Story

মিড-লাইফ ক্রাইসিস

September 27, 2026

12 views

ইদানীং মাজেদা বেগমের যেন কি একটা জটিল অসুখ হয়েছে!

সারাদিন মাথার ভেতর বিচিত্র সব কথোপকথন চলতে থাকে। কথোপকথনের কেন্দ্রে থাকেন তার স্বামী। অনেকটা কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর মতো পরিস্থিতি। কখনো তার স্বামীর বিপরীতে থাকেন বিচারক, কখনো শিক্ষক, কখনো পুলিশ। কিন্তু কোনোবারই কল্পিত সেই তর্কে নাসিম সাহেব হারেন না।

মাজেদা বেগম তার এই অসুখের কি নাম দেবেন ভেবে পাননা। এখনও তার মাথার ভেতরে সেইরকমই কিছু একটা চলছে। কল্পনায় তিনি এবং নাসিম সাহেব একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞের চেম্বারে বসে আছেন।

ডাক্তার সাহেব তাকিয়ে আছেন নাসিম সাহেবের দিকে, ‘জ্বি বলেন, কি সমস্যা আপনার?’

মাজেদা বেগম পাশ থেকে উত্তর দিলেন, ‘ডাক্তার সাহেব, এখন তো ভাদ্র মাস চলতেছে, প্রচণ্ড গরম। এই গরমে উনি সকাল সাড়ে সাতটায় প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার আগে গিজারে বিশ মিনিট পানি গরম করেন, তারপর গোসল করেন। একটু দেখবেন, উনার শরীরে কি সমস্যা?’

ডাক্তার নাসিম সাহেবকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কি সমস্যা আপনার, ঠান্ডা লাগে?’

‘জ্বি। ঠান্ডা লাগে সকালে।’

‘রাতে ঘুম হয়?’

আবার মাজেদা বেগম উত্তর দিলেন, ‘জ্বি না। উনিতো গরমে রাতে ঘুমাতে পারেন না। আমাদের বাসায় এসি নেই, সারারাত ঘামে উনার গা জবজব করে।’

ডাক্তার সাহেব বিরক্ত হয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই নাসিম সাহেবের ডাকে মাজেদা বেগম কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরে আসেন।

'কি যে চিন্তা করো সারাক্ষণ! চায়ে চিনি দেও।'

মাজেদা বেগম চায়ে আধা চা-চামচ চিনি দিয়ে সামান্য ঘুটে দেন।

কাপে চুমুক দিতে দিতে নাসিম সাহেব পত্রিকা পড়তে থাকেন।

পড়া শেষ করে অফিসে রওনা দেন।

এ বছর স্বামী এলপিআরে যাবেন ভেবে তিনি যথেষ্ট দুশ্চিন্তায় আছেন।

সকাল নয়টা থেকে দশটা পর্যন্ত মাজেদা নিজের মতো করে সময় কাটান। বই পড়েন অথবা গান শোনেন। তারপর ঘর গুছিয়ে, রান্নার কাজ।

মুরগি কষাতে কষাতে আবার কল্পনার জগতে চলে যান।

দৃশ্যকল্পে এবার তাঁরা দুজন ভবন কমিটির সভাপতির সামনে।

‘নাসিম সাহেব, একটা বিষয়ে কথা বলতে এসেছি। আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে বিভিন্ন ফ্ল্যাট থেকে।’

‘জ্বি, বলেন।’

‘আপনি মনে হয় গরমের মধ্যে সকালে দীর্ঘক্ষণ গিজার চালু করে রাখেন। এ কারণে নিচ থেকে উপর পর্যন্ত সব ফ্ল্যাটের পানি গরম হয়ে যায়।’

‘আচ্ছা? সেটা সম্ভব?’

‘জ্বি সম্ভব। আমাদের স্যানিটারি মিস্ত্রী বলেছে, সম্ভব।’

নাসিম সাহেবের একরোখা, রাগী চাহনি দেখে ভদ্রলোক ঢোক গিলে পরের প্রসঙ্গে চলে যান।

‘দ্বিতীয় বিষয় হলো, আপনি অকারণে সকাল থেকে শুরু করে দীর্ঘ রাত পর্যন্ত ঘরে আলো জ্বেলে রাখেন।’

নাসিম সাহেব বুকের কাছে দুই হাত কষে ভাঁজ করে প্রশ্ন করেন, ‘তাতে অন্যদের কি অসুবিধা?’

‘অন্যদের সরাসরি কিছু না হলেও বিদ্যুৎ বেশি খরচ হয়। আমরা গরিব দেশ, অপ্রতুল বিদ্যুৎ উৎপাদন করি।’

এ পর্যন্ত শুনে নাসিম সাহেব উঠে দাঁড়ান। বাধ্য হয়ে সভাপতিকেও উঠে পড়তে হয়। তিনি দরজা দিয়ে বের হতে হতে বলেন,

‘কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার বলে গেছেন,

যে জন দিবসে, মনের হরষে, জ্বালায় মোমের বাতি

আশু গৃহে তার, দেখিবে না আর, নিশীথে প্রদীপ ভাতি।’

ঠিক এই সময় কলবেলের শব্দে মাজেদা বেগম বাস্তবে ফিরে আসেন।

শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ও ঘাড়ের ঘাম মুছে নেন। তারপর দরজা খুলে স্বামীর নামে আসা পার্সেল রিসিভ করেন। রান্না শেষ করে গোসলে যাওয়ার আগে পার্সেলটা খুলে দেখেন।

‘হাতে কলমে এ আই শিখি' দুই খণ্ডের বই মোট আটশ টাকা নিয়েছে ডেলিভারি চার্জ সহ। মাজেদা বেগম একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

Picked up where you left off

Comments

তারিক হোসেন was this story’s first reader

+20 XP

    Please login to post comment. Login

  • তারিক হোসেন 13 hours ago First reader

    অনেক সুন্দর গল্প। অনেক ভালো লিখেছেন। আরো সুন্দর সুন্দর গল্পের অপেক্ষায় রইলাম।

    • Shahzadi Nasrin 12 hours ago

      অসংখ্য ধন্যবাদ @tarik_hossain ।