যুবক দাঁড়িয়ে বলল,
চাচা, এগুলো নিলে আমাদের কিছু শীতার্ত মানুষ উপকৃত হতো। কিন্তু আপনি যে চাকুরীতে আছেন এবং সেটার প্রেক্ষিতে আপনার জীবনযাত্রা দেখে আমরা যা বুঝি, আপনার ইনকাম অনেস্ট নয়। আপনি যদি নিজের বুকে হাত দিয়ে বলতে পারেন, আপনার উপার্জন সৎ, তাহলে আমরা আপনার অনুদান নেবো।
শফিক সাহেব হতভম্ব হয়ে গেলেন। প্রথম মূহুর্তে তিনি অপমানিত বোধ করলেন এবং তার দুকান ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল। এর পরমূহুর্তেই তার এ ভাবান্তরগুলো উবে গেল। তার মনে হলো, জীবনে এই প্রথমবার তিনি নিরেট সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন। দুবার ঢোঁক গিলে ড্রাইভারকে বললেন, কম্বলগুলো তুলে নিতে। কাউন্টারের ছেলেমেয়েগুলো সবাই কেমন শক্ত চোয়াল করে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
ড্রাইভার এতক্ষণ পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে এসে দশটা কম্বল হতে আটটা তুলে নিয়ে গাড়িতে রাখল। বাকীদুটোর দিকে ইশারা করে সে এসে কাউন্টারের সামনে এসে বলল, আমার টাকা হতে আমি এ দুটো কম্বলের দাম স্যারকে দিয়ে দেব। আমার আয়ে তো সমস্যা নাই! আমার দুটো নেবেন?
প্রথম ছেলেটা তার রিসিপ্ট বইটা টেনে নিয়ে বলল,
জ্বী, আপনার নাম বলেন।
শফিক সাহেব মাথা নিচু করে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। ড্রাইভার নাম লিখিয়ে দৌড়ে এসে গাড়ির দরজা খুলে দিলো। গাড়িতে ঢুকতে গিয়ে কি মনে করে ছেলেমেয়েগুলোর দিকে তাকালেন একবার। সবাই তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
গাড়িতে উঠে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। গাড়ি একটু এগোতেই ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলে গাড়ি থেকে নেমে গেলেন শফিক সাহেব। নেমে ড্রাইভারকে বললেন, গাড়ি নিয়ে বাসায় চলে যেতে।
গাড়ি হতে নেমে ফুটপাত ধরে হাঁটতে লাগলেন শফিক সাহেব। মনটা ভারী হয়ে আছে। গত বছর হজ্বে গিয়েছিলেন। এর আগেও পুরো পরিবার নিয়ে ওমরাহ করেছেন কয়েকবার। সেখানে তো তিনি কান্নাকাটি করেছিলেন আল্লাহর দরবারে। তার মেয়ে সে ছবি ফেসবুকেও দিয়েছিল। কতজন তার কাছে তখন দোয়া চেয়েছিল। কিন্তু সেখানে কেন তার বিবেক তাকে নাড়া দিলো না? আজ এই বাচ্চা বাচ্চা ছেলেগুলো তাকে এরকম নিরেট সত্যটা স্বীকার করিয়েই ছাড়ল! শফিক সাহেব ভাবলেন, এ ছেলেগুলো তো ঠিকই আছে। তার আয়ে ঢাকা শহরের এ জায়গায় ভাড়া বাসা নিয়ে থাকাও তো তার অর্থনৈতিক সামর্থে থাকার কথা নয়। সে জায়গায় এখানে তার আলীশান ফ্ল্যাট, তিনটে গাড়ি! শফিক সাহেবের কান্না পাচ্ছে কেন যেন! সেটা ঠিক বিবেকের দংশনে নয়, অপমানেও নয়, তার নিজের একটা ভয়ানক মিথ্যাচারে তিনি ধরা খেয়ে গেছেন- এরকম একটা কারণে। তার মিথ্যাচারটা স্রস্টার সাথে। আজ এ ছেলেমেয়েগুলো তার চোখের পর্দা সরিয়ে দিয়েছে। আনমনে হেঁটে হেঁটে এগোচ্ছেন তিনি, কান্নায় তিনি এখন সব ঘোলা দেখছেন। উফ, একটা হোঁচট খেলেন যেন। পড়ে যাচ্ছেন তিনি, ফুটপাতে তার ডান হাঁটুটা বাড়ি খেলো যেন। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলেন শফিক সাহেব।
এই তোমার কি হয়েছে? এই, কি হয়েছে?
ধড়মড় করে উঠে বসলেন শফিক সাহেব। পাশেই মিসেস শফিক বিছানায় বসে অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন শফিক সাহেব। পুরো ঘটনা তাহলে স্বপ্ন ছিল! উফ, বাঁচা গেল, মনে মনে ভাবলেন শফিক সাহেব। পরমূহুর্তেই মনে হলো, এরকম একটা স্বপ্ন দেখলেন কেন? তার বাসা হতে তিন চারশ গজ দুরে তো সত্যিই শীতের কাপড় সংগ্রহের একটা বুথ খুলেছে। নাহ, দরকার নাই, সেখানে কম্বল দিতে যাবার।
Comments
Be this story’s first reader
+25 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.
-
-
Habiba Rozy 2 hours ago
সমাজ সচেতনতামূলক শিক্ষণীয় গল্পটি ভালো লেগেছে
-
robin ahmed 2 hours ago
দারুণ লিখেছেন।
-
probash khobor 3 hours ago
দারুণ লিখেছেন।