মুসার মনটা আজ খারাপ হয়ে আছে। বাড়ি হতে হননি সকাল হতে। খুব সকালে ঘুম ভাঙতেই কি মনে করে বিছানার পাশের আলমারিটা খুলে ড্রয়ারের ভেতর হতে একটা ছবির এলবাম বের করলেন। চুপচাপ এলবামের পাতাগুলো উল্টে গেলেন। কিছুক্ষণ ছবিগুলো দেখার পর বুকের ভেতরে জমে থাকা মেঘগুলো বড় হতে হতে মনের আকাশ পুরোটা ছেয়ে ফেলল। পুরাতন কষ্ট ফের বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু করেছে। বহুবার ভেবেছেন, পুরাতন সব ভুলে যাবেন, ভুলতে পারেন না হয়তো কিংবা নিজের অজান্তেই রেখে দেন নিজের কাছে। মানুষ নিজের একান্ত কষ্টগুলোকে পুষে রাখে নিজের ভেতরে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মুসা। একটা জীবন পেরিয়ে যাচ্ছে, অথচ জীবন যাপন হলোনা। নিঃসঙ্গ মানুষের কষ্ট তার চারপাশের কেউই বোঝে না।
গত সপ্তাহ হতে তার নিজের মধ্যে পুরাতন কষ্টগুলো আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। নিজের এলাকার দিকে খেয়াল রাখতে রাখতে নিজের খেয়াল হলোনা। মানুষের জীবনকে গুছিয়ে দিতে দিতে তার নিজের জীবন গোছানো হলো না। সংসার এক আশ্চর্য অধ্যায়। কিছু মানুষ পুরো পৃথিবী পায়, অথচ একটা সংসার পায় না। তার মনে হচ্ছে, তিনি নিজেও সেরকম একজন মানুষ হয়ে গেছেন। নিজেকে আজ বেশী বেশী নিঃসঙ্গ লাগছে।
থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর তেমন চাপ নেই। রিমি একা একা বসে আছে। সকাল দশটা পেরিয়েছে। যে কোয়ার্টারে উঠেছে, সেখানেও একা একা থাকা। সেখানে একঘেয়েমি লাগে বলে হেলথ কমপ্লেক্সেই চলে আসে। একা একা রুমে থাকার চেয়ে এখানে চলে আসলে অন্তত কিছু মানুষের সাথে দেখা হয়, কথা হয়। রুমের বাইরে অপেক্ষমাণ রোগিদের জন্য রাখা চেয়ারে সেই যুবক বসে আছে। রিমি অবশ্য এখন তার নাম জানে। টুটুল।
সে যুবক এখনো তার কাছে এক রহস্য মানুষ। রিমি আজো জানে না, সে কে? কেন তার সাথে লেগেই আছে! ঢাকা হতে এসে এই লোহাগড়া অব্দি তার সাথে সাথেই আছে? তবে রিমি এখন বুঝে নিয়েছে, টুটুল তার কোন ক্ষতি করবে না। তবুও মাঝে মাঝে ভয় লাগে। যদি কথাবার্তায় টুটুল একজন দারুণ মানুষ। বোঝা যায় শিক্ষিত। কিন্তু ঠিক কি কাজে সে এখানে তার সাথে সাথে আছে, সেটা এখনো বুঝে উঠতে পারছে না।
সেদিন বাস স্ট্যান্ড এ ওকে দেখে চোখ ভিজে যাবার ঘটনাটা নিয়ে টুটুল জিজ্ঞেস করেছিলো কয়েকবার। কি হয়েছে? ঢাকা হতে লোহাগড়া আসার পুরো পথ টুটুলকে নিয়েই ভেবেছিল, টুটুল কেন ঢাকা হতে আসার সময় দেখা করল না, সে জন্য মন ভার হয়েছিল । কিন্তু এখানে এসে কিছুই মুখ ফুটে বলতে পারেনি। বলতে পারেনি এটুকুও যে, তাকে এখানে লক্ষীপাশা বাসস্ট্যান্ডে দেখে আনন্দে কান্না এসে গিয়েছিল। রিমি এখন বুঝতে পারে, সে টুটুলকে পছন্দ করা শুরু করেছে। কিন্তু তার সাথে কোন কথাবার্তার সময় যেন তাকে পছন্দের ব্যাপারটি টুটুল টের না পায়, সে নিয়ে রিমি খুব সতর্ক রয়েছে। তবে টুটুল একটু অন্যধরণের মানুষ। সে আগ বাড়িয়ে আজ অব্দি রিমির সাথে কোন কথাই বলে নি। নীরব দেহরক্ষী ধরনের একজন মানুষ হয়ে সারাক্ষণ তার চারপাশে থাকে। টুটুল এখানে কোথায় উঠেছে, জানা হয়নি। এখন রিমির মনে হচ্ছে, একবার জিজ্ঞেস করবে। সকালে কোয়ার্টার হতে বেরোবার সময় টুটুলকে প্রতিদিন কোয়ার্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। যতক্ষণ হাসপাতালে থাকে, সে রুমের সামনে থাকে। বিকেলে ফিরে গিয়ে বাসায় ঢুকা অব্দি সারাক্ষণ একজন মানুষ, নিজেকে মাঝে মাঝেই একজন খুব স্পেশাল কেউ একজন বলে মনে হয়। ভাবতে ভাবতে মনে হলো, আজ রাতে টুটুলকে তার সাথে ডিনার করতে বললে কেমন হয়
মোবাইলটা বেজে উঠতেই রিমি চমকে উঠলো। মা ফোন করেছে।
-মা, কেমন আছ তুমি?
-আমি ভালো আছি। তুই কেমন আছিস? ওপাশ হতে সুরাইয়া আক্তার বললেন।
-আমিও ভালো আছি।
-তোদের ওখানে দেখলাম বিধবা ভাতা নিয়ে কি এক সমস্যা হয়েছে।
কথাটা শুনেই রিমি হেসে ফেলল। রিমি এখানে আসার পর হতে নিউজপেপারে শুধু নড়াইলের লোহাগড়ার খবর খোঁজে মা।
-মা, আমি নিজেই জানিনা এ ঘটনা কবে হলো।
-কি বলিস, তুই জানিস না? আমি তো তিনটা পত্রিকায় এ খবর দেখলাম। কি যে হলো দেশটার!
রিমি বুঝে ফেলেছে, মা এখন দেশের ভবিষ্যত কতোটা অন্ধকার, তা নিয়ে দশ মিনিট কথা বলবেন। রিমি চুপচাপ কথা শুনে যাচ্ছে। মা ওপাশ হতে বলেই যাচ্ছেন। মায়ের কথা শেষ হতে না হতেই সিস্টার এসে জানালো, দুজন রোগী এসেছে। ওদের একজন একজন করে ভেতরে পাঠাতে বলল রিমি।
মুসা এইমাত্র এলাকার ইমাম সাহেবদের সাথে কথা বলে শেষ করে কাছারিঘরে ঢুকলেন। আজ বৃহস্পতিবার। কাছারিঘরের ভেতর মুসা একা একা বসে আছেন। টেবিলের উপর রাখা মোবাইলটা তুলে একটা কল দিলো। ওপাশে কেউ ধরল না। রিং বেজেই চলেছে। একসময় সেপাশের রিংও থেমে গেলো। মুসা হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মুসা কিছুক্ষণ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রইলেন । তারপর মোবাইলের ডায়াল স্ক্রিনে একটা নাম্বার টাইপ করে কল করলেন। এক রিং এই ওপাশ হতে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো? মুসা শুধু জিজ্ঞেস করলেন,
-কি অবস্থা?
ওপাশের জবাবটা শুনে একটা আশ্বস্তির প্রশান্তি ফুটে উঠলো তার মুখে। ফোনটা টেবিলের উপর রেখে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে একটা সিগারেট ধরালেন মুসা। সিগারেট টানতে টানতে শাহজাহানকে ডাক দিলেন। শাহজাহান ঘরের ভেতর ঢুকতেই বললেন, থানার ওসিকে আমার সাথে দেখা করতে বলবি আজ বিকেলে। এলাকায় কি কি হচ্ছে, সেগুলোর কোন খবর রাখে না এরা। শাহজাহান জ্বী হুজুর বলে ঘর হতে বেরিয়ে গেল।
মুসা কি যেন ভাবছেন। মোবাইলে কিছু এস এম এস এসেছে। সেগুলোকে গভীরভাবে দেখছেন। কারা তাকে এ মেসেজ পাঠাল, বোঝার চেষ্টা করছেন মুসা।
রিমি লোহাগড়া এসে নিজেই রান্না করে খাচ্ছে। দিনের বেলা একজন এসে ঘর ঝাড়ামোছা করে যায়। সে আজ সন্ধ্যার পরও ছিলো। আজ মেহমান আসবে বলে সেও রিমিকে সাহায্য করছে রান্নাঘরে।
মনটা কেমন যেন হয়ে আছে। টুটুলকে বলেছে আজ রাতে ওর সাথে খাবারের জন্য। রাত আটটার দিকে আসবে সে। মনের মধ্যে একটা অন্যরকম আনন্দ হবার কথা ছিলো। কিন্তু কেন যেন সে আনন্দটা আসছেনা। ঠিক কি কারণে এমনটা হচ্ছে, রিমি বোঝার চেষ্টা করছে। কেন যেন তার মনে হচ্ছে, আজ কিছু একটা ঘটবে! মনকে স্থির করে ভাবার চেষ্টা করল সে। নাহ, মনের অস্থির ভাবটা কাটছেই না।
এদিকে রান্নার কাজ শেষ। হাতমুখ ধুয়ে রিমির মনে হলো, একটা শাড়ি পরে নিলে ভালো হয়। সবুজ রং তার ভালো লাগে। সাথে একটা সবুজ টিপ পরবে। আবার তখনই তার মনে হলো, টুটুলের জন্যেই কি সে শাড়ি পরতে চাচ্ছে?
আটটা বাজতে আর দশ মিনিট বাকী আছে। টুটুল নিশ্চয়ই চলে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যে। আয়নায় নিজের চেহারার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো। সবুজ শাড়ি, কপালে সবুজ টিপ; নিজেকে দেখে রিমি সন্তুষ্ট। ঠিক আছে। টেবিলে রাখা খাবারগুলোর দিকে তাকাল। সে। টুটুল এলে কোন চেয়ারে বসাবে আর সে কোন চেয়ারে বসবে, তা নিয়ে কি যেন চিন্তা করল। একটা অসম্ভব সম্ভাবনা মাথায় আসতেই নিজে একা একা একটা সলাজ হাসি দিলো।
ফোনে রিং বেজে উঠতেই ঘড়ির দিকে তাকাল রিমি। আটটা বেজে গেছে। আশ্চর্য, টুটুল আসেনি এখনো। হেলথ কমপ্লেক্স এর ডিউটি ডাক্তারের ফোন। ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ হতে শুধু বলল, তাড়াতাড়ি হাসপাতালে আসেন। বলেই লাইনটা কেটে দিল।
রিমি অবাক হয়ে গেল। এত রাতে জরুরী কি হয়েছে? টুটুল কোথায়? আসেনি কেন?
বাসার গেটে তালা লাগানোর সময় আবার ফোন বেজে উঠলো। মা ফোন করেছে।
তালা বন্ধ করে হাঁটা শুরু করল। অন্যান্য দিন টুটুল আশেপাশে দৃষ্টিসীমার মধ্যে থাকতো। আজ টুটুলকে দেখা যাচ্ছে না। একটা ভয় ভয় ভাব তার মধ্যে চলে এসেছে। মায়ের ফোনটা ধরল রিমি। ও পাশ হতে মা উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
-তোদের ওখানে কি হয়েছে?
-কেন মা? কই কিছু হয়নি তো।
-তুই কিছুই জানিস না। কি একটা হামলা নাকি হয়েছে ওখানে? টিভিতে দেখিয়েছে। সন্ধ্যার পরই তো হলো। তুই কোথায়?
-আমি তো বাসায়, মা। ইচ্ছে করেই ব্যাপারটাকে হালকা করার জন্য মিথ্যে কথাটা বলল রিমি। ও পাশ হতে সুরাইয়া আক্তার বললেন,
-তুই বুঝতে পারছিস না। তুই হাসপাতালে খবর নে। তোদের লোহাগড়ার কথাই তো বলল।
-মা, তুমি এত কিছু নিয়ে ভাবো কেন? শুধু শুধু টেনশন করছ তুমি। পুরো পৃথিবী বাদ দিয়ে তুমি এই লোহাগড়াকে নিয়েই পড়লে কেন?
-তুই কি বুঝবি? তুই কিছুই বুঝবি না কেন আমি অমন করি।
হাসপাতালে ঢুকার মুখে অনেক লোকের ভিড় দেখে রিমি থমকে গেল। ভিড় ঠেলে এগোতে এগোতে যা বুঝলো, কারা যেন এখানে কার উপর হামলা করেছে। কিছুটা ঘাবড়ে গেলো রিমি। একটা হামলার প্রেক্ষিতে এখানে এত মানুষের ভিড় কেন? একজনকে উত্তেজিত গলায় কথা বলতে শোনা গেল, মুসা ভাই এর যদি কিছু হয়, তাইলে কিন্তু খবর আছে।
হাসপাতালের ভেতর ঢুকতেই থানার ওসি সাহেবের সামনে পড়ল। উনি মোবাইলে কাউকে বলছেন, জ্বি স্যার। উনি নিজে এটা আঁচ করতে পেরেছিলেন। আমাকে বিকেলেই জানিয়েছিলেন। সন্ধ্যায় মাগরিবের পর বাড়ির সামনের রাস্তায় হাঁটতে গিয়েছিলেন। এটি উনি প্রতিদিনই করেন। যারা এ হামলা চালিয়েছে, তারা দেখে শুনে উনার এ অভ্যাসটাকে স্পট করেই প্ল্যান করেছিল, স্যার। স্যার, লোন উল্ফ পদ্ধতিতে এটাক হয়েছে।
রিমি সরাসরি ওটির দিকেই যাচ্ছিল। লোন উলফ কথাটা কানে যেতেই রিমি দাঁড়িয়ে ওসি সাহেবের কথা শুনতে লাগলো। লোন উল্পফ পদ্ধতিটাতো জঙ্গিদের স্টাইল। পেপারে এ নিয়ে পড়েছিল সে। এরকম কয়েকটা অপারেশন ওরা ঢাকাতেও চালিয়েছিল। ওদিকে ওসি সাহেব বলে যাচ্ছেন,
-না না, স্যার। গুলি নয়। কুপিয়েছে। সমস্যা অন্যখানে। মুসা সাহেব ভালো ইনজুর্ড, তবে উনাকে বাঁচাতে গিয়ে আরেকজন আহত হয়েছে। তাকে আমরা চিনিনা। সে লোকটা কিছুটা বিপদজনক ধরণের। জ্বী, স্যার। এটাক করেছিল দুজন। সে দুজনও আহত হয়েছে। যে লোকটা মুসা সাহেবকে বাঁচাতে গিয়েছিল, সে ঐ দুজনকেই গুলি করেছে। আমি জানিনা এখনো, এ লোকটা কে বা তার কাছে পিস্তল এসেছে কিভাবে?
ওটির সামনেও ভিড়। রিমি অবাক হয়ে গেল, অনেক লোকের মাঝে ক্যামেরাসহ কয়েকজন সাংবাদিকও সেখানে আছে। রিমি ওদের পাশ কাটিয়ে ওটির দিকে পা বাড়ালো। মুসা লোকটা মনে হয় এলাকার হোমড়া চোমড়া কেউ!
(চলবে)
এ গল্পটি আমার ছায়া গল্পগ্রন্থে (২০২১) প্রকাশিত হয়েছিল।
Comments
Be this story’s first reader
+25 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.