রুমে ফিরতে ফিরতে রাত একটা বেজে গেছে। যতোটা ক্লান্তি তার চেয়ে অনেক বেশী মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে রিমি ঘরে ফিরল। ঐ মুসা নামের লোকটার সাথে দ্বিতীয় লোকটা টুটুল। টুটুলের বাম হাতের বাহুতে একটা কোপ পড়েছে। মুসা সাহেবের ইনজুরি বেশী। তবে এখন অবস্থা স্ট্যাবল। জেলা সদরের সিভিল সার্জন দুজন সার্জন পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ডিসি স্যার এসেছিলেন, সদরের এসপিও এসেছিলেন। জঙ্গি দুজনের মৃতদেহ নিয়ে প্রচুর আলাপ আলোচনা হচ্ছিল। ওরা এ এলাকার নয়। রিমি সেখানে থাকা লোকজনের কথায় কথায় যা বুঝলো, মুসা লোকটা নাকি ভালো। আর এ জঙ্গিরা নাকি সংবাদ শিরোনাম হবার জন্যেই রাজধানী হতে দূরবর্তী জেলাগুলোতে এ ধরণের কাজ করার প্ল্যান করেছিল। রাতেই হাসপাতাল হতে এস পি স্যার টিভি ক্যামেরায় কথা বললেন। ঐ দুজন জঙ্গির ছবিও তুলেছে সাংবাদিকরা। টুটুলের বিছানার পাশেই কেন যেন দুজন পুলিশ পাহারা দেয়া শুরু করেছে। সম্ভবত ও এখানে অচেনা মানুষ এবং তার সাথে পিস্তল ছিলো বিধায় পুলিশ এ ব্যবস্থা নিয়েছে। ঐ অস্ত্রটা বৈধ নাকি অবৈধ, সেটাও তো জানা দরকার। রাতারাতি লোহাগড়া দেশের সব টিভি চ্যানেলে এসে গেল।
মা ফোন করেছিলেন কয়েকবার। তিনি টেলিভিশনে দেখে দেখে এটা ওটা জিজ্ঞেস করলেন। মুসা সাহেবকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। আর সাথে যে উনাকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হয়েছে, তার ব্যাপারেও জিজ্ঞেস করলেন। মায়ের কৌতূহল দেখে বেশ অবাক লাগলো রিমির। অবশ্য তাদের মা মেয়ের জীবনে এ ধরনের ঘটনার অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম। আর রিমি এখানে আছে বলেই মা এতকিছু জিজ্ঞেস করেছে, রিমি ভাবলো। টেবিলে রাখা খাবারগুলোর দিকে তাকাল একবার। বুকের ভেতর খাঁ খাঁ করে উঠলো টুটুলের জন্য। আয়নার সামনে গিয়ে সবুজ টিপটা খুলে আয়নায় লাগিয়ে রাখতে গিয়ে আবার মনে পড়ল টুটুলের কথা। একরাশ অভিমান এসে ভিড় করল যেন মনের ভেতর। কি দরকার ছিল ঐ লোককে বাঁচাতে যাবার? কিন্তু টুটুলের কাছে পিস্তল কেন?
ক্লান্তিতে দু চোখ বন্ধ হয়ে আসছে রিমির। আর কিছু ভাবতে চায়না সে আজকের দিনটাকে নিয়ে। ঘুম পাচ্ছে তার। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেল রিমি।
ঘুমের ভেতর মনে হয় মানুষের ভেতর আরেকটা মানুষ জেগে উঠে। জাগতিক মানুষ ঘুমালে ভেতরের সেই মানুষ জেগে উঠে। সে মানুষ এটা ওটা করে, নানান কিছু বলে, জাগতিক পরিচিতদের সাথে কথা বলে, নানান কাজ করে। জাগতিক মানুষটা ঘুম ভাঙ্গার পর সেসবের কিঞ্চিৎ মনে করতে পারে। সে তখন সেগুলোকে স্বপ্ন বলে ভাবে। রিমির মনে হলো সারা রাত ঘুমের মধ্যে সে টুটুলের সাথেই ছিলো। একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে তখন বা সে স্বপ্ন দেখেছে। কোন একটা জায়গায় খুব গোলাগুলি হচ্ছে। সেসবের মধ্যে সে টুটুলের পেছনে ওর গা ঘেঁষে একটা খামের পেছনে বসে থরথর করে কাঁপছে। টুটুল মাঝে মাঝে খামটার পাশে মাথা বাড়িয়ে কাকে যেন গুলি করছে। একবার সে বলল, টুটুল আমার ভয় করছে। টুটুল মুচকি হেসে বলেছে, আরে ধুর! ভয়ের কি আছে? আমি তো আছি।
রাতের স্বপ্নটার কথা মনে পড়তেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো রিমির। মানুষটাকে নিয়ে এত ভাবনা কেন আসে তার? অথচ তাকে তেমন চেনেই না সে। কিছুই তো জানে না সে টুটুল সম্পর্কে।
সকাল নটা বেজে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে হাসপাতালের দিকে এগোল রিমি। গতকাল রাতের ঐ ভিড় নাই, তারপরেও অনেক লোক সেখানে এখনো। ভেতরে গিয়েই রাতের দুই রোগীর কাছে গেলো। দুজনেই ঘুমাচ্ছে। মুসা, বয়স কত হবে? পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন হবে হয়তো। বেঘোরে ঘুমুচ্ছে মানুষটা। কাল রাতে শুনেছে লোকটা এলাকায় বেশ নামকরা। যা যা শুনলো, সব ভালোই শুনেছে। এলাকায় আধিপত্য আছে। মুসার বিছানার পাশে একজন কাল রাত হতে বসেই আছে। উনাকে কয়েকবার বলা হয়েছে সরে যাবার জন্য। রিমি লোকটার আনুগত্য দেখে অবাক হয়ে গেছে। লোকটা, শাহজাহান না কি যেন নাম; বসে বসে নীরবে চোখের পানি ফেলেই যাচ্ছে। আজকাল বিশ্বস্ত মানুষ দেখা যায় না।
রিমি এসে নিজের চেম্বারে বসে রইল। চেম্বারের বাইরে একবার চোখ গেলো। যে চেয়ারটায় প্রতিদিন টুটুল বসে থাকে, সে চেয়ারটা আজ খালী। পুলিশ এখনো তাকে পাহারা দিয়ে যাচ্ছে।
এগারটা বেজে গেছে। রিমি এর মাঝে আরো একবার দুই রোগীকে দেখে এসেছে। রুমে এসে একটু থিতু হতেই মায়ের ফোন। ফোনটা কানে নিতেই সুরাইয়া আক্তারের উত্তেজিত কণ্ঠ
-রিমি তুই কই?
-মা, আমি তো আমাদের এখানেই। থানা হেলথ কমপ্লেক্সে। রিমি জবাব দিলো।
- তুই একটু বাইরে আয়। আমি তোর হেলথ কমপ্লেক্সের সামনে।
-কি! রিমি প্রায় চিৎকার দিয়ে উঠে বাইরে বেরিয়ে অবাক। বাসার গাড়ি নিয়ে মা এখানে। মাকে দেখেই প্রায় ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছে। অল্প কদিনের না দেখা, তবু যেন অনেক বছর পর মা মেয়ের দেখা হলো। রিমি বলল,
-মা, তুমি? তুমি এখানে কিভাবে? এত সকালে!
-শোন মা, সেই ভোর চারটায় রওনা দিয়েছি। চল, তোর অফিস দেখি।
-আগে আমার বাসায় চলো।
-না, আগে তোর অফিস দেখবো। আর কালকের রোগী দুজন এখনো এখানে?
মায়ের কৌতূহল দেখে রিমি এবার অবাক হলো। দুষ্টুমির ছলে রিমিও জবাব দিলো,
-হ্যাঁ মা, এখনো আছে। তুমি রোগীদের দেখবা তো?
-হুম, দেখতেই এসেছি। কিছুটা গম্ভীর শোনালো সুরাইয়া আক্তারের গলা।
মুসার ঘুম ভেঙ্গেছে। পাশেই শাহজাহান দাঁড়িয়ে একমনে তাকিয়ে আছে মুসার চোখ মুখের দিকে। সেই কৈশোরবেলা এসেছিল সে মুসার কাছে। আজীবন একনিষ্ঠ অনুগতের ভূমিকায় ছিল সে। গতকাল সে আসর নামাজের পর বাজারে গিয়েছিল। সেখানেই সে ঘটনা শুনে দৌড়ে এসেছে। মরমে মরমে অনুতাপের আগুনে পুড়ে যাচ্ছে সে। কেন সে কালই হুজুরকে একা রেখে বাজারে গেলো! মুসার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েই আছে সে, যদি কোন কিছু মুখ ফুটে বলেন মুসা। এ সময় রুমটার দরজার পর্দা ঠেলে রিমি ঢুকলো, পেছনে পেছনে সুরাইয়া আক্তার।
দুজনকে দেখেই মুসা এবং শাহজাহান দুজনেই চোখ বড় করে তাকাল। শাহজাহানের দুচোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে কোটর ছেড়ে। সুরাইয়া আক্তারের দিকে দুপা এগিয়েই আচমকা মাটিতে বসে নীরবে কান্না করা মানুষটা চিৎকার করে ‘আম্মাজান’ বলে সুরাইয়া আক্তারের দুই পা জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলো। রিমি থতমত খেয়ে গেলো ঘটনার আকস্মিকতায়। মুসা পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছেন সুরাইয়া আক্তারের দিকে। বিড়বিড় করে শুধু বললেন,
-সুরাইয়া।
রিমি যেন আকাশ হতে পড়লো এবার। সুরাইয়া আক্তার আস্তে আস্তে এগিয়ে এলেন মুসার বিছানার দিকে। এসে মুসার কপালে হাত রেখে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। রিমি এক আশ্চর্য গোলকধাঁধার মধ্যে যেন পড়ে গেছে। একটা ঘোর লাগা অনুভূতি হচ্ছে তার মধ্যে। শাহজাহান পা ধরে কাঁদছেই, সুরাইয়া আক্তারের কান্না দেখে রিমিরও কান্না পাচ্ছে। মুসা নীরবে কাঁদছেন। পাশের রুম হতে সম্ভবত কান্নার শব্দ শুনেই টুটুল এসে ঘরে ঢুকলো। সে এসে রুমের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ালো।
কাঁদতে কাঁদতে সুরাইয়া আক্তার রিমিকে কাছে ডাকলেন। রিমি গিয়ে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে মায়ের কাঁধে মাথা রেখে হয়ত কিছু বুঝে বা না বুঝেই কান্না শুরু করে দিলো। মুসা’ই প্রথমে কথা বললেন,
-এত বছরে ফিরলে? ভালো ছিলে আমাকে ছেড়ে?
-তোমার উপর রাগ করে চলে গিয়েছিলাম সত্যি। কিন্তু একটা দিনও ভালো থাকিনি।
-আমার মেয়ে এখানে এসেছে ডাক্তার হয়ে আমি জানতাম। মুসা বললেন।
কথাটা শুনে রিমি অবাক হয়ে তাকাল। মুসা তখন চোখের ইশারায় টুটুলকে দেখালেন। রিমি ঘাড় ফিরিয়ে টুটুলের দিকে তাকালো। টুটুল দরজায় হেলান দেয়া অবস্থায় মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো।
-এত রাগ করে কেউ? আমি প্রতি বৃহস্পতিবার তোমাকে ফোন করেছি বছরের পর বছর। কোনদিন ফোন ধরোনি।
কথাটা শুনে কান্নার বেগ যেন আরো বেড়ে গেলো সুরাইয়া আক্তারের। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বললেন,
-আমি বুঝতাম, সেটা তোমার ফোন। কথা বলিনি ঠিকই। কিন্তু ঐ ফোন কলের জন্য আমি সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করতাম। মনে মনে ভেবে নিতাম, এটাই আমাদের জীবন। তোমাকে এখানকার জীবন হতে বের করতে চেয়ে নিজেই সারাজীবন তোমার কাছ হতে দুরে রইলাম। বলেই কাঁদতে লাগলেন।
রিমি এখন অনেক কিছু মিলিয়ে নিচ্ছে। বাবা সম্পর্কে মা কখনো কিছু বলেননি। একটু বড় হবার পর কখনো বাবাকে নিয়ে সে নিজেও কিছুই জানতে চায়নি। নানার কাছে একবার জিজ্ঞেস করাতে নানা রাগতস্বরে বলেছিল, তাঁর সম্পর্কে যেন আর কখনো কিছু জিজ্ঞেস না করে। রিমি আর কোনদিনই কারো কাছে জানতে চায়নি তার নিজের বাবার সম্পর্কে।
দুচোখে এক রাজ্যের কান্না নিয়ে মুসা এবার বললেন,
-আমি তো এদের ছেড়ে যেতে পারবোনা তোমাকে বিয়ের আগেই বলেছিলাম। এখানে তুমি থাকতে চাওনি, আবার তোমার বাবাও তো তোমাকে এখানে রাখতে চাননি। যতোটা তুমি আমায় ছেড়ে গেছে, তার চেয়ে বেশী তোমার বাবা তোমাকে এখান হতে নিয়ে গেছেন।
কথাটা বলে এবার টুটুলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-এদিকে আয় বাবা।
টুটুল দূর্বল ভঙ্গীতে এগিয়ে এলো বিছানার পাশে। টুটুলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
গত কয়েকটা মাস কষ্ট করেছিস অনেক। তোর পেমেন্ট নিয়ে নে। কাল তুই না থাকলে হয়ত ওরা আমাকে মেরেই ফেলত।
-কিসের পেমেন্ট, বা_বা_বাবা? আমতা আমতা করে বাবা বলে ডেকে ফেলল রিমি।
-মা, ও তোর বডিগার্ড হিসাবে ছিলো। সেটার পেমেন্ট। আর গতরাতে আমাকে বাঁচালো বলে ওকে এক্সট্রা পেমেন্ট দেয়া হবে। এখন যা, বিশ্রাম নে। টুটুল নির্বিকার মুখে সব শুনলো।
-আমি আমার রুমে যাচ্ছি। ছদিন পর স্টিচ কাটবে। সেদিন আমি চলে যাবো। আমার জন্য দোয়া করবেন। বলে টুটুল টলটলায়মান পায়ে পাশের রুমের দিকে এগোলো।
টুটুল ওর বডিগার্ড ছিলো? পেমেন্ট পাবার পর চলে যাবে? টুটুলের পেছনে পেছনে রিমি বেরিয়ে গেলো। মুসার রুমের বাইরেই পেছন হতে রিমি ডাক দিলো,
-টুটুল।
টুটুল ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল।
-সত্যি তুমি চলে যাচ্ছ? রিমি জিজ্ঞেস করল।
-আমার কাজই তো এটা। বলে টুটুল নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেলো। একটু এগিয়ে গিয়ে থেমে রিমির দিকে ফিরে বলল,
-তোমার কখনো দরকার পড়লেই আমি চলে আসব। তবে হায়ার পেমেন্ট লাগবে। দুর্বল কণ্ঠে মুচকি হেসে টুটুল বলল। রিমি দৌড়ে ঢুকলো তারা বাবার রুমে। ঢুকেই বলল,
-বাবা, টুটুল যাবে না। উত্তেজনার বশে কথাটা বলেই লজ্জা পেলো সে। শাহজাহান এবার কথা বলে উঠল,
-কেমনে যাইব? যাইব না। জীবনের পয়লা আবদার আমগো বেটির। বলেই রুম হতে বেরিয়ে টুটুলের রুমের দিকে ছুটল সে।
সুরাইয়া আক্তার কান্না ভরা চোখে একবার মেয়ের দিকে, একবার মুসার দিকে তাকাচ্ছে। রিমি একদৃষ্টিতে বাবাকে দেখছে। মুসা সুরাইয়া আক্তারের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-খুব চাইতাম, জীবনের শেষ সময়টাতে তুমি আমার পাশে থাকো। আল্লাহ আজ আমায় আমার সবকিছু ফিরিয়ে দিয়েছেন। আলহামদু লিল্লাহ।
সমাপ্ত
এ গল্পটি আমার ছায়া গল্পগ্রন্থে (২০২১) প্রকাশিত হয়েছিল।
Comments
Be this story’s first reader
+25 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.
-
-
probash khobor 3 hours ago
একটা দারুণ গল্প। সিম্পলি এক্সিলেন্ট।