বায়জিদ ভোর সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুলের জন্য তৈরি হতে থাকে। আজ তার স্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। রাতে উত্তেজনায় সে ঘুমাতে পারেনি। টিউবওয়েলের ঠান্ডা পানিতে গা ধুয়ে সে রান্নাঘরে ঢাকা দিয়ে রাখা পান্তা ভাত লবণ দিয়ে ডলে গপাগপ গিলে ফেলে।
বায়জিদের মা জেগে থাকলে তাকে ডিম ভেজে দিতো। কিন্তু ইদানীং তার মা প্রায়ই সারারাত জেগে থাকে ছোট ভাই মাহাদীর জন্য। মাহাদীর বয়স মাত্র ছয় মাস।
গ্রামের একমাত্র প্রাইমারি স্কুলে সে তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষার্থীদের থেকে তার নামটা একেবারেই ভিন্ন।
তার বাবা গ্রামের মসজিদে শুক্রবারের খুতবায় বায়জিদ বোস্তামীর গল্প শুনেছিলেন। সেই গল্প তার মাকেও শোনান। সে পেটে থাকার সময়ে মা এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নে মায়ের খুব পিপাসা পাচ্ছিলো। চোখ খুলে একটা ছোট্ট ছেলেকে টিনের গ্লাসে পানি হাতে দাড়িয়ে থাকতে দেখে মা। নাম জিজ্ঞাসা করলে উত্তর আসে, "বায়জিদ"।
এই হচ্ছে তার নামকরণের ইতিহাস।
বায়জিদ মায়ের ঘুম ভাঙায় না। ভেজা চুল একটু তেল দিয়ে আঁচড়ে স্কুলের জামা পরে রওয়ানা হয়। সে ১০০ মিটার দৌড়ে নাম দিয়েছে। ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড যেকোনো একটা হলেই কাঁচের বাটি অথবা ফুলদানি পাবে। আর মেডেল তো পাবেই।
তাদের স্কুলকে আজ অন্যরকম দেখাচ্ছে। লম্বা দড়িতে রঙিন কাগজ আঠা দিয়ে লাগিয়ে মাঠ সাজানো হয়েছে। সকাল ৯ টার দিকে প্রধান অতিথি আসলে খেলা শুরু হয়ে যাবে।
আজকে সব বাবা মায়েদের স্কুলে দাওয়াত আছে। মায়ের আসার সম্ভাবনা খুবই কম। তবুও সে আশা করে থাকে। অবশ্য সেটা নির্ভর করছে মাহাদীকে কারো কাছে রাখতে পারবে কি না তার উপর। ক্ষণে ক্ষণে বায়েজিদের চোখ চলে যাচ্ছে গেটের দিকে। সাড়ে এগারোটায় দৌড় শুরু হবে। আর মাত্র বিশ মিনিট বাকি।
দৌড়ের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে বায়জিদ এদিক ওদিক তাকিয়ে মা কে কোথাও খুঁজে পায় না। অনেক মন খারাপ নিয়ে দৌড়ে অংশগ্রহণ করে সে। একটুর জন্য ফোর্থ হয়। থার্ড হলে সে ফুলদানিটা মাকে দিতে পারতো।
সব ধরনের দৌড় শেষ হওয়ার পর মায়েদের জন্য বালিশ খেলা আর বাবাদের দড়ি টানাটানি। সব শেষে যেমন খুশি তেমন সাজো, তারপর পুরস্কার।
ক্লাস ওয়ানে থাকতে সে দৌড়ে একবার থার্ড হয়েছিল। মা এসেছিল সেবার। বায়জিদ বোস্তামী সাজিয়ে দিয়েছিলো মা তাকে। তবে পুরস্কার পায়নি।
বালিশ খেলা শুরুর ঠিক পাঁচ মিনিট আগে বায়জিদের বাবা, মা আর মাহাদী আসে। মাহাদী কে বাবার কোলে দিয়ে মা বালিশ খেলায় অংশগ্রহণ করে। পুরস্কার ও পায়।
ফেরার পথে কাঁচের বাটিটা বুকের কাছে নিয়ে সে মায়ের পাশে পাশে হাঁটতে থাকে। দৌড়ের আগে তার গলার কাছটায় কেমন করছিল। বুকটা ও ভারী হয়ে ছিল। সেসব এখন আর নেই। আজকের বিষন্ন দিনটাকে হঠাৎ করে তার খুব ভালো লাগতে থাকে।
লেখকের নোট: আমার প্রথমদিককার লেখা মৌলিক শিশুতোষ গল্প। ফেইসবুকে প্রকাশিত।