রিমি এখন পরিস্থিতি কিছুটা মেনে নিয়েছে। দুই সপ্তাহ হয়ে গেল, ঐ যুবক সকাল বিকেল তার গাড়ির পেছনে পেছনেই থাকে। সারাদিন হাসপাতালের সামনেই বসে থাকে। প্রথম দুই দিন ভয় পেয়েছিল। তখন একবার মনে হয়েছিলো ৯৯৯ তে ফোন করে পুলিশে সব জানিয়ে দিই। না দেয়াতেই বোধহয় ভালো হয়েছে। বরং এখন তার একটা ধারণা হয়েছে, থাকুক, সম্ভবত ক্ষতিকর কেউ নয়। কিন্তু এভাবে দিনের পর দিন তাকে এভাবে অনুসরণ করছেই বা কেন- সেটার কোন জবাব সে মিলাতে পারছে না। হাসপাতালে থাকায় বিবিধ ধরণের রোগী আসে। একটা বড় সংখ্যক রোগী আসে, যাদের হাসপাতালে আসা কোন অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট। সেসব রোগী হাসপাতালে এলেই পুলিশ আসে। অপরাধের ধরণ পাল্টেছে আজকাল। তাই যাকে তাকে বিশ্বাস করার মতো পরিচ্ছন্ন সমাজ এখন আর নাই। এ যুবক কে, কেন তাকে অনুসরণ করে যাচ্ছে- তা সে এখনো বুঝতে পারছে না।
আজ অবশ্য রিমি বেশ একটা আশ্বস্ত বোধ করছে। আজ সকালের ঘটনাটার পর মনের ভেতরের মেঘ কিছুটা কেটেছে। তবুও দ্বিধা যাচ্ছে না মন হতে।
সকালে অফিসে আসার পথে ফার্মগেটে বাসার গাড়িটা হঠাৎ থেমে যাবার পর স্টার্ট নিচ্ছিল না। পেছনেও কিছু গাড়ি তার গাড়ির জন্য আটকে গিয়েছিল। এ ধরণের পরিস্থিতিতে খুব অস্বস্তি বোধ করে রিমি। ড্রাইভার নেমে সামনে বনেট খুলে দেখছিল। ঠিক তখন ঐ মটর সাইকেল তার গাড়ির পাশে এসে থামতেই অন্তরাত্মা যেন খাঁচাছাড়া হবার উপক্রম হয়েছিলো রিমির। ভয় পেয়ে মটর সাইকেল আরোহীর দিকে তাকিয়ে কি করবে বুঝে উঠতে পারছিলো না সে। একবার মনে হলো জোরে চিৎকার দেই।
ছেলেটা ততক্ষণে হেলমেট খুলে সেটা হাতে নিয়েছে। তারপর তার দিকে তাকিয়ে বলল,
-রিমি, চলো তোমাকে দিয়ে আসি। আমি তোমার হাসপাতালের দিকেই যাচ্ছি।
ছেলেটার কথা বলার ধরন দেখেই রিমির মনে হলো, না, মনে হয় বিপদজনক কোন কিছু নয় মানুষটা। তবু সে রাজী হলো না। গাড়িতেই বসে রইল। কিছুক্ষণ পরেই গাড়িটা স্টার্ট হলো। ছেলেটা সারাক্ষণ গাড়ির পাশে তার মটর সাইকেলে বসে রইল। কি মনে করে রিমি তখন গ্লাস নামিয়ে ছেলেটাকে বলে বসলো, আচ্ছা যাই।
ছেলেটা কিছুই বলল না। শুধু মাথা নাড়ল।
চলতি পথে কোন্ ঘটনা মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়, মানুষ তার কিছুই জানে না। হয়ত সাদামাটা কোন কিছু ভেবেই চলে যায় মানুষ। কিন্তু সেই ছোটখাটো কিছু ঘটনাই আবার সামনে এগিয়ে আমাদের পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। একদিন মানুষ সেই ঘটনা প্রবাহের ভেতর নিজেকে নিয়ে নেয়। তখন মানুষ একটা চলমান ঘটনাকে বুকে নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। এখানেও এ দুই চরিত্রের মধ্যে সেরকম ঘটে গিয়েছিল। রিমি এবং সে যুবক দুজনের কেউই তখন জানতো না, তাড়া কোথায় এগোচ্ছে। তবে সেদিনের ঐ ঘটনার পর রিমি ঐ যুবকের উপস্থিতিকে সহজভাবে মেনে নিয়েছে। বরং ইদানীং তার একটা বিচিত্র অনুভূতির জন্ম হয়েছে। হাসপাতালে যাওয়া আসার পথে সে নিজেই আড়চোখে ঐ যুবককে খোঁজে। যুবকের উপস্থিতি তার মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাসী নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে।
কয়েকদিন পর আরেকটা ঘটনা ঘটে গেলো। হাসপাতাল হতে বাসায় ফেরার পথে রিমি গাড়ি ঘুরিয়ে বনানীর দিকে গাড়ি ঘুরিয়ে ফেলতেই তার মোবাইলে একটা অপরিচিত নাম্বার হতে কল এলো। হাসপাতালে চাকুরীর সুবাদে এখন সে অপরিচিত নাম্বারের কল ধরে। রিমি ফোনটা নিয়ে হ্যালো বলতেই ও পাশ হতে একজন অপরিচিত পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেল।
-কোথায় যাচ্ছ? তুমি বাসার রাস্তা হতে অন্য দিকে যাচ্ছ।
-আপনি কে? কথাটা বলেই কি মনে করে গাড়ির পেছনে তাকাল। অবাক হয়ে দেখল, সেই মোটরসাইকেল আরোহী, কানে ফোন। মুচকি হেসে রিমি বলল,
-কফি খেতে যাচ্ছি। বনানী এগারো নম্বর রোডে। আমি যেখানে থামবো, আপনি সেখানে থামবেন। একসাথে কফি খাবো।
আগেই বলেছিলাম, চলতি পথের ঘটনা মানুষের জীবনকে কখনো কখনো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলে। ঘটনাক্রমে আমাদের এ দুই চরিত্রও সেরকম কিছুর দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে।
কফি খাবার সময় রিমি যুবককে বলল,
-আজ আমার একটা আনন্দের দিন। আমার ভালো লাগছে, আপনার সাথে কফি খাচ্ছি।
যুবক নির্বিকার চেহারা করে জিজ্ঞেস করলো,
-কি হয়েছে?
রিমি ঝলমলে চেহারা করে বলল,
-আমার বিসিএস পরীক্ষার ফলাফল বেরিয়েছে। আমার পোস্টিং হয়েছে। আমি নড়াইল লোহাগড়া যাচ্ছি।
-এটা একটা ভালো খবর।
-আপনি খুশী হয়েছেন? রিমি জিজ্ঞেস করল।
-হুম, এটা একটা খুশীর খবর।
-আমি ঢাকা হতে চলে গেলে তখন কাকে ফলো করবেন, ঠিক করেছেন? রিমির চোখেমুখে কিছুটা দুষ্টামি।
-দেখি, নতুন কাকে ফলো করি! বলে যুবক চোখ নামিয়ে একমনে কফি কাপে চুমুক দিতে লাগলো। রিমির মা সুরাইয়া আক্তার খুশী হতে পারলেন না পুরোপুরি। চাকুরী হয়ে যাবার ব্যাপারটা ঠিক আছে। কিন্তু উনি বারবার বলতে লাগলেন,
-কোথায় নড়াইল! এতদূরে কিভাবে থাকবি? কাউকে বলে কয়ে ঢাকায় থাকলে হতো না?
রিমি মা’কে বোঝানোর চেষ্টা করল। প্রথম পোস্টিং, আমি নিজেও তো সব এখনো জানিনা, কোথায় বললে কাজ হবে। তারচেয়ে আগে আমি গিয়ে জয়েন করে দেখি মা।
সারাজীবন একা একা মেয়েকে বড় করেছেন। এখন মেয়ের চাকুরী হবার ঘটনায় আনন্দের পাশাপাশি মন খারাপ হয়ে গেছে সুরাইয়া আক্তারের। মেয়েকে ছাড়া একা একা কিভাবে থাকবেন, সে ভাবনাতে পেয়ে বসেছে উনাকে। মেয়ের যাবার দিন যতো ঘনিয়ে এসেছে, ততোই বিষাদে ভরাক্রান্ত হয়ে যাচ্ছেন তিনি। কয়েকবার তার মনে হলো, মেয়ের সাথে চলে যাবেন। আবার নিজেকে সংযত করলেন। মেয়ে বড় হয়েছে। তাকে একা একা চলতে দিতে হবে। একা একা না চলতে পারলে ভবিষ্যতে তাকেই বিপত্তিতে পড়তে হবে। মেয়ে তখন তাকে দোষারোপ করবে। একটা সময় সব সন্তানকেই স্বাধীনতা দেয়া উচিত। নইলে জীবনের অনেক কিছুই তারা শিখবে না।
সেই একই সময়ে রিমিরও মন খারাপ। মাকে ছাড়া জীবন সে কখনোই ভাবতে পারে না। মা তাকে সারাজীবন ছায়ার মতো আগলে রেখেছেন। সেই মাকে ঢাকায় রেখে একা একা কিভাবে অচেনা জায়গায় থাকবে, সে চিন্তা তাকে পেয়ে বসেছে। এরমধ্যে একটা খবরে সে কিছুটা আশ্বস্তবোধ করছে। লোহাগড়া থাকা হেলথ কমপ্লেক্সে তার কলেজের দুই ব্যাচ সিনিয়র একজন আছে। সেটা জানার পর রিমি এবং সুরাইয়া আক্তার দুজনেই কিছুটা মনে জোর পেলেন।
মানুষ যেদিন স্বাধীন হয়, সেদিন তার মনের ভেতর লুকানো অনেক কিছু সে বের করে করে দেখে। খুব গোপনে লালন করে রাখা সেই সব বিষয়গুলো সেদিন হতে মানুষ বের করে চোখের সামনে রেখে দেয়, যাতে সারাক্ষণ সেগুলো দেখতে পায়। রিমিরও সম্ভবত তেমন কিছু ঘটেছিল ঢাকা হতে লোহাগড়া যাবার দিন। বাসা হতে বেরিয়ে বাস স্ট্যান্ডে যাবার সময় কয়েকবার মাথা ঘুরিয়ে দেখেছে, ঐ নাম না জানা যুবককে খুঁজেছে। তাকে না দেখে বুকের ভেতর একটু আক্ষেপ হচ্ছিলো তার। বিশেষ করে বাসে উঠার পর হতে এ ভাবনাটা তাকে যেন খুব বেশী পোড়াতে লাগলো। প্রতিদিন আসে যায়, আজ সে ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। অন্তত আজকের দিনটাতে তো এতে পারতো। বুকের ভেতর কিছু কথা সে জমিয়ে রেখেছিল। ভেবেছিলো, ঢাকা ছেড়ে যাবার দিন তাকে বলবে। লোহাগড়া যেতে যেতে সারাটা পথ অজ্ঞাত কারণে অজ্ঞাত যুবকের ভাবনায় তার মন ভার হয়ে রইল।বেলা তিনটার দিকে লক্ষীপাশা বাস স্ট্যান্ডে গাড়িটা থামল। বাস হতে নাম্বার আগেই মা’কে ফোন করে জানালো, সে পৌঁছে গেছে। নতুন জীবন এখান হতেই শুরু। ভেতরে ভেতরে একটা চাঞ্চল্য অনুভব করছে সে। বাস হতে নেমে সামনে তাকাতেই হতভম্ব হয়ে গেল রিমি। তার ঠিক সামনেই সে যুবক দাঁড়িয়ে আছে।
অনেক দিনের চেনা মানুষের মতো অজ্ঞাত যুবক তাকে বলল, রাস্তায় কোন অসুবিধে হয়নি তো?
রিমির চোখ ভিজে এলো কথাটা শুনে। বুকের ভেতরের সব অভিমান যেন চোখের জল হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
(চলবে)
এ গল্পটি আমার ছায়া গল্পগ্রন্থে (২০২১) প্রকাশিত হয়েছিল।